Skip to main content

Full text of "Grihabhanga"

See other formats


অন্তর্ভারতীয় পুত্ডভকমালা 
গৃহতল 


এস. এল, ভৈরপ্লা 
অনুবাদ 
নন্দিতা মুখোপাধ্যায় 





- ঃ 
সি. 
স্্ 


ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ইগ্ডিয়া 


পাপা পাপা 


1990 (শক 1912) 
মূল 6 এস. এল. ভৈরপ্লা 

বাংল] অনুবাদ ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ইণ্ডিয়া, 1990 
মূল্য 8 3000 টাকা 


07017911119: 09111/53171/50/5 11621772092) 
981109/1 112175/21101 : 59111881104 


নির্দেশক, ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ইপ্ডিয়া, এ-5, গ্রীন পার্ক, নয়াদিল্লি-110016 
কর্তৃক প্রকাশিত 


ভুমিকা 


বতমান শতকের শুরুকে কন্নড় উপন্যাস-সাহিত্যের জন্মকাল বলে ধরা হয়। এই জন্ম- 
লগ্নটি যাঁদের কতিত্ে সুচিহিন্তি তাঁদের মধ্যে স্বগাঁয় গন্লগনাথের নামই বিশেষভাবে উল্লেখ- 
যোগ্য ৷ এ্রতিহাসিক বিষয়বস্ন্ত এবং বতমান যুগের বিপুল বিস্তৃতিকে গল্লগনাথ তাঁর উপন্যাসে 
রূপ দিয়েছেন। কনড় উপন্যাস-সাহিত্যকে তিনি এক সুদুঢ় ভিভির ওপর স্থাপিত করেছেন 
এবং সেই সঙ্গে অন্যান্য ভাষার উপন্যাস-সাহিত্যের সঙ্গে কড় ভাষা ও সাহিত্যের অনুরাগী- 
দের পরিচয়ও করিয়ে দিয়েছেন। গল্লগনাথের এতিহ্য অনুসরণ করে কমশঃ এই সাহিত্য 
আরো সমৃদ্ধ হয়েছে তো বটেই, সঙ্গে সঙ্গে প্রগতিশীল, নবোদয়, রাঘ্য, নব্য ইত্যাদি নানা 
শাখাপ্রশাখায় তা আরো পল্লবিত হয়ে উঠেছে । এ সম্পকে আলোচনা প্রসঙ্গে দুটি গুরুত্ব- 
পূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার । প্রথম--নব্যদল এবং অন্য সমস্ত গোষ্ঠীগুলিই নিজেদের 
বিশেষ মতবাদপুষ্ট ধারাগুলিকে অনুসরণ করে চলেছেন তাঁদের রচনায়, আর দ্বিতীয়--- 
এ'রা ছাড়াও রয়েছেন কিছু বিখ্যাত উপন্যানকার, যাঁরা কোন বিশেষ গোষ্ঠীতুক্ত বলে 
নিজেদের চিহ্িগতি করেননি । সাম্প্রতিককালের কন্নড় সাহিত্যের সমালোচনাগুলিতে 
প্রধানতঃ এই দ্বিতীয় শ্রেণীর উপন্যাসকারদের রচনাই আলোচিত হচ্ছে। ডঃ ভৈরপ্পার 
রচনা সম্বন্ধে আলোচনা করতে গেলে এই কথাটি বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, কারণ 
কন্নড় ভাষার দুই মহান ওপন্যাসিক--ডঃ শিবরাম কারন্ত ও ডঃ এস. এল. ভৈরপ্পা এরা 
দুজনেই কখনো কোন গোষ্ঠী বা দলভুক্ত বলে নিজেদের প্রচার করেননি । উপন্যাসকারের 
অনুসন্বিৎসু দৃষ্টি দিয়ে এরা জীবনকে দেখেছেন এবং নিজেদের সৃষ্টির মধ্যে তাকে 
যথাযথভাবে রূপ দিয়েছেন। বিভিন্ন মতবাদ বা আদর্শের অন্ধ অনুসরণকারী সাহিত্যিকদের 
সাহিত্যকৃতির মধ্যে ব্যাপ্তি বা উদারতার অভাব কুমশই উপলব্ধ হয়েছে, তবু এখনও কিছু 
সাহিত্যিক আছেন যাঁরা সাহিত্যক্ষেত্রে জীবনের সন্কীর্ণ একপেশে ছবিই একে চলেছেন। কন্নড় 
ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার শ্রীরঙ্গ কনডুসাহিত্যের প্রথম মনস্তাত্বিক উপন্যাসের রচগ্িতা। 
“দেবুডু'র জীবনের অভিজ্ঞতা সাহিত্যিকসুলভ সজনী প্রতিভার গুণে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। 
চতুরজজীর উপন্যাস “সর্বমজলা" ট্র্যাজিক উপন্যাস হিসাবে একটি নার্থক সুষ্টি। বিভিন্ন 
পুরুষ বা জেনারেশনের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন বিনায়ক গোকক 
তাঁর “দসমরসবে জীবন' (সমরসই জীবন) উপন্যাসে । কে. বি. পুষ্টপ্প (ক্বেম্পু) তাঁর রচিত 
'কানুর সুকম্ম হেগডতী” এবং “মলেগলন্লী মদুমগল্লু' পোহাড়তলার বউ) উপন্যাস দুটির 
মাধ্যমে বলতে চেয়েছেন গ্রামীন জীবনের মধ্যে যে উদার বিস্তৃতি আছে সেই উপকরণ 
দিয়ে মহাকাব্য রচনা সম্ভব। রাওবাহাদুর রচিত গ্রামায়ণ”« উপন্যাসে দেখানো হয়েছে 
গ্রামীণ জীবনের এক বিরাট ট্র্যাজেডি, কোন ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির চেয়ে যার আবেদন অনেক 
গভীর। একটি বিশেষ অঞ্চল যেন পাঠকের চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তালিকা 
আরো বাড়ানো যেতে পারে, কিন্তু মূল বক্তব্য হল, উপরোক্ত উপন্যাসগুলিতে উত্ত লেখকদের 


1 গৃহতঙ্গ 
সহজ স্বাভাবিক জীবনবোধ ও জীবনদুষ্টির প্রকাশ ঘটেনি, তার পরিবর্তে জীবনের তাব্র 
আবেগময় অস্বাভাবিক মুহ্তগুলির প্রতিই তাঁরা পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছেন। 
এদের মধ্যে অনেকেই সাহিত্যের অন্যান্য শাখাতেও নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন । 
একথা ভুললে চলবে না যে, ডঃ শঙ্কর মোকাশী “পুনেকরে'র বহ-আলোচিত উপন্যাস “গঙ্গব্বা 
গঙ্গামাঈ* (লেখকের একমান্তর উপন্যাস) এবং ডাঃ মু. আর. অনন্তমৃর্তি রচিত “সংস্কার, 
উপন্যাসটিও এই তীব্র আবেগপ্রবণতা ও স্বাভাবিকতার অভাব থেকে মুক্ত নয়। 

কন্নড় উপন্যাসজগতের এই পটভ্মিকায় ডঃ ভৈরপ্পার সাহিত্যকৃতি আলোচনা করতে 
বসলে মনে হয় কেবলমাত্র ডঃ শিবরাম কারন্ত এবং ভৈরপ্পা এই দ্লজনই তাঁদের রচনার 
মধ্যে সমাজের সবস্তূরর মানুষকে একন্র সমন্বিত করেছেন এবং নিজেদের ভাবনাচিস্তা 
ও জীবনবোধকে উপন্যাসের মাধ্যমে সঞ্চারিত করতে পেরেছেন সম্মীজের সকল স্তরের 
পাঠকদের মধ্যে। বর্তমানে কন্নড় ভাষার সাহিত্যকর্মের বিপুলতা সত্তেও ঠিক এই ধরনের 
প্রবণতা আর কারো রচনায় বড় একটা চোখে পড়ে না। 

আমাদের দেশের যুগসন্ধিকালের সমস্ত সমস্যাকে প্রতিফলিত করার ক্ষমতা রাখে 
একমাত্র উপন্যাস-সাহিত্য। তাই সাহিত্যের এই বিশেষ শাখাটির দায়িত্ব যথেষ্ট। ডঃ 
ভৈরপ্পা অত্যন্ত সচেতন এবং সংবেদনশীল মন ও ব্যক্তিত্রে অধিকারী, তাই তাঁর রচনায় 
যুগ-পরিবতনের সন্ধিলগ্নের অবশ্যস্তাবী সংঘাত, দ্বন্্, মনশ্চাঞ্চল্য ও আলোড়ন অত্যন্ত 
স্বাভাবিক দক্ষতায় চিম্নিত হয়েছে। 

ডঃ ভৈরপ্পার প্রথম উপন্যাস ধর্মশ্রী'। প্রেমের আকর্ষণে খম্টধর্ম গ্রহণে উদ্যত এক 
হিন্দু যুবকের জীবনের দ্বন্দের কাহিনী এটি। তাঁর পরবতী বহু উপন্যাসেই মানব মনের 
যুক্তি ও বৃদ্ধির সঙ্গে ভাবনা ও আবেগের এই সংঘাত বর্ণিত হয়েছে। ধর্মশ্রী” উপন্যাসে 
হিন্দু যুবকটির অন্তদ্বন্দ্ব চিন্রণের সঙ্গে সঙ্গে লেখক এ ইঙ্গিতও দিয়েছেন যে, প্রয়োজনীয় 
ক্ষেত্রে ধর্ম পরিবর্তনের বিধান থাকা উচিত। এর পরের উপন্যাস “দূর সরিদরু' দেরে চলে 
যায়) মন ও বৃদ্ধির অসমতা থেকে উৎপন্ন পরিস্থিতি নিয়ে লেখা--এই উপন্যাসটি প্রধানতঃ 
দুটি চরিঘ্রের বিতকমূলক আলোচনা, কিন্তু সে আলোচনায় যেন ঠিক প্রাণসঞ্চার করতে 
পারেননি লেখক । 

“বংশরক্ষ' ভৈরপ্পার প্রথম বিখ্যাত উপন্যাস। বুগসন্ধিক্ষণের সমস্ত সমস্যাই এ 
কাহিনীতে চমণ্কারভ্তাবে প্রতিবিষ্বিত হয়েছে । বিশেষ করে ক্যাত্যায়নীর প্রগতিশীলতার 
ছবি আঁকায় লেখকের কৃতিত্ব অনস্বীকার্ষ। সমস্ত উপন্যাসটির মধ্যে শ্রোন্ত্রি যেমন ধর্ম- 
ভাবনা ও সাত্ত্িকতার প্রতীকরুপে উজ্জ্বল হয়ে আছেন, তেমনি বিধবা ক্যাত্যায়নীর পুন- 
বিবাহের মধ্য দিয়ে ভাস্বর হয়ে উঠেছে আধুনিকতার চেতনা । সনাতন ধর্মভাবনা ও 
আধুনিকতার চেতনা-_এই দুটি ধারা সমান্তরালভাবে প্রবাহিত, কোথাও কোন বিতর্কের 
সৃষ্টি না করেও লেখক এত শক্তিশালীভাবে দুটি ধারাকে চিত্রিত করেছেন, যা ইতিপর্বে 
আর কোন কন্ড় উপন্যাসে দেখা যায়নি। লেখক দুটি ধারাকেই বিশ্বাসযোগ্যভাবে 
সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌনে দিতে পেরেছেন এবং পান্র-পান্রীদের চরিত্র ও কাহিনীর মাধ্যমে জীবনের 
ট্র্যাজেডিকে ফুটিয়েছেম নিখুঁতভাবে । এরই জনপ্রিয় উপন্যাসটি এবং এর ভিত্তিতে রচিত 





ভূমিকা 1 
রাস্ট্রপতি-পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রটি ভতৈরপ্পাকে সর্বভারতীয়স্তরের খ্যাতিমান লেখক- 
গোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছে ।) 

“জলপাত” উপন্যাসটি দাম্পত্যজীবনের সমস্যা নিয়ে রচিত। ট্বজ্ানিক দৃষ্টিভঙ্গির 
বাড়াবাড়ি কত সময় দাম্পত্যজীবনকে দুঃখময় করে তোলে তাই দেখান হয়েছে এখানে। 
শিল্পীর জীবনে সন্তানের আবির্ভাীবকে কন্রিম উপায়ে রোধ করতে গিয়ে তার শিল্পীজন্তা 
ক্ষতবিক্ষত হয়ে ওঠে । বোক্বাইয়ের নগরজীবনের পটভূমিতে শিল্পী এবং উদীয়মান 
ডান্তণরের সমস্যাকন্টকিত জীবন সমান ওঁজ্জ্বল্যে বিকশিত হয়ে উঠেছে এ গল্লে। বিতক- 
মলক বিষয়বসন্ত সত্ত্বেও 'জলপাত” রচনা হিসেবে “দূর সরিদরু” অপেক্ষা সার্থক সুন্টি। 

“নাথী নেরজ্লু' কেক্রের ছায়া) একটি ভিন্ন স্বাদের উপন্যাস। পুনজন্মের রহস্য নিয়ে 
রচিত এই কাছিনীটি সমগ্র কন্নড়সাহিত্যে এক নতুন ধরনের স্স্টি। এই উপন্যাস 
সম্বন্ধে ভৈরপ্পা নিজেই মন্তব্য করেছেন, “দুই পরস্পরবিরোধী ভাবনা ও বিশ্বাসের জগতের 
মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেছে গল্পটি ।” “নাথী নেরল্ল্‌্* পড়ার পর লেখকের বর্ণিত বিবরণ 
পাঠককে ভাবায় কিন্তু চরিত্রগুলি মনে তেমন দাগ কাটে না। এই উপন্যাসের “জৌগয়া' 
চরিন্রটি “গৃহভঙ্গ'-এর “অইয়াজী"' চরিত্রকে মনে পড়িয়ে দেয়। এই ধরনের বিষয় নিয়ে ভৈরপ্পা 
আরো উপন্যাস লিখেছেন । “তব্বলিয়ু নিনাদে মগনে" (বাছা, তুই অনাথ হলি) উপন্যাসেও 
এই ধরনের সমস্যাই আলোচিত হয়েছে । গোয়ালাদের জীবন নিয়ে লেখা এই কাহিনীতে 
আমাদের গ্রামীণ জীবনের অন্ধ সংস্কার ও সঙ্কীর্ণ মনোভাব কিভাবে সমস্যা সুম্টি করে 
তারই পূর্ণ পরিচয় বিধৃত হয়েছে । গোয়ালা সমাজের একটি ছেলে বিদেশ থেকে ফিরে 
নিজেদের এলাকার অন্ধ কসৎস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই শুর করে, তাকে সাহায্য করতে 
চায় তার আমেরিকান স্ত্রী। শেষ পযন্ত মনে হয় আমেরিকান মেয়েটির দেশে ফিরে যাওয়া 
ছাড়া আর কোনভাবেই সমস্যার সমাধান হবে না। কিন্তু এই সমস্যা ছাড়াও আরো 
একটি বক্তব্য আছে এ উপন্যাসে, সেটি হল বৈজ্তানিক পদ্ধতিতে গ্রামের গোচারণভূমিকে 
অধিক ফসল উৎপাদনকারী ক্ৃষিক্ষেত্রে পরিণত করার সরকারী প্রচেষ্টা ও তার পরিণাম । 
একদিকে আধুনিকতার আকষণ অন্যদিকে পুরাতন রীতি ও সংস্কার এই দুইয়ের সংঘাতে 
ক্ষতবিক্ষত চরিন্রগুলি গ্রামের পটভূমিকায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে ভৈরপ্পার সৃক্ম সংবেদনশীল 
রচনাশভ্ির গুণে । 

“মতদান' উপন্যাসে ভৈরগ্পা এক নতুন পথে পা দিয়েছেন। এই প্রথম রাজনীতি 
তাঁর উপন্যাসে স্থান পেয়েছে । এক জনপ্রিয় ডাক্তারের রাজনীতিতে যোগদান এবং তার 
ট্যাজিক পরিণাম বর্ণিত হয়েছে এ উপন্যাসে । রাজনীতির ক্ষেত্রে যে কত নোংরামী আছে 
তা বৃদ্ধিজীবীগোষ্ঠী কল্পনাও করতে পারেন না_-এই কথাই এখানে লেখকের মূল বক্তব্য । 
ভৈরপ্পার নতুন উপন্যাস “দাটু' ও এই একই বিষয় নিয়ে লেখা । 

মোটামুটিভাবে বলা যায়, এই সময় পর্যন্ত ভৈরপ্পার উপন্যাসগুলিতে জীবনের পবিস 
শুচি-সুন্দর দিকটিই চিত্রিত হয়েছে এবং পারিবারিক বা দাম্পতাজীবনের সমস্যাগুলি নিয়ে 
কাহিনী রচিত হয়েছে । কিন্তু “গৃহভঙ্গ' উপন্যাসে ধ্বনিত হল এক নতুন সুর। পূর্ববর্তী 
উপন্যাসকারদের দ্বারা স্বীকৃত অনেক প্রচলিত মূল্যবোধ সম্বন্ধে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন এ 


৬111 গৃহতঙ্গ 


উপন্যাসে । তিপটুর, চন্নপন্টন অঞ্চলের মানুষদের গল্প এটি, সময়সীমা 1920 থেকে 
1940-45 সাল পর্যন্ত বিস্ভৃত। প্রথম অধ্যায়ে পাটোয়ারী রামন্নার পারিবারিক জীবনের 
পরিচয় পাওয়া যায়। গক্পম্মা বিধবা, শিক্ষাদীক্ষার নামগন্ধও নেই তার মধ্যে, তার মুখ- 
নিস্ত অকথ্য শব্দগুলিই গৃহভঙের প্রধান কারণ হয়ে ওঠে। তার দুই ছেলে চেম্নিগরায় 
ও অপ্পনায়ার স্বভাবে বেশ পার্থক্য আছে। চেন্নিগরায় অলস ও স্বার্থপর, নিজের স্ত্রী ও 
সন্তানদের জন্য একবিন্দু মমতা নেই তার মনে। স্ত্রীর ওপর জুলুম করলেও মনে মনে 
সে একান্ত কাপূুরুষ। সে এতই কুঁড়ে আর উদাসীন যে, মনে হয় তার স্ত্রী নন্জম্মা 
যদি অপ্পন্নায়ার স্ত্রীর মত কলহপ্রিয়া হত তাহলে হয়ত তার স্বভাব কিছুটা বদলাতে 
পারত। কিন্তু কন্ঠীজোইসের মত মানুষের মেয়ে হয়েও নন্জশ্মার সহিষ্ণতা অসাধারণ । 
দুই পরিবারের শান্তি ও সুনাম রক্ষায় তার চেম্টার অন্ত নেই, কিন্তু সারাটা জীবন তাত 
একটানা দুঃখের কাহিনী । স্বামী মূর্খ ও লোভী, শাশুড়ী তো নৃশংস পশুর মতই নিষ্ঠুর। 
নন্জশ্মার সংসার যেন নরক, এই নরককে স্বর্গে পরিণত করতে সে বদ্ধপরিকর, কিন্তু 
শেষ পর্যন্ত তার এ সংগ্রাম ব্যথ হয়ে যায়। বিবাহিতা কন্যা, বুদ্ধিমান পুন্র পরপর স্লেগের 
কবলে পড়ে মারা গেল। অবশেষে সে নিজেও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মুর্তি পেল এই দুঃখময় 
জীবন থেকে। 

এই পর্যায়ের অন্য বিখ্যাত উপন্যাস “বংশরক্ষ'-এর “শ্রোন্রি” চরিত্রের সঙ্গে “গৃহভঙ্গ'-এর 
“কন্ঠীজোইস*-এর তুলনা করা চলে। একদিক থেকে দেখতে গেলে কন্ঠীজোইস দেবদ্েষী 
নাস্তিক, কারণ সে ঝাড়ফুঁক মন্ত্রতন্ে বিশ্বাস করে। কিন্তু তবু তার মধ্যে নীচতা নেই। 
অর্থাৎ দেবদ্বেষী নাস্তিক মানুষও যে ভাল লোক হতে পারে, তাই দেখাতে চেয়েছেন ভৈরপ্পা। 
ঠিক তেমনিই অইয়াজীও শুদ্ধাচারী সনাতন ধর্মের অন্ধ উপাসক নন, তিনি অন্য জাতের 
ছেলের জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দিতেও প্রস্তত। আবার খ্যাতনামা ব্রাহ্মণ বংশেও 
চেনিগরায়ের মত মুখ অমান্ষ জন্মায়। এতদিন পর্যন্ত ভৈরপ্পা আধনিক ও প্রাচীনপন্হীদের 
সংঘাতকেই চিন্রিত করতেন কিন্ত “গহভঙ্গ' উপন্যাসে তিনি তর্কবিতর্কের মধ্যে না গিয়ে 
মানব মনের বৈচিন্র্াকেই উদ্ঘাটিত করতে চেয়েছেন। তাই এ উপন্যাসের নায়িকা, বিহ্”র 
মা নন্জম্মার ধীরোদাত্ত চরিত্র অপূর্ব ওজ্ভ্বল্য নিয়ে বিকশিত হয়ে উঠেছে। তার বিবাহ 
হয়েছে এক মৃতিমান আলস্যের সঙ্গে। তার তীব্র জীবনসংগ্রাম তাকে এক সার্থক 
ট্র্যাজিক নায়িকার মহিমায় উতীর্ণ করে দিয়েছে। নন্জম্মার দুঃখ পাঠকের মনে একই 
সঙ্গে জাগায় ভীতি ও করুণা । ভৈরপ্পা গ্রাম জীবনের পটভূমিকায় এমন এক মহিমা- 
মণ্ডিত চরিত্র একেছেন যা ঘে কোন মহাকাব্যে স্থান পাবার উপযুক্ত । 

উপন্যাসের উপসংহারে দেখা যায় রাক্ষসী প্লেগ যেন এক অমোঘ দুর্দেবের মত সবাইকে 
টেনে নিচ্ছে তার বিরাট করাল গ্রাসের মধ্যে । কিন্তু এই সব্বগ্রাসী মৃত্যুর বর্ণনাও কাহিনীর 
স্বাভাবিকতা ও বাস্তবতাকে ক্ষুণ্ন করেছে বলে মনে হয় না। 

গৃহভজ" উপন্যাসে জীবনের একটা দিককে সার্থকভাবে চিন্লিত করার কাজে লেখক 
সফল হয়েছেন। কনড় উপন্যাস-সাহিত্যের সমস্ত উল্লেখযোগ্য গুণগুলিই এই উপন্যাসের 
মধ্যে কোন না কোনভাবে প্রকাশ পেয়েছে। কথোপকথনের ভাষায় গ্রাম্যভঙ্গীর প্রয়োগ 


ভূমিকা 17 


চরিন্রগুলিকে বাস্তবসম্মত করেছে । কন্নড় ভাষার এই বিখ্যাত উপন্যাসটি যে এত জন- 
প্রিয় হয়েছে তার কারণ এখানে “বংশরক্ষ'"এর মত তর্কবিতকের মাধ্যমে কোন যুক্তি বা 
মতবাদকে প্রতিষ্ঠা দেবার চেস্টা করেননি লেখক। তার পরিবতে গগুহভঙ্গ'কে তিনি 
একটি বিশুদ্ধ সাহিত্যকৃতি হিসাবেই সূম্টি করতে চেয়েছেন । 

রাওবাহাদুরের গ্রামায়ণ'৩* ট্র্যাজিক উপন্যাস, কিন্তু সেখানে একটি সমগ্র আঞ্চলিক 
জীবনের ত্র্যাজেডি রুপায়িত হয়েছে, আর গগৃহভঙ্গ' ননজশ্মা নামে একটি মেয়ের ব্যক্তিগত 
জীবনের সংগ্রাম ও ব্যর্থতার কাহিনী । গগৃহভঙ্গ'-এ ব্যাক্তিজীবনের ট্র্যাজেডিকে উজ্জ্বল করেছেন 
ভৈরপ্পা, আর "্রামায়ণ*-এ সমম্টিগত জীবনের ট্র্যাজেডিকে তুলে ধরেছেন রাওবাহাদুর। 

“গুহভঙ” উপন্যাসে লেখকের নির্লিপ্তি দেখে অবাক হতে হয়। ঈশ্বর যেমন নিজের 
সৃম্টিকে নিরীক্ষণ করেন অসীম নির্লিপ্ততায় ঠিক তেমনি নির্লিপ্ত নিরুচ্ছাস ভঙ্গিতে 
লেখক বর্ণনা করেছেন জীবনের বিচিন্রতাকে। ভৈরপ্পা নিজেই বলেছেন, «এ উপন্যাসে 
কোন বিশেষ সমস্যাকে রূপ দেবার চেস্টা করা হয়নি, শুধু নিছক বাস্তবকে রূপায়িত করতে 
চাওয়া হয়েছে । এ প্রচেষ্টায় তিনি যে সম্পর্ণ সফল হয়েছেন একথা নিঃসন্দেহে বলা 
চলে। 

“গুহভঙ্গ-এর পর প্রকাশিত “নিরাকরণ' ও গ্রহণ” বেশ দুর্বল রচনা । এক স্বামীজী 
বিবাহ করতে ইচ্ছক হলে সারা গ্রামে কিরকম হৈচৈ পড়ে যায় তাই নিয়েই গ্রহণ'-এর 
গল্প। স্ামীজীর উক্ত ইচ্ছার মধ্যে কোন অস্বাভাবিকতা নেই, তাই তাঁর বাসনাও পর্ণ 
হয়। কিন্তু স্বামীজীর সন্্যাসধর্মের প্রতি ধিক্কার ও বিরুপতা তমন তীব্রভাবে কাহিনীর 
মধ্যে ফোটেনি। “নরাকরণ'এ মানবজীবনের সংঘাত ও নিলিপ্তি নিয়ে গল্প রচিত হয়েছে। 
কিন্তু এখানেও বিতকমূলক আলোচনার ফলে উপন্যাসের শিল্পরস ক্ষুপ্ন হয়েছে অনেক 
জায়গায়। এ কাহিনীর নায়ক নরহরি স্ত্রীর মৃত্যুর পর সন্তানদের দত্তক দিয়ে নির্বিকার- 
চিত্তে বেরিয়ে পড়ে শান্তির সন্ধানে-_-এই হল নিরাকরণ'এর কাহিনী । এ উপন্যাস পড়তে 
পড়তে ডঃ শিবরাম কারন্তের লেখা “অল্লিদা মেলে” মৃত্যুর পরে) বইটির কথা বার বার 
মনে পড়বে পানকের। সংক্ষেপে বলা চলে গ্রহণ” ও এনরাকরণ' এ দুটি উপন্যাস কনড়- 
সাহিত্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য সংযোজন নয়। 

ভৈরপ্পার সাম্প্রতিক রহত উপন্যাস “দাটু”, আবার প্রমাণ করেছে যে, ডঃ কারন্তের 
পর ভৈরপ্পাকেই কমড় সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ওপন্যাসিকের সম্মান দেওয়া যায়। কন্ডসাহিত্যের 
সমালোচকরন্দও এ উপন্যাসটি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা করেছেন। 1975 সালের 
সাহিত্য আকাদেমির পুরস্কার পেয়েছে এই উপন্যাস। এতে আমাদের বতমান সমাজের 
জাতিভেদ-বর্ণভিদ ইত্যাদি সমস্যাকে নিরপেক্ষ দুম্টিতে বিচার করতে চেয়েছেন ভৈরপ্পা। 
বিপ্লব নিয়ে উপন্যাস লেখা যায়, আবার বৈপ্লবিক উপন্যাসও লেখা যায়। “দাট্'কে 
সম্ভবত এই দ্বিতীয় শ্রেণীর উপন্যাসের দলে ফেলতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে বৈপ্লবিক 
মতামত বা যুক্তিতর্ক কাহিনীর সাহিত্যগুণকে খর্ব করেনি, এইটিই বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় । 
অন্য জাতের ছেলেকে বিবাহ করতে চাওয়ায় এ কাহিনীর নায়িকা তার দ্বজাতীয়দের দ্বারা 
পরিচালিত কলেজের চাকরী থেকে বিতাড়িত হয়। মন্ত্রী মেলেগিরিগৌড় হরিজনদের 


ষ গুহভঙ্গ 


মন্দিরে প্রবেশের অধিকার দিতে উৎসাহী আর তাঁরই পিতা বড়গৌড়জী হরিজনদের মন্দিরে 
প্রবেশের পর গোময় ও গোমন্্র সহযোগে মন্দিরকে শুদ্ধ করতে মেতে ওতঠেন। নিজেকে 
ব্রান্মণদের চেয়ে শ্রে প্রমাণ করার বাসনায় ব্রা্গণদের চেয়েও বেশী আচার-বিচার 
মেনে চলেন তিমি। ওদিকে হরিজন নেতা বেট্টয়া হরিজন পাড়ায় গান্ধীজীর বাণী প্রচার 
করে কিন্তু বেহ্ছটরমন্যাকে সে ছোয়াহ ঘি বাঁচিয়ে চলার কথাও বলে। এই সব বিরোধাভাস 
সমগ্র কাহিনীকে বাস্তবমুখী করেছে। 

মননশীল উপন্যাসেই পান্র-পান্রীর মনের চিন্তা-ভাবনার প্রকাশ ঘটে, তাই “দাটু” প্রশ্নই 
করে কেবল, সহমত হয় না কারো সঙ্গে। এই যে বিভিন দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সমস্যাকে 
দেখা এবং তার ব্যাখ্যা করার প্রচেস্টা এটিকে কনড় উপন্যাসের ক্ষেত্রে একটি সুস্থ ও 
স্বাভাবিক দুম্টিভঙ্গী হিসাবে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সমকালীন সমস্যার যথাযথ মূল্যায়ন 
করা বেশ কঠিন কাজ, উপন্যাসকারকে এক্ষেত্রে অনেক শক্ত শক্ত প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে 
হয়। এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে জীবন সম্পকে বাস্তব অভিজক্ততা ও তীক্ষ পর্য- 
বেক্ষণ শক্তির অধিকারী হতে হবে। লেখকের এই দুটি বস্তই আছে এবং সেই কারণেই 
“দাটু* উপন্যাসটি কনডসাহিত্যে একটি স্থায়ী আসন লাভ করেছে। 

“গৃহভঙ্গ-এর পরবতী খণ্ড “অন্বেষণে” নামে প্রকাশিত হতে চলেছে । এছাড়া গত পাঁচ 
বছর ধরে ভৈরপ্পা বর্তমান জীবনে মহাভারতের প্রভাব এবং তারই ভিভ্তিতে নিজের 
জীবনদর্শনকে একটি রূুহৎ উপন্যাসের মাধ্যমে রূপ দেবার প্রস্ভৃতিতে ব্যস্ত আছেন। 


মাধব কৃুলকণা 


* ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ইত্ডিয়া কর্তৃক এই উপন্যাসের নানা ভাষায় অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে । 


গৃহভঙগ 


মহীশ্র রাজ্যের তুমকুর জেলার একটি তহসিলের নাম তিপটুর, আর এরই অন্তগত এলাকা 
কম্বনকেরে । এই এলাকার রামসন্দ্র গ্রামের পাটোয়ারী ছিলেন রামন্নাজী। তিনি আজ আর 
ইহসংসারে নেই-_রেখে গেছেন স্ত্রী গঙ্গম্মা আর দুই পুত্র চেনিগরায় ও অপ্পন্নায়াকে । 
রামন্নাজীর মৃত্যুর পর ছ" বছর কেটে গেছে, অর্থাৎ যে বছর বিশ্বেশ্বরায়া দেওয়ান বাহাদুর 
হলেন সেই বছরই রামন্নাজী স্বর্গে যান । তখন স্ত্রী গঙ্গশ্মার বয়স মোটে পঁচিশ, বড় ছেলে 
চেন্নিগরায়ের বয়স তখন নয়, আর ছোটটি সাত বছরের । পাটোয়ারীর কাজটা রামন্নাজীদের 
বংশেরই বাঁধা কাজ, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর থেকে গ্রামের প্যাটেল শিবেগৌড়ের শালা শিবলিঙ্গে 
গৌড় এ কাজটা দেখাশোনা করছে কারণ আরো তিন বছর পরে চেন্নিগরায় যখন আঠার বছরে 
সাবালক হবে তখনই সে এই কাজের ভার নিতে পারবে । পাটোয়ারীর কাজ তো আর 
ছেলেখেলা নয়, তারজন্য প্রচুর শিক্ষার দরকার । অন্ততঃ “জৈমিনী ভারত” খানা তো পড়ে 
বুঝতেই হবে, তা নাহলে খাতাপন্র, রায়শুমারী ইত্যাদির কাজকর্ম কিছুই বোধগম্য হবে না। 
তাই চেন্নিগরায় এখন গ্রামের পাঠশালার মাস্টার চাতালি বেঞ্চব) চেন্নাকেশবয়ার কাছে 
লেখাপড়া শিখছে । 

অগ্পন্নায়ার বয়সও তেরো পূর্ণ হয়ে গেছে, কিন্তু সে এখনও পাঠশালার চৌকাঠ মাড়ায়নি । 
কাগজের ওপর “শ্রীওম্প্রুকুও লিখতে পারে না। তার উপনয়নও হয়নি এখনও । তার মা 
ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলে ওঠে, “কিরে অপ্পন্না, পাঠশালা যেতে হবে না £ 

“যদি না যাই তো তোর কি? গরু: ছেনাল কোথাকার !, 

মা বলে ওঠে, “আমাকে ছেনাল বলছিস £ তুই নিবংশ হবি রে, হারামী £ 

“তুই নির্বংশ হোস কিনা, তাই দেখ, কথা শেষ না হতেই বাইরে থেকে এসে হাজির হল 
মুদ্দা। “দেখু মুদ্দা, আমাকে গরু বলছে, ছেনাল বলছে ! এই রাঁড়ের ব্যাটাকে ঘাড় ধরে 
চেন্নাকেশবয়ার কাছে বসিয়ে দিয়ে আয় তো, হুকুম দিয়ে দিল গঙ্গম্মা । কথাটা শোনার সঙ্গে 
সঙ্গেই চম্পট দিল অপ্পন্নায়া । কিন্ত মুদ্দাও লম্বাচওড়া জোয়ান, কয়েক পা যেতে না যেতেই 
তেড়ে গিয়ে চেপে ধরল তার টিকির গোছা । মহা কান্নাকাটি জুড়ে দিল সে, কিন্তু ছাড়া পাওয়া 
গেল না। গন্গম্মার সামনে এনে হাজির করল তাকে । গজম্মা হুকুম দিল, “রাঁড়ের ব্যাটাকে 
দুই লাথি মেরে নিয়ে যা !,_কিন্তু বামুনের ছেলেকে মুদ্দা এখন লাথি মারে কি করে £ এমন 
কাজ করলে তার পায়ে যে পোকা পড়বে সেটা কি আর সে জানে না? কাজে কাজেই মুদ্দা ওকে 
হাত ধরেই টানতে টানতে নিয়ে গেল । 


২ | 00 


ছোট ছেলেকে বিদায় করে এবার গঙ্গম্মার নজর পড়ল বড় ছেলের ওপর। সেও বাড়িতেই 
ছিল। হ্যারে চেন্নিগা, হোননবল্লির সীতারামের কাছে খাতা লিখতে যাবার জন্য তোর কাছে 
আর কতবার মাথা খুঁড়তে হবে শুনি £ কাল সকালে যাবি, না কি তোকেও দু ঘা দিতে হবে £' 

“এই যে, এবার আমার পেছনে লাগলেন ! রুদ্রন্না নাপিতকে ডেকে তোর মাথা মুড়িয়ে দেব 
বুঝলি ৮ থামের ওপাশ থেকে গর্জে উল বড় ছেলে । 

“ওরে, যেদিন তোদের বাপ মরেছে সেই দিনই তো আমার মাথা মুড়োন হয়ে গেছে । নিজের 
মাকে এমন কথা বলিস, জিভে যে তোর পোকা পড়বে রে ছেনালের ব্যাটা !, 

রামসন্দ্র থেকে হোন্নবল্লির দূরত্ব প্রায় আঠার মাইল । দুটি গ্রাম একই তহসিলের অন্তর্গত 
হলেও ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় । রামসন্দ্র পড়ে কম্বনকেরে এলাকার মধ্যে । আর হোন্নবলি নিজের 
এলাকার একটি প্রধান কেন্দ্র, এককালে তো এটা একটা তহসিলই ছিল, তবে আজকাল তিপটুর 
সম্বদ্ধ হয়ে ওঠায় এর গুরুত্ব অনেকটা কমে গেছে । চিক্মগলুর ও কড়ুরের উন্নতি হওয়ার 
পর থেকে তহসিল কার্যালয় নিয়ে যাওয়া হয়েছে তিপটুরে । হোন্নবল্লি যখন তহসিল ছিল 
তখন থেকেই দক্ষ পাটোয়ারী হিসাবে সীতারামাইয়ার খুবই নামডাক। অস্কশাস্ত্রে তিনি ছিলেন 
বিশেষ পারদর্শী । তাছাড়া সরকারী আমলাদের পর্যন্ত বিপর্যস্ত করে দেবার মত ব্যক্তিত্ব ছিল 
তাঁর। যারা তাঁর কাছে বসে খাতা লিখতে শিখেছে তারা সকলেই পাটোয়ারীর কাজ খুব 
ভালভাবে চালাতে পারে । অরসীকেরে, গণ্ুসী, জাবগল্লু ইত্যাদি সব জায়গার প্যাটেল আর 
পাটোয়ারীরা একথা একবাক্যে স্বীকার করে থাকে । কিন্তু সীতারামাইয়ার সঙ্গে মানিয়ে চলা 
সহজ কাজ নয় । খাতার মাথার শীর্ষক থেকে শুরু করে লাল কালির লাইন টানা পযন্ত সব 
কাজ শিখতে শিখতেই অন্ততঃ দু'একশ ঘা রুলের বাড়ি খেতেই হবে। পাঠশালার 
পণ্তিতমশাইদের মত তিনিও বলেন, হাতুড়ির হাজারটা ঘা না পড়লে কি আর কাঠের টুকরো 
থেকে মৃতি তৈরী হয় £ 

দুই ছেলের ব্যবহার দেখে গজশ্মার বড় রাগ হয়েছে, দুচোখে জল ভরে এসেছে । অন্যের 
বাড়ির ছেলেপেলেরা মাকে কত ভয় করে । কিন্তু এই রাঁড়ের ব্যাটাদের কি যে রোগে ধরেছে ! 
আমার কপালই এমনি.” বলতে বলতে সে কেঁদেই ফেলে । কিছুক্ষণ পরে উঠে সোজা চলে 
যায় রান্নাঘরে, চিমটেটা তুলে নিয়ে রেখে দেয় উনুনের ভিতরে । বেলা তিনটে বেজে গেছে, 
উনূনে আগুন নেই, নারকেলের ছোবড়া ইত্যাদি দিয়ে ভ্বালানো আগুন প্রায় ছাই হয়ে এসেছে। 
এদিকে ছেলের বয়স পনের বছর, তারওপর 'জৈমিনী ভারত"খানাও পড়ে ফেলেছে, সুতরাং মা 
কেন চিমটে গরম করছে তা বুঝতে তার বিলম্ব হল না। এক নিঃশ্বাসে ছেনাল, রাঁড়, কুলটা 
ইত্যাদি গালাগালি দিতে দিতে সে বাড়ি ছেড়ে পালাল । গঙ্গম্মা বুঝল এখন আর ওকে ধরা 
যাবে না। কিন্তু সেও হার মানবার পাত্রী নয়। বসে বসে ভাবতে লাগল কি করে এই 
হারামজাদা দুটোকে শায়েস্তা করা যায়। ওদিকে নিভন্ত আঁচে চিমটে ক্রমেই তেতে উঠছিল । 

গঙ্গম্মা তের বছর বয়সে এ সংসারে এসেছে । তখন তাঁর স্বামীর বয়স ছিল পঁয়তাল্িশ। 
তাঁর প্রথম স্ত্রীর গর্ভেও দুটি সন্তান জন্মেছিল, কিন্ত দুটিই মারা যায়। তারপর তাদের মায়েরও 
স্তত্যু হল। সেই প্রথমা পত্বী ছিলেন গম্মাদেরই গ্রাম জাবগল্লুর মেয়ে । সেই জন্যই 
গঙ্গম্মারও বিয়ে হয়ে গেল রামন্নাজীর সঙ্গে। তিনি তখন রামসন্দ্রসমেত তিনখানা গ্রামের 


গুহভঙ ৩ 


শর 


পাটোয়ারী । তাঁর ছ" একর ফসলের ক্ষেত, আট একর ফলের বাগান, তিনশ নারকেল গাছ, ঘরে 
প্রচুর সোনাদানা, বাসন তৈজসপন্ত্র, এমন মানুষকে কে না মেয়ে দিতে চায় £ সারা গ্রামের লোক 
বলাবলি করত রামন্নাজী অতি ভালমানুষ, একেবারে গরু-বাছুরের মত নিরীহ, কিন্তু গঙ্জশ্মা 
নাকি একেবারে সাক্ষাৎ বাঘিনী । এসব কথা গঙ্গশ্মার কানে গেলে সে গজে উঠত, “এইসব 
লোকের মুখে বাঁ পায়ের ছেঁড়া জুতো গুজে দিতে হয়।” ছেলে দুটোর যদি একটু বুদ্ধি শুদ্ধি 
থাকত আর বাধ্যবশ হত তাহলে গঙ্শ্মা কারো তোয়াক্কা করত না। এসব লোকের মুখে সে 
তাহলে ঠিক জুতো গুজে দিয়ে তবে ছাড়ত। কিন্তু এই নচ্ছার দ্লটো একেবারে বেয়াড়া 
হয়ে গেছে । “এদের শিক্ষা দিতেই হবে । না দিই তো আমি জাবগল্লুর মেয়েই নই ৷ চিমটে 
উনুনেই থাক, আরো গরম হোক। সন্ধ্যেবেলা পিশ্তি গিলতে তো আসতেই হবে, তখন বাছুরকে 
যেমন করে ছ্যাকা দেয় তেমনি করে দুটোর পায়ে দাগা দিয়ে দেব । ছ্যাকা না খেলে কি আর 
বাছুর কথা শোনে £ কথার বাধ্য করার জন্যই তো ছ্যাকা দিতে হয়”__নিজের মনেই বিড় বিড় 
করতে করতে গঙ্গশ্মা তার লাল শাড়ীর আঁচল দিয়ে ধরে চিমটেটা তুলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল, 
তারপর আবার রেখে দিল সেই নিভন্ত আঁচের মধ্যে । 

এই সময় হঠাৎ মনে হল খাপরার চালের ওপর কে যেন চুপি চুপি হাঁটাচলা করছে । এই 
দিনদুপুরে আবার কোন শুয়োর জালাতে এল £ বাঁদর নিশ্চয় ! রাঁড়ের ব্যাটারা বাগানের 
নারকেল ভেঙে খাওয়া ছেড়ে এখন গাঁয়ের মধ্যে এসে ঢুকতে শুরু করেছে! গঙম্মা এইসব 
ভাবছিল, ইতিমধ্যে মনে হল আওয়াজটা ঠিক ওর মাথার ওপর এসে পৌছেছে । সে এবার 
গলা ছেড়ে হাঁক দিল, “তোদের গুচ্ঠিসুদ্ধ নিপাত যাক!” কিন্তু বলতে বলতেই খেয়াল হল, 
হায়, হায়, এ দের আবার সাক্ষাৎ অঞ্জনেয়র বংশধর বলা হয়, গাল দিলে অভিশাপ দিতেও পারেন, 
সুতরাং জিভে লাগাম কষে এবার সে চেয়ে দেখতে লাগল ওপর দিকে । ওর মনে হল কারা যেন 
দুটো ডাণগ্ডা দিয়ে খাপরাগুলোর ওপর একসঙ্গে বেদম পিটিয়ে চলেছে । দেখতে দেখতে পনের- 
বিশখানা খাপরা চুর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ঘরের মধ্যে, ওর মুখের ওপর এসে পড়ল । “তোদের গুন্ঠির 
সর্বনাশ হোক" বলে গালিগালাজ করতে করতে কান্না জড়ে দিল সে। এই সময় ওপর থেকে 
চেনিগরায়ের গলা শোনা গেল, “ওরে অপ্পন্না, ওটা এইখানেই আছে, আরো দু-চার ঘা লাগা । এরপর 
দুই ভাইয়ে মিলে হাতের ডাণ্ডাগুলোর সাহায্যে মায়ের ঠিক মাথার ওপরের খাপরাগুলোর ওপর 
নিজেদের বাহুবলের পরিচয় দিতে শুরু করল । 'রাঁড়ের ব্যাটারা, প্যাটেল শিবেগৌড়কে বলে, 
তোদের দুটোকে আমি ফাঁসিতে লটকাব', বলতে বলতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল গজম্মা । 

“ও চনৈয়া, এ শোন্‌, বলছে শিবেগৌড়কে ডাকবে” বড় ভাইকে এবার সাবধান করে দেয় 
অপ্পন্নায়া ! ডাগুা দুটো সেইখানেই ফেলে রেখে খাপরার চাল থেকে দৌড়ে নেমে পেছন 
দিকের নালা পার হয়ে উধাও হয়ে যায় তারা। 


৮ 


শোনা যায় একসময়ে নাকি এই রামসন্দ্র গ্রামে পাঁচশ পরিবার বাস করত কিন্তু বর্তমানে, পাটো- 
য়ারীর রায়শুমারী অনুসারে, এখানে মান্তর একশ সাতচল্লিশটি পরিবারের বাস। গ্রামটি দুদিক 


৪ গৃহভঙ্গ 


থেকে জলাশয় দিয়ে ঘেরা । এখানে যে ভাঙাচোরা কেল্লার ধ্বংসস্তপ আছে তারই প্রাচীরের 
গায়ে প্রতি বায় জলাশয়ের জল এসে আছড়ে পড়তে থাকে । দক্ষিণ দিকে জলাশয়ের উচু পাড়ের 
ওপর চোলেশ্বর শিবের মন্দির, সেখানে মূল লিঙ্গ স্থাপিত আছে । গ্রামের মধ্যে মন্দিরের সামনের 
পথের শেষ প্রান্তে আছে ব্রক্মদেব মণ্ডপ, তারই কাছে হনুমান-মন্দির। গ্রামের বাইরে তরুশ্রেণীর 
কাছে গ্রামদেবী মা কালীর মন্দির রয়েছে । গ্রামে বেনে, তাঁতী, তেলী, রাখাল সব জাতেরই 
এক একটা আলাদা গলি আছে। তবে এক জাতের লোক অন্য জাতের গলিতে যে একেবারে 
থাকে না তা নয়। তবে হ্যা, মাংসাহারীদের পাড়ায় ব্রাহ্মণ, লিঙ্গায়ণ, বৈষ্ণব এরা থাকে না 
বললেই চলে। 

স্বর্গত পাটোয়ারী রামন্নাজীর বাড়ির দুটো গলির পরে প্যাটেল শিবেগৌড়ের বাড়ি । দুই 
বাড়ির মধ্যের জায়গাটায় আরো অন্ততঃ বিশ-বাইশখানা বাড়ি আছে । শিবেগৌড় বাড়িতেই ছিল । 
গজম্মা সোজা ভিতরে এসে ডাক দিল, “শবেগৌড় শীগগির উচচে এসে দেখ, আমার চেন্নিগ আর 
তপপন্না ছাদের খাপরাগুলোকে ডাগ্ডার বাড়ি মেরে মেরে ভাঙছে ! এই দেখ না মাথায় খাপরা পড়ে 
আমার রক্ত বেরিয়ে গেছে !? 

“কেন, কেন 

“আমি শুধু বলেছিলাম পাঠশালায় যেতে । ব্যস, সে কথা তো শুনলই না, উল্টে খাপরা 
ভাঙতে শুরু করে দিল।” শিবেগৌড়ের স্ত্রী গৌরম্মা স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বলল, ওরা একেবারে 
বিগড়ে গেছে। ধরে নিয়ে এস দুটোকে ।” শিবেগৌড় একে মোটা মানুষ তার ওপর বিরাট 
ভুঁড়ি! সে হাঁটে যেন মদমত্ত হস্তী। পায়ে চটিটা গলিয়ে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল। গিয়ে দেখে 
দুই ভাই ততক্ষণে ফেরার হয়ে গেছে । তবে ইতিমধ্যে মন্দির থেকে মহাদেবায়াজী ও আরো 
দশ-পনেরজন লোক সেখানে এসে জমা হয়েছে । রান্নাঘরের পেছন দিকের সমস্ত খাপরা ভেঙে 
শেষ হয়ে গেছে। গৌড় উপস্থিত লোকেদের অপরাধীদের ধরে আনবার জন্য দুই-চারজনকে 
হুকৃম দিল। 

রামাঘরের ছাদের অবস্থা দেখে গজহ্মার চোখে জল এসে গেল। বলে উল, "শিবেগোড়, 
সেই রাঁড়ের ব্যাটাদের তুমি ঘাড় ধরে এখানে টেনে আন, ওদের শ্যাং ভেঙে ফেলে রাখা উচিত! 

ছেলেদের কিন্তু খুঁজে পাওয়া গেল না। রাত হয়ে গেল, তখনও তাদের পান্ডা নেই। গন্গশ্মা 
সমানে গজ গজ করে চলেছে, “সমূলে বিনাশ হবে এদের, কোথায় ভেগেছে কে জানে -**।” বাড়িতে 
সে একেবারে একা । পেছন দিকের খাপরাগুলো সব ভেঙে গেছে কিন্তু একা থাকতে তার কিছু- 
মাত্র ভয় করে না। দে বলে, আমি যেখানে থাকি সেখানে ভূতেও আসতে সাহস করে না। কিন্ত 
এ হারামজাদা দুটো গেল কোথায় £ প্রাণের মায়া এতট্ুক নেই £ কোথায় লুকিয়ে বসে আছে, 
কি খাবে তার ঠিক নেই। হয়ত বাগানে নারকেল ভেঙে খাচ্ছে। আর খেতের দিকে যদি গিয়ে 
থাকে তো নির্ঘাত আখ ভেঙে খাচ্ছে । কিন্তু এতক্ষণেও কি বাড়ি ফেরার হ'শ হতে নেই £ কাল 
সকালে পেটের ভ্বালায় আসতেই হবে, তখন দেখে নেব আমি !, 

এ বাড়ির ঠিক সামনেই চোলেশখবরের মন্দির । মন্দিরের প্রবেশদ্বার উত্তরমূখী আর এবাড়ির 
দরজা পূর্বমূখ্ী, অর্থাৎ মন্দিরের বাঁ-দিকটা এদের বাড়ির সামনে থেকে দেখা যায়। মন্দির আর 
বাড়ির মাঝখানের জায়গাটায় একটা ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে সেখানেও কোন মন্দির ছিল, এখনও 


গৃহভঙগ ৫ 


তার চিহ দেখা ঘায়। মন্দিরে মহাদেবায়াজী একা থাকেন, ডান হাতে একতারা আর বাম হাতে 
চুটকী বাজিয়ে ভজন গান করেন তিনি। এই তাঁর নিত্যকার কাজ। মধ্যরান্ত্রি পর্যন্ত ভজন 
গেয়েই চলেন, আবার ভোরে মোরগ ডাকার আগেই ভজন শুরু করে দেন। এ'র দেশ কোথায়, 
কোন গ্রামে বাড়ি সেসব কথা কেউ জানে না। লোকে বলে, প্রায় কুড়ি-একুশ বছর পূর্বে ইনি এ 
গ্রামে এসেছেন, অর্থাৎ গঙ্গম্মার বিয়ের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই ইনি এ গ্রামে বাস করছেন । 
এখন তো চোলেহ্বরের মন্দিরই ও'র আস্তানা । ভজন গেয়ে আর ভিক্ষা করে পেট চালান। দীর্ঘ 
শরীর, গোল ধরনের মুখ, ললাটে তিনটি বিভূতির রেখা আঁকেন তাছাড়া দুই ভূরুর মাঝখানে এবং 
কানের পাশেও থাকে বিভূতির টিকা। মস্তক মুণ্তিত, পরিধানে গেরুয়া রঙের ধূতি আর জামা । 

গজম্মা শুয়েছিল বটে কিন্তু ঘুম আসছিল না, কারণ ছেলেরা তখনও ফেরেনি । মহাদেবায়্া- 
জীর ভজন প্রায় শেষ হবার সময় হয়ে এসেছে, এখন মঙজগলারতির চরণগুলো গাওয়া হচ্ছে । গঙ্গশ্মা 
উঠে পড়ল, তারপর বাড়ির দরজা বন্ধ করে চলে এল মন্দিরে । মন্দিরের সিংহদ্বার মণ্ডপাকৃতি, 
কিন্ত তাতে কোন দরজা নেই। মহাদেবায়াজী সেইখানেই বসে গান করেন । সন্ধ্যাবেলা গ্রামের 
আরো অনেকে ভজন শুনতে আসে, তারাও “চুটকী, বাজিয়ে সবাই মিলে ভজন গায়। 

এখন মধ্যরান্রি। মন্দিরে মহাদেবায়াজী ছাড়া আর কেউ নেই। গঙ্গম্মা এসে তাঁর সামনে 
থামের পাশে বসে পড়ল। ভজন সমাপ্ত করে একতারা রেখে দেবার পর, গঙ্গম্মা প্রশ্ন করল, 
“মহাদেবায়াজী, এই রাঁড়ের ব্যাটাদের আর কতদিনে বৃদ্ধিশুদ্ধি হবে বলুন তো £ 

'বৃদ্ধিশুদ্ধি ধীরে ধীরেই হয় গঙ্গশ্মা। কিন্তু তার আগে তোমাকে ভদ্র ভাষায় কথা বলতে 
শিখতে হবে । 

“আমি খারাপ কি বললাম ? 

““রাঁড়ের ব্যাটা” বলছ কেন, বল, আমার ছেলেরা ।” 

ভদ্রভাবে কথা বলার জন্য এর আগেও মহাদদবায়াজী গঙ্ম্মাকে কয়েকবারই বৃঝিয়েছেন। 
কিন্তু এ দোষ শুধরানো যাবে না জেনেও, এখনও তিনি সুযোগ পেলেই একথা গঙ্গম্মাকে মনে 
করিয়ে দেন। গজম্মা আবার ছেলেদের বাড়ি না ফেরার কথা তুলল। .. 

গঙ্জম্মা, নিজের ছেলেদের শাস্তি দেবার জন্য তৃমি প্যাটেলকে ডাকতে গেলে কেন ঠ, 

“কেন£ আমি ওদের ধরতে পারতাম নাকি £ 

“দোষ তোমারই গঙ্গশ্মা, মহাদেবায়াজী বোঝাতে থাকেন, “বাড়ির গৃহিণী-স্বয়ং মা ছাড়া 
আর কেউ কি ছেলেপিলেকে সংশোধন করতে পারে £ 

পুরোন উপদেশ। আবার শুনে একটু থতমত খেকে যায় গঙ্গম্মা। 

“তুমি অপ্পন্নায়াকে পাঠশালায় পাঠালে । সেখানে সে মাস্টারমশাইকে “রাঁড়ের বেটা” বলে 
গালাগাল দিয়ে পালিয়ে এল। কিন্তু এসব গালাগালি সে শিখল কোথা থেকে 2, 

“আমার কপালই ওদের দিয়ে এমন কথা বলায়। এ গালাগাল শোনবার পর মাস্টার এ 
রাঁড়ের ব্যাটাদের কি আর এমনি ছেড়ে দেবে £ 

“সেখান থেকে ফিরেই তো দুই ভাই খাপরা ভেঙেছে, তাই না 

'যাক। হারামজাদাদের ঘরদোর ধুলোয় মিশে যাক! নতুন খাপরা কেনার পয়সা এখন 
মামি কোথা থেকে যোগাড় করব £ 


৬ গুহভঙ্গ 


গঙ্গম্মা, আবার ওসব কথা বলছ £ তুমি '*-* মহাদেবায়াজী আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলেন 
কিন্তু এই সময় বাইরে থেকে দশ-বারজন লোক ছুটে আসছে বলে মনে হল। তারা চিৎকার 
করছে, আখের খেতে আগুন লেগেছে, ছুটে এস, সবাই ছুটে এস।” দুজনে মন্দির থেকে বেরিয়ে 
এসে দেখেন জলাশয়ের পেছন দিককার সমতলভূমিতে খেতের মধ্যে আগুনের শিখা লকলক্‌ করে 
ভ্বলছে, সেই আলোয় ধোয়াও দেখা যাচ্ছে। 

“হায়, হায়, ওখানে তো আমারও আখ রয়েছে । কোন রাঁড়ের ব্যাটা আগুন লাগাল কে জানে" 
বলতে বলতে গলম্মা বাড়ির দিকে ছুটল। বাড়ির দরজায় তালা লাগিয়ে সেও অন্য লোকেদের 
সঙ্গে জলাশয়ের পাড়ের দিকে দৌড়তে আরম্ভ করল। 

গ্রামের সামনের দিকটা দুধার থেকেই জলাশয় দিয়ে ঘেরা, কাজেই জলাশয়ের ওপারের কিনারায় 
পৌছতে হলে অনেকটা পথ ঘুরে আসতে হয়। গ্রামসূদ্ধ মানুষ তখন জলাশয়ের পাড়ের দিকে 
ছুটেছে, পাড়ের ওপরও অনেক লোক এদিকে ওদিকে দল বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে । এই সমতল জমিটার 
প্রায় অর্ধেক আখের চাষ করা হয়েছে । পশ্চিমদিকে বাঁধের মুখের কাছে দুটো আখ-মাড়াইয়ের 
কল বসেছে। আগুন লেগেছিল পূর্বদিকে, এখন ক্রমশ: সেটা পশ্চিম আর উত্তরদিকে এগিয়ে 
আসছে। খেতের আখ এখন একেবারে তৈরী । আখের ডাঁটার নিচের দিকের পাতাগুলো 
শুকিয়ে গেছে, ফলে সেগুলো এই আগুনে খুব ভালভাবেই ইন্ধন জোগাচ্ছে। বাতাস না থাকলে 
আগুনের দাপট হয়ত কিছুটা কমে আসত, কিন্তু এখন তো কখনও পশ্চিমে, কখনও দক্ষিণে 
এলোমেলো হাওয়া দিচ্ছে। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে । আখ-মাড়াই কলের 
লোকেরা বলদগডলোকে খুলে বাঁধের দিকে সরিয়ে দিল। মজররা সরাতে লাগল গুড়ের বস্তা- 
গুলো। গুড় বানাবার চাকিগুলো জোড়া জোড়া করে বেঁধে বাঁধের ওপর তোলা হল। মনে 
হচ্ছিল আর মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই গগনস্পশী অগ্নিশিখা চারপাশের বাঁশ, নারকেল পাতার রাশি 
এবং লোহার বড় বড় কড়াইগুলো ভস্ম করে ফেলবে । চারদিকে ছড়িয়ে পড়া আগুনের উত্তাপ 
থেকে কোনমতে নিজেদের বাঁচাবার চেস্টা করতে করতে, “হায় হায়” করছে খেতের মালিকরা । 
আগুনট্টা লাগল কি করে, কে লাগাল £ এইসব নিয়ে তক-বিতর্ক চলছে লোকেদের মধ্যে। 
আখ-মাড়াই কলের পাশেই গঙ্গম্মার এক একরের ফলের বাগান, এতে আছে প্রায় চক্িলশটা 
নারকেল গাছ। তার অন্য ফলের বাগানটা আরেক জায়গায় । এই বাগানটাকে আগুন চারদিক থেকে 
ঘিরে ফেলেছে । বাগানের পাশেই গুড় জ্বাল দেবার কড়াইগুলো পুড়ে গিয়ে অগ্নিশিখা আর ধোয়ার 
কৃণুলী উশ্ছে আকাশের দিকে । হনাৎ শোনা গেল বাগানের মধ্যে থেকে কে যেন চিৎকার 
করছে---ওরে বাপরে ! বাঁচাও। ভগবান ! বাঁচাও, আমি পুড়ে ম'লাম গো । বাঁচাও, বাঁচাও । 
জ্বলন্ত আগুনের আওয়াজের মধ্যেও সেই স্বর স্প্ট শোনা গেল। সবাই ভীষণ রকম ঘাবড়ে 
গিয়ে ভয়চকিত দৃষ্টিতে, যে দিক থেকে শব্দটা আসছিল সেই দিকে চেয়ে রইল। এমন সময় 
চিৎকার করে উঠল গঙ্জম্মা, “ওরে, এ যে আমার চেন্নির গলা । হারামজাদা এতক্ষণ বাগানের 
মধ্যে কি করছিল £ ওগো, তোমাদের পায়ে পড়ি, কেউ গিয়ে ওকে বাঁচাও ।” কিন্তু এ আকাশ- 
ছোয়া আগুনের মধ্যে ঢুকবে কে? বাগানের বেড়া তখন আগুন ধরে গেছে। একটুক্ষণের 
মধ্যেই নারকেলের শুকনো পাতার রাশি জ্বলে উঠবে। এই সময় চেন্নিকে বাঁচাতে যাবার মত 
সাহস কেউই সংগ্রহ করতে পারছে না। কিন্তু মন্দিরের মহাদেবায়াজী নেমে এলেন বাঁধের ওপর 


গুহভঙ ৭ 


শু 


থেকে । তারপর, “বাগানের ভেতরে আগ্তন লাগবে না, চলে এসো” বলে ডাক দিয়েই নিজে সেই 
জ্বলন্ত খেতের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত জলের নালাটা পার হয়ে বাগানের মধ্যে ঢুকে গেলেন। 

“তোরা কেউ বাপের ব্যাটা ন'স, আমি মেয়েমান্য, তবু আমিই যাচ্ছি* বলতে বলতে গম্মাও 
নেমে পড়ে বাঁধের ওপর থেকে । এবার কোলী মুদ্দা, অদ্ভুত বেলুরা, ভজন-শ্রবণ-প্রিয় তোটিমর 
এবং আরো সাত-আটজন বাঁধ থেকে নেমে তার পেছন পেছন ছুটতে থাকে । 

বাগানের মধ্যে একটা নারকেল গাছের মাথায় বসে চেন্নিগরায় প্রাণভয়ে চিৎকার করে চলেছে। 
মহাদেবায়জী তাকে ডাক দিয়ে বললেন, “চেন্নৈয়া, বাগানের মধ্যে এখনও আগুন লাগেনি চটপট 
নেমে এস।” কিন্তু সে নামতে ভয় পাচ্ছে, বলল, “আমার ভয় করছে যে* বলতে বলতে কাঁদতে ও 
শুরু করে দিল। ইতিমধ্যে মুদ্দা, বেলুরা, তোটিমর-রা সবাই এসে পৌ"ছেছে, হাঁফাতে হাঁফাতে 
গজম্মমাও হাজির। “নেমে আয় বাবা, অপ্পনা কোথায় গেল £ বলতে বলতে কেঁদে ফেলে 
গঙ্ম্মা। এতক্ষণে কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে চেন্নিগ বাঁদরের মত অবলীলাক্রমে নেমে এল গাছ 
থেকে । শুকনো নারকেল পাতার রাশিতে এবার আগুন লাগবে মনে হচ্ছে, তাই সবাই চটপট 
তাকে নিয়ে বেরিয়ে এল বাগান থেকে । যে নালাটার ধার দিয়ে ওরা ফিরছিল তার দুপাশে আখ 
পুড়ে গিয়ে এখন আগুন ক্রমশ: নিভে আসছে কিন্তু গুড়ের কড়াইগুলোর কাছে আগুন এখন লেলিহান 
শিখায় ভ্বলছে এবং সেখানে স্তুপীকৃত আখের ছিবড়েগুলো সেই আগুনে ইন্ধন জোগাচ্ছে। 

সবাই জলাশয়ের তীরে এসে পৌছল। মহাদেবায়াজী প্রশ্ন করলেন চেন্নিগরায়কে, এত 
রাত পধন্ত নারকেল গাছে বসে ছিলে কেন £ 

“মা যে শিবেগৌড়কে ডাকতে গিয়েছিল! ততক্ষণে সবাই সেখানে এসে পৌছে গেছে। 
প্যাটেল শিবেগৌড়ও এসেছে । 

মহাদেবায়াজী আবার জেরা করেন, “তামরা দুই ভাইয়ে মিলে খাপরা ভেঙেছে কেন £ 

“াপরা চুলোয় যাক। অপ্পন্না গেল কোথায় রে£ এবার কাতরভাবে জিজ্তাসা করে 
গজম্মা। 

“সে পালিয়েছে লিঙ্গাপুরের দিকে । আখের খেতে আগুন তো ওই-ই লাগিয়েছে । 

“ও কেন লাগাতে যাবে & 

“আমি বললাম, চল্‌ দুজনে নারকেল গাছে চড়ে লুকিয়ে থাকি, কিন্তু ওতো খাড়া লঙ্কা গাছে 
চড়তে পারে না, তাই ও বলল খেতের মধ্যেই থাকবে । কিন্তু গুড়ের উনুনের কাছের এ লোকগুলো 
পাছে দেখে ফেলে, সেই ভয়ে ও নালার দিকে পালান। তারপর বিড়ি খাবার জন্য দেশলাই 
ত্বেলেছিল, সেই ভ্বলন্ত কাঠি আখের পাতায় গিয়ে পড়েছে।, 

এই পর্যন্ত শুনেই শিবেগৌড় গর্জে উঠল, “কে আছিস, যা সেটাকে ধরে নিয়ে আয়। কিন্তু 
মহাদেবায়াজী বললেন, “এ বলছে বলেই বিশ্বাস করতে হবে নাকি £ তুই জানলি কি করে যে 
ও বিড়ি ধরাতে গিয়েই আগুন লাগিয়েছে £ 

“ভগবানের দিব্যি মশায়, আমি মিছে কথা বলছি না। ও নিজেই আমার কাছে ছুটে এসে 
বলল যে, এই কাণ্ড হয়েছে আর পুরদপ্পার খেতে আগুন লেগে গেছে । তারপর কাউকে কিছু না 
বলে চুপচাপ লিঙ্গাপুরের দিকে পালাতে বলছিল । কিন্তু আমি বললাম, আগুন তো তুই লাগিয়েছিস, 
আমি কেন পালাতে যাব £ পরে আমিই ওকে বললাম-_পালা। তখন ও পালাল ।, 


৮ গৃহভ 


শিবেগৌড় এবং অন্যান্য বিভ্জনেরা তৎক্ষণাৎ বুঝে ফেলল এই স্বীকারোতিশর পরিণাম কি 
হতে পারে। গজম্মা কি করবে কিছুই বুঝতে পারছিল না। মহাদেবায়াজী সব বুঝেও কোন- 
রকমে উদ্ধারের উপায় খুঁজছিলেন, তিনি বলে উঠলেন, “এই ছেলেটার কথা বিশ্বাস করা যায় 
নাকি 2 

প্যাটেল বেশ দাপটের সঙ্গেই পাল্টা প্রশ্ন করে, “কেন বিশ্বাস করা যায় না, শুনি £ 

চেন্নিগরায় নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য আবার জোরের সঙ্গে বলে বসল, “প্যাটেলজী, 
আমি সব সত্যি কথা বলছি।, মহাদেবায়াজী এবার চুপ করে থাকাই শ্রেয় মনে করলেন। 
যখন বড়ভাই-ই এইভাবে মুখতা প্রকাশ করছে, তখন সেখানে বেশী বৃদ্ধি খেলাতে গেলে প্যাটেল 
এবং গ্রামসুদ্ধ লোক ওর ওপরেই চটে উঠবে। 


১১ 


প্যাটেলের আদেশে গ্রামের চৌকিদার ও তার কর্মচারী বেরিয়ে পড়ল অপ্পন্নায়ার সন্ধানে । রাত্রের 
অন্ধকারে সে বেশীদুর পালাতে পারেনি । জলাশয়ের অপর প্রান্তে জলনিকাশী নালার পাশে 
একটা ভাঙা ভূতুড়ে মণ্ডপের মধ্যে লুকিয়ে বসেছিল। ডাকাডাকি শুনেও প্রথমটা সে ভয়ের 
চোটে বেরোতেই চায় না। কাছে যেতেই ওদের পায়ে পড়ে সে কাকুতি-মিনতি শুরু করে দিল। 
কিন্তু লোকে যেমন করে চার পা ধরে ছাগলছানাকে কাঁধে তুলে নেয় ঠিক সেইভাবে মুদ্দা নুয়ে- 
পড়া অপ্পন্নায়াকে কাঁধের ওপর তুলে নিয়ে চলল । 

গ্রামের লোকেরা তখনও বাধের ওপরেই রয়েছে । এতক্ষণে আখ-মাড়াইয়ের সব জিনিস- 
পন্্রই পুড়ে শেষ হয়ে শুধু ভস্মাবশেষ চোখে পড়ছে । খেতির আখগুলো পুড়ে কালো হয়ে গেছে। 
জ্যোৎস্না রান্রি নয়, তবু সমস্ত আকাশটা কেমন যেন ধোয়াটে দেখাচ্ছে । সবার সামনে এনে 
অপ্পন্নায়াকে নামান হল। ভয়ে সে ঠক্‌ ঠক্‌ করে কাঁপছে । মাথার টিকির জায়গাটা ছাড়া 
বাকি মৃণ্ডিত অংশ ঘেমে উঠেছে । ছেলের মখের চেহারা দেখে গঙ্গশ্মা একটা বড় রকমের নিশ্বাস 
নিল। সে তো আগে থেকেই স্থির করে রেখেছিল শিবেগৌড়ের হাতে ছেলেকে মার খাওয়াতে 
হবে। কিন্তু দেখা গেল, শিবেগৌড়ের সিদ্ধান্ত একটু অন্যরকম। 

সে প্রশ্ন করল, আখের খেতে আগুন লাগালি কেন, বল্‌ £ 

অপপন্নায়া ভয়ে কোন কথাই বলল না। দ্বিতীয়বার আরও জোরে প্রশ্নটা করা হলে বলে 
উঠল, “আমি কিছু জানি না, মশায় ।” 

“আরে! কিছুই জানে না! বিড়ি ধরাতে গিয়ে আগুন লাগাস্নি তুই £ আমি যখন নারকেল 
গাছে চড়েছিলাম, তুই নিজেই এসে বলিস্নি, সৈ কথা £  চেন্নিগরায় অপরাধ প্রমাণ করতে তৎপর 
হয়ে ওঠে । কিন্তু অপ্পন্নায়া মাথা নত করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ওর পা কাঁপছে, খাটো ধুতির 
ভেতর থেকে বেশ দেখা যাচ্ছে সে কাপুনি। পাণ্ডা অইয়াশাস্ত্রীজী দাঁড়িয়েছিলেন সেখানে, তিনি 
বললেন, “মৌনং সম্মতি সূচকং, অর্থাৎ স্পম্ট বোঝা যাচ্ছে ও-ই আগুন লাগিয়েছে। অতঃপর 
কি করা হবে তাই বলো।, 


গৃুহভঙ্গ টা 


খু 


যাদের খেত তারা সবাই এবার কথা বলতে শুরু করল ।-_-আমার খেতের আখে মিছরির 
মত মিঠে গুড় হত। এক আনায় দু ভেলি দাম ফেললেও বিষ্যদবারের বাজারে সব বিকী হয়ে 
যেত। কম করেও তিনশ টাকা লোকসান হয়ে গেল',__-এই বলে গজগজ করছিল রাখাল সন্নয়া। 
বেনে রেবন্না শেট্রি বলে উঠল, “আমার গুড় তো তৈরীই হয়ে গিয়েছিল। খেতে আখের যে ডাঁটা- 
গুলো পড়েছিল সেগুলো বড় হলেও অন্তত চারশ টাকা ঘরে আসত।” এইভাবে সবাই একে একে 
নিজেদের লোকসানের হিসেব দিচ্ছিল। 

পাণ্ডা অইয়াশাস্ত্রীজীর কোন খেত-খামার নেই। কিন্তু তিনিও জানিয়ে দিলেন, “আমার 
নিজের খেত নেই বটে, কিন্ত গুড় বানাবার সময় সবাই গণপতির পূজো দেয় তো! প্রতি কড়াই 
থেকে আমি এক এক ভেলি গুড় পাই। হিসেব করলে আমার ভাগে অন্তত পাঁচশ ভেলি গুড় হয়, 
অর্থাৎ কিনা, আমারও প্রায় পঞ্চাশ টাকার মত লোকসান হয়েছে । তাছাড়া, আখের রস, কড়াই 
নামাবার সময় সেখানে হাজির থাকলে গরম গুড়, এসব তো আছেই |, 

শান্ত্রীজী, আপনার হিসেবটা কিন্তু সুদে-আসলে বড়ই বেড়ে যাচ্ছে। যাদের আখ নম্ট হয়েছে 
তাদের লোকসানের হিসেব ন্যায়সঙ্গত, কিন্ত এর ওপর আবার গণপতি পুজোর পাওনা গুড়ের ভেলির 
হিসেব জড়বেন না”_-কথার মাঝখানেই টুকে উঠলেন মহাদেবায়াজী, 'রেবন্া শেটির আখ-কেটে 
গুড় তৈরী হবার পর খেতে যে ডাঁটা পড়ে আছে তারই দাম নাকি চারশ টাকা, অথচ ওর খেত তো 
মোটে দেড় একরের, তার প্রথম ফসলের দাম একশ টাকাও হয়নি। তাহলে এখন কেবল ডাঁটা- 
গুলোর দাম চারশ টাকা হয় কি করে? ও নিজেই আমাকে একদিন বলেছে, ডাটাগুলো আর 
খেতে ছেড়ে রাখব না, জমিটা সাফ করিয়ে ফেলে সামনের বছর ধানের চাষ করব, আখের চাষে 
জমি খারাপ হয়ে যায় ।' 

লোকে হয়ত নিজের নিজের লোকসানের হিসেব আরো বাড়িয়ে বাড়িয়েই বলত, কিন্তু এখন 
মহাদেবায়াজীর মন্তব্য শোনার পর সবাই একটু ভেবে-চিন্তে কথা বলতে লাগল । 

মহাদেবায়াজী আবার বলতে শুরু করলেন, “গণপতি পুজোর জন্য যে ভেলি দেওয়া হয় তার 
মাপ অনেক ছোট, সেই রকম পাঁচশ ভেলির দাম পঞ্চাশ টাকা, কে দেবে 2 ও রকম হিসেব করলে 
তো এক টাকায় দশ ভেলি গুড় নিতে হয়। অথচ, বাজারে এক টাকায় চলিলশ ভেলি গুড় পাওয়া 
যায়। কাজে কাজেই এ রকম ছোট ভেলির গুড় দেড় আনায় একখানা কখনও হতে পারে £ 

পাগ্ডা অইয়াশাসত্রীজীর মুখে আর কথাটি নেই। এবার যাবার উদ্যোগ করতে করতে 
মহাদেবায়াজী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবার ভঙ্গিতে বললেন, “লোকসানের হিসেব যদি করতে 
থাক তাহলে কেউই কিছু পাবে না। ছেলেমানুষ ! ইচ্ছে করে তো আর কিছু করেনি। তবে 
হ্যা, এইটুকু ছেলে বিড়ি খেতে শিখেছে, তার জন্য ওকে শাসন করা দরকার । ওকে চার ঘা বেত 
লাগাও আর নয়ত মাস্টারজীকে বলে ওকে বেঁধে রাখ ॥ 

এবার অপ্পন্না কান্নাকাটি শুরু করল, “না, মশায় না, আমাকে বাঁধবেন না, পায়ে পড়ি 
আপনার ।” চেন্নিগরায় মাঝে থেকে অকারণেই বলে উঠল, “আমার কিন্তু কোন দোষ নেই। 
ওকেই বেধে রাখুন ।” 

কিন্তু প্যাটেল শিবেগৌড় অন্য সুর ধরল-_-সে বললে, “মহাদেবায়াজী, আপনি হলেন সন্যাসী- 
মান্ুষ। আপনার তো না আছে ঘর-সংসার, না আছে ছেলেপিলে। ছেলেকে শাসন করে শিক্ষা 


২১০ গৃহতঙ্গ 


খু 


দেওয়া, সেটা আলাদা ব্যাপার । কিন্তু এই যে লোকসানটা হল, এর ক্ষতিপূরণ কে করবে £ আমি 
এ গাঁয়ের প্যাটেল, আমাকে তো ন্যায়বিচার করতে হবে £ আমার সিদ্ধান্ত শুনুন-__সারা গ্রামের 
এই ক্ষতির জন্য একটা থোক টাকা ক্ষতিপূরণ হি,সবে দিতে হবে এবং সে টাকা, যাদের যাদের 
ক্ষতি হয়েছে তাদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে ॥ 

অধিকাংশ লোকই এবার মাথা নেড়ে বলতে লাগল, “হ্যা, এই তো উচিত কথা, ন্যায়বিচার । 

রেবনা শেট্রি আর অইয়াশাস্ত্রী জোর গলায় বলতে লাগল, হ্যা, এইতো যোগ্য বাপের ব্যাটার 
মত কথা, একেবারে খাঁটি কথা । ওদের উদ্দেশ্য ছিল মহাদেবায়াজীকে একটু তাতিতে দেওয়া, 
কিন্তু মহাদেবায়াজী এসব কথায় কান দিলেন না। এতক্ষণে গজম্মাও বুঝতে পারছে ব্যাপারটা 
কোনদিকে মোড় নিচ্ছে । সে এবার হাতজোড় করে শুরু করে, “আমি অবলা বিধবা, এরা না 
বৃঝে সুঝে এমনটা করে ফেলেছে -*** আরো কিছু সে বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু চেনিগরায় কথার 
মাঝেই বাধা দিয়ে বলে ওঠে, আমার কোন দোষ নেই মা, বলতে হয় অপ্পন্নার নামই বলো।' 
এ কথাটা যেন শুনতেই পায়নি এমনভাবে গ্ম্মা মিনতি করতে থাকে, “দোষ করেছে তার জন্য 
ওকে শাস্তি দিন, কিন্তু জরিমানা দেবার মত আমার কাছে কিছুই নেই।' 

ওদিকে অপ্পন্না কাঁদতে কাঁদতে বলে, 'জরিমানাই করে দিন, আমাকে সাজা দেবেন না।, 

গ্রামের বিজ্লোকেদের মধ্যে এবার আলোচনা আরম্ভ হল। শেষ পর্যন্ত এই স্থির হল যে, 
সমস্ত ক্ষতিপূরণ করা যদি সম্ভব না হয় তাহলে সবাইকে অন্তত কিছু কিছু টাকা ভাগ করে দেবার 
জন্য গঙ্গম্মাকে দু-হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে এবং অইয়াশাস্ত্রীজী, গণপতি পুজোর প্রাপ্য 
গড় থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে তাঁকে দশ টাকা ও রেবন্না শেটির খেতের ডাঁটাগুলোর জন্য পঁচিশ 
টাকা দেওয়া হবে। 

গজম্মা হাতজোড় করে অনেক কাকৃতি-মিনতি করল কিন্তু কেউ তার অনুনয়ে কান 
দিল না। তার পক্ষ নিয়ে কথা বলতে গেলে কোন লাভ হবে না বুঝে মহাদেবায়াজীও চুপ করে 
রইলেন। গজম্মা জানাল, তার কাছে এক কানাকড়িও নেই। তাই শুনে শিবেগৌড় পরামর্শ 
দিল, “তুমি যদি তোমার খেত, বাগান, ঘর-বাড়ি সব আমার কাছে বাঁধা রাখ, তাহলে 
জরিমানার টাকাটা আমি দিতে পারি। পরে আমার টাকা ফেরত দিয়ে নিজের সম্পত্তি 
ফিরিয়ে নিও ।” 

গঙ্গম্মা কি করবে ঠিক বুঝতে পারছিল না। সে অহইয়াশাস্ত্রীজীর মুখের দিকে তাকাল। 
কিন্তু শাস্ত্রী তাঁর ভাগের দশ টাকা ছাড়বেন কেন £ সুতরাং সেদিকে চেয়ে কোন লাভ হল না। 
গ্রামের আর এক পুরোহিতের নাম অন্নাজোইস। সে অইয়াশাস্ত্রীর আত্মীয়, দূর সম্পকের বড় 
ভাইয়ের ছেলে। খুড়োর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সেও কোন কথা বলল না। সারা গ্রামের গণ্যমান্য 
ব্যক্তিরা এই বিধান দিয়েছেন, এটা মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোন পথ নেই। সুতরাং গঙ্জশ্মাকে 
এই দণ্ড মেনে নিতেই হল। মহাদেবায়াজী অনেক চেম্টা করেছিলেন, কিন্তু কোন ফল হল না। 
তবু তিনি গঙ্ম্মাকে পরামর্শ দিলেন, “জমি বাঁধা দিয়ে খণ করো না, তোমার যদি সোনা-রূপোর 
গহনা কিছু থকে তো তাই বিকী করে দাও। তাতেও যদি সব টাকার জোগাড় না হয় তাহলে 
ঘরের ফসল, নারকেল ইত্যাদি বিকী করে টাকা যোগাড় কর। ধার করলেই তার সুদও বাড়তে 
থাকবে, এ সব ব্যাপার সম্বন্ধে তোমার কোন অভিজ্ততাই নেই 


গুহভজ ৎ১ৎ১ 


প্যাটেল শিবেগৌড় বলে উঠল, “এর জন্য আবার অভিজ্ঞতার কি দরকার £ আমি কি সুদ 
চাইছি না-কি ওর কাছে £ কেবল একটা প্রমাণপন্র লিখে দিক, তাহলেই হবে। বিয়ের সময় 
আর গুরুজনদের কাছ থেকে যে সব গহনাগাঁটি, কাপড়-চোপড় পেয়েছে তা যদি একবার বেচে 
দেয়, আর কি কখনও ফিরে পাবে £ সন্ম্যাসীদের না হয় সোনা-রূপোর কোন প্রয়োজন নেই, কিন্তু 
তাই বলে গেরস্ত সংসারী মান্ষেরও কি ওসবের দরকার নেই? গন্সম্মাজী ভাল করে ভেবে 
দেখো, সন্যাসী মহাদেবায়াজীর পরামর্শ শুনবে, না গাঁয়ের দশজন বিজক্তলোকের কথামত কাজ 
করবে? 

সকলেই বলতে লাগল, প্যাটেলের কথা খুবই যুক্তিসঙ্গত। প্যাটেলের শালা, যে এখন 
পাটোয়ারীর কাজ করছে---সে বললে, “আইনে বলে, বিবাহের সময় পাওয়া সোনা-রূপোর জিনিস 
স্বামীর মৃত্যুর পর বিকী করার অধিকার কোন স্ত্রীলোকের নেই। জমি বাঁধা দেওয়া চলতে পারে ।, 
অইয়াশাস্ত্রাও কথাটা অনুমোদন করলেন। এতজনের অভিমতের বিরুদ্ধে যাবার মত আইনজ্ঞান 
মহাদেবাগ্নাজীর ছিল না। আর থাকলেও, যখন সকলেই একত্র হয়ে জোট বেঁধেছে, তখন 
তারা ও"'র অভিমত মানবেই বা কেনঠ এদের কথাই গঙ্গশ্মা মেনে নেবে কিনা, তাও ঠিক 
জানা নেই, এক্ষেত্রে চুপ করে থাকাই তিনি শ্রেয় মনে করলেন। 

ন্যায়বিচার যখন হয়ে গেছে, তা পালিত হতে বিলম্ব হওয়া উচিত নয়। সুতরাং চটপট দু-খানা 
গরুর গাড়ি প্রস্তত হয়ে এসে গেল। দুই পুন্রসহ গঙ্গাম্মাকে নিয়ে প্যাটেল ও আরো কয়েকজন 
গণ্যমান্য ব্যক্তি তিপটুর রওনা হয়ে গেলেন। সাবরেজিস্ট্রারের সামনে শিবেগৌড় দু-হাজার টাকা 
দিয়ে দিল এবং গঙ্গাম্মাদের পারিবারিক দুর্যোগের কারণ দেখিয়ে তার সমস্ত সম্পতি বন্ধক লিখিয়ে 
নিল। পাটায়ারী শিবলিঙ্গেগৌড় এই সব কাগজপন্র তৈরী করার মজুরী হিসেবে দাবী করল 
পঁচিশ টাকা । গঙ্গম্মাকে কথা দিতে হল, এ বছর দরটা একটু চড়লেই সবৃজী বেচে এ টাকাটা 
সে দিয়ে দেবে। প্যাটেল নিজের আখের খেতের লোকসানের দরুন চারশ টাকা কেটে নিয়ে 
বাকিটা ভাগ করে দিল অন্যদের মধ্যে । 

গঙ্গশ্মা বিধবামানুষ, তিপটুরের হোটেলে তার খাওয়া চলবে না। লুচি যদিও ভাজা খাবার, 
কিন্তু ভাজবার পূর্বে ময়দাটা জল দিয়ে মাখা হয় তো, সুতরাং লুচিও খাওয়া নিষেধ। অগত্যা 
সে একটা পুকুরে স্নান করে ভিজে কাপড়ে শুদ্ধাচারে দু”মুশ্ো গরম ছোলা আর গুড় খেয়ে গাড়িতে 
উঠে বসল। ছেলেদের সে দিল ছ'আনা পয়সা, ব্রাহ্মণদের সঙ্গে গিয়ে তারা খেয়ে এল দোসা 
আর চাটনী। 

গ্রামে ফিরে এসে লজ্জায় সঙ্কোচে গঙ্জশ্মা দিনচারেক বাড়ি থেকে বেরোল না পযন্ত। তারপর 
তিন মাইল দুরে সন্নীনহল্লীর কৃষোর বাড়িতে গিয়ে ষোল টাকায় পাঁচশ খাপরা কিনে এনে ছাদ 
মেরামত করাল। 

প্রায় আট্দিন পরে একদিন সে মন্দির থেকে ডেকে পাঠাল মহাদেবায়াজীকে । অনেক সুখ- 
দুঃখের কথা হল। এরপর কি করা যায় সেকথা জিজ্ঞাসা করায় তিনি উপদেশ দিলেন, “অপ্পন্নাকে 
আবার মাস্টার মশাইয়ের কাছে পাঠাও, একট লেখাপড়া শিখলে ও শুধরে যাবে । চেনিগরায়কেও 
পাঠাও হোন্নবল্লীর পাটোয়ারীর কাছে। তুমি নিজে সঙ্গে যাও এবং তাঁকে অনুরোধ কর যাতে 
ছেলেটাকে ভাল করে তালিম দিয়ে দেন। এ বংশের পাটোয়ারী বৃত্তি এখন রয়েছে অন্যের হাতে, 


১২ গৃহভঙগ 


এমনভাবে শিক্ষা দিতে হবে যাতে সে এ কাজের দায়িত্ব নিতে পারে । অবিলম্বে চলে যাও, আর 
দেরী করা উচিত নয়। ছেলের বয়স পনের হল তো £ 

গঙ্গশ্মা মেনে নিল কথাটা । চেন্নিগরায়কে হিসেব লেখা শেখাবার জন্য হোন্নবল্লীর পাটোয়ারী 
সীতারামাইয়ার কাছে পাঠান হচ্ছে, এ খবর পৌছে গেল প্যাটেলের কানে । 

গঙ্শ্মাকে সে এসে বোঝাতে লাগল, “কেন ছেলেটাকে অতদুরে পাঠাচ্ছ £ আমাদের শিব- 
লিঙ্গের কাছে দাওনা পাঠিয়ে, বাড়ির কাছেই কাজ শিখতে পারবে, সেইটেই কি উচিত হবে না £ 

কিন্তু গঙ্গম্মার দুঢ় বিশ্বাস হোন্নবল্লীর সীতারামাইয়াজীর কাছে না শিখলে শিক্ষা সম্পূর্ণ 
হবে না। পাটোয়ারীর কাজ তো অনেকেই করে. কিন্তু উপযুক্ত গুরু হবার মত যোগ্যতা আছে 
একমাত্র সীতারামাইয়াজীর। জাবগল্লুতে হলেবিডের বেঙ্কটেশায়াজী আছেন, তিনিও খুব 
সুদক্ষ, কিন্তু তিনি তিক এ অঞ্চলের নন। আর প্রত্যেক এলাকার কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, 
সেগলো জানা থাকে কেবল সেই এলাকারই লোকেদের । 

গজ্ম্মা গরুরগাড়ির ব্যবস্থা করে দুই ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল হোন্নবল্লীর উদ্দেশ্যে। 
যাবার দুদিন আগে কুদ্রন্না নাপিতকে ডেকে চেন্নিগরায়ের মাথা কামানো হল, কপালে আঁকা হল 
চন্দনের রেখা । দ্বিতীয় দিনে হল তৈল সম্নান। “কোড্বলে আর চালের গুড়োর নাড়, প্রস্তত 
করে বাঁধা হল পুঁটলিতে । কোট, টুপী পরে সেজেগুজে গাড়িতে ওঠার সময় মহাদেবায়াজী বললেন, 
“বড় জায়গায় যাচ্ছ, এখন থেকে ভুলেও যেন মুখ দিয়ে খারাপ কথা না বের হয়। বুদ্ধিমান হয়ে 
ফিরে এস! 

হোননবল্লীর সীতারামাইয়াজী স্বর্গীয় রামন্নাজীর পরিচিত ছিলেন । গন্গশ্মার আগ্রহ দেখে 
তিনি চেন্নিগরায়কে নিজের কাছে রেখে কাজ শেখাতে রাজি হয়ে গেলেন। বিদায়ের সময় মা 
আর ছোটভাইকে গাড়িতে উঠতে দেখে কেদে ফেলে চেন্নিগ, তারপর বলে ওঠে, “মা, কারো হাতে 
আরো কোড্বলে আর নাড়, পাঠিয়ে দিও কিন্তু ৷” 

গ্রামে ফিরে এসে অপ্পন্নাকেও ভর্তি করা হল চেন্নাকেশবয়ার পাশ্শালায়। রোজ দুই পকেট 
ভরে ছোলা, গুড় আর নারকেলের টুকরো দিয়ে তবে তাকে পাঠশালায় পাঠাতে হয়। 


দ্রিতীম্ন অধ্যায় 


চেন্নিগরায়ের শিক্ষার তিন বছর সমাপ্ত হল। এখন নে বেশ নিপুণভাবে বাঁ হাতে রুল ধরে ভান 
হাতের কলম দিয়ে সরলরেখা টানতে পারে । বাঁদিকের হিসেব সে এখন ভুল না করেই লিখতে 
পারে ; তাছাড়া ডান দিকের হিসেব কিভাবে লিখতে হয় তারও রীতিনীতি তার শেখা হয়ে গেছে। 
তবে শিক্ষাটা সম্পূর্ণ হরেছে কিনা সেটা বলা কঠিন। শুরু সীতারামাইয়াজী বলেন, “তামার 
চারআনা শিক্ষাও হয়নি ।” চেনিগরায় অবশ্য তাঁর সামনে এ কথার কোন উত্তর দেয় না; কিন্ত 
মনে মনে সে একথা মোটেই বিশ্বাস করে না। ভাবে, উনি কি মনে করেন হিসেব শিখবার জন্য 
আমি এইখানেই বরাবর পড়ে থাকব £, 

বছরে দুই-তিনবার সে গ্রামে আসে, পায়ে হেঁটেই আসতে হয়। এসেই মাকে জিক্তাসা করে, 
“আর কতদিন ওখানে থাকতে হবে শুনি £ এবারে আমি এখানে এসে পাটোয়ারীগিরির চার্জ নেব ।” 

“হিসেবটা ভাল করে শিখেছিস তো £, 

“তা আর শিখিনি 2 জিজ্ঞেস করে দেখো না-_-এই তো, এক নম্বর হল ব্যবহার খাতা, 
দ্ু'নম্বর বঞ্জর খাতা, তিন মর্দশুমারী, চার নম্বর খাতা, তারপর হল পাঁচ নম্বর ভাড়া, ছয় নহ্ৃর 
অন্তর, সাত তকার খাতা, আট ইনাম রেজিস্টার, নয় নম্বর জমাবন্দী গৌশওয়ারা, দশ খতৌনী, 
এগার রসিদ খাতা আর বার নম্বর হল গিয়ে রায়স্তমারী। এই হল পাটোয়ারী কাজের বার 
রকমের খাতা । এরপর সে প্রভব, বিভব ইত্যাদি ষাট সম্বংসরের নাম বলে গেল গড়গড় করে। 

এতক্ষণে মায়ের বিশ্বাস হল, হ্যা ছেলে বিদ্বান হয়েছে বটে। এবার ছেলে বলে ওঠে, “তা 
তুমি ঘে দেখি একেবারে চুপচাপ বসে আছ, আমার বিয়ে-টিয়ে কি দেবে না কি £ 

“ওমা, তা কেন দেব না£ তা, পাটোয়ারীগিরিটা আগে হাতে নিয়ে নে £ 

“সে তো নিয়েই নিচ্ছি। আঠার বছর বয়স হয়ে গেল আমার, এখন আমি সাবালক । লোকে 
ষোল বছরেই ছেলের বিয়ে দেয়, এখনও যদি আমার বিয়ে না হয় লোকে বলবে কি 2, 

ইতিমধ্যেই চেনিগরায়ের জন্য বিয়ের সন্বন্ধ আসতে শুরু করেছে । কিন্তু এতদিন গজম্মা 
এদিকে বিশেষ মনোযোগ দেয়নি । এখন ছেলের নিজেরই বিয়েতে মন হয়েছে, সুতরাং বিয়েটা 
দিয়ে ফেলাই উচিত। গঙ্গশ্মা মহাদেবায়াজীর কাছে পরামর্শ নিতে গেল, কিন্তু তিনি উপদেশ 
দিলেন, ও আরো দ্র-এক বছর কাজ শিখুক, পাটোয়ারী কাজের দায়িত্ব নেবার পরই বিয্লেটা দেওয়া 
উচিত হবে। 

এ কথা শুনেই চেন্িগরায় বেজায় খাপ্পা, চেচিয়ে উল, “আহা হা, এখনও আরো দু'বছর বসে 
থাকতে হবে ! আপনি কি বোঝেন £ চুপ করে থাকুন তো। এর আগে কখনও চেন্িগরায় 
ও"র সঙ্গে এভাবে কথা বলেনি । মহাদেবায়াজী আর কোন কথা বললেন না। 


১৪ গৃহভজ 


হোনবল্লীতে আর ফিরল না চেন্নিগরায়। একদিন শিবলিঙ্গেগৌড়ের বাড়ি গিয়ে হাজির 
হল সে এবং নিজেদের বংশের প্রাপ্য পাটোয়ারীগিরির দায়িত্ব ফিরে পেতে চাইল তার কাছে। 
শিবলিজেগোড় জানাল, “হ্যা, দিয়ে তো দেবই, দাঁড়াও, ওপর থেকে হকৃমটা আসুক ।” চেন্নিগরায় 
ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছিল না। কি করা উচিত এখন£ঃ ইতিমধ্যে বিয়ের কথাবার্তাও 
কানে আসতে লাগল + সুতরাং কাজকর্মের দিকে আর মনোযোগ রইল না তার। 

হঠাৎ একদিন দেখা গেল, একটা সাদা ঘোড়া এসে দাঁড়িয়েছে বাড়ির সামনে । ঘোড়ার 
জিন আর লাগাম একেবারে ঝক্ঝকু করছে । ঘোড়া থেকে নামলেন একটি মোটাসোটা 
গণ্যমান্য চেহারার ভদ্রলোক, পরনে সাদা রঙের কোট-প্যান্ট এবং পায়ে জতো-মোজা । 
সাদা ঘোড়া এবং এই ভদ্রলোককে দেখলে যে কোন লোকেরই ধারণা হতে পারে যে ইনি 
ডেপুটি কমিশনার । গন্গম্মাও এই রকম কিছু আন্দাজ করে ভিতরে এসে ডাকল চেন্িগরায়কে। 
সে তাড়াতাড়ি ছুটে বাইরে এসে আভুমি প্রণত হয়ে সেলাম করে দাঁড়াল, তারপর কোনকমে 
তোৎলাতে তোৎলাতে বলল, “আপনি মহানুভব, আমাকে অনুগ্রহ করুন ।, তারও ধারণা হয়ে 
গিয়েছিল যে, পাটোয়ারী কাজের ভার তাকে দেওয়াবার জন্যই স্বয়ং ডেপুটি কমিশনার সাহেব 
এসে পো ছেছেন। 

শিবলিঙ্গেগোড়কে ডেকে আনব কি £ জানতে চাইল সে। 

“কিসের জন্য £ 

“'আঁজে, পাটোয়ারীর কাজটা এখন সেই দেখাশোনা করছে কিনা! ওর কাছ থেকে কাজটা 
আমাকে পাইয়ে দিন ধর্মাবতার। আমার নাম চেন্নিগরায়, আমি এখানকার স্থায়ী পাটোয়ারী 
রামন্নাজীর বড় ছেলে । 

“পাইয়ে দেব। এখন ভেতরে চলো । 

সবাই ভেতরে এলেন। কিন্তু ঘরে বসতে দেবার জন্য কোন চেয়ার নেই। অন্নাজোইসজীর 
বাড়িতে একখানা চেয়ার আছে, তাছাড়া সারা গ্রামে আর কারো বাড়িতেই ও-সব জিনিস নেই। 
আগন্তক মাদুরের ওপরই বসলেন। চেন্নিগরায় গঙ্গাজল এনে সামনে রাখায় তিনি বলে উঠলেন, 
“এখন আমার জলপান করা উচিত নয়।” 

এরা দুজনে ব্যাপারখানা কিছুই বুঝতে পারছে না। এরই মধ্যে আগন্তক কথা শুরু করলেন, 
“আপনারা নাগলাপুরের নাম শুনেছেন আশা করি । আমি সেখানকার স্থানীয় পুরোহিত । আমাকে 
লোকে কন্টীজোইস বলেই জানে । আমার একটি কন্যা আছে, নাম নন্জম্মা। রেবতী নক্ষত্রে 
দ্বিতীয় পাদে জন্ম। বার বছর চলছে, জন্মকৃণ্ডলী আমি সঙ্গেই এনেছি । আপনার পুত্রের 
জন্মকুণডলীটি আমাকে দেখতে দিন।, 

এতক্ষণে গঙ্গম্মা বুঝল, ডেপুটি কমিশনার নয়, এ হচ্ছে নাগলাপুরের কল্ঠীজোইস এবং তার 
ছেলের সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ের সপ্বন্ধ করতেই এখানে এসেছে। এদিকে আবার এতবড় এক 
ঘোড়ায় চড়ে ডেপুটি কমিশনার সাহেবের মত পোশাক পরে আসা হয়েছে! সে বলল, “পাটোয়ারীর 
কাজটা হাতে এলে, তারপর আমি ছেলের বিয়ে দেব।” 

“মা, তুমি কিছুই বোঝ না, তুমি চুপ করে থাক তো! উনিতো আগেই বলেছেন, আমাকে 
চার্জটা পাইয়ে দেবেন” মাকে থামিয়ে দিল চেন্নিগ। 


গৃহভঙল ১৫ 


শর 


“আপনার অধিকার আপনাকে পাইয়ে দিতে কতটা সময় লাগবে তা আমি জানি। আমি 
নিজে কথা বলব অফিসারের সঙ্গে। কিন্তু বিয়েটা তো আগে হয়ে যাক ।, 

গঙ্গশ্মা এবার এনে দিল ছেলের জন্মকণ্ডলীর কাগজখানা। কন্ঠীজোইসজী নিজেই জ্যোতিষ 
জানেন, কোষ্ঠীপন্ত্র হাতে পেয়েই মিলিয়ে দেখে বললেন, “হু, ঠিক মিলে যাচ্ছে। এবার তাহলে 
কথাবাতা শুরু করা যাক ।, 


২ 


রামসন্দ্র গ্রামের বার মাইল পশ্চিমে নাগলাপর। এ অঞ্চলে এমন কেউ নেই যে, কন্ঠীজোইসজীর 
নামডাক শোনেনি । রামসন্দ্র, তৃুমক্র জেলার তিপটুর তালুকের অন্তর্গত, আর নাগলাপুর হল 
হাসান জেলায় চন্নরায়পন্টন তালুকের মধ্যে। সেই কারণেই রামসন্দ্রের লোকের কাছে 


কন্ঠীজোইসজী ততটা পরিচিত নন, কিন্তু ওদিকে চন্নরায়পট্টন তালুক, শান্তিগ্রাম, হাসান, কৌশিক 
ইত্যাদি সমস্ত জায়গায় কন্ঠীজোইসজী সবজন পরিচিত ব্যক্তি। 
কন্ঠীজোইসজীর দীর্ঘ শরীর, বিশাল ললাট | দুম্টিশক্তি অতি তীক্ষ । বিয়ে হয়েছিল 


যোল বছর বয়সে। স্ত্রী যখন ঘর করতে এলেন তখন তাঁর বয়স বিশ বছর । দুবছর পরে 
জন্মাল প্রথম সন্তান, একটি ছেলে । আরো দুবছর পরে একটি শিশু জন্মের পরই মারা যায়। 
তারপর আরো দুটি সন্তান হয়েছিল কিন্তু তারাও বাঁচেনি। শেষবারে জন্মাল একটি কন্যাসন্তান, 


কিন্তু এবার তাদের মাকেই বিদায় নিতে হল পুথিবী থেকে । কন্ঠীজোইসজীর মা মান্ষ করতে 
লাগলেন শিশুকন্যাটিকে। আর দ্বিতীয় বিবাহ করেননি কন্ঠীজোইস। এখন তাঁর দুটিমান্র 


সন্তান, বড় ছেলে কল্লেশ শ্রবণবেলগোলায় পুলিশে কাজ করে, আর মেয়ে এই নন্জম্মা, যার 
বিয়ে স্থির হচ্ছে চেনিগরায়ের সঙ্গে । 

কন্ঠীজোইসজীর এত নামডাক এমনিতে হয়নি । তার যথেষ্ট কারণও আছে। প্রথমত 
তাঁর ভীমকান্তি শরীর একবার দেখলে কেউ ভুলতে পারে না। নাটক, ষক্ষগান* ইত্যাদিতে তাঁর 
অভিনয় যারা দেখেছে তারাই মুগ্ধ হয়ে গেছে। কালিদাসের নাটকে রাজা ভোজের পাট তাঁর 
মত করে অন্য কেউ করতেই পারবে না। মহাভারতে দুর্যোধনের ভূমিকায় তো ও'কে ছাড়া আর 
কাউকে ভাবাই যায় না। যক্ষগানে বীরবেশে নৃত্য করতে করতে পা দুখানা যখন একেবারে 
ভেঙে পড়তে চায় তখনই কেবল উনি নাচ বন্ধ করেন। উ'চু দরাজ গলায় এক নিঃশ্বাসে তিনি 
রাগ সহযোগে কন্দপদ্য গেয়ে যেতে পারেন। হারমোনিয়াম, তবলা ইত্যাদি বাজানোতেও হাত 
আছে। শুভ-অশুভ দুরকম কাজেই পৌরোহিত্য করে থাকেন । এছাড়া জ্যোতিষবিদ্যা, মন্ত্র-তন্ত্র, 
ঝাড়-ফুঁক ইত্যাদিও জানা আছে । সরকারী আমলাদের সঙ্গে ইংরাজীতে কথাবার্তা বলতে পারেন; 
আবার মুসলমানদের সঙ্গে বিশুদ্ধ উদ্দুূতে আলাপ করার ক্ষমতাও রাখেন। 

এতরকম গুণাবলীর জন্যই এ র এত প্রসিদ্ধি। লোকে বলে এককালে নাকি তিনি দু-একটা 
খুনের মামলাতেও জড়িয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু আদালতে জয় হয়েছিল তাঁরই । তবে এসব কথার 


* কর্নাটকের এক বিশেষ ধরনের নৃত্য-নাটিকা 


১৬ গৃহভ 


কতটা সত্যি, কতটা বানানো সেটা কেউই সঠিক জানে না। জোইসজী নিজে তো বলেন, ও-সব 
মিথ্যে রটনা । কারো সঙ্গে বিবাদ বাধলে তিনি যেভাবে হুঙ্কার দিয়ে বলে ওঠেন, "খুন করে ফেলব 
একেবারে', তাতে যদি কেউ ভয়ে আঁতকে ওঠে তো আশ্চর্য হবার কিছু নেই। অন্ধকারকে উনি 
ভয় করেন না, যত ঘোরাফেরা সব ও"র রাতেই । ছোরাখানা কোমরে বেঁধে একাই বেরিয়ে পড়েন 
এবং ভাঙাচে।রা এবড়ো-খেবড়ো চব্বিশ মাইল পথ পার হয়ে সূর্যোদয়ের আগেই পৌছে যান 
হাসানে। দিনের বেলা ঘোরাঘুরি ওর বিশেষ পছন্দ নয়। জটাধারী সাধু-সন্াসী আর 
কোল্লীদেবদের (পিশাচ ) সঙ্গেও মুকাবিলা করবার মত সাহস যা'র আছে তাঁর কীর্তিকাহিনী যে 
দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়বে এতো জানা কথাই। 

চেনিগরায়ের বিয়েতে রামসন্দ্র গ্রামের সমস্ত ব্রাহ্মণ, তাছাড়া এই পাটোয়ারী এলাকার মধ্যে 
যারা পড়ে, অর্থাৎ কৃরুবরহল্লীর প্যাটেল গুণ্ডেগীড় ও আরো বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি এসেছিলেন। 
দশখানা গরুরগাড়ি বোঝাই করে বরযাত্রীরা রওনা হল। নাগলাপুরের জলাশয়ের পাড়ে এগিয়ে 
এসে তুরীবাদ্য বাজিয়ে কন্যাপক্ষ স্বাগত জানাল তাদের । বরকে অভ্যর্থনা করে নিয়ে যাবার 
জন্য কন্চীজোইসজী স্বয়ং এসেছেন তাঁর সাদা ঘোড়া নিয়ে । চেন্নিগরায়ের কিন্তু অতবড় ঘোড়ায় 
চড়তে বেশ ভয় করছে। অথচ না চড়তে পারলে সারা রামসন্দ্র গায়ের অপমান, এ কথাটাও 
মনে হচ্ছে তার। শেষ পর্যন্ত গ্জম্মা যখন “ভীতু, কাপুরুষ কোথাকার” বলে ধিক্কার দিয়ে উঠল 
তখন সে চোখ কান বুজে কোন রকমে উঠে পড়ল ঘোড়াটার পিঠের ওপর। কনের ভাই পুলিশ 
কল্লেশ ঘোড়াটার লাগাম ধরে তার সঙ্গে সঙ্গে হেটে চলল । 

কন্চীজোইসজীর ব্যক্তিত্ের পরিচয় পেতে বেশী দেরী হলনা বরযান্রীদের। খুব ধনী হয়ত 
নন, কিন্তু বিয়েতে ধূমধাম হচ্ছে প্রচূুর। হাসানের এক উকিলসাহেবও এসেছেন বিয়েতে । 
অইয়াশাসত্রীজী এবং অন্নাজোইসজী দুজনেই এসেছেন বরপক্ষের পুরোহিত হয়ে। মাসিক শ্রাদ্ধ, 
পৃণ্যাহ, গোরীগণেশ ব্রত-_-এই জাতীয় পূজা-অর্চনা ছাড়া আর বিশেষ কিছু জানেন না অহয়াশাস্ত্রী। 
তবে অন্নাজোইসজী বয়সে ছোট হলেও সিন্ধুঘট্রের সূরন্নজোইসজীর কাছে নিয়মিত শাস্ত্র অধ্যয়ন 
করে এ অঞ্চলে নাম করেছেন। অনেক বিবাহ উপনয়ন ইত্যাদির কাজ করিয়েছেন তিনি । 
এখানেও তাঁর মন্ত্রোচ্চারণে বিরাম নেই। বরপক্ষের জন্য নির্দিষ্ট ঘরে বসে হোম করাতে 
করাতে অন্নাজোইসজী সরবে পাঠ করে চলেছেন, “ওম্‌ ভূরগ্রিয়ে প্রাণায় স্বাহা। ইদমগ্রিয়ে 


কন্যাপক্ষের পাশের বাড়িতেই বরযাত্রীদের রাখা হয়েছে, কাজেই এই মন্ত্রপাঠ কনের বাড়িতেও 
জপম্ট শোনা যাচ্ছে। কন্ডীজোইসজীর কানে যেতেই তিনি হঠাৎ সেখানে এসে বলে উঠলেন, 
“জোইসজী অগ্নি আহতির মন্ত্রটা আর একবার বলুন তো।, 

“কেন? 

“শোনা দরকার । বলুন আপনি ।” 

“বেদমন্ত্র দ্বিতীয়বার উচ্চারণ করতে নেই এই বলেই অন্নাজোইসজী তাকালেন অইয়াশাস্ত্রীর 
দিকে। 

“কে বললে উচ্চারণ করতে নেই 2 আপনি ভূল বলতে তো পারেন।, 

“আমি ভুল মন্ত্রপাঠ করছি? সিম্ধুঘত্রের সুরন্জোইসজীর শিক্ষা ভুল£ খুড়োমশায়, 


গহভঙ্গ ১৭ 


শি 


আপনি বলন এ বিয়ে দেব, না আমি উঠে যাব £ বলতে বলতে আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠলেন 
অন্নাজোইস। 

“আপনার গুরুকে আমার জানা আছে। বিশুদ্ধ সংস্কৃত তিনি জানেন না। “ভূরগ্রিয়ে” 
ভুল “ভূরগ্রয়ে” বলা উচিত। আপনার ব্যাকরণের ভুল হচ্ছে বই খুলে দেখিয়ে দিতে পারি । বেদ- 
মন্ত্র অশুদ্ধ উচ্চারণ করলে মস্তক সহস্র খণ্ড হয়ে ভেঙে পড়ে, তা জানেন £ 

অন্নাজোইসের মুখে আর কথা নেই । কন্ঠীজোইসজীর শাস্ত্রজ্ঞান দেখে বরযান্ত্রীরাও হতবাক । 
এরপর পাণিগ্রহণের সময় কন্যাদানের মন্ত্রও তিনি এত চমণ্কারভাবে পাঠ করলেন যে, সবাই 
মৃন্ধ হয়ে শুনল। বিবাহের সব আচার-অনুষ্ঠান শেষ হবার পর বরযাত্রী বিদায় নেবার সময় 
অন্নাজোইসজী কন্ঠীজোইসজীর কাছে এসে বলে গেলেন, আমি কেবল মন্ত্রপাঠ করতে শিখেছি, 
কিন্ত ব্যাকরণের জ্ঞান আমার অসম্পর্ণ। অধ্যয়ন সমাপ্ত হবার আগেই পিতার মৃত্যু হল, তাই 
শিক্ষা অধ-সমাপ্ত থেকে গেছে, বাকিটা আমি নিজে পড়ে শিখেছি । যা ভুলচুক হয়েছে অনুগ্রহ 
করে ক্ষমা করবেন ।” 

যাহোক, বেশ সুশৃঙ্খলভাবেই বিবাহপর্ব শেষ হল। বধূর বাহুতে বাজবন্ধ, কম্কণ, খোপায় 
ফল, কোমরে রুপোর গো আর পায়ে পাঁইজোর। বরপক্ষ থেকে রীতি অনুযায়ী দেওয়া 
হয়েছে মঙ্জলসন্ত্র, ঝুমকো এবং নথ । বধ তার পিতার মতই দীর্ঘাঙ্গী, প্রশস্ত ললাট এবং 
চোখ দুটি বেশ বড় বড়। বেশ সুলক্ষণা বধূ। রামসন্দ্রের লোকেরা বলাবলি করতে লাগল, 
“চেনিগরায় অনেক পুণ্য করেছিল, তাই এমন বউ পেয়েছে । কথাটা অবশ্য গজম্মার পছন্দ 
হল না। চেন্নিগরায়কে শ্বশুর বাড়িতে যখন খেতে দেওয়া হয়েছিল, সে এমনভাবে চেটেপুটে 
খেয়েছে যে, পাতে এতট্রকৃও উচ্ছিষ্ট কিছু পড়ে ছিল না, এই ব্যাপারটা নিয়েও রামসন্দ্র আর 
নাগল।পুরের লোকেরা বেশ সমালোচনা করল--অমন হ্যাংলার মত খাওয়াটা উচিত হয়নি । 
কিন্ত চেনিগরায়ের মনে হল সে ঠিকই করেছে, অত ভাল ভাল খাবার কখনও পাতে ফেলে রাখা 
যায় নাকি £ 


৯০ 


চেন্নিগরায় অনেকবার বলা সত্ত্বেও শিবলিন্গেগীড় পাটোয়ারীর কাজটা কিছুতেই ছেড়ে দিচ্ছে না 
ওর হাতে । প্রথমে কিছু দিন তো “এই দিচ্ছি, দেব” করে কাটিয়ে দিল। চেন্িগরায় কিছুদিন 
অপেক্ষা করার পর আবার যখন জিজ্ঞাসা করল, তখনও সেই এক জবাব। অবশেষে একদিন 
সে বলল, “এই বর্ষান্তের হিসেবটা শেষ করে তারপর দেখবখন ।, বর্ষান্তের হিসেব মানে এপ্রিল 
মাসের শেষ, অর্থাৎ এখনও পাঁচ মাস অপেক্ষা করতে হবে । গৌড় নানা রকম ভণিতা করে বলে, 
“বছরের হিসেবটা চুকিয়ে না দিলে তুমি তো কিছুই বুঝতে পারবে না!” এ কথা মেনে না নিয়ে 
উপায় কি£ 

বাড়িতেও কিছু কাজকর্ম নেই। বধূ এখন ছোট, তাই দ্বিরাগমন হয়নি এখনও । সে আছে 
বাপের বাড়িতে । অপ্পনায়া গ্রামের পাঠশালায় যাওয়া আসা করছে আজ দুবছর, কিন্তু পাঠশালার 
মাস্টারমশাই তার দিকে একেবারেই মনোযোগ দেন না। কারণ, তাঁর ধারণা বিদ্যাজন করতে 

্ 


৮ গুহভঙ্গ 


খু 


হলে পুর্বজন্মের যে সঞ্চিত পুণ্য থাকা দরকার তা ওর নেই, সুতরাং বিদ্যাজন ওর দ্বারা হবে না। 
বাগানে মৌমাছির চাক ভাঙা, নারকেল গাছে চড়ে জলভরা নারকেল পেড়ে খাওয়া-_এই সব 
কাজেই আজকাল সময় কাটে অপ্পন্ায়ার। ভাবী পাটোয়ারী চেন্নিগরায় সকালে উঠে প্রাতঃক্ত্য 
ও সম্মানের পর মাথায় কপালে এমনভাবে বিভূতি মাখে যে দেখে মনে হয় যেন ব্যান্ডেজ বাঁধা 
হয়েছে। ভিজে কাপড়েই উপবীতের ব্রহ্মগাঁট হাতে নিয়ে এমন তারস্বরে ওম্‌ তৎসৎ .-. ক'রে 
এক হাজার আটবার গায়ত্রী জপ করে যে পাড়াসুদ্ধ লোক শুনতে পায়। 
বছর শেষ হলে সে আবার গেল শিবলিজের কাছে পাটোয়ারীগিরি নেবার জন্য। এবার 

শিবলিঙ্গে জবাব দিল, ওপর থেকে হুকুম না এলে সে কিছুই করতে পারবে না। 

“আমারই কাজ আমাকে ফিরিয়ে দেবে তাতে আবার ওপরের হুকমে কি দরকার £, 

হ্যা, তোর বাপের নামে লেখা আছে কি না! আমার এখন দশ বছরের অভিজ্ঞতা হয়ে 
গেছে । পারিস যদি তো কেড়ে নে দেখি আমার হাত থেকে ।, 

শুনে কান্না পেয়ে গেল চেনিগরায়ের। তার মুখে একটা খারাপ গালাগাল এসে গেল, কিন্ত 
সাহসের অভাবে উচ্চারণ করতে পারল না কথাটা । শিবলিজেগৌড়ের বোনাই শিবেগৌড়ের 
কাছে গিয়ে নালিশ করাতে সে স্পম্ট বলে দিল, “ওহে, পাটোয়ারীর কাজ সামাল দেওয়া তোমার 
কর্ম নয় বুঝলে £ এত বড় দায়িত্র, একি ছেলেখেলা ভেবেছ নাকি? 

এরপর আর কি বলা যায় ভেবে পেলনা চেনিগরায়। তাছাড়া প্যাটেলের মুখোমুখি কথা 
বলার সাহসই বা তার কোথায় £ সেই ছোটবেলা থেকে গজম্মা এই প্যাটেলের নাম করেই তাকে 
ভয় দেখিয়ে এসেছে । সোজা মায়ের কাছে ফিরে গিয়ে প্যাটেল আর শিবলিঙ্গে মা যা বলেছে সব 
সে জানাল গঙ্গশ্মাকে । গঙশ্মা চুপ করে খাকার পান্রীই নয়। প্যাটেলের দরজার সামনে 
পথের ওপর দীঁড়িয়ে চিৎকার শুরু করল সে, “গরে শিবেগৌড়, কার গু খাবার শখ হয়েছে তোর £ 
তোর বৌয়ের হাতের চুড়ি ভাঙবে, ঘরদোর তোর মাটি হয়ে যাবে বুঝলি £ 

শাপমান্যি শুনে প্যাটেলের বউ গোরম্মা ভয় পেয়ে গেল। বিধবা ত্রাক্মণীর অভিশাপ যদি 
সত্যি ফলে যায় £ সেস্বথামীকে বলে উঠল, “ওদের চিতের কাঠ নিয়ে দরকারটা কি আমাদের £ 
শিবলিঙ্গে ভাইয়াকে বলে দাও না ছুঁড়ে ফেলে দিক ওদের জিনিস" 

প্যাটেল এবার বেরিয়ে এল ঘর থেকে । বলল, গঙ্গশ্মা, এমন সব অলুক্ষণে কথা কেন 
বলে যাচ্ছ £ এসো, এখানে বসে যা বলবার বলো ।, 

গোরম্মা বসবার জন্য দালানে মাদুর পেতে দিল; গঙ্গম্মা এসে বসল তার ওপর। 
প্যাটেলও বসল সেখানে একটা তাকিয়ায় হেলান দিয়ে। ভাবী পাটোয়ারী চেন্নিগরায় এতক্ষণ 
বাইরে দীঁড়িয়েছিল, প্যাটেলের ডাক শুনে সেও এসে বসল ভিতরে! বন্রমান পাটোয়ারী 
শিবলিজেও বসে পড়ল দালানের একপাশে, পায়ের ওপর পা তলে দিয়ে। এবার প্যাটেল কথা 
বলল, “শিবা, এই মহিলাকে তুমি বুঝিয়ে বদ কেন তুমি চার্জ দিতে চাইছ না।' 

শিবলিজে এবার প্রশ্ন করল গল্গম্মাকে, “আপনার ছেলের বয়স কত £ 

“উনিশ চলছে এখন ।” 

“সে তো আপনি বলছেন। কিন্তু সরকারী রেকর্ডে বলে এখন ওর ষোল বছর বয়স। ও 
এখনও নাবালক । নাবালককে সরকারী কাজ কি করে দেওয়া যায় £ 


গুহভঙ ৩১জ১ 


গ্ 


“ছেলে যখন জন্মেছে তখন তো আমার স্বামীই ছিলেন পাটোয়ারী, তিনি কি ওর মিথ্যে বয়স 
লিখে রাখবেন 2 ঠিক করে দেখ দিকি তুমি !, 

'জন্ম-মৃত্যুর রেজিস্টার আমার কাছে থাকে না। সেটা দেখতে হলে সরকারকে টাকা দিতে 
হবে। পঞ্চাশ টাকা ফেলুন, এখনি তিপটুরে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছি ।, 

জন্ম-মৃত্যুর রেজিস্টার পাট্োয়ারীর কাছে থাকে কি না, সেটা দেখতে হলে সরকারকে মাশুল 
দিতে হয় কি না, আর দিলেও পঞ্চাশ টাকাই দিতে হয় কি না, এত খবর গঙ্গ্মার কিছুই জানা 
ছিল না। সেজিজক্তাসা করে, হ্যারে চেন্নিগ, তুইও তো এসব শিখেছিস, তুই কি বলিস এ ব্যাপারে £ 
ছেলে তখন মুখ বিকৃত করে ভাবছে । মা আবার প্রশ্ন করে, “কি রে, কিছু বল? 

ছেলে এবার জবাব দেয়, “আমি জানি না মা! 

তুই যে বলেছিলি সব কিছু শিখে এসেছিস £, 

শিবলিল্দে এবার বলে ওঠে, আমিও তো শুনেছিলাম তুমি নাকি হোন্নবল্লি থেকে সব কিছু 
শিখে এসেছ। তা সেই বোকারাম নিজে যদি জানে তবে তো শেখাবে তোমাকে ! যাক গে, এখন 
বছর চারেক একে আমার এখানে ময়লার ঝুড়ি বইতে পাঠিয়ে দাও, আমিই সব শিখিয়ে দেব এখন ।, 

প্যাটেল শিবেগৌড় বলল, “যেতে দাও ওসব কথা । গঙ্গম্মা, তুমি একে পঞ্চাশটা টাকা দিয়ে 
দাও, ওপর থেকে তোমার ছেলের সঠিক বয়সটা লিখিয়ে নিয়ে আসবে । 

“টাকা দিতে হবে কেন শিবেগোড় £, 

“সরকারী নিয়ম, ছেলেখেলা তো আর নয় £ 

গঙ্গম্মার আর কিছু করার নেই। পঞ্চাশ টাকা না দিলে ছেলের বয়সের হিসেব পাওয়া 
যাবে না। আর ওটা না পেলে পাট্োয়ারীগিরিও থাকবে নাগালের বাইরে । কিন্তু এত টাকা 
তো ঘরে নেই। বাড়িতে এসে খুঁজে দেখে সব বাকুস-প্যাটরা। পাওয়া গেল তিরিশটা 
ভিকটোরিয়ার মোহর । তার সঙ্গে আরো ছ'পল্লী মডয়া। নিয়ে গিয়ে শিবলিঙ্গেকে দিয়ে সে 
বলল, “যত তাড়াতাড়ি পারো বয়সের হিসেবটা আনিয়ে দাও । আমাদের বংশের পাটোয়ারীগিরি 
ছেলের হাতে এসে যায় যেন, এটা আমি দেখতে চাই ।” 

দেখতে দেখতে কেটে গেল তিনমাস, কিন্তু কোন খবর নেই । গঙ্গম্মা খোজ নিতে গেলে 
শিবলিঙ্গে বলে “সরকারী ব্যাপার, অত তাড়া দিলে কি চলে £ চিঠিখানা প্রথমে যাবে ডেপুটি 
কমিশনারের কাছে, সেখান থেকে যাবে দেওয়ান মিজা সাহেবের কাছে, তারপর ফেরত আসবে । 
একটু ধৈর্য ধরে থাক, আসবে ঠিকই । গায়ে বাছুর লেপটে থাকা গরুর মত ছটফটিয়ে তো 
লাভ নেই, কদিন সবুর কর। 

নিরুপায়ভাবে বাড়ি ফিরে আসে গঙ্গম্মা। ছেলেকে ডেকে বলে, 'দেখ চেম্না, মনে হচ্ছে 
কাজটা ফিরিয়ে দেবার মতলব নেই ওর। তুই নিজেই তিপটুর চলে যা, অফিসারের পায়ে পড়ে 
নালিশ কর গিয়ে ।" 

কিন্তু অফিসারের সঙ্গে একা দেখা করার সাহস নেই চেন্নিগরায়ের। সে ভাবে, আমার ওপর 
যদি ক্ষেপে যায় তখন কি করব£ঠ যদি আমার আসল বয়স জিজ্ঞাসা করে তখন কি বলব £ 
হয়ত আসলে আমার বয়স ষোলই হবে, জন্মপত্রিকায় হয়ত ভুল হয়েছে। “মা, আমি বোধহয় 
সত্যিই এখন ষোল বছরের । আরো দুবছর না হয় অপেক্ষাই করি £ 


স্২০ গুহভল 


খু 


“ওরে রাঁড়ের ব্যাটা, আমি তোকে জম্ম দিয়েছি, আমি যে এখনও বেঁচে আছি রে ! তোর বয়স 
আমি জানিনে £ এবার উনিশ পূর্ণ হতে চলেছে । সোজা গিয়ে অফিসার সাহেবের পায়ে পড়, 
রেগে বলে ওঠে গঙশ্মা । 

“মা, আমার বড় ভগ করে। 

“লজ্জা করে না তোর, কাপুরুষ কোথাকার ! চল, আমি তোর সঙ্গে যাচ্ছি ।, গঙ্গশ্মা কথাটা 
বলল বটে কিন্তু তারপর চুপ করে ভাবতে লাগল, মেয়েমানুষের সরকারী কাজে নাক গলান 
উচিত হবে কিনা । লোকে বলে মেয়েমানুষে সরকারী কাগজপন্ত্র ছুঁয়েছে খবর পেলেই নাকি 
পুলিশে ধরে নিয়ে যায়। অফিসারের সামনে গিয়ে দি দাঁড়াই, তিনি কি আর সহজে রেহাই 
দেবেন £ 

সুতরাং কিছুই সুরাহা হল না, এ মাসট্টাও কেটে গেল। অবশেষে গজম্মা একদিন বলল, 
'যা হবার হবে। নাগলাপুরে গিয়ে তোর শ্বশুরের পরামর্শ নে। তিনি নিশ্চয় কিছু উপায় করতে 
পারবেন ।? 


€ 


বিয়ের পর দেড়বছর কেটে গেছে কিন্তু চেন্নিগরায় এখনও পর্যন্ত একবারও শ্বশুর বাড়ি যায়নি । 
যাবার ইচ্ছা যে ছিল না তা নয়, কিন্তু তারা যদি আমন্ত্রণই না জানায় তবে যাওয়া যায় কি করে £ 
নিজে থেকে সে এতদিন যায়নি বোধহয় লজ্জা বা সঙ্কোচের জন্যই । এখন পাটোয়ারীগিরির জন্য 
মা নিজে থেকেই যেতে বলছে দেখে সে খুশি হয়ে উল । একদিন ভোর ভোর উঠে স্নান করে 
তিন আচমনেই চটপট পূজোপাঠ সেরে ফেলল সে। তারপর আহার করল বরবটির কুটি, চাটনী 
আর দই। পথে খাওয়ার জন্য একটা পুঁটলিতে বাঁধা হল তিনখানা রুটি আর চাটনী। বিয়ের 
কোট, পাড়ওয়ালা ধুতি ইত্যাদি পরে সাজগোজ করল । পায়ে জুতো বা চটি পরার অভ্যাস নেই, 
সুতরাং খালি পায়েই সে নাগলাপুরের উদ্দেশ্যে পশ্চিমমখে রওনা হয়ে পড়ল। বার মাইল পথ 
হাঁটতে হবে। 

রামসন্দ্র থেকে তিন মাইল দূরে একটা টিলার ওপর উঠতে হয়, সেটা পার হবার পরে চৌলা 
টিলা। কালোপাথরের এই ছোট পাহাড়টা থেকে নেমে দেখা যায় একটা বেলেমাটির পুকর, তার 
চারদিকে পলাশ গাছের বন। নাগলাপুরের পথে এই পুকরটা পার হবার পর একটা বালি-কাঁকর 
ভরা ছোট কয়োর ধারে বসে চেন্নিগরায় তার পুঁটলিতে বাধা রুটি আর চাটনী খেয়ে নিল, তারপর 
কৃয়ো থেকে আঁজলা করে জল খেয়ে আবার শুরু করল পথ চলা । চৌলা টিলা ডান দিকে রেখে 
চড়াই থেকে নামার পর লাল মাটির পুকৃর আর তারই ওপারে কটিগেহল্লী। এখান থেকে আর 
একটু এগিয়ে গেলেই হুবিনহল্লী, এটা নাগলাপুরের এলাকার মধ্যে পড়ে । এই গ্রাম থেকে আরো 
একমাইল পথ হাঁটলেই দেখা যায় নাগলাপুরের বিশাল জলাশয়। কেয়াঝোপের পাশে পাশে 
পাকদণ্ডির পথ দিয়ে করবী ফুলের বনের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাটতে এসে পৌছন যায় সেই 
জলাশয়ের কাছে। এরপর বাকি থাকে আর মান্র মাইল দুই পথ। জলাশয়ের ধারে ধারে 
মাইলখানেক হাঁটলেই গ্রামের সীমানা, তারপর বাজার, বাস, ততক্ষণে নাগলাপুর এসে গেল। 


গৃহভঙ্গ ২১ 


গ্রামের জলাশয়ের তীরে পৌছে একটু ভাবনায় পড়ে যায় চেন্নিগরায়, যদি কেউ চিনে ফেলে £ 
যদি জিজ্ঞাসা করে বসে, এ সময়ে এখানে এসেছ যে হঠাৎ £ শ্রশুরমশায় স্বয়ং যদি এই প্রশ্ন 
করেন তাহলেই বা কি জবাব দেওয়া যাবে 2 “সে” কেমন আছে, কে জানে! আমার সঙ্গে কথা 
বলবে কি না তাই বাকে জানে? কথা না বললে সে হারামজাদীকে আচ্ছা করে শিক্ষা দিতে 
হবে! কতদিনে যে আমাদের গ্রামে আসবে, শুনছি তো তের বছর বয়স হয়ে গেল, যুবতী হতে 
আর কত দেরী কে জানে £ এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে সে বাঁধের ওপর দিয়ে হাঁটছিল-_ 
গ্রামের সীমানা এসে গেছে, এখানে পৌঁছে আবার সে ইতস্ততঃ করতে লাগল । যে রাস্তা দিয়ে 
বরধযান্রী গিয়েছিল সেই পথেই সে চলেছে--যদি কেউ চিনে ফেলে তাহলে** £ 

এ গ্রামের বাড়িগুলো সবই একেবারে গায়ে গায়ে ঘেষাঘেষি করে রয়েছে, গ্রামের প্রবেশ পথ 
একটিমান্র-__পাটোয়ারী মার্গ। এ গ্রামের পাটোয়ারী শ্যামননাজী খুব দাপটের সঙ্গে নিজের ক্ষমতা 
জাহির করে থাকেন। সেই জন্যই এ পথের এই নাম। এই পথ ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলে, 
যেখানে রাস্তাটা মোড় ঘুরেছে সেই মোড়ের প্রান্তে চেমিগরায়ের শ্বশুর কন্ঠীজোইসজীর বাড়ি। 
সে বাড়িটি অন্য বাড়িগুলোর চেয়ে বড়। 

চেনিগরায়ের বুক ধড়ফড় করছিল, কোন রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে আধখোলা দরজা 
ঠেলে সে প্রবেশ করল ভেতরে । কোথাও কোন সাড়া-শব্দ নেই। একটুক্ষণ অপেক্ষা করার পর 
পাহস সঞ্চয় করে এবার সে ডাক দিল, “বাড়িতে কেউ আছে নাকি £, 

রান্নাঘর থেকে রুদ্ধার সাড়া পাওয়া গেল, “কে গা£ কালেগৌড় নাকি £ 

“না, আমি রামসন্দ্র থেকে আসছি । স্বগাঁয় রামন্নাজীর ছেলে চেনিগরায়।" 

“এসো বাবা এসো ***” বলতে বলতে ব্যস্ত হয়ে এবার বেরিয়ে এল বৃদ্ধা। তাড়াতাড়ি 
একখানা প্লাদর বিছিয়ে বসতে দিল নাতজামাইকে, তারপর তামার একটি বড় পঞ্চপান্রে করে জল 
এনে রাখল তার সামনে এবং কুশল প্র্॥দি করতে আরম্ভ করল। এই সময় বাগানের দিক 
থেকে বাড়িতে এসে ঢুকল চেনিগের বউ । ঘরের মধ্যে আবছা অন্ধকার, সেখানে কেউ বাইরের 
লোক আছে এটা তার নজরেই পড়েনি, সে তার সবুজ রঙের শাড়ি আর জামা ঝাড়তে শুরু করল। 

“ওরে নন্জা, তোর বর এসেছে যে! ওখানে বসে রয়েছে, আঁধারে দেখতে পাসনি নাকি £' 
এই কথা শুনেই বউ এমন চমকে উঠল যে শাড়িতে পা বেধে হড়মুড়িয্জে পড়ল আছাড় খেয়ে, পর 
মুহতেই উঠে আবার ছুট লাগাল বাগানের দিকে। 

ঠাকুমা ততক্ষণে জামাইকে হাত-মবখ ধোবার জল দিয়েছেন । এরপর কটি, পাঁপড়, আচার, 
দই ইত্যাদি পঞ্চব্যঞজজন সাজিয়ে খেতে বসিয়েছেন তাকে । বৃদ্ধার উপরোধে পরে চেন্নিগরায় “না, 
না, আর দেবেন না", ইত্যাদি বলতে বলতেও শেষ পধন্ত আকন্ঠ খেয়ে ফেলল। 

খাওয়া-দাওয়া শেষ হবার পর জানা গেল শ্বশুরমশাই গ্রামে প্রায়ই থাকেন না। ঘোড়ায় 
চড়ে চনরায়পট্টন, নরসীপুর, হাসান এই সব জায়গায় ঘুরে বেড়ান। এবার প্রায় দিন-কুড়ি আগে 
বেরিয়েছেন, হয়ত আর দু-তিন দিনের মধ্যেই ফিরে আসবেন । চেনিগরায় ভাবল, যখন এসেই 
পড়েছি, দেখাটা না করে চলে যাওয়া উচিত হবে না।” ব্রদ্ধাও অনুরোধ করল থেকে যাবার জন্য, 
সুতরাং কদিন থেকেই গেল সে। পাড়া-পড়শীরা ওকে এদিক-ওদিক বেড়াতে নিয়ে গেল, 
কন্টীজোইসজীর খেত-খামার ইতা।দিও দেখিয়ে আনল | দ্বিতীয় দিন সকালে বৃদ্ধা ওকে তেল 


৮৬, গুহভঙ্গ 


মাখিয়ে স্নান করালেন। কিন্তু নন্জশ্মার চিহ*মান্ত্র কোথাও দেখা যাচ্ছে না। সেদিন আবছা 
অন্ধকারে ভিজে শাড়ী ঝেড়ে শুকোতে দেবার সময় সেই যে এক ঝলক তাকে দেখা গিয়েছিল, ব্যস, 
সেই শেষ। তারপর আর তার দেখাই নেই। প্রতিবেশীদের বাড়ি বেড়াতে যেতেও চেন্নিগের 
লজ্জা করে, কাজে কাজেই সময় আর কাটতে চায় না। বাড়িতে যেমন করত এখানেও তেমনি 
ভোরে উঠে সান করে, তারপর মাথায় কপালে বিভূতির রেখা এ কে সন্ধ্যাবন্দনা ও এক হাজার 
আটবার গায়ন্ত্রী উচ্চারণ করে থাকে । তবে গ্রামে এটা করত ভিজে কৌপীন পরে, এখানে তার 
বদলে পরনে থাকে ভিজে গামছা । এসব দেখে শুনে বৃড়ী ঠাকমা ভারি খুশি । 

চতুর্থ দিন প্রায় মাঝরাতে হঠাৎ শোনা গেল গলির কৃকরগুলো সমস্বরে ডাকন্ছ। তার মধ্যেই 
কারো মুখে অস্ফুট গালাগালও শোনা গেল “তার বোনের ..”।॥ বাড়ির কাছেই মানুষের সাড়া 
পাওয়া গেল। এরপরই দরজায় কে যেন আঘাত করল, ডাক শোনা গেল, নন্জা, দরজা খোল ।” 
চেন্নিগরায় বুঝল শ্বসশুরমশাই ফিরে এসেছেন, কিন্তু উঠে গিয়ে দরজা খুলতে তার সঙ্কোচ বোধ 
হল। সে চুপচাপ চোখ বুজে পড়ে রইল কমল-মুড়ি দিয়ে। 

রান্নাঘরে ঠাকমার কাছে শুয়েছিল নন্জম্মা। সেও বুঝেছে বাবা ফিরে এসেছেন। কিন্তু 
ওদিকে সামনের ঘরেই যে স্বামী শুয়ে রয়েছেন, সেখানে গিয়ে দরজা খুলতেও যে লজ্জা করছে। 
অগত্যা বুড়ী ঠাকুমাকেই গেলে তোলে সে। বুড়ী উঠে আলো ভ্বেলে গিয়ে থলে দেয় বাইরের 
দরজা। কন্ঠীজোইসজী সেই দরজা দিয়েই ঘোড়াটাকে ভেতরে ঢুকিয়ে পেছনের বাগানে নিয়ে 
গিয়ে বেধে দিলেন। তারপর ভেতরে এসে জিজ্ঞাসা করলেন “ওখানে শুয়ে কেঠ 

“চেন্নিগরায় এসেছে যে, আজ চারদিন হয়ে গেল। তোমারই অপেক্ষায় বসে আছে ।' 

“চেন্নিগরায় £ এমন জোর গলায় বলে উঠলেন কন্গীজোইসজী, যে মনে হল যেন কেউ 
মাথায় এক ঘা কষিয়ে দিয়েছে । বৃদ্ধা বলে উঠল, “আহা ঘুমোচ্ছে বেচারা, এখন জাগিও না। 
চুপ করে গেলেন কন্ঠীজোইস। খাওয়া-দাওয়া সেরেই এসেহেন সুতরাং এখন আর কিছু খাবেন 
না। তবে তামাকটা চাই। জুতো মোজা কোট প্যান্ট ছেড়ে ধুতি পরে ফেললেন, তারপর 
মেয়েকে আর না জাগিয়ে চুপচাপ জামাইয়ের পাশের ঘরখানায় শুয়ে পড়লেন একখানা চাদর 
বিছিয়ে । 


সকালে ঘুম ভাঙল বেলা দশটায়। জামাইয়ের কুশল সমাচার নেওয়া হল। সে সমস্ত কথাই 
খুলে বলল। শিবলিঙ্গে কিভাবে তার মায়ের কাছ থেকে পঞ্চাশ টাকা আদায় করেছে, সে কথাও 
জানাল চেন্নিগরায়। শুনে কন্ঠীজোইসজী চটে বললেন, “তোমার ঘটে কি বুদ্ধিতশুদ্ধি কিছু নেই, 
মাথার মধ্যে কেবল গোবর পোরা £ পাটোয়ারীগিরির নিয়ম-কানুন তো কিছুই জান না দেখছি, 
কাজটা করবে কি করে শুনি 

চেন্নিগরায় কোন মতে ঘাড় নেড়ে শেষে মাথা নিচু করে বসে রইল । বুড়ীও বসে ছিল সেখানে । 

এসব কথা বুড়ীর আগেই শোনা হয়ে গেছে। জামাইকে এভাবে ধমক দেওয়াটা তার মোটেই 
পছন্দ হল না। সে বলে উঠল, “হ্যারে কল্ঠী, তুইও এমনি করে কথা শোনাবি£ ও বেচারী 


গৃহভ ২৩ 


ছেলেমান্ষ, কি বোঝে এখন £ কড়া কথা ছাড়া আর কিছু কি বলতে শিথিস নি£ যাবাপু, 
কোন রকমে ওর কাজটা ওকে পাইয়ে দে।, 

এরপর কন্ঠীজোইসজী আর কোন কথা বললেন না। স্নান ও সন্ধ্য-আহিদক সমাপন করে 
অন্দরমহলে এলেন খাওয়ার সময় । চাল দিয়ে থালি-প্ঠা আর বেগুন পোড়। রেঁধেছে নন্জম্মা । 
ঠাকমা পরিবেশন করল, শশুর আর জামাই একসংঙগই থাওয়া-দাওয়া করলেন। খাওয়ার পর 
তামাক খেতে খেতে তিনি জামাইকে রামসন্দ্র সম্বন্ধে কয়েকটা প্রশ্ন করলেন। চেন্নিগরায়ের যা 
জানা ছিল যথাসাধ্য উত্তর দিল সে। জোইসজীর খেতে লাঙল দেয় হোমনা, তাকে ডেকে পাতিয়ে 
তার হাতে একখ।না চিষ্তি দিলেন তিশি। তারপর নিদেশ দিলেন, “সাজা চলে যাও 
শ্রবণবেলগোলা, সেখানে আমার ছেলে পুলিশের কন্ষ্টেবল কল্লেশকে এই চিতি দিয়ে চটপট এর 
জবাব নিয়ে আসবে । এরপর জোইসজী একেবারে চুপচাপ হয়ে গেলেন। আর কোন কথাবাতা 
হল না জামাইয়ের সঙ্গে। জোইসজী ফিরেছেন এ খবর গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে, সুতরাং ভূত নামানো, 
ঝাড়-ফুঁক, মন্ত্র-তন্ত গুজোপাঠ ইত্যাদির প্রয়োজনে অনেক লোক আসতে শুরু করল। বাইরের 
ঘরে ভীড় জমে গেছে দেখে ঠাকুমা বুড়ী জামাইকে ডেকে নিয়ে এলেন রান্নাঘরে । কারণ তাঁর 
মনে হচ্ছিল ভীড় দেখে জামাই হয়ত ঘাবড়ে যাবে । নন্জম্মা এবার রালাঘর ছেড়ে পালাল 
খামার বাড়ির দিকে । 

পরদিন বেলা এগারটা নাগাদ হোন্ন ফিরল শ্রবগবেলগোলা থেকে । এসে সে জোইসজীর 
হাতে দিল একখানা কাগজ । হোম্ন চলে যাবার পন জোইসজী মাকে ডেকে বললেন, অক্ুম্মা, 
ও আর আমি জাজ রাতে রামসন্দ্র যাব ।' 

“ওমা সে কিঠ আজই চলে যাবে £ এখনও তো একদিনও ভাল-মন্দ কিছু খাওয়ানোই 
হল না।' 

“আজ সন্ধ্যায় খাইয়ে দাও। রাতে খাবার জন্য পাগ্নেস রাঁধ না আজ !' 

“তুই তো সাক্ষাৎ কোল্লদেব,* রাত-বিরেতে ঘুরে বেড়াস। কিন্তু ওকে কেন এই অন্ধকারে 
নিয়ে যাবি £ 

“ও কি কচি খোকা নাকি £ পুরুঘ মানুষ জেনেই তো ওর হাতে মেয়ে দিয়েছি আমি ।" 
অন্ধকারকে অবশ্য বিশেষ ভয় পায় না চেনিগরায়, কিন্ত ভূত, পিশাচ এরাও তো আবার অন্ধকারেই 
ঘোরাফেরা করে, তাদের কথা ভেবে ওর বেশ ভর করতে লাগল, বুকের মধ্যে টিবতিব করতে 
শুরু করল। তা ছাড়া সবাই বলে চোলেশ্বরের টিলার কাছে নাকি বাঘের ভয়ও আছে । কিন্ত 
এসব কথা বলতে গেলে হয়ত শ্বশতরমশায়ের কাছে বকুনি খেতে হবে সেই ভয়ে সে চুপ করেই 
রইল। 

রদ্ধা তাড়াহুড়ো করে তৈরী করল “কোড়বলে'। চাকলীর জন্য নন্জশ্মা আগের দিন আটা 
পিষে রেখেছিল, সেগুলি আজ ভাজা হল। রাতের আহারে দেওয়া হল পায়েস। তারপর 
জোইসজী জুতো-মোজা, সাদা প্যান্ট, খাঁকি কোট ইত্যাদি পরে প্রস্্ুত হয়ে মাথায় টুপীটা চাপালেন। 
সকাল বেল।ই নাপিত এসে ক্ষৌরকর্ম করে গেছে. ঘন দাড়ি-গোফের জঙ্গলে মুখখানা প্রায় ঢেকে 


* পিশাচ, যাঁরা রাতে মশাল হাতে পথ চলে। 


২৪ গৃহভজ 


গিয়েছিল। ঘোড়ার পিঠে জিন কষা হল, লাগাম পরানো হল। জামাকাপড় একটা থলির 
মধ্যে ভরে জিনের সামনের দিকটায় দু'পাশ থেকে ঝুলিয়ে দিলেন । রওনা হবার পূর্বে চেন্নিগরায় 
রূদ্ধা ঠাকুমা ও শ্বশুরমশাইকে প্রণাম করল। ঠাকুমা নন্জম্মাকে ডাক দিল স্বামীকে প্রণাম 
করার জন্য; কিন্তু নন্জম্মা কিছুতেই সামনে এল না! শেষে জোইসজী নিজে যখন ডাকলেন, 
তখন এসে দূর থেকেই মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে পালাল। বউয়ের মুখখানি দেখার খুবই ইচ্ছে 
ছিল চেন্িগরায়ের, কিন্ত শ্বশুরমশাই সামনেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন, তাই সে লজ্জায় সেদিকে চোখ তুলে 
দেখতেই পারল না। 

রান্রি প্রায় দশটার সময় ওরা রওনা হয়ে গেলেন। অমাবস্যার রাত। চারিদিক ঘন অন্ধকারে 
ঢাকা। গ্রামের বাইরে এসে জোইসজী জামাইকেও ঘোড়ায় উঠে বসতে বললেন, কিন্তু সে রাজি 
হুল না কিছুতেই, বলতে লাগল, ভয় করে, যদি পড়ে যায় । শ্বশুর বললেন, “তিনি ধরে থাকবেন” 
কিন্তু তাতেও চেন্নিগ রাজি নয়, “না না, আপনি যাই বলুন, ও আমি পারব না কিছুতেই এই বলে 
কাটিয়ে দিল। 

“বেশ তবে হেটেই চল"--বলে জোইসজী এমন জোর কদমে পা চালালেন যেন সামনের পথ 
একেবারে স্পম্ট দেখা যাচ্ছে । ঘোড়াটা পিছন পিছন আসতে লাগল । তারও প্রায় দশ-বার 
গজ পিছনে চেন্নিগরায়। শ্বস্তর চলেছেন নিঃশব্দে । নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে বাতাসের শন্‌ শন্‌ শব্দ 
ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। 


৬ 


বাঁধের চড়াই ভেঙে ওরা পুকুরটা পার হয়ে এল, তারপর পেরিয়ে এল হুবিনহলী আর কটিগেহলী। 
এখন চোলেশ্বর টিলার পশ্চিম দিকের উৎত্রাইটা নামার আগে যে লালমাটির পুকুরট্া পড়ে তারই 
পাশ দিয়ে চলেছে ওরা । আট মাইল পথ অতিক্রম করা হয়ে গেছে। 

কন্ঠীজোইসজী চলেছেন আগে আগে । তাঁর পেছনে চলেছে তাঁর টগবগে ঘোড়া । অন্ধকারে 
সাদা ঘোড়ার আরুতিটা অস্পম্ট ধোয়াটে মত দেখা যাচ্ছে, আর তারই পেছন পেছন ক্লান্ত পদক্ষেপে, 
কখন হেঁটে কখনও বা দৌড়ে ওদের সঙ্গে তাল রেখে চলেছে চেন্িগরায় । হঠাৎ শ্বশুরমশাই 
দাঁড়িয়ে পড়লেন। আচমকা ঘোড়াটাও থেমে গেল এবং তার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে দাঁড়িয়ে গেল 
জামাইও। এদিক ওদিক চেয়ে চোখে পড়ল কিছুদরে পথের ডান দিকে আলো দেখা যাচ্ছে। 
শ্বশুরমশাই বললেন, “একটু এগিয়ে এসো। ঘোড়াটার পাশ কাটিয়ে এগিয়ে আসতে শ্বশুর আলোর 
দিকে ইশারা করে বললেন “এ দেখ” । সেদিকে ভাল করে চেয়ে দেখতে গিয়েই চেন্নিগরায়ের 
তো সারা গা দিয়ে দরদর করে ঘাম ছুটতে লাগল, হাত-পা কাঁপতে লাগল থর থর করে । 

প্রায় কোমর সমান উচ্চতাবিশিষ্ট এক চস্ভীপ্রতিমা বীরাসনে দণ্ডায়মানা, উল্মক্ত মুখ- 
গহবরের মধ্যে থেকে বেরিয়ে রয়েছে রক্তরজিত জিহবা । মনে হচ্ছে যেন রক্ত লেহন করছে। 
কণ্ঠে বিরাট এক করবী ফুলের মালা । দু'পাশে মশালের মত ভুলছে দুটি ম্বত্প্রদীপ। সামনে পড়ে 
আছে ছিন্ন শির তিনটি মোরগ, তার পাশে দ্বিখণ্ডিত চালকুমষড়ো, দুই-তিন গুচ্ছ কলা, চারদিকে 
ছড়িয়ে আছে কুস্কুম, প্রতিমার সবাজেও মাখান হয়েছে হলুদ ও কুস্কুম চূর্ণ । কাঁচা সুতো, তামার 


গৃহভঙ্গ ৫ 


চু 


পাত, তাবিজ-মাদুলী । মানুষ বা পশুর হাড়গোড় ইত্যাদি নানারকম জিনিস ছড়িয়ে রয়েছে 
প্রতিমার আশেপাশে । 

ঘন অন্ধকারের মধ্যে আলোর আভায় প্রতিমা যেন জ্যোতির্ময়ী মৃতিতে আবির্ভীতা মনে হচ্ছে। 
শ্বশুর আবার বললেন, “দেখছ তো? £ 

বহু কম্টে চেনিগরায় জবাব দেয় “হু * তার জিভ তখন ভয়ে অসাড় হয়ে গেছে। 

“যাও, ওখানে গিয়ে এ মূর্তির বুকে লাথি মেরে ভেঙে দাও, আর তুলে নিয়ে এসো এ কলার 
গুচ্ছ, অনেক পয়সা পেয়ে যাবে । 

থর থর করে কেপে ওঠে চেন্নিগরায়, সভয়ে তোতলাতে তোৎলাতে বলে ওঠে, “না, না, না।, 

“বেশ তবে ঘোড়াটার লাগাম ধরে এখানে দাঁড়াও, আমিই যাচ্ছি ।” জামাইয়ের হাতে 
লাগামটা ধরিয়ে দিয়ে এগিয়ে যান কন্ঠীজোইসজী । সেজা প্রতিমার সামনে গিয়ে তুলে নেন 
কলার গোছা । মিনিট দুই মৃতিটির দিকে চেয়ে থাকেন পরখ করার ভঙ্জিতে, তারপর মূর্তির দুই 
বাহ, জিভ, মাথা হাঁটুর খাঁজ সবন্র হাত ৮।লিয়ে খুঁজে খুঁজে কি যেন বার করতে থাকেন, সম্ভবতঃ 
রূপোর টাকা । অবশেষে জ্তোসুদ্ধ বাঁ পা তুলে প্রতিমার বৃকে সজোরে মারেন এক লাথি । প্রতিমা 
ভেঙে চর্ণ-বিচর্ণ হয় । দেই সঙ্গেই ছড়িয়ে পড়ে আরো রোপ্যম্দ্রা, মনে হল যেন কিছু আশরফিও 
আছে তার মধ্যে। সমস্ত টাকা-পয়স। খুঁজে কড়িয়ে নিয়ে পকেটে ভরে এবার ফিরে এসে ঘোড়ার 
লাগাম ধরেন তিনি, তারপর বলেন, চিল' । আবার শুরু হয় পথ চলা । 

এবারেও সবার আগে কন্টীজোইসজী, তারপর তাঁর ঘোড়া ও সবশেষে চলেছে চেনিগরায় । 
তার পেছনে পড়ে রয়েছে খণ্ডিতা চশ্তীপ্রতিমা। পিছু ফিরে সেদিকে দেখতেও ভয় করছে । কিন্তু 
হঠাৎ পেছন থেকে এসে যদি গলা টিপে ধরে--সেই আতঙ্কে মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে না দেখেও 
থাকতে পারছে না। আগের মতই চারিধার নিস্তব্ধ । শ্বশুরমশাই তো বিনা বাক্যব্যয়ে পিশাচের 
মত তীব্র গতিতে এগিয়ে চলেছেন । কথাবাতা বললে ভয়ট্রা যদি কিছু কমে এই আশায় চেনিগ 
তোতলাতে তোৎ্লাতে প্রশ্ন করে, “ও, ওটা কি-ন্কি ছিল £ 

“আজ অমাবস্যা কি না! 

“ত্-তাতে কি 

“কারো জন্য তুৰু তাক করা হয়েছে আরকি । করিগেরে বীরাচারী নামে একটা লোক আছে, 
এই সব তারই কাজ । যে তুক করায় তার সামনে পুজোটা করে তখনকার মত তার সঙ্গেই সে 
চলে যায়। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে প্রতিমার জিভ আর হাতের মধ্যে লুকোন টাকা-পয়সা আর 
কলা ইত্যাদি নিয়ে যায় । আজ বেচারা ফিরে এসে পাবে শুধু মাটির ঢেলা । 

“ও-ওটাকে ছুঁয়ে আ-আপনি যে কি সব বার করলেন £ এ-এখন আ-আপনার কিছু হবে 
নাতো? 

“নিজের বুকে হাত দিয়ে বুঝতে হবে ! যদি ভুমি প্রকৃত সাহসী হও কেউ তোমার কেশাগ্রও 
স্পর্শ করতে পারবে না। তবে এমন কাপুরুষ অনেক আছে যারা আতঙ্কেই রন্তবমি করতে 
শুরু করে দেবে ।, 

এই শেষের কথাগুলো শুনে খুবই ভয় পেয়ে গেল চেন্নিগরায়। তবে ইতিমধ্যে ওরা টিলাটা 
পার হয়ে এসেছে । এখান থেকে সেই তুক্তাকের জায়গাটা আর দেখা যাচ্ছে না। এতক্ষণে 


২৬ গৃহভঙ্গ 


ভয়টা দূর হয়েছে কিছুটা । সাহস সঞ্চয় করে এবার সে পেছন ফিরে তাকাল, কিন্তু ঘন কালো 
অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। উৎত্রাই আরম্ত হয়ে গেছে, পলাশের জঙ্গলও প্রায় 
শেষ হয়ে এল। শ্বশুরমশাই এই উৎকট অন্ধকারের মধ্যেও এমন জোর কদমে এগিয়ে চলেছেন 
যে, মনে হচ্ছে সমস্ত পথ যেন ও র নখ-দর্পণে । 


ণ 


রান্রি প্রায় দুটোর সময় দুজনে বাড়ি এসে পৌ'ছলেন। কন্ঠচীজোইসজীর ছেলে, পুলিশের কনস্টেবল 
কল্লেশ একজন হাবিলদার সঙ্গে নিয়ে এদের আগেই এখানে এসে পৌছে গেছে । গজম্মা ও 
অপ্পন্নায়া দুজনেই ওদের কুটুস্ব কল্পেশকে দেখে চিনতে পেরেছিল । প্রায় আধ ঘন্টা আগে তাঁরা 
এসেছে। দু'জনেরই পরনে খাঁকি উর্দি, পায়ে পত্রি জড়ানো মোজা ও জুতো পরা। দু'জনেরই 
অঙ্গে পুরোদসন্তর পুলিশের পোশাক, গায়ে গরম ওভারকেট এবং হাতে পুলিশের ছড়ি । এই সময় 
এরা কেন এসেছে তা গঙ্গম্মা কিছুই বোঝেনি এবং এ রাও কোন কথা খুলে বলেনি। অতিথিদের 
গঙ্গম্মা গরম গরম থালি-পিঠা ভেজে খাইগসেছে। কফি তৈরী করতে সে জানে না, তাছাড়া এত 
রাতে দুধও পাওয়া সম্ভব নয়। কাজেই অতিথিরা নিজেদের সঙ্গে আনা কফিপাউডার গুড় দিয়ে 
গুলে তাই পান করেছে । এদের কাছেই খবর পাওয়া গেছ যে চেনিগরায়ও তার শ্বশুরের সঙ্গে 
রানেই এস পৌছচ্ছে। 

ঘোড়া আর জামাইসহ এসে পোৌ"ছবার পর কম্ঠীজোইসজী নিজের ছেলেকে পাটোস্নারীগিরি 
সংক্রান্ত ব্যাপারটা খুলে বললেন । অবশেষে তিনি ঘোষণা করলেন, চিল, এখনি গিয়ে চাজটা 
একে পাইয়ে দেওয়া যাক ।: 

কল্পেশের সঙ্গী জমাদারটি এবার প্রশ্ন করল, “কি করে চাজ দেওয়াবেন £ 

“আপনি চুপচাপ শুধ আমার সঙ্গে এসে দেখুন কি হয়” এই বলে বাইরে গিয়ে ঘোড়ার পিঠে 
উঠে বসলেন কম্ঠীজোইসজী, তারপর জামাইকে বললেন, চল, এবার তার বাড়িটা কোথায় দেখিয়ে 
দাও ।" 

ব্যাপারটা চেনিগরায়ের মাথায় কিছুই ঢুকছিল না, বেশ ঘাবড়ে গেছে সে। বকৃনী খাবার 
ভয়ে কোন প্রশ্ন করতেও সাহস হচ্ছে না। আগে আগে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল সে। তার পেছনে 
ঘোড়সওয়ার কল্ঠীজোইসজী এবং তাঁর দুই পাশে দুই জাঁদরেল পুলিশ । শিবলিঙ্গেগোড়ের বাড়ির 
সামনে পৌছে বাজখাঁই গলায় বললেন জোইসজী, “দরজায় ধাল্কা মেরে জাগাও লোকটাকে ।' 

চেনিগরায় দরজার কড়া নাড়তে ভিতর থেকে শিবলিঙ্গের বউ সাড়া দিল, “কে 2, 

“শিবম্মা, আমি চেন্নিগ। শিবলিজেশৌড়কে ডেকে দাও চেনিগের কথা শেষ না হতেই 
শিবলিঙ্গে উঠে এসে দরজা খুলল এবং ঘুমজড়ানো গলায় ধমকে উল, “কি £ হয়েছেটা কি £ 
এই অসময়ে ঘুম ভাঙাতে এসেছ, তোমাকে একটু আক্কেল বিবেচনা শেখাবার মত কি কেউ নেই £, 
কথা বলতে বলতেই এবার ওর নজরে পড়ল ঘোড়ায় চড়া কন্ঠীজোইসজী এবং তার সঙ্গে দুই 
পুলিশ। তার বৃকের মধ্যে ধক্‌ করে উঠল | মুখ দিয়ে আর কোন শব্দ শোনা গেল না। ঘোড়- 
সওয়ার বীরবিক্রমে হুকুম দিলেন, “হাবিলদার একে গ্রেপ্তার করো ।” দুপাশ থেকে পুলিশ 


গৃহভঙ্গ ২৭ 


এসে তার দুই হাত চেপে ধরল । দরজার পাশ থেকে চিৎকার করে উঠল শিবম্মা, “হায়, ভগবান ! 
কি অপরাধ করেছে আমার স্বামী £ এবার গাজ উঠল কছেলশ, কথা বললে তোকেও নিয়ে 
গিয়ে নেকড়েদের মধ্যে ফেলে দেব। একদম চপচাপ থাক ।, এই কথা শুনে সে দু'হাত তুলে 
নিজের মুখ চাপা দিয়ে ফেলল । 

ঘোড়া থেকে নেমে আদেশ দিলেন কল্চীজোইসজী, “ভিতরে চলো ।, শিবলিঙ্গেকে পুলিশ 
ধাক্কা দিয়ে নিয়ে এল ভিতরে । ভিতর থেকে দরজায় শিকল তুলে দিয়ে এবার কল্ঠটীজোইসজী 
প্রশ্ন করলেন, আমার কাছে নাশিল এসেছে, জন্মতারিখ খোজ করাবার অজহাতে তুমি পঞ্চাশ টাকা 
ঠকিয়ে নিয়েছ £ হারামজাদা, বদমাশ, ভোমার ফাঁসী হবে তা জান 

৩-ওকে এ-এ-এ বারটা ছেড়ে দিন', বলতে গেল চেন্নিগরায়, কিন্ত ঘোড়সওয়ার তাকেও 
প্রচণ্ড এক ধমক দিলেন, “তুমি চুপচাপ হাক ।॥ এবার সেও দুই হাতে নিজের মুখ চাপা দিল। 
শিবলিঙ্গের দিকে ফিরে আবার গজে উহলেন, “রাজার সরকার এটা, স্থয়ং দেওয়ান মিজা সাহেবের 
হকুম। কোনরকম জোচ্গরি চলবে না এখানে । ব্যাটা বান্‌ -** ভেড় য়া, ছেনালের ব্যাটা, 
সরকারের নাম করে নিজের পেট ভরা, এত সাহস £ ইংরেজ সরকার থেকে হকুম হয়েছে 
তোর শুলদণ্ড হবে। এই, একে বেড়ি লাগিয়ে দাও ।” 

শুনতে শুনতে শিবলিঙ্গ থর থর করে কাপছিন। এবার তার দ্ত্রী গিয়ে আছড়ে পড়ল ঘোড়- 
সওয়ারের পায়ে। তিনি বললেন, বার করো হেই পঞ্চাশ টাকা 

শিবলিঙ্গে শরীর উদ্দেশ্যে বলে ওঠে প্রি লো-লোহার বাক্সে, তা-তালা খুলে বের করে দাও ।, 

বউ বিছানার নিচে থেকে চাবী নিয়ে বাক্স খলে গুনে গুনে বের করে দেয় রাপোর টাকাগুলো । 

“ইনস্পেক্টর, এই টাকা পকেটে রাখ, কাল খাজনায় জমা দিতে হবে।' ঘোড়সওয়ারের 
আদেশে হাবিলদার টাকা তলে নেয় । 

ঘোড়সওয়ার এবার এর পরের প্রসঙ্গে এলেন, শালা, বজ্জাত, ভেড় য়া কোথাকার, পাটোয়ারী- 
গিরির চাজ একে দিতে এত দেবী হচ্ছে কেন £ 

“আজে, নানা" তোত্লাভে থাকে শিবলিজেগোড়। 

“ওর হাত ছেড়ে দাও” ঘোড়সওয়ারের হুকুম শুনে পুলিশেরা হাত ছেড়ে সরে দীঁড়ায়। এবার 
হুকুম হয়, কাগজ কলম নিয়ে এসো)? 

শিবলিঙ্গে কাগজ ও কলম আনবার পর ঘোড়সওয়ার আবার গজন করে ওঠেন, “যেমনভাবে 
বলব ঠিক তেমনি লিখে যাবে হু 81 লেখ, সন উনিশ শ"*" মহীশর রাজ্যের মহারাজ- 
সরকারের তুমকুর জিলা, তিপটুর তালুক, ক্ধনকেরে বিভাগের অন্তর্গত রামসন্দ্র গ্রামের স্থায়ী 
পাটোয়ারী স্বীয় রামন্নাজীর জ্যেষ্ঠ পুন্র শ্রীচেন্নিগরায় মহাশয়সকে, আমি, অর্থাৎ উপরোত্ত জিলা 
ও তালুকের অন্তগত রামসন্দ্র গ্রামের বতমান পাটোয়ারী শিবলিঙেগৌড় এই লিখিত চুক্তি অনুসারে 
কাভার সমপণ করিতেছি, কারণ এই কাধপ্রাপ্তির অধিকার প্রকৃতপক্ষে তাহারই, এবং আমি 
এতদিন এই কার্ধের রক্ষণাবেক্ষণ করিতেছিলাম। তিনি নাবালক হওয়া হেতু আমাকে এতদিন 
পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করিতে দেওয়া হইয়াছিল, বর্তমানে, প্রায় দেড় বৎসর পুর্ব তিনি সাবালকত্ব 
প্রাপ্ত হওয়ায় আজ “-* তারিখে উপরোক্ত কার্ষের অধিকার তাহাকে সমপণ করিতেছি । এই 
চুক্তিপন্র এবং এই কার্য সংক্রান্ত হিসাবের নথিপত্র বিধি অনুসারে তাঁহার হস্তে তুলিয়া দিতে আমার 


২৮ গৃহভঙ্গ 


শু 


বিন্দুমাত্র আপত্তি নাই। পরিশেষে ইহাও জানাই যে, কঠিন পীড়ায় আক্রান্ত হওয়ায় এই সরকারী 
দায়িত্ব পালনে আমি অসমর্থ, সেই কারণে সরকারী হুকৃমনামা আসিবার পূর্বেই আমি এই দায়িত্বভার 
তাঁহাকে সমর্পণ করিতেছি। তিনি অনুগ্রহপূর্ক এই কার্ভার গ্রহণ করুন। যা যা বলা 
হল শিবলিঙ্গে ঠিক সেইভাবে সব কথা লিখে দিল। এরপর কাগজপন্রের তালিকা- অর্থাৎ 
এক নপ্বর ব্যবহার খাতা, দুই নম্বর বঞ্জর খাতা ইত্যাদি বার রকম খাতাপত্রের নাম লেখা হল, 
সবশেষে নিচে শিবলিজেগৌড় নিজের নাম স্থাক্ষর করে দিল। 

এই কাগজখানা হস্তগত ক'রে তারপর তাকে সমস্ত খাতাপন্তর বার করে দেবার জন্য আদেশ 
করা হল। বড় বড় পুলি বাঁধা রেজিস্টারের গোছা সামনে নিয়ে আসার পর হুকৃম হল, “তুমি 
এবং তোমার স্ত্রী এগুলো বয়ে নিয়ে যাও চেনিগরায়ের বাড়িতে |” 

শিবলিঙজেগৌড়, তার স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েরা সবাই মিলে কাপতে কাঁপতে সেই খাতার রাশি 
পৌছে দিয়ে এল। কন্ঠীজোইসজী শাসিয়ে দিলেন, ন্যাজ নাড়বার চেস্টা করলেই খতম করে 
দেব। একদম মুখ বন্ধ করে দু'জনে বাড়ি গিয়ে শুয়ে পড়। পুলিশ এইখানে এখন টহল দিয়ে 
বেড়াবে ।, 

শিবলিলেগোড় নিঃশব্দে স্ত্রী-পুন্র-কন্যাদের নিয়ে বাড়ি ফিরে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল । 
স্বপ্নের মত এইসব অপ্রত্যাশিত ব্যাপার ঘটতে দেখে এখনও তার গায়ে যেন কাঁটা দিচ্ছে। 
কাঁপুনি তার আর থামতেই চায় না। অবস্থা দেখে তার স্ত্রী সান্ত্বনা দিয়ে বলতে লাগল যে, তবু 
যা হোক এর চেয়ে বেশী কোন বিপদ ঘটেনি এই রক্ষা। 

এদিকে পুলিশরা এসেই ঘুমিয়ে পড়েছে । গঙ্গম্মা, অপপন্নায়া আর চেন্নিগরায় শুয়েছে রাম্না- 
ঘরে। চেন্িগরায়ের চোখে ঘুম নেই, ভয়ের চোটে তার মনে হতে লাগল ত্বর আসছে। 
কন্ঠীজোইসজী ঘুমিয়েছিলেন কিনা কেউ দেখেনি, তবে রান্রে তাঁর বোধ হয় ক্ষুধার উদ্রেক হয়েছিল । 
কারণ কালে উঠে দেখা গেল সেই তুক পুজোর কলার ছড়ার মধ্যে দু-ছড়া কলার খোসা পড়ে 
রয়েছে থামের পাশে । সকাল সাতটার সময় তিনি অপ্পনাকে বললেন, গ্রামের চৌকিদারের 
কমচারীকে ডেকে নিয়ে আসতে । সে এসে পৌ'ছবামান্্র হকৃম দিলেন, “সারা গ্রামে নাকাড়া 
বাজিয়ে ঘোষণা করে দাও-_চেনিগরায় এখন থেকে পাটোয়ারী, সবাইকে তার কথা মেনে চলতে 
হবে, অন্যথা করলে তা অপরাধ বলে গণ্য করা হবে। পুলিশরা ভিতরে শুয়ে এখন ঘুমোচ্ছে, 
তাঁদের টুপী, জতো ইত্যাদি বাইরে খুঁটির গায়ে ঝুলছে সেটাও দেখিয়ে দেওয়া হল লোকটিকে । 
কারিন্দা (কর্মচারী ) আভূমি প্রণত হয়ে নমস্কার করে চলে গেল । আধ ঘন্টার মধ্যে সারা 
গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল খবরটা । কল্লেশের সঙ্গে যে হাবিলদার এসেছিল তাকে পঁচিশ টাকা দিলেন 
কন্ঠীজোইসজী | বাকি পঁচিশ টাকা নিজের পকেটে ভরে তিনিও ঘোড়াম্ন চড়ে রওনা দিলেন। 
এখন কম্বনকেরে গিয়ে এলাকাদারের সঙ্গে দেখা করে পাটোয়ারীগিরি কাজটার বিধিমত ব্যবস্থা 
করতে হবে। কল্লেশ আর অন্য হাবিলদারটি খাওয়া-দাওয়ার পর ফিরে গেল শ্রবণবেলগোলায় । 

কন্ঠীজোইসজী ফিরে এলেন রান্তরি দশটায়, চেন্নিগরায়ের তখন ত্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। গঙ্গম্মা 
ছেলের কপালে ওষুধ দিয়ে পটি বেধে দিয়েছে । ভ্বরের ঘোরে ভুল বকছে চেন্নিগরায়___হায়, 
হায় আমি লাথি মারি নি মা। আমার ভুল হয়েছে মা! কেউ কিছু বুঝতে পারছে না এসব 
কথার অর্থ কি। কন্ঠীজোইসজী ভিতরে এসে তার অবস্থা দেখেই ব্যাপার বুঝলেন। একটা 


গৃহভঙ্গ ২৯ 


শরের কলম আনিয়ে তাতে একটা মণ্ডল একে সেটা গোল করে পাকিয়ে তার ওপর কাঁচা সুতো 
জড়িয়ে সেটা বেঁধে দিলেন। তারপর একটা নারকেল ভেঙে তার জলটা তিনবার রোগীর সামনে 
উৎসর্গ করে তার মুখের ওপর সেই জলের ঝাপটা দিতে লাগলেন। তাবিজটাও উৎসর্গ করে 
বেধে দিলেন রোগীর গলায়। মন্ত্রপাঠ করতে করতে তার সর্বা্গ ঝাড়লেন তিনবার, তারপর 
মাথায় স্পর্শ করলেন চারবার । গঙ্গম্মাকে বললেন লবঙ্গ, আদা, লঙ্কা ইত্যাদি একসঙ্গে ফুটিয়ে 
পাঁচন তৈরী করতে, সেই পাঁচন খাওয়ানো হল চেন্নিগরায়কে। তারপর সে ঘুমিয়ে পড়ল। 

দ্বিতীয় দিন সকালে যখন তার ঘৃম ভাঙল তখন দেখা গেল ভ্ুরটা গত রান্রেই সম্পর্ণ ছেড়ে 
গেছে। 


তুভীম্ন অধ্রযাঘ্র 


নন্জশ্মমা খতুমতী হবার পর দ্বিরাগমনে শ্বশুর বাড়ি এসেছে । ইদানীং পত্রীর প্রয়োজন চেনিগরাস্ 
খুব বেশী করেই অনুভব করছিল, অথাৎ তার ওপর নিজের কতৃত্ত ফলাবার ইচ্ছেটা ক্রমশঃ 
মাথাচাড়া দিচ্ছিল। কতৃত্র ফলানো মানে চেনিগরায়ের ধারণায় ধমক-ধামক মারপ্রোর ইত্যাদি--- 
কিন্ত এ ব্যাপারগুলো আবার চেন্নিগরায়ের ঠিক আসে না। নিরীহ গরু-বাছুরকেও মারবার সাহস 
তার নেই। কেবল মুখের জোরেই সে স্ত্রীর ওপর যতটা সম্ভব দাপট দেখাবার চেস্টা করে। 
ছিনাল, রাঁড় ইত্যাদি জঘন্য শব্দ সে অনায়াসে উচ্চারণ করতে পারে । সুতরাং প্গুলোর সঙ্গে 
আরো কিছু বিশেষণ জড়ে দিয়ে সে পত্রীকে গালিগালাজ করেই আশ মেটায় । অবশ্য তার মানে 
এই নয় যে, অকথ্য ভাষা প্রয়োগে চেমিগের কিছু শত্রির অভাব আছে £ কারণ, হাজার হোক সে তো 
গঙ্গম্মারই ছেলে । কিন্তু বেশী বাড়াবাড়ি করলে কথাগুলো যদি শ্বশুরমশাইয়ের কানে ওঠে 
সেই ভয়ে সে বউয়ের ওপর বেশী জলুম করতেও সাহস করে শা। 

বউয়ের ওপর কতু ত্র ফলানো এবং সাধ মিটিয়ে তাকে গালিগালাজ করার ইচ্ছাটা গঙ্গম্মারও 
কিছু কম নয়। কিন্তু বেহাই সম্বন্ধে তারও মনে যথেস্ট ভয় আছে, সুতরাং চাপা তর্জন-গর্জন 
করেই তাকে ক্ষান্ত থাকতে হয়। 

পাতোয়ারীগিরি হাতে নেবার পর প্রথম বছরের হিসেবপন্ত্র, জমাবন্দী ইত্যাদি নিয়ে চেনিগরায় 
নিজেই গিয়েছিল, এগুলো ছিল তালগুক_ ন্দী, হুঞ্জর-জমাবন্দী নয় । ঘুষের টাকাও সে দিয়েছিল 
বিধিমত কিন্তু তা সত্তেও ছেডক্লাক ওর ছিসেবে হাজারট্টা ভূল বার করে ফেলল । বাস, আটকে 
গেল ওর জমাবন্দী। 

তোর মায়ের ***" অকথ্য গালাগালটা মনে মনেই শেষ করল চেনিগরায়, চেচিয়ে কাউকে 
গালাগাল দেবার সাহস তার মোটেই নেই। হেডক্লাক সাফ বলে দিল, “এ জমাবন্দী মঞ্জর হবে 
না। দু'মাসের মধ্যে আবার নিজে তিপটুরে এসে সাহেবকে দিয়ে সই করিয়ে নিয়ে যেও |” মনে 
মনে দে ভাবল, যাক, সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে গাল খাওয়ার হাত থেকে এবারটা অন্তত রক্ষা 
পাওয়া গেছে। 

তিম্লাপুরের পাটোয়ারী দাবরসায়াজীও এসেছিলেন নিজের জমাবন্দীর হিসেব নিয়ে । সবাই 
জানে ওর হিজেবে কখনও ভুলছুক হয় না। এই পাট্োয়ালীগিরি ছাড়া তাঁর অন্য কোন উপাজন 
নেই; তাই দুঃখ করে বলছিলেন, আচার যেমন ভোজনের স্বাদ বূ্দি করে এই পাট্োয়ারীগিরিও 
শিক তেমনি, এ দিয়ে আহারকে আর একট মুখরোচক করা যায় মাত্র, কিপ্ত এর দ্বারা পেট ভরানো 
সম্ভব নয়! চেনিগরায় এই দাবরসায়াজীর শরণ নিল। তিনি জানালেন, বছরে পঞ্চাশ টাকা 
দক্ষিণা পেলে তিনি চেন্নিগরায়ের হিসেবটাও লিখে দিতে রাজি আছেন। তিনখানা গ্রাম মিলিয়ে 


গহভজ ৩০) 


জু 


চেনিগরায়ের বাধিক আয় একশ বাইশ টাকা সাত আনা এগার পাই। এর মধ্যে সবুজ ছাপের 
নোটগুলো বাদে বাকি পয়সা তো কালি আর কাগজ কিনিতেই শেষ হয়ে যায়। তারপর বছরের 
শেষে “বর্ষাসন*এর খরচ দেখাবার সময় সেরেস্তাদারকে দিতে হয় দশ টাকা (শোনা যায় তারমধ্যে 
ছ* টাকা নাকি আমলাদার পায় আর সেরেস্তাদারের ভাগে থাকে বাকি চার টাকা), হেডক্লাকের 
প্রাপ্য দু” টাকা, বিভাগীয় কেরানী আরো দু* টাকা তারপর চাপরাশীদের আট আনা করে, অঞ্থাৎ 
প্রায় সতের-আঠার টাকার ধাক্সা। তাছাড়া তালকে আসা-যাওয়া, খাওয়া-দাওয়ার খরচও তো 
আছে। এত সবের পরে আবার যদি হিসেব লেখানোর মজরী পঞ্চাশ টাকা দিতে হয়, তবে 
চেন্নিগ্ুরায়ের আর থাককেটা কি £ অবশ্য, খাজনা আদায় করার সময়, যারা দশ ট্রাকার বেশী 
খাজনা দেয় তাদের কাছে এক টাকা, যারা দশ টাকার কম দেয় তাদের কাছে আট আনা এবং 
হারা দেয় দ্বু* টাকা তাদের কাছ থেকে চার আনা হিসেবে দক্ভরী নেওয়ার প্রথা চালু আছে। কিন্ত 
রামসন্দ্র গ্রামে এ দস্ভুরীটা বরাবর প্যাটেল নিজেই মেরে নেয় । লিঙ্গাপূুর থেকেও বিশেষ কিছু 
পাওয়া যায় না। করুবরভজ্গী থেকে অবশ্য পাওয়া যায় প্রায় চল্লিশ টাকা। আসল কথা এই 
উপরি রোজগারটা নির্ভর করে সম্পূর্ণ ভ!নে পাট্রোয়ারীর নিজের ক্ষমতার ওপর । বাটোয়্ারা, 
খরিদ-বিক্রী, বন্ধকী, তক্রার, দরখাস্ত ইত্যাদি থেকে কিছু কিছু আয় হওয়ার সপ্তাবনা আছে 
বটে কিন্তু চেনিগরায় তো নিজের খাতাপন্র এবং হিনেবগুলোই কিকমত লাতে পারে না। 
কাজেই এ সব কাজ-কারবার থেকে তার কিছুই উপার্জন হয় না। 

তিষ্লাপুরের দাবরসায়া এসে দিন-পনের থেকে গিলেন রামসন্দ্র গ্রামে। গঙ্গম্মা আর 
ননজম্মা রেধেবেড়ে খাওয়াল্‌, চেনিগরায়ও করল যথাসাধ্য সেবা-যত্র। হিসেব লেখা শেষ করে 
তিনি নিজে চেনিগরায়কে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন । হেডক্লাককে ছু' টাকা এবং সেরেস্তাদারকে 
পাঁচ টাকা খাইয়ে শেষ পর্যন্ত জমাবন্দীতে স্বাক্ষর করানোর কাজটা হয়ে গেল। মাথায় পাগড়ী, 
গায়ে কোট পর তার ওপর চাদর ঝুলিয়ে চেঘিগরায় তালুক অফিস ঘুরে এল, জমাবন্দীতে সই 
করানোর সময় সে জোডহস্তে দাঁড়িয়েছিল সাহেবের সামনে, তবে সৌভ্ডাগ্যক্রমে সাহেব তাকে 
কিছুই জিজ্ঞাসা করেননি, হেডক্লাকের নির্দেশিত জায়গায় চুপচাপ সই করে দিয়েছেন। 

তিপট্ুর থেকে প্রথম গাড়ি ধরেই তিশ্লাপুর এদে দাবরসায়াজীকে পৌছে দিয়ে চেনিগরায় 
ফিরে এল নিজের গ্রামে । দ্পুরবেলায় সে হেকে ডেকে হুকুম করল স্ত্রীকে, এই ছেনাল, জমা- 
বন্দীর কাজ সেরে এলাম, সারা শরীরট্রা যেন মোচড় দিচ্ছে । চটপট রেড়ির তেল নিয়ে আয়, 
কপালে মালিশ কর আর গা-হাত-পা টিপে দে দেখি !ঃ 

নন্জম্মা মেয়েটি বেশ দীর্ঘাঙ্গী এবং স্থাস্থ্যবতী। বাড়ির পেছনের কৃয়ো থেকে জল তুলে সে 
শুকনো নারকেল পাতা জালিয়ে এক হাঁড়ি জল গরম করল । স্বামীর সবাজে ভাল করে তেল 
মালিশ করে স্নান করিয়ে দিল তাকে । তোয়ালে দিয়ে গা মুছে চেনিগ মাথায় একখানা গামছা 
বাঁধল, তারপর নন্জশ্মার পেতে দেওয়া বিছানায় শুয়ে পড়ল আরাম করে । নন্জম্মা জোড়া 
কম্বল দিয়ে তাকে সযত্রে দেকে দিল। তারপর চেন্নিগরায়ের তৃপ্তি না হওয়া পযন্ত তার পাশে 
বসে আস্তে আস্তে টিপতে থাকল তার হাত-পা । 


৩২ গৃহভঙ্গ 


সময়মত বিয়ে দিলে দু-বছর আগেই অপপন্নায়ার বিয়ে হয়ে যাবার কথা । কিন্তু তখন তো 
চেনিগরায়ের বিয়ে হল, তারপর সে পাটোয়ারীগিরি হাতে পেল। সুতরাং এতদিনে অপ্পন্নায়ার 
বিয়ের কথা উঠছে। 

অপ্পন্নায়া বছর দুই চেন্নাকেশবায়ার পাঠশালায় যাতায়াত করেছে বটে কিন্তু মাস্টারমশাই 
বলেই দিয়েছিলেন যে, ওর কপালে বিদ্যা নেই। সুতরাং ওকে দোষ দিয়ে কি লাভ ঃ বালির 
ওপর লিখতে লিখতে ওর আঙ্গুলের ছাল চামড়া উঠে যেত কিন্তু অক্ষর তবু ফুটে উঠত না। তবে 
তা নিয়ে কারো বিশেষ চিন্তা ছিল না। পাছে আবার বিড়ি খেতে গিয়ে কারো আখের খেতে না 
আগুন ধরিয়ে দেয়, সেই ভয়েই তো তাকে পাশ্তশালায় পাঠান হয়েছিল ! 

কড্রু অঞ্চলের নুগ্গীকেরে গ্রামের পুরোহিত শ্যামভটের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল 
অপ্পনায়ার । গজম্মার বাপের বাড়ির গ্রাম জাবগল্জর লোকেরাই বিয়ের সন্বন্ধটা স্থির করে দেয়। 
মেয়েটি মা-বাগের একমান্ত্র সন্তান, তার কোন ভাইও নেই। মেয়েটি সেলাই-ফৌড়াই এবং 
ঘর-কম্বার কাজেও নিপুণ, আচার-বিচার সন্বন্ধেও জ্ঞান আছে। এমনকি অশ্বথ পাতার ওপর 
কষ্ণমূর্তি আঁকতেও জানে সে। খুব বৃদ্ধিমতী মেয়ে, কিন্তু এ কথাটা শ্যামভট্ট গঙ্গশ্মাকে জানতে 
দেননি, কারণ বেশী চালাক-চতুর মেয়েকে ঘরের বৌ হিসেবে গঙ্গশ্মার পছন্দ হবার কথা নয়। 

বিয়েটা হল বেশ ধুমধাম করে । কন্যাপক্ষ একসেরী রূপোর পঞ্চপান্র, মক্ট, দামী ধুতি, 
জরীদার পাগড়ী ও আরো অনেক জিনিসপন্ত্র দিয়েছে যৌতুকে । বরের মাতাপিতার পরিবতে 
পাণি গ্রহণের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করাল ভাই ও ভাই-বৌ, অগ্থাৎ চেন্নিগরায় ও নন্জম্মা। বিয়ের 
ছয় মাস পরেই খতমতী হল সাতম্মা এবং তার ষোল দিন পরে দ্বিরাগমনে সে এল শ্বশতর বাড়ির 
ঘর করতে। 

দ্রীকে কি করে শাসন করতে হয় সেটা নিয়ে অপ্পন্নায়াও প্রথমটা একটু সমস্যায় পড়েছিল । 
তবে এটুকু সে বৃঝেছিল যে, দাদা যেভাবে বৌদিদির ওপর তশ্বি করে তারও ঠিক এরকমই করা 
উচিত। সুতরাং বৌ এবাড়িতে এসে পৌ'ছবার পরই সে একদিন হাঁক দিল, “এই ছেনাল, 
এদিকে আয়, আমায় তেল মালিশ করে দিয়ে যা।” 

সাতু প্রথমটা বুঝতেই পারেনি স্বামী কাকে এভাবে সম্ছোধেন করে কথা বলছে। সে ঘর 
ঝাঁট দিচ্ছিল। আবার হঙ্গার শোনা গেল, তাকে বলছি, এই সাতি, বজ্জাত ছু ডী, শুনতে পাসনা 
নাকি £ এবার সাতমশ্মা চোখ তুলে অবাক হয়ে চেয়ে রইল স্বামীর দিকে । গজে উঠল অপ্পনা, 
“অমন হাঁ করে দেখছিস কি£ গাধা কোথাকার, কানে কম শুনিস নাকি £ কেঁদে ফেলল 
সাতু। ঝাঁটাগাছটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে শাশুড়ীর কাছে এসে নালিশ করল, “মা, আপনার ছেলের 
কথা শুনছেন £ আমার সঙ্গে এমনি করে কথা কইতে কে শেখাল ওকে £ 

বউমান্ষ এমন করে নালিশ করবে £ এত সাহস হবে তার£ এ তো গঙ্গম্মা কল্পনাও 
করতে পারে না। বড় বৌ নন্জম্মাকে চেন্লিগরায় তো এমনিভাবেই সম্োধন করে থাকে, কই 
সে তো কোনদিন আপত্তি জানায়নি £ টুপচাপ শুনে যায় সে। কিন্তু এ পোড়ারমুখী খোদ 
শাশুড়ীর সঙ্গেই এমনি করে কথা বলছে £ 


গৃহভঙজগ ৩৩ 


“ভাতার নিজের বৌকে আবার কেমন করে ডাকবে রে, ছেনাল £ হারামজাদী কোথাকার ! 

“আমি কেন ছেনাল হতে যাব £ যারা বলছে তারাই হবে হয়ত! 

কথাটা শুনেই তেলেবেগুনে ত্রলে ওঠে গঙ্গশ্মা, “ওরে ভেড়া, কাপুরুষ, হারামজাদা, শুনলি £ 
তোর বৌ, তোর নিজের গর্ভধারিণী মাকে কি বলছে সেটা শুনলি তুই£ঃ আমি হারামজাদী 2 
নিজের বৌকে নিজে টিট করতে পারবি কিনা বলে দে, শিখণ্ডী, ছেনালের ব্যাটা কোথাকার ! 

গাল[্টাল খেয়ে পৌরুষ জেগে উঠল অপ্পন্নায্সার। উঠে গিয়ে বউয়ের ঘাড় ধরে কষিয়ে 
দিল এক মোক্ষম চড়। চড় খেয়ে সাতু ছিটকে পড়ল মাটিতে । “ছেনালটাকে একেবারে শেষ 
করে ছাড়ব" গজাচ্ছে তখনও অপন্না, এরই মধ্যে রান্নাঘর থেকে ছুটে এল নন্জম্মা। সব কথাই 
তার কানে গেছে। এতদিন পর্যন্ত কখনও সে অপ্পন্নায়ার সঙ্গে উ'চুগলায় কথা বলেনি । আজ 
সে বলে উঠল, “অপ্পন্না, ঘরের বৌকে যদি এমন করে জ্বালাও তো তোমার হাত খসে পড়বে । 
আঙ্কেলবৃদ্ধির মাথা কি খেয়ে বসেছ একেবারে £ 

ভিতর থেকে জল এনে সে এবার সাতুর মাথায় জলের ঝাপটা দিতে লাগল । অপ্পনায়ার 
ইচ্ছা হচ্ছিল বৌদিদিকেও “ছেনাল" সম্োধনে আপ্ায়িত করে, কিন্ত কে জানে কেন, হয়ত বৌদিদির 
বাবা কন্ঠীজোইসজীর কথা মনে পড়ে যাওয়ায় ভয়ে চুপ করে গেল। সাতু এখনও সম্পূর্ণ সুস্থ 
হয়নি, তবু সে উঠে বসল। বলে উঠল, “সদ্ধংশে জন্ম হলে তবে তো মুখ দিয়ে ভাল কথা বেরোবে ! 

“সাতু তুই আর কথা বাড়াস না, চুপচাপ আমার সঙ্গে চলে আয়* নন্জম্মা ওকে ডেকে নিয়ে 
সোজা ছাদে উঠে গেল। পেছন থেকে শাশুড়ীর মন্তব্য শোনা গেল, এর রাক্ষুসী এবার নিয়ে চললেন 
কানে ফুসমন্তর দিতে ।” নন্জম্মমা কথাটা স্পষ্ট শুনতে পেলেও এমন ভাব দেখাল যেন কিছুই 
শোনেনি । 

ছাদে একটা চাটাইয়ে বসে সাতু এবার প্রশ্ন করে, “ব্রাহ্মণ হয়ে এরা এমনি ভাষায় কথা বলে, 
দিদি 2 

“তুই নতুন এসেছিস তাই অবাক হচ্ছিস। এ বাড়ির রীত-ব্যবহার এই রকমই । 

“ভাসুরঠাকৃর তোমার সঙ্গেও কি এমনি ব্যবহার করেন £ 

“দু-বছর তো কেটে গেল। শুনতে শুনতে এখন আমার অভ্যাস হয়ে গেছে । 

তুমি শুনেও চুপ করে থাক কিনা তাই এদের সাহস এত বেড়ে গেছে! 

এ কথার কোন উত্তর দিল না নন্জম্মা। সে চুপ করে কি যেন ভাবছিল। সাতু আবার 
বলে, “দিদি, তোমার বাবা তো কতবড় নামডাকের মান্ষ। আমার বিয়ের সময় এসেছিলেন, 
সবাই ও'কে দেখে কত সমীহ করে চলছিল। আমার বাবাও বলছিলেন উনি বিখ্যাত লোক । 
ভাসুরঠাকুরকে পাটোয়ারীর কাজ তো শুনি উনিই পাইয়ে দিয়েছেন। তোমার বাবাকে বলে 
এদের একবার একটু ভয় দেখিয়ে দাও না, তাহলেই এদের এই মুখ ছোটান বন্ধ হয়ে যাবে । তুমি 
নিজেই তো এদের একটু বলতে পার, তাতেও হয় তো চৈতন্য হবে এদের ।” 

“সাতু তুই ছেলেমানু্ষ, তাই বুঝতে পারছিস না। নিজের স্থামীকে ভয় দেখানোর জন্য 
বাপের কাছে নালিশ করতে যাওয়াটা উচিত কাজ নয়।” এরপর নন্জম্মা তার বাবার স্বভাবের 
কিছুটা পরিচয় দিল সাতুর কাছে, বলল তার বাবার যখন কারো ওপর রাগ হয় তখন তিনি তার 
ওপর একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তার চুলের ঝুঁটি ধরে গালে এমন জোরে থাপ্পড় কষান যে দাঁতের 


ঙ 


৩৪ গৃহভজ 


জু. 


পাটি নড়ে ওঠে । মারটা দেবার পর তার সঙ্গে কথা আরম্ভ করেন। এ ছাড়া শাসন করার অন্য 
কোন পদ্ধতি তাঁর জানা নেই। মেয়ের সামনেও তিনি জামাইকে বিন্দৃমান্র খাতির দেখাবেন না। 
যে ধীরবৃদ্ধি নয় তাকে তিনি একেবারেই সম্মান দেখান না, এ রকমই তার স্বভাব । কিন্ত নিজের 
স্বামীর যাতে অপমান না হয়, এটা তো স্ত্রীকেই দেখতে হবে £ 

সাতু এবার বলল, “তাহলে তুমিই ওকে বলে দাও, আমার সঙ্গে যেন আর কখনও এভাবে 
কথা না বলে।, 

ইতিমধ্যে নিচে থেকে চেম্নিগরায়ের হাঁক শোনা গেল, "সব গেল কোথায় £ জাহান্নামে যাক 
শুম্ঠিসুদ্ধ, এখনও পর্যন্ত রুটি আর চাটনীটাও হয়ে ওঠেনি নাকি £ 

“শুনলি তো, তোর ভাসুরঠাক্রের কথার ছিরি £ যাক, আমি গিয়ে রুটি করছি, তুই চটপট 
চাটনীটা পিষে ফেল দেখি । চল্‌, ওহ । আচ্ছা থাকু, তুই বরং তোর বরকে গিয়ে তেলটা মালিশ 
করে দে* কথা বলতে বলতে উঠে দাঁড়ায় ননজম্মা । 

“মালিশ করাতে হয় তো নিজের মাকে দিয়ে করাক, আমি যাচ্ছি চাটনী পিষতে” মনে মনে 
ঠিক করে ফেলে সাতম্মা। 


চতুর্থ অধ্যায় 


নন্জম্মা অন্তঃসত্ত্বা, সাত মাস পর্ণ হয়ে গেছে। এই সময় ঘোড়ায় চড়ে একদিন কন্ঠীজোইসজী 
এসে দেখা দিলেন রামসন্দ্র গ্রামে । তাঁর আবিভীাবের ঘন্টা দুই পরে একখানা নরম গদি দেওয়া 
গরুর গাড়ীও এসে পৌছল। এবার উনি দিনের বেলাই এসেছেন, মেয়েকে প্রসবের জন্য নিজের 
কাছে নিয়ে যেতে এসেছেন তিনি । 

ও'র ছেলে কল্লেশেরও বিয়ে তিক হয়ে গেছে, আর পনের দিন পরেই কন্যাপক্ষের গুহে 
বিয়ে হবে। বৌটি হাসানের মেয়ে। কন্ঠীজোইসজী এ বাড়ির সকলকেই বিয়েতে নাগলাপুর 
যাবার জন্য নিমন্ত্রণ করলেন। নাগলাপুর থেকে সবাই গাড়ীতে হাসানে বরযাত্রী যাবে, সে কথাও 
জানালেন। কিছুক্ষণ আলাপের পর কন্যাকে নিয়ে যাত্রার জন্য প্রস্ভত হলেন কন্ঠীজোইসজী । 
নন্জশ্মা উচ্চে বসল গাড়ীর মধ্যে, আর তার বাবা আগে আগে সেনাপতির মত চললেন সাদা ঘোড়ায় 
সওয়ার হয়়ে। 

নাগলাপুরের বাড়িতে একাই থাকেন বুড়ি ঠাকুমা । জন্মের পর থেকে নন্জশ্মা মানুষ 
হয়েছে এ রই হাতে । তাই অন্বশ্মাকে দেখে নন্জম্মার কানা আর থামেই না। এ অশ্র 
কারণ কি ঠাক্মার সঙ্গে এই দীর্ঘ বিচ্ছেদ, না আরো অন্য কিছু তা সে নিজেও ঠিক বুঝতে পারে 
না। নাতনী গর্ভবতী হবার আগেই তাকে একবার নিজের কাছে আনতে চেয়েছিল অক্কম্মা কিন্তু 
সে সাধ পূর্ণ হয়নি। কারণ কন্ঠীজোইসজী বহুদিন পরে সবেমান্ত্র গতকাল গ্রামে ফিরে এসেছেন । 
আর এসেছেন একেবারে ছেলের বিয়ের দিন-তারিখ সব কিছু স্থির করে। ছেলের বিয়েটা যে 
আরো অনেকদিন আগেই দেওয়া উচিত ছিল, এটা এতদিন ও"র খেয়ালই হয়নি । হঠাৎ সেদিন 
এক কনস্টেবলের কাছে শুনেছেন কল্লেশের চালচলন নাকি আজকাল ভাল ঠেকছে না। ব্যস, 
আর কথাবাতা নেই, একেবারে দ্ব-দিনের মধ্যে পাত্রী খুঁজে, বিয়ের দিন স্থির করে, সব ব্যবস্থা 
করে ফেলেছেন । 

দাদার বিয়ের প্রস্ততিতে এবার নন্জম্মাও লেগে যায় মহা উৎসাহে । বাড়ি-ঘর পরিম্কার 
করিয়ে চুনকাম করানো, চাকর-বাকরদের নির্দেশ দিয়ে কাজ করানো ইত্যাদির সব দায়িত্ব সেই 
তুলে নিয়েছে নিজের হাতে । নিজের গ্রামে একটানা বেশীদিন থাকা কল্টীজোইসজীর কোম্ভীতে 
নেই। এবার তিনি ফিরে এলেন প্রায় আটদিন পরে, বিয়ের তখন আর বাকি মাত্র ছদিন। 
কল্পেশ পুলিশী পোশাক পরেই গ্রামে এসেছে । সে বেশ করিতকর্মী ছেলে, নিজের বিয়ের প্রস্ততিতে 
বোন এবং ঠাকুমাকে সব কাজেই সাহায্য করছে সে। রামসন্দ্রের ক্টুম্বরাই এখন এদের নিকট- 
তম আত্মীয়। তাই “দেব সমারাধন* অনুষ্ঠানের একদিন পুবেই চেন্নিগরায়, তাপ্পন্ায়া ও সাতম্মা 
গরুর গাড়ী করে এসে পৌছল। গন্গম্মা বলে পাঠিয়েছে-_সে বিধবামানুষ, তাই শুভকর্মে যোগ 





৩৬ গুহভঙ্গ 


চু 


দেবে না। “দেব ভোজনের' পর সেই রান্ত্রেই বরযান্ত্রী রওনা হবার কথা, কিন্তু নন্জম্মার জ্বর 
এসেছে দেখে সবাই চিন্তিত হয়ে পড়ল। বেশী খাটুনীর ফলে সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, ভ্বরটা এসেছে 
দুপুরবেলাই, রান্রে দেখা গেল ভ্বর খুব বেড়েছে, নন্জশ্মাকে শুয়ে পড়তেই হল। এই অবস্থায় 
রান্ত্রে চব্বিশ মাইল পথ গরুর গাড়ীতে যাওয়া তার পক্ষে একেবারেই উচিত হবে না। তাই শেষ 
পর্যন্ত স্থির হল অক্রশ্মা বাড়িতেই থাকবে নন্জম্মাকে নিয়ে । 

ঠাকৃমা আর নাতনী গ্রামের বাড়িতেই থাকবে এটা ঠিক হবার পরও নন্জম্মার কেমন ভয় 
করতে লাগল, প্রথম গর্ভের বিচিন্তর অনুভূতিই বোধহয় তার কারণ। ওর মনে হতে লাগল স্বামীও 
এই সময় কাছে থাকলে ভাল হয়, তাই সে ডেকে পাঠাল চেন্নিগরায়কে । স্ত্রীর আহবান শুনে 
ভেতরে এসে সে চাপা গলায় অন্যের অশ্্ত স্বরে গর্জে উঠল, “কি হয়েছে কি £ 

“আমার ভয় করছে। পুরুষমান্ষ কেউ এখানে থাকবে না। অপ্পন্না আর সাতু বিয়েতে 
যাক, তুমি এখানে থেকে যাও ।, 

“বাঃ, তা কি করে হবে? বলতে বলতে চেন্নিগরায়ের মুখের চেহারাখানা এমন হয়ে উঠল 
যেন বিয়ের ভোজটা এখনি কেউ তার সামনে থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে । 

“কেন হবে নাঃ আমি কল্লেশ ভাইয়া আর বাবাকে বলে দিচ্ছি, ও'রা তোমাকে এখানেই 
রেখে যান। 

“না, আমি থাকব না, চাও তো সাতুকে রেখে দাও ।” এই দ্ব-বছরের বিবাহিত জীবনে স্বামীকে 
বেশ ভাল করেই চিনেছে নন্জম্মা । একটুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলে, থাক, কোন দরকার 
নেই। তুমি ঘুরে এস ॥ 

চেন্নিগরায় তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে কেটে পড়ল, এবং বাইরে গিয়ে গদি বিছান গরুর গাড়ীতে 
উঠে বেশ ভাল জায়গা দেখে বসে পড়ল যাতে পথে ঠাণ্ডা না লাগে। এই জায়গাটার ওপর প্রথম 
থেকেই নজর ছিল ওর। সাতু নন্জশ্মার কাছে এসে বলল, “দিদি, আমি তোমার কাছে থাকি £ 

“না, না, তুই যা, ঘুরে আয়” নন্জন্মা বলে, কিন্তু তার কথায় কান না দিয়ে সাতু এবার 
অক্কশ্মার কাছে গিয়ে বলে, “আপনি বুড়োমানুষ, বাড়িতে আর কেউ নেই, আমি এখানেই থেকে 
যাই। 

“না, না, তুমি যাও। ওখানকার কাজ-কর্ম সামলে দেবার মত আমাদের তরফের মেয়ে তো 
কেউ নেই। বিয়ের মণ্ডপের পাশে হাজির থেকে অনেক কিছু যোগাড় দিতে হবে, তুমি গেলে চে 
কাজটা অন্তত করতে পারবে । আমি তো থাকছি নন্জার কাছে, ভয় পাবার কিছু নেই।' 

অক্কশ্মার এই কথার পর সাতুও চলে গেল বরযান্্রীদের সঙ্গে । 

রান্ত্রি আটটা নাগাদ রওনা হয়ে গেল চারখানা গরুর গাড়ী। কন্ঠীজোইসজী যথারীতি 
কোট-প্যান্ট-জতো-মোজা ইত্যাদিতে সজ্জিত হয়ে ঘোড়ায় চড়ে চললেন সবার আগে আগে। 
কলেলেশ তার বন্ধ্‌-বান্ধব ও পুলিশের অন্য কয়েকজন হাবিলদারের সঙ্গে চলল তাঁর পেছনের 
গাড়ীতে । যতক্ষণ পর্যন্ত গাড়ীগুলো চোখের আড়ালে না চলে যায়, ততক্ষণ নন্জম্মা সেদিকে 
চেয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল বাড়ির দরজায় । 

রাত্রে বিছানায় শুয়ে শুয়ে অঙ্কশ্গমা বলছিল, “দেখু ননজা, ছাগলের দুটো বাঁটের মতই তোরা 
আমার দুই সন্তানের মত। তোর বাপ জানে যে, তুই সাত মাস পোয়াতি, ঠিক এই সময় কিনা 


বনু ৩৭ 
ও গিয়ে কল্লেশের বিয়ের দিন ঠিক করে ফেলল £ ওর কি কোন কালেও আক্কেল হবে বলে তোর 
মনে হয়2, 

“বাবার স্বভাবই এ রকম, সব কাজেই তাড়াহুড়ো । 

“তোকে জম্ম দিয়েই তো তোর মা মরল, সেই থেকে একলা হাতে আমিই তো সব সামলাচ্ছি। 
কল্লেশ, হাজার হোক পুরুষ ছেলে, তুই যখন জন্মাস ওর বয়স তখন সাত বছর। ছেলে তো 
যা হোক করে বড় হয়েই যায় । এদিকে, তোর বাবা তিন দিন যদি ঘরে থাকল তো তারপর তিন মাস 
উধাও। বিয়ের পর তুইও চলে গেলি, সেই থেকে একা একা এ বাড়িতে আমার আর মন টেকে 
না। তোর কোলজুড়ে দু-চারটে বাচ্চা কাচ্চা হবে, তাদেরও হাতে করে মানুষ-মুনুষ করব এ 
আমার অনেক কালের সাধ। এতকালে ভগবান সে সুযোগ দিলেন। মেয়েকে একবার পরের 
হাতে দিলে তারপর আর তো ইচ্ছে করলেই আনা যায় না!” 

এখন আর ভাবনা কি£ কল্লেশ ভাইয়ার বউ আসছে, এবার তো দুজনে মিলে থাকতে 
পারবে । 

“ওরে, ও সব তোর ভুল ধারণা। ছেলের যে পুলিশের চাকরী, যখন যে গাঁয়ে বদলী হবে 
সেখানেই গিয়ে থাকতে হবে, আর বৌও যাবে ওর সঙ্গে সঙ্গে। তার ওপর সে আবার শহরে মেয়ে। 
বিয়েটা পাকা করে ফেলবার আগে তোর বাপ তো আমাকে একবার জিভ্তাসাও করল না, যা মনে 
হল তক্ষুণি তাই করে বসল, ব্যস। কি-যে এক ব্রক্মদৈত্য জন্মেছে আমার গর্ভে সে আমিই জানি ।' 

নন্জম্মাও মনে মনে ভাবছিল তার বাবার সৃচ্টিছাড়া স্বভাবের কথা । এই সময় অন্কম্মা 
হঠাৎ প্রশ্ন করল, “হ্যারে, তোর শাশুড়ী তোকে যত্র-আত্তি করে তোঃ 

হ্যা, খুব যত্র করে।, 

'যাক, তা হলেই হল। মেয়েদের তার চেয়ে বেশী আর কি চাই? এই বলে চুপ করে 
যায় অক্কম্মা। একটু পরেই কিন্ত আবার কথা শ্তরু করে, “দেখ খুকী, তোর সেই সীতা 
বনবাসের গান, লব-কৃশের যৃদ্ধের কথা, সে সব এখনও মনে আছে তো? 

“ওখানে যাবার পর থেকে তো আর একদিনও ওসব গান গাইনি । একদিন ভোরে উঠে 
মহুয়া বাটতে বাটতে গুন গুন করে গাইছিলাম, তা সবাই বকল, বলতে লাগল---ওতে নাকি ওদের 
ঘুমের ব্যাঘাত হচ্ছে। তারপর থেকে মুখ বুজেই বাটনা বাটি। 

“কাল থেকে তুই রোজ গাইবি, আমার খুব শুনতে ইচ্ছে করে এ সব গান" একটু পরেই আবার 
কি যেন মনে পড়ে যায়, ব্রদ্ধা বলে ওঠে, থাক, থাক, এখন আবার তুই পোয়াতি মেয়ে, সীতা 
বনবাসের গান এখন গাইতেও হবে না, শুনতেও হবে না। | 

মিনিট দুই চুপ করে থেকে বলে ওঠে, “দেখ ননৃজা, তুই যাবার পর থেকে এ গাঁয়ে গান গাইবার 
মত একটাও মেয়ে পাওয়া যায় না। কারো বাড়ি পূজো-আর্চা থাকলে সব যেন কেমন ফিকে 
ফিকে মনে হয়, সবাই এই কথা বলে । গানের বইগুলোও তো তুই এখানেই ফেলে গিয়েছিস, 
কন্ঠী একদিন কোথা থেকে বের করেছিল, সেই আবার কোথাও রেখে দিয়েছে। সকালে উঠে 
খুঁজে দেখিস তো, গান না গাইলে সব যে ভুলে যাবি শেষে!” 


৩৮ গুহভঙ্গ 


শি 


যেদিন কল্লেশের বিয়ে সেইদিনই নাগলাপুরের জেলেপাড়ায় ইদুর মরল। এর মানে হল এই যে 
প্লেগদেবী এবার গ্রামে দেখা দেবেন। যারা কোন কিছু মানত করে তা পূর্ণ করে না অথবা যাদের 
মনে ভয়-ভক্তির অভাব, তাদেরই পড়তে হয় তাঁর করাল গ্রাসে । এ'র আবির্ভাবের সূচনা দেখলেই 
গ্রামর লোক ঘরবাড়ি ছেড়ে পালায়, লোকালয়ের বাইরে খেতের মধ্যে নারকেল পাতার কুঁড়ে 
তৈরী করে বাস করতে থাকে । মাস তিনেক পরে প্লেগের প্রকোপ শেষ হলে তবেই জন-মানুষ 
আবার গ্রামে ফিরে আসে । 

দ্বিতীয় দিনই গ্রামের পথে ঝুড়ির মধ্যে বাহিতা মারীমাতার দর্শন পাওয়া গেল। হাতে 
একটা 'মজবৃত লম্বা চাবুক, লোকটা কখনও সেটাকে সজোরে শন্যে আন্দোলিত করছে, কখনও 
বা নিজের শরীরেই সপাৎ করে বসিয়ে দিচ্ছে এক ঘা, সর্বাঙ্গ তার হলুদ আর আবীরে লিপ্ত, মাথার 
ওপরে একটা ঝুড়ি, তারই মধ্যে আছেন মারীমাতা। লোকটার পিছন পিছন চলেছে তার স্ত্রী, 
দৈববাণীর মত করে সে ঘোষণা করে যাচ্ছে--আশে-পাশের চৌযট্রিখানা গীয়ে মা দর্শন দিয়েছেন, 
ধুলোয় পড়ে ছটফট করছে মানুষ, মাকে ফেলে ছেলেকে খাচ্ছেন, কচি বাচ্চাদের মা টেনে নিচ্ছেন। 
গৌনা দ্িরাগমন) না হওয়া মেয়েদের পেটে পূরছেন, গৌনা হতে আসা ছেলেদের মাথা খাচ্ছেন, 
পোয়াতি মেয়ের প্রাণ টেনে নিচ্ছেন ---**- * এরই ফাঁকে ফাঁকে দেবীর বাহক পুরুষটি নিজের নগ্ন 
দেহে নির্দয়ভাবে মাঝে মাঝে চাবুক চালিয়ে যাচ্ছে । 

এইভাবে ঝুড়িতে চেপে মারীমাতার আবিভাব বা অলক্ষণ চক ঘোষণা শুনিয়ে যাওয়া কিছু 
নতুন ব্যাপার নয়, প্রচলিত প্রথা । কিন্তু পোয়াতি মেয়ের প্রান টেনে নেওয়া'র কথাটা শুনে অক্কশ্মার 
প্রাণটা যেন শিউরে উঠল । তাড়াতাড়ি করে সে একটা কুলোর ওপর হলুদ, আবীর, চাল, ডাল, 
নারকেল, তিন পয়সা দক্ষিণা ইত্যাদি সাজিয়ে নিয়ে গিয়ে মারীমাতার পুজো দিল তারপর সেই 
প্রসাদী আবীর কুঙ্কুম এনে দিল ননৃজুকে। 

পরের দিন আরও বেশী ই'দুর মরল। গ্রামের অন্যান্য পাড়াতেও মড়ক ছড়িয়ে পড়ছে । খবরটা 
রাক্ট্র হতেই আশে-পাশের গ্রামের লোক গ্রাম ছাড়তে আরম্তভকরেছে। এখন এদেরও উচিত গ্রামের 
বাইরে ঝুঁড়ে তৈরী করা । এ গ্রামের পাটোয়ারী শ্যামন্নাজী সেদিন সন্ধ্যাবেলা প্রত্যেক পরিবার 
থেকে এক একজনকে ডেকে পাঠিয়ে পঞ্চায়েতে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন যে আগামী সোমবারের 
মধ্যে সবাইকে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে । ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে কাজ আরম্ভ হয়ে গেল। পরদিন 
ভোর থেকেই লোকে নিজের নিজের খেতে বা গ্রামের বাইরের ফলের বাগানে কুড়ে তুলতে আরম্ত 
করে দিল। যাদের নিজেদের বাগান বা খেত নেই তারাও অন্যের জমিতে কুড়ে তুলছে। 
ছোট-খাট কাজ-কারবার যাদের তারা রুজি-রোজগারের জিনিসপন্ত্রও সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে । 

কন্ঠীজোইসজী ছেলের বিয়ে দিয়ে গ্রামে ফিরলেন যখন, ততক্ষণে অনেক বাড়িই খালি হয়ে 
গেছে। বিষের ঝামেলা চুকিয়ে কোথায় দুদিন বিশ্রাম নেবেন তা নয, এই এক নতুন উৎপাত । 
এই সম্প্রতি বাড়িতে চুনকাম হয়েছে কিন্ত তা সত্তেও বাড়ি খালি করতেই হবে। সাধারণত এইভাবে 
গ্রাম ত্যাগ করার আগে পুরোহিত ডেকে শুভক্ষন দেখে নেবার প্রথা আছে। ছোটখাট পৌরোহিত্য 


গহভঙ্গ ৩৯ 


কাজের জন্য কন্ঠীজোইসজী নিজেই এড্তোরের গরীব ব্রাক্মণ পুট্টভট্টকে নিষক্ত করে দিয়েছেন, 
এ সব কাজের যা কিছু উপার্জন সব এ পুষট্টভট্রকেই দেওয়া হয়। কিন্তু এবার পাটোয়ারী শ্যামন্নাজী, 
কন্ঠীজোইসজীকে কিছুই জিজ্ঞাসা করেননি, এমন কি তাঁর অনুপস্থিতিতে পুন্টভট্টকে ডেকেও 
জিক্তাসা করেননি । সব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একেবারে নিজে নিজেই । এদের দু'জনের শন্রতা চলে 
আসছে বহুদিন ধরে। এই গত বছরও খেতের জল নিয়ে কলহ হয়েছে দু'জনের মধ্যে। সেই 
থেকেই এই ধরনের খুট-খাট চলেছে। এবার কন্ঠীজোইসজী স্থির করলেন পাটোয়ারীর এই 
সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে হবে। 

বিবাহ অনুষ্ঠান সেরে ফিরে আসার পর দ্বিতীয় দিনে মাসিক “কম্বলীশাস্ত* প্রেথা) হয়ে যাবার 
পর শামিয়ানা খুলে ফেলা হল। চেন্িগরায়, অপ্পন্নায়া আর সাতম্মা তিনজনেই গরুর গাড়ীতে 
ফিরে গেল তাদের নিজের গ্রামে । 

এই শ্যামন্নাটাকে নিয়ে কি করা যায় £ তার এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করাই উচিত । কিন্তু 
এখন তো গ্রামসুদ্ধ লোক জিনিসপন্ত্র নিয়ে চলেই গেছে, ঘরে ঘরে তালা ঝুলছে । যারা লিখতে 
জানে তাদের মধ্যে অনেকে আবার দরজার ওপর লিখে দিয়ে গেছে কাল এসো'। একজন গ্রাম 
ছাড়লেই অন্যেরা সবাই ভয় পেয়ে পোটলা-পুঁটলি বাঁধতে শুরু করে দেয় । কন্ঠীজোইসজী বললেন, 
“আমি শাস্ত্র দেখেছি, এ গ্রামের কিছু হবে না, কারো যাবার প্রয়োজন নেই ।” কিন্তু কেউই সে কথা 
শুনতে চায়না । শেষে একজন প্রশ্ন করল, তা, আপনি কি গ্রামের মধ্যেই থাকবেন ঠিক করেছেন £ 
ঝোকের মাথায় তিনি উত্তর দিয়ে বসলেন, “হ্যা, তাই থাকব” । নিজের জিদ বজায় রাখতে তিনি 
স্থির করে ফেললেন এই জনশন্য গ্রামে একাই থাকবেন। 

এ কথা শুনেই প্রচুর আপত্তি জানাল অক্কশ্মা। “নাতনী এই প্রথম প্রসবের জন্য এসেছে 
এখানে । এখন এই গাড়ে সাতী লাগা শনির দশা) গ্রামে একলা একটা পরিবার কখনও থাকতে 
পারে£ঃ আমাদেরও চলে যাওয়া উচিত। নয়ত ওকে আবার শ্বশুর বাড়িই না হয় পাঠিয়ে দিই ! 
আমরা আঁতুড় তুলতে পারলাম না বলে তারা হয়ত বদনাম করবে । তারা ঘদি বলে, আমি না 
হয় সেখানে গিয়েই ওর আঁতুড় তুলে আসব?” 

“আমি জোর গলায় বলে এসেছি যে, “গ্রাম আমি ছাড়ব না”, এখন সে কথা না রাখতে পারলে 
আমার ইজ্জত থাকবে না।' 

এতে আবার ইজ্জতের কথা আসছে কেন £ চুপচাপ চলে গেলেই হল £ 

কিন্তু কন্গীজোইসজী নিজের মান খোয়াতে রাজি নন কোনমতেই । সুতরাং বহক্ষণ বাদ- 
প্রতিবাদের পর স্থির হল যে, অক্ম্মা আর নন্জম্মা গিয়ে ও'দের খেতের মধ্যে কুঁড়ে ঘরে থাকবে 
এবং সেইখানেই হবে নন্জার প্রসব ও আঁতুড় ঘর। আর কন্ঠীজোইসজী থাকবেন এখানে, 
এই গ্রামের বাড়িতেই। 

“আচ্ছা, তুই কি সাক্ষাৎ যমরাজ £ একলাটি এখানে কেন পড়ে থাকবি বল দেখি £ কেন 
আমাদের সঙ্গে ওখানে গিয়ে থাকা যায় না 

“্লেগমাতা আমার কাছ থেকে কিছুই ছিনিয়ে নিতে পারবেন না। আমি পুরুষমানুষ, 
এখানেই থাকব ।, 

সুতরাং আর কোন উপায় নেই। খেতের মধ্যে কুড়ে তৈরী হয়ে গেল। শাকৃমা এবং 


৪০ গৃহভজ 


গর্ভবতী নাতনী গিয়ে আশ্রয় নিল সেখানে । পাটোয়ারী শ্যামন্নাজী পঞ্চায়েতের নির্দেশ জানিয়ে 
দিলেন, কন্ঠীজোইসজী গ্রাম থেকে বেরিয়ে নিজের মা ও মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে যেতেও পারবেন 
না, কারণ তাঁর শরীরে প্লেগমাতার ছোয়া থাকতে পারে। সুতরাং নন্জর প্রসব এবং সুতিকা- 
গারের সমস্ত দায়িত্ব গিয়ে পড়ল বৃদ্ধা অক্কশ্মার ঘাড়ে । 


৯১১, 


সারা গ্রামে কল্ঠীজোইসজী এখন একেবারে একা । একটা গরু পাঠিয়ে দিয়েছেন খেতের কুঁড়ে 
ঘরে। অন্য গরু ও তার বাছুরটাকে রেখেছেন নিজের কাছে। রান্না-বান্না করছেন নিজের হাতে । 
প্রতাহ ঘরদ্বার পরিজ্কার-পরিচ্ছন্ন করে তারপর বাঘছালের আসনখানা পেতে বসে জ্যোতিষশাস্ত্ 
নিয়ে লেখাপড়া করেন, তালপাতার পুঁথি খুলে বিভিন্ন মণ্ডল, ভ্রিকোণ, চতুন্কোণ, পঞ্চকোণ আদি 
নানাবিধ চিন্র দেখেন, হাং, ধীং, ওম ইত্যাদির মন্ত্রশক্তি সম্বন্ধে চিন্তা করেন। কখনো বা উচ্চৈ- 
স্বরে মন্ত্রপাঠ করতে করতে পায়চারী করেন বাড়ির বাগানে । নেহাত মন মেজাজ খারাপ 
হলে ঘোড়াটার পিঠে চড়ে খানিকটা ঘুরে আসেন চনরায়পট্রনের দিকে। 

একটানা এতদিন ও'কে গ্রামে কখনো থাকতে হয়নি । থাকবার দরকারও ছিল না, কিন্ত 
ও"র জিদ তো উনি ছাড়বেন না কিছুতেই । পাটোয়ারী শ্যামন্নার নির্দেশ, তাছাড়া, সারা গ্রামের 
লোক ওর নিষেধ সত্ত্বেও যে ভয় পেয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে, এই সব কিছুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ 
জানাতেই ও'কে থাকতে হবে। অন্ধকার, নিঃসঙ্গতা, চোর, ডাকাত, গুপ্তা, সাপ, বিছে দুনিয়ার 
কোন কিছুতেই ভয় পাওয়া ওর কোষ্ঠীতে নেই। 

একদিন একটি লোক এসে দেখা দিল গ্রামে। বয়স প্রায় পঞ্চাশ, মাথায় শিখাগুচ্ছটি ছাড়া 
বাকি সমস্ত অংশ পরিস্কারভাবে কামানো, টিকির শুভ্রকেশ গ্রন্হিদ্ধ। পরনে লাল জামা, 
ময়লা হয়ে যাওয়া কালো কোট এবং ফেরতা দিয়ে ধূতি পরা। সামনের দুটি দাঁত নেই এবং 
দেখলেই মনে হয় গালে তামাক পোরা। ডান হাতের মধ্যমাঙ্গুলিতে সোনার তারে গাঁথা মন্ত্রপৃত 
আংটি। কন্ঠীজোইসজী আগন্তককে দেখে প্রথমটা ঠিক চিনতে পারেননি । একটুক্ষণ পরে 
মনে পড়ল, বললেন, ণকি খবর বীরাচারী £ এই জনশন্য গ্রামে হঠাৎ এসে দেখা দিলে যে ?, 

আপনার সে দেখা করার জন্য এই দু'বছরে চারবার এসেছি । আপনি গ্রামে কবে আছেন, 
কবে নেই সে কথা কেউই বলতে পারে না। আজও আপনার সঙ্গে দেখা করার আশাতেই বেরিয়ে 
পড়েছিলাম। 

“এসো এসো, ভিতরে এসে বস।, 

ভিতরে এসে বসে বীরাচারী। কন্ঠীজোইসজীর আসনের পাশে খান-চারেক পুরোন চটি- 
জতো পড়ে আছে দেখে বীরাচারী প্রশ্ন করে, “হাতের কাছে পুরোন চটি রাখতে ভালবাসেন দেখছি £ 

হ্যা, কারণ ওটা হাতে নিয়ে দাঁড়ালে লোকে চুপচাপ যা বলি মেনে নেয় ।” 

“সে কথা বলছি না। শুনেছি আপনি নাকি ভূত প্রেত পিশাচ ইত্যাদি তাড়াতে পারেন £ 

“তাও ধরে নিতে পার, তবে উপস্থিত এগুলো তো মানুষ তাড়াবার জন্যই রাখা আছে।' 


গুহভঙজ ৪১ 


আরো কিছুক্ষণ এটা সেটা কথাবার্তার পর জোইসজী প্রশ্ন করেন, “তা, কি জন্য এসেছ বল 
দেখি £ | 

“এই এমনিই চলে এলাম। বছর দুই পূর্বে একটা ঘটনা ঘটে। কটিগেহল্লীর লোকেদের 
জন্য চোলেশ্বরের টিলার কাছে একটা মন্ত্রপূত পূজা করিয়েছিলাম, রাতটা ছিল অমাবস্যা। মা 
কালীর মৃতির মধ্যে রাখা দক্ষিণার টাকা-পয়সা, তিনছড়া কলা সব কিছু কেউ বার করে নিয়ে 
গিয়েছিল, তাই ভাবলাম ব্যাপারটা সম্বন্ধে আপনি হয়ত কিছু খোঁজ-খবর দিতে পারবেন ।, 

“যারা তুকতাক করতে জানে তারা শাস্ত্র পড়ে গুনতে জানে না নাকি £ আমাকে জিজ্ঞাসা 
করতে এসেছ কেন? আমি কি তোমার চেয়ে ভাল গণনা করতে পারি £ 

“এটা বোঝার জন্য শান্তর দেখবার দরকার হয় না। সে রাতে ওখানে ফিরে এসে সব কিছু 
দেখে সেই মুহতেই আমি বুঝেছিলাম যে, আমার পূজো করা মা কালীর প্রতিমা খণ্ডিত করে তার 
মধ্যে থেকে টাকা-কড়ি আর কলার ছড়া চুরি করার সাহস এ অঞ্চলে আর কারো নেই। অমাবস্যার 
রান্রে এ জায়গায় যাবারই হিম্মত হবে না কারো, কন্ঠীজোইসজী ছাড়া আর কারো দ্বারা এ কাজ 
সম্ভব নয়। সত্যি কথাটা বলুন তো জোইসজী ৷, 

“তোমার বুদ্ধি আছে বীরাচারী। তা, এতদিন পরে কি সেই পয়সা ফেরত নিতে এসেছ £ 

“পয়সা চুলোয় যাক, তার জন্য আসিনি আমি । শুধু আপনাকে হাত জোড় করে অনুরোধ 
করছি, ভবিষ্যতে আর কখনও এভাবে আমার কাজে বাগড়া দেবেন না। 

“আচ্ছা বেশ, তাই হবে। এখনও আমার রান্না হয়নি, চল দু'জনের জন্যই রান্না করা যাক, 
এখানেই খেয়ে যাও ।, 

বীরাচারী রাজি হয়ে গেল। খেয়ে-দেয়ে সে চলে গেল বিকেল চারটে নাগাদ। রাত্রে শুয়ে 
শুয়ে মেয়ের জন্য চিন্তা হতে লাগল কল্ঠীজোইসজীর--এবার তো প্রসবের সময় হয়ে এসেছে, 
আমি একবার যেতেও পারলাম না। হতভাগা শ্যামন্নাটা পঞ্চায়েতকে দিয়ে আমার ওপর নিষেধাক্তা 
জারি করিয়েছে, সেই ভয়েই আমি ঘরে বসে থাকব নাকি £ কাল ঠিক গিয়ে দেখে আসব, দেখি 
কি করতে পারে ব্যাটা! আমার কুঁড়ের পাশেই তো ওর কুঁড়ে । বুক ফুলিয়ে ওর সামনে দিয়েই 
যাব আমি। যদি একটুও চ্যাচামেচি করার চেস্টা করে তো “মা **** ' ব্যটার গায়ের চামড়া 
তুলে নেব। এতদিন না যাওয়াটা মোটেই উচিত হয়নি । ব্যাটা ভাবছে ওর নিষেধের ভয়েই 
আমি বুঝি ওদিকে যাচ্ছি না। সেই দেমাকে ব্যাটা বোধহয় গৌঁফে তা দিচ্ছে বসে বসে। ব্যাটার 
গোঁফজোড়া মুড়িয়ে দিতে হয়।” চিন্তা করতে করতে বিছানায় পাশ ফিরলেন কন্ঠীজোইস, 
এমন সময় হঠাৎ মনে হল যেন ছাদের ওপর কিছু পড়ল। মিনিটখানেক পরই চিল পড়ার 
আওয়াজ হতে লাগল। এ কি বীরাচারীর কাজ নাকি? একথা ভাবতে ভাবতেই অন্ততঃ 
বিশ-তিরিশখানা পাথর পড়ল বাড়ির ওপর। “না, এ বীরাচারীর কাজ নয়, মনে হচ্ছে গ্রামেরই 
লোক, আমাকে ভয় দেখাতে এসেছে । হারামজাদা ভীতুর দল! দেখাচ্ছি মজা। নিঃশব্দে 
উঠে পিছনের দরজা খুলে বাগানে চলে গেলেন জোইসজী, নিঃশব্দেই পাঁচিল টপকে, পাশের 
বাড়িটার ওধার দিয়ে ঘুরে সামনের গলিতে এসে হুঙ্কার দিলেন, “দেখি তুই কোন হারামজাদা £ 
আজ খুন করে ফেলব তোকে । চার-পাঁচটা লোক এদিক ওদিক পালাতে শুরু করল, ভয়ে 
থরথর করে কাঁপছে তারা একজনকে ধরে ফেললেন কন্ঠীজোইস, বাকিরা পালিয়ে গেল। 


৪২ গৃহতঙগ 


যে লোকটা ধরা পড়ল তার নাম জুট্গ। সে শ্যামন্নার খেতের বাটাইদার, বেশ সাহসী লোক । 
কিন্তু এখন ধরা পড়ে থরথর করে কাঁপছে । কন্ঠীজোইসজী তো এখন সাক্ষাৎ প্লেগদেবীরই 
প্রতিরূপ। জ্ট্রগ বেচারা শুনেছে পরিত্যক্ত গ্রামে এখন প্লেগমাতা অধিল্ঠান করছেন। এই 
গভীর রাতে, সঙ্গী-সাহী সবাই পালিয়ে গেছে, ও একলা বন্দী হয়েছে যার হাতে, অন্ধকারে তার গর্জন 
শুনে ও ঠিক বুঝতে পারছে না ইনি কন্ঠীজোইসজী না সাক্ষাৎ প্লেগমাতা। মানুষটা যে কন্ঠী- 
জোইসজী তা অবশ্য ও বুঝতে পারছে কিন্তু দেবীই স্বয়ং ও র মধ্যে দিয়ে আবিভভূতা হয়েছেন কিনা 
কে জানে! : 
হাত জোড় করে সে কাকৃতি-মিনতি শুরু করে, “হু-হু"*'হুজর, ছে-*ছেড়ে*শদিন আমায় "তত 

“কে তুই? শ্যামন্না পাঠিয়েছে তোকে, ঠিক কিনা £ 

হাঁ ঃ 

“এখানে আসবার সাহস হল কি করে তোর £ 

“ব.**ব্বলেছিল আ.**.আপনি গাঁয়ে নেই) 

“আমি যদি গাঁয়ে নাও থাকি, তু আমার রাড়িতে পাথর ছোড়ার সাহস হয় কি করে তোর ? 

“আমাকে ভয় দেখিয়েছিল, না এলে খেত কেড়ে নেবে । 

“আর কে কে ছিল তোর সঙ্গে £ 

“তিম্মন্ধদের বাড়ির গিড্ডা, ও পাড়ার গুল্লিগ আর চৌকিদার সিদদুর ।” 

“এদেরই বা এত সাহস হল কি করে? 

“সরকারী জমি দেওয়া হবে না বলে শাসিয়েছিল।” 

“হ'ঃ, তা তোর কি ইচ্ছে যে, তোর বৌ বিধবা হোক £ 

না, না, হুজুর, দোহাই অমনটা করবেন না। 

“আমার বাড়িতে পাথর ছুঁড়ে তার পরেও বেচে থাকবি £ 

জুট্রগের মুখে কথা নেই, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কীপছে শুধু । কন্ঠীজোইসজীর ইচ্ছা হচ্ছিল গিয়ে 
শ্যামন্নার কুঁড়েটার ওপর তেল ছড়িয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। কিন্তু ওর নিজের কুঁড়েও তারই পাশে, 
সেখানে রয়েছে ও'র মা আর মেয়ে । পাটোয়ারীর কুড়ে থেকে আগুন ওদের কঁড়েতেও ছড়িয়ে 
পড়বে, সুতরাং এ পরিকল্জনাটা বাতিল করতে হল । এ পোকাটাকে পরিন্কার দিনের আলোয় 
শিক্ষা দিতে হবে, রান্ত্রে বদূলা নিতে গেলে দু'জনের মধ্যে আর প্রভেদ রইল কোথায় £  জ্ট্রগ 
তখনও দাঁড়িয়ে আছে জোড় হস্তে । 

“আমাদের কুঁড়ের দিকে গিয়েছিলি £ 

“কাছাকাছি গিয়েছিলাম, ভিতরে যাইনি । 

“মা কেমন আছেন £ 

শুনেছি আজ দুপুরে নন্জম্মাজার মেয়ে হয়েছে । পো -** পোয়াতি---দু'জনেই ভাল 
আছে ।? 

খবর শুনে খুশি হলেন কন্ঠীজোইসজী। কাল সকালেই দেখতে যেতে হবে। দেই সময় 
শ্যামন্নার সঙ্গেও বাক্যালাপ করা যাবে এখন । জ্ট্রগকে বললেন, “আচ্ছা, তুই যা এখন । 

কিন্তু সেআর নড়ে না, বলে, একলা যেতে ওর ভয় করছে, সঙ্গে করে যদি পৌছে দেন। 


গৃহভঙ্গ ৪৩ 


“বাঃ রে হারামজাদা, আসবার সময় ভয় করেনি £ এখন ফিরতে তয় করছে! চুপচাপ 
বিদেয় হবি না পিঠের ওপর ভাল করে হাতের জুখ করে নেব £ 

“না, না, যাচ্ছি, যাচ্ছি” বলতে বলতে সে গ্রাম থেকে বাইরে যাবার পথে এগোতে থাকে । কিন্তু 
প্লেগমাতা কবলিত গ্রাম থেকে বেরোতে হলে এই সঙ্করী গলি ছাড়িয়ে আরো অন্ততঃ দুশতিনশ কদম 
হাঁটতে হবে । কোন রকমে সাহস সঞ্চয় করে সে জোইসজীর বাড়ির সামনের সঙ্করীগলি পার 
হয়। তারপরেই হঠাৎ শোনা যায় “ও মাগো" বলে বিকট চিত্কার করে সে ছুটে পালাচ্ছে । 

বাড়ির সামনের দরজা তো ভিতর থেকে বন্ধ। কাজেই জোইসজী আবার বাগানের পাঁচিল 
টপকে পিছন দরজা দিয়ে বাড়িতে ঢুকলেন। এসে আবার শুয়ে পড়লেন বটে, কিন্তু সহজে ঘুম 
এল না। কাল শ্যামন্নার সঙ্গে কিভাবে বোঝা-পড়াটা করতে হবে, সেই চিন্তাই ঘুরতে লাগল মাথার 
মধ্যে। ওদের বাপেদের আমল থেকেই ছুই পরিবারে রেষারেষি চলে আসছে । শ্যামনার বাবা 
নরসিংহায়া বলতেন, পাটোয়ারীর কাজ হল রাজমহলের কাজ, আর পাটোয়ারী হচ্ছে রাজপ্রতিনিধি 
“খন এই রাড়ের ব্যাটাও সেই কথাই বলে বেড়ায়, কিন্তু আমিই বা কম কিসে? ওর কাজ যদি 
রাজমহলের তো আমার কাজও গুরুমহলের । আগেকার দিনে রাজমহলের কর্মচারী গুরুমহলের 
মান্কে ধমক-দাবড় করে ডাঁট দেখাত বটে, কিন্তু একালে আর ও সব চলবে না। ও রা লোকের 
কাছে আদায় করেন আর আশা করেন যে সবাই ও'দের জী হুজ্র বলে খাতির দেখাবে । কিন্তু 
ও-সব অভিনয় আমার সামনে চলবে না। কল্ঠীজোইসের সম্বন্ধে কি জানে ওরা £ “কন্ঠী' 
শব্দের অর্থ রণধীর কন্ঠীরাও, এই সব রাজমহলেরও অধিপতি তিনি। ---এই হারামজাদাদের 
কাল আচ্ছা করে মজা দেখাতে হবে--এই সব ভাবতে ভাবতে ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়লেন 
কন্ঠীজোইসজী । 

ঘম যখন ভাঙল তখন বেলা দশটা বেজে গেছে । শ্যামন্নার কাছে যাবার কথা ভাবতে ভাবতেই 
উঠলেন, পিছনের বাগানে গিয়ে আবার ফিরে এলেন। এসেই দেখেন বাড়ির সামনে এক পুলিশ 
দাঁড়িয়ে । প্রশ্ন করতে সে জানাল, “আপনার ছেলে কল্লেশের প্লেগ হয়েছে । তার বা দিকের 
বগলে উচু হয়ে ফুলে উঠেছে, আপনি এখনি চলুন ।” 

“তাই নাকি 2 কোথায় সে 2 

“বেলগোল্লাতে আছে! এখনও জ্ঞান আছে। হাবিলদার আমাকে পাঠালেন আপনাকে 
নিয়ে যেতে। গ্রামে ডিউটিতে গিয়েছিল ফেরার সময় প্লেগদেবীর ছোয়াচ নিয়ে এসেছে। 
শীগগীর চলুন ।” 

বেশী কথা বলার সময় নেই। পিছনের বাগানে গরু আর বাছুরটা বাঁধা ছিল, গ্রামের বাইরে 
থেকে পরিচিত লোককে ডেকে তাদের তার সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেন নিজেদের খেতের কুঁড়ে 
ঘরে। তারপর ঘরে তালা দিলেন। এবার ঘোড়ার পিচে চড়ে পুলিশের কনস্টেবলটিকেও 
বসিয়ে নিলেন নিজের পিছনে এবং বাতাসের বেগে ছুটে চললেন শ্রবণবেলগোল্লার পথ ধরে। 


8৪8 গৃহভঙ্গ 
৪ 


এবারের গ্লেগের আক্রমণে নাগলাপুরে কারো প্রাণহানি হয়নি। আশে-পাশের সমস্ত মানুষ গ্রাম 
ছেড়ে দূরে চলে গেছে। রামসন্দ্র গ্রামের অধিবাসীরাও গ্রামের বাইরে কুঁড়ে তৈরী করে বসবাস 
করছিল কিন্ত্ত তা সত্ত্বেও সেখানে তিনজন মারা গেছে। অন্যান্য গ্রামেও বেশ কিছু প্রাণহানি 
ঘটেছে। অবশ্য প্লেগ দেবী নাগলাপুর থেকে একটিও বলি গ্রহণ করেননি একথা বলা চলে না। 
সেই রান্রে কন্ঠীজোইসজীর বাড়িতে পাথর ছ-ড়ে বাড়িতে ফিরে এসেই প্রবল স্বরে আক্রান্ত হয় সেই 
জুট্রগ নামের লোকটি। নিজের স্ত্রীকে সে তখন জানায় যে, সে পরিত্যন্ত গ্রামের ভিতরে ঢুকেছিল, 
ফেরার পথে তার মনে হয়েছিল অন্ধকার গলির মধ্যে যেন মোটামত কালো রং এক স্ত্রীলোক তার 
কালো শাড়ীর আঁচল ছড়িয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই দেখেই তার জ্বর এসে গেছে। সেত্বর 
আর ছাড়ল না জ্টগের, দ্বিতীয় দিন দুপুর থেকেই সে অচৈতন্য হয়ে পড়ল, সন্ধ্যার দিকে একটু জ্ঞান 
ফিরে এলে স্ত্রীকে সে বলল, “কন্ঠীজোইসজীকে ডেকে ঝাড় ফুঁক ও পুজোর ব্যবস্থা কর। স্ত্রী 
তার ছোট মামাকে পাঠাল গ্রাম থেকে কন্ঠীজোইসজীকে ডেকে আনার জন্য। কিন্তু দেখা গেল 
তাঁর বাড়ির দরজায় তালা ঝুলছে, এদিক ওদিক খুঁজেও কন্ঠীজোইসজীকে পাওয়া গেল না। পরের 
দিন সকালে আবার খোজ নেওয়া হল কিন্তু তখনও বাড়ি তালাবন্ধ। জুট্রগের আবার একবার 
চেতনা ফিরতেই সে জানতে চায়, “জোইসজী এসেছেন £ তাঁকে পাওয়া যাচ্ছে না শুনেই জুটগের 
চোখের পাতা বূঁজে যায়, তারপর আর জ্তান ফিরে আসেনি তার। দুদিন পরে মৃত্যু হল জুটগের। 
অবশ্য তার শরীরে কোথাও কোন গাঁট ফলে উঠেছিল কি না সেটা কেউ দেখেনি, তবে প্লেগমাতার 
কোপদৃম্টিতে পড়ে যাকে প্রাণ দিতে হল তার শরীরে কোথাও গাঁট যে ফুলবেই এমন কথাও তো 
নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। জুট্রগ অনেক মিনতি করে বলেছিল কন্ঠীজোইসজীকে, তার স্ত্রীকে 
যেন বিধবা হতে না হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে শেষ পর্যন্ত জু্রগের স্ত্রীকে বিধবা হতেই হল। 


নন্জুর যে দিন প্রসব হয় তার পরের দিন দুপুর বেলা ওদের খেতের বাটাইদার হোন্নাকে 
অন্কম্মা বাড়িতে পাঠাল কন্ঠীজোইসজীকে খবরটা দিয়ে আসার জন্য। নন্জুর মেয়ে হয়েছে 
এবং নবজাতক ও প্রসূতি দু'জনেই ভাল আছে-_-এই সংবাদ নিয়ে এসে হোমনা দেখে বাড়িতে তালা 
ঝুলছে। ফিরে গিয়ে সেই কথাই সে জানাল অক্কম্মাকে। 

গিড্ডা, গুলিলগ, সিদৃদুর ইত্যাদি যারা সে রান্দ্রে কন্ঠীজোইসজীর বাড়িতে পাথর ছু ড্রেছিল, তারা 
কেউ ঘুণাক্ষরেও সে সব কথা কারো কাছে উল্লেখ করেনি । সুতরাং অক্কম্মা বা নন্জম্মা 
সে ব্যাপার সম্বন্ধে কিছুই জানতে পারল না। গরু আর বাছুরটা পাঠিয়ে দেওয়াতে অন্কম্মা ধরে 
নিল ছেলে আবার কোথাও ঘুরতে বেরিয়েছে এবং এখনও বাড়ি ফেরেনি। পুরোহিত পুট্রভট্টর 
স্ত্রী এসে অনেক সাহায্য করল অন্কম্মাকে। অক্কশ্মা পুট্টভট্টরকেই অনুরোধ জানাল যে, সে নিজে 
যেন রামসন্দ্র গিয়ে শিশুর নামকরণ অনুষ্ঠানে যোগ দেবার জন্য চেন্নিগরায়কে নিমন্ত্রণ জানিয়ে 
 আসে। রামসন্দ্র গ্রামের লোকও গ্রাম ত্যাগ করে বাইরে চলে গেছে, সেই পরিত্যক্ত গ্রামে যাওয়া 
উচিত কিনা তাই নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। আঁতুড় ঘরে শোয়া নন্জশ্মা দূর থেকেই বলে উঠল, 
“তারাও সবাই নিশ্চয় গ্রাম ছেড়েছে। গ্রামের সামনের দিকে দেবমন্দিরের পিছনে যে বড় ডূমূর 


গৃহভঙজ 8৫ 


গাছটা আছে তারই কাছে আমাদের ফলের বাগান, আপনি সেখানেই গিয়ে খোজ নেবেন” এরপর 
পুটভট পূবদিকের পথ ধরে রওনা হয়ে গেলেন। 

কঁড়ে ঘরেই সবরকম আচার-অনুষ্ঠান পালন করার আয়োজন করা হল। দশম দিনে হবে 
নামকরণ অনুষ্ঠান, সেই অনুষ্ঠানে যোগ দেবার উদ্দেশ্যে পায়ে হেঁটেই রওনা হল চেনিগরায়। গরুর 
গাড়ির ব্যবস্থা করে অপ্পন্নায়া আর সাতুকেও নিয়ে এলে ভালই হত, কিন্তু সাতু এখন গর্ভবতী । 
তার বেশ শরীর খারাপ, এখনও প্রায়ই বমি করছে। তার ওপর সে আজকাল নিজের স্বামী ও 
শাশুড়ীর সঙ্গেও বিশেষ কথাবাত্তা বলে না। অবশ্য মাঝে একদিন সে কথায় কথায় জবাব দিয়ে 
বসেছিল এবং তারপর অনেক গালিগালাজও হয়। ভাসুরের সঙ্গে তো সে কোন দিনই বেশী কথা 
বলেনা । ভাসুরও কখনও সাতুর সঙ্গে কথা বলার চেস্টা করেনি। সুতরাং এ রকম পরিস্থিতিতে 
চেন্নিগরায়কে একাই নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যেতে হল। 

বেলা এগারটা নাগাদ বেলে মাটির নালাটা এবং চোলা টিলা পার হয়ে কটিগেহল্লী পৌছে গেল 
সে। তারপর আরো একটু হেটে পৌ'ছল হুবিনহল্লী। তার নজরে পড়ল একটা দোকানে পাকা 
লাল এলাচী কলার কাঁদি টাঙানো রয়েছে । এক আনায় তিন ছড়া হিসেবে চেম্নিগরায় তিন ছড়া 
কলা কিনে ফেলল। আগামীকাল নামকরণের পুজোর সময় “তাম্ুল থালি'তে কলা দিতে হবে, 
তখন এগুলো কাজে লাগবে । একটা খোলা টিনের মধ্যে ভূরা চিনিও রয়েছে দোকানে, তাও 
সওয়া সের কিনে একটা কাগজের ঠোঙায় ভরে রেখে নিল নিজের পুঁটলির মধ্যে। 

আরো মাইল দুই পথ চলতে চলতে একটা চিন্তা এল ওর মনে-_ প্রসতির তো খুবই যত্র হয়, 
তিন দিনে একবার তেল মালিশ করিয়ে স্নান, খাওয়ার সময় চামচ ভরে ভরে ভাল ঘি ও অন্যান্য 
পুষ্টিকর খাবার তার ওপর সারাক্ষণ আরাম করে শুয়ে থাকা । কিন্তু তাতে আমার কি লাভ ? 
বৌ নাগলাপুর যাওয়ার পর থেকে আমাকে তো কেউ একটা দিনও তেল মালিশ করে গরমজলে 
স্নান করায় নি£ আমার বুঝি গা-হাত-পায়ে ব্যথা হয় নাঃ এ ঠাকুমাবুড়ি অক্কম্মা তো নিশ্চয় 
তাঁর আদুরে নাতনীটিকে নিত্য-নতুন মুখরোচক রান্না করে করে খাওয়াচ্ছেন। মা নেই বলে 
সেবা যত্রটা তো আরো বেশী করেই হচ্ছে। পুট্টভট্টর মুখে তো এ সব খবর ভাল করেই পাওয়া 
গেল, কিন্তু আমার জন্য তো কিছুই পাঠায়নি £ এমন কথাও বলে পাঠায়নি যে, তুমি অবশ্য 
এসো, তোমার জন্য অনেক মিল্টি-মিঠাই বানিয়ে রাখছি! লাগাতে হয় জুতোর বাড়ি! 

এই সব ভাবতে ভাবতে পথ চলছিল চেন্নিগরায়, এমন সময় দেখা গেল এক বিশাল বটরক্ষ 
এবং তার কাছেই একটি পুষ্করিণী। আমাদের পাটোয়ারীমশাই অন্যমনস্কভাবে হাতের পুটলি 
নামিয়ে বসে পড়লেন সেই বটের ছায়ায় । ও হারামজাদাদের বাড়ির জন্য কলা আর চিনি বয়ে 
নিয়ে যাওয়ার কি দরকার £ কথাটা যেই মনে হওয়া, তৎক্ষণাৎ পুটলি খুলে বার করা হল কলার 
ছড়াগুলো, চিনির ঠোঙাটা খুলে রাখল সামনে, তারপর একটি একটি করে কলার খোসা ছাড়িয়ে 
চিনিতে ডুবিয়ে টপাটপ মুখে পুরতে শুরু করে দিল। এক একটা গ্রাস ভাল করে চিবোবারও 
যেন তর সইছে না, অর্ধচর্বিত অবস্থাতেই কলাগুলো কৌৎ কৌৎ করে গিলতে লাগল। ততক্ষণে 
আর একটা কলার খোসা ছাড়িয়ে চিনিতে ডুবিয়ে হাতের মুঠোয় প্রস্ভত করে রাখা হয়ে গেছে। 

দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেল আটন্রিশটা কলা এবং সওয়া সের ভুরা চিনি। এবার পুকুরে 
নেমে জল খেয়ে এল চেনিগরায়। পুঁটলিটাকে বালিশ করে সেইখানেই শুয়ে পড়ল সে এবং ন্ধ্যা 


৪৬ গুহভঙ্গ 


পর্যন্ত নাক ডাকিয়ে তোফা একটি ঘুম দিল। ঘুম ভাঙতে ধড়মড় করে উঠে পা চালিয়ে 
চলল নাগলাপুরের দিকে। ওদের কুঁড়ে ঘরটা কোন দিকে তার হদিশ পুটভট্ট আগেই বুঝিয়ে 
দিয়েছিল, কাজেই খুঁজতে বিশেষ অসুবিধা হল না। অক্কশ্মা তো জামাইয়ের জন্য পথ চেয়ে 
বসেই ছিল। দুপুর বেলা যা রেধে রেখেছিল, সে সব ঠাণ্ডা হয়ে গেছে; তাই আবার নতুন করে 
খাওয়ার যোগাড় করতে সে ভিতরে চলে গেল। এই অস্থায়ী আস্তানাতেও নন্জম্মার আতুড়ের 
জন্য একপাশে আলাদা একটা ঘর করা হয়েছে, সেইখানে একটা খাটের ওপর নবজাত শিশুকে 
নিয়ে শুয়েছিল সে। চেন্নিগরায় সেই ঘরের দরজার কাছে যেতে সে বলে উঠল, “দুপুর বেলা 
তোমার জন্য রাঁধা খাবার সব ঠাণ্ডা হয়ে গেল। তুমি সোজা এখানে না এসে এ গাছের তলায় 
শুয়ে ঘুমোচ্ছিলে কেন £ 

খুব আশ্চয হয়ে গেল চেন্নিগরায়, তোমরা সে কথা জানলে কি করে £ 

"ুবিনহল্লীর দোকানদার চিন্নৈয়া আমাদের পুরোহিত, সেই তো এসে বলল, তার দোকান 
থেকে তুমি তিন ছড়া লাল কলা আর সওয়াসের ভূরা কিনেছ। সে এ গ্রামে এসেছিল কিছু জিনিস- 
পন্র কিনতে, আসার পথে সে দেখেছে তুমি বটতলায় শুয়ে দুমোচ্ছ আর পাশে একরাশ কলার 
খোসা পড়ে আছে।, 

এই কথা বলেছে এসে £ ব্যাটার মায়ের **" গালাগালটা সম্পূর্ণ উচ্চারিত হবার আগেই 
নন্জ বলে ওতে, “মুখ-খারাপ করছ কেন? পথে খিদে পেয়েছিল তাই কলা কিনে খেয়েছ, অমন 
তো সবাই করেই থাকে, তাতে আর কি হয়েছে? তবে তাড়াতাড়ি যদি চলে আসতে তো খিদের 
মুখে বাড়িতে বসে ভাল করে খেতে পারতে ! এ কথার কোন জবাব যোগাল না, কোন গালাগালও 
আর দিতে পারল না চেনিগরায় 

পুট্টভট এবং তার স্ত্রীর সাহায্যে গ্রামের আরো কিছু প্রতিবেশীকে আমন্ত্রিত করে নবজাতকের 
নামকরণ অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন করাল অক্কশ্মা। পাটোয়ারী শ্যামন্নার পরিবারও এসেছিল। বাড়ির 
প্রথম কন্যাসন্তানের নাম ঠাক্মা গঙ্গশ্মার নাম অনুসারেই হওয়া উচিত। কিন্তু এক্ষেত্রে তিনি 
জীবিত আছেন, সুতরাং নাম ধরে ডাকার সমস্যা দেখা দেবে--সেই কথা চিন্তা করে অবশেষে 
জন্ম-নক্ষত্র অনুসারে মেয়ের নাম রাখা হল পার্বতী । চেনিগরায় শ্বশুর বাড়িতে থেকে গেল আট 
দিন। অক্কম্মা রোজ তাকে ভাল ভাল রান্না করে খাওয়ালো, আদর যত্বেরও কোন ভ্রটি হল না। 
প্রসূতির পুষ্টির জন্য আনা হয়েছিল শুকনো নারকেল আর গুড়, বেশ পরিতৃস্তি সহকারে তাতেও 
ভাগ বসাল চেন্িগরায়। প্রসূতি নন্জশ্মাও পান সেজে দিত ওর জন্য। নাতজামাইকে আরো 
ভাল ভাল সুখাদ্য প্রস্তত করে খাওয়াবার খুবই ইচ্ছা ছিল ঠাক্মার, কিন্তু বার্ধক্যের ফলে আজকাল 
সাধ থাকলেও শক্তিতে কূলোয় না বেচারীর। তার ওপর ছেলে কন্ঠীজোইস যে কোথায় গিয়ে 
বসে আছে কে জানে, ভাল সুখাদ্য বাঁধতে হলে ভাল করে বাজারও করতে হয়, এদিকে রদ্ধার হাতে 
পয়সা-কড়িও কৃমশঃ ফুরিয়ে আসছিল। 

নন্জু একদিন স্বামীকে মনে করিয়ে দেয়, “গ্রামে পাটোয়ারীর নিশ্চয় অনেক কাজ পড়ে রয়েছে, 
এলাকাদারকে না জানিয়ে এখানে এতদিন থেকে গেলে কোন গোলমাল হবে না তোঠ 

স্বামী উত্তর দিল, “তাহলে এলাকাদারকে একখানা চিঠি লিখে দিই না হয় £, 

“আদায় উসুলের সময় এসে গেছে। এ সময় তুমি গ্রামে না থাকলে দাবরসায়াজী একলা 


গৃহভঙগ ৪৭ 


কি করে বসবেন কে জানে। তাছাড়া আদায়-উস্গুলের কাজটা তো তোমারই করা উচিত£ আজ 
বোধহয় পনের-যোল তারিখ হয়ে গেল। বর্াও এসে গেছে, গ্রামে জমিগুলোর অবস্থাও তো দেখা 
দরকার! 

সৃতরাং গ্রামে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই। অগত্যা চেন্নিগরায় পাটোয়ারী 
মহোদয় পরদিন সকালে জলখাবার খেয়ে ঠাকুমা অক্কশ্মার দেওয়া জিনিসপন্র পুঁটুলিতে বেধে বাড়ির 
পথে রওনা হয়ে গেল। সে চলে যাবার পর অন্কম্মা নাতনীকে প্রশ্ন করে, হ্যারে ননজ্‌, এই কদিনে 
তোর বর কিন্তু একটিবারও বাচ্চাটাকে কোলে নেয়নি, মেয়ে হয়েছে বলে ওর রাগ হয়নি তো £ 

কোন উত্তর দেয়না নন্জ, তার চোখে তখন জল এসে গেছে। তার ইচ্ছা হচ্ছিল সে বলে, 
ছেলে হলেও সে কোলে নিত না।” কিন্তু ও কথা বলা চলবে না, কাজেই এমন ভাব দেখাতে হল 
যেন সে ঠাকমার প্রশ্নটা শুনতেই পায়নি। নিঃশব্দে সে চোখের জল আঁচলে মুছে ফেলল। 


€ 


কন্ঠীজোইসজী যখন গিয়ে পৌছলেন ততক্ষণে কল্লেশের বগলের ফলো খুব বেড়ে উঠেছে, যন্ত্রণাও 
হচ্ছে দারুণ। সরকারী হাসপাতালের ডাক্তার তাকে দেখে ওষুধ দিলেন বটে কিন্ত সেই সঙ্গে 
বড় ডাক্তারকে দিয়ে চিকিৎসা করাবার পরামশশও দিলেন। কিন্তু এ অবস্থায় রোগীকে নড়ানো 
মুশকিল। ডাক্তার অবশ্য বললেন তাঁর যতদর সাধ্য তিনি চেস্টা করবেন। কিন্তু কন্ঠীজোইসজী 
হাবিলদারকে অনুরোধ করলেন কোন রকমে একখানা গাড়ির ব্যবস্থা করতে। 

হাবিলদার চেন্নপষ্টন গিয়ে একখানা গাড়ি যোগাড় করে আনার পর কল্লেশকে তাইতে শুইয়ে 
হাসান শহরে নিয়ে যাওয়া হল। পথেই তার প্রাণটা বেরিয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কা ছিল, কিন্তু 
সৌভাগ্যকূমে তা ঘটল না। তাকে নিয়ে গিয়ে ভূতি করা হল বড় হাসপাতালে । কল্লেশের 
শ্বশুর রঙ্গন্নাজী এই হাসানে পোষ্টম্যানের কাজ করছেন আজ পচিশ বছর। হাসপাতালের ডাক্তার 
তাঁর বিশেষ পরিচিত। ডাক্তার খুব যত্র করেই চিকিৎসা করলেন। বগলের ফুলে ওঠা জায়গাটার 
পৃজ-রক্ত ও বিঘিয়ে ওঠা অংশটা অস্ত্রোপচার করে বার করে ফেলে ওষুধপন্র দিয়ে ব্যাণ্ডেজ করে 
দিলেন। জীবনের আশঙ্কা কেটে গেল। কিন্তু কল্লেশ খুবই দুর্বল হয়ে পড়ল, ডাক্তার তাকে 
বললেন আরো অন্তত পনের দিন হাসপাতালে থাকতে হবে। এই সময়টা কন্ঠীজোইসজীও থেকে 
গেলেন কল্লেশের শ্বশুর বাড়িতে, সেখানে থেকে কল্লেশের দেখাশোনা করতে লাগলেন। 

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবার দিন দেখা গেল কল্লেশ বাঁ হাতখানা ভালভাবে নাড়াতে 
পারছে না, কারণ সেইদিকের বগলে আবার একটা ফোড়া উঠেছে। ডাক্তার বললেন, “একে 
এখন এখানেই রাখুন, আমি চিকিৎসা করব।” সুতরাং রঙ্গন্নাজী জামাইকে নিজের বাড়িতে 
নিয়ে গিয়ে রাখলেন এবং আরো দিন আম্টেক পরে ঘোড়ায় চড়ে কন্ঠীজোইসজী রওনা হলেন 
নিজের গ্রামের উদ্দেশ্যে। গত পচিশ দিনে সত্যিই দি কম্ট কারো হয়ে থাকে তো সেটা হয়েছে 
এ বেচারা ঘোড়াটার। কন্ঠীজোইসজী তো কটুম্বের বাড়িতে ছিলেন, হাসানের পোষ্টম্যান 
রঙ্গমাজীর বাড়িতে ঘি দুধের খুব একটা প্রাচুর্য না থাকলেও তাঁর খাওয়া-দাওয়া কিছু খারাপ হচ্ছিল 
না। কিন্ত তাঁর আদরের সাদা ঘোড়ার উপযুক্ত দানাপানি ঘাস ইত্যাদির বাবস্থা কে আর করবে £ 


৪৮ গৃহভজ 


এতদিনে গ্রামে প্লেগের প্রকোপ প্রায় শেষ হয়ে গেছে । আশে-পাশে দু'্চার পশলা রচ্িও 
পড়েছে। নাগলাপুরের অধিবাসীরা কুঁড়ে ঘর ছেড়ে ফিরে এসেছে নিজেদের গ্রামের বাড়িতে । 
অক্রম্মা এবং নন্জম্মা কদিনের মধ্যেই খবর পেয়ে গেল, কল্লেশের প্লেগ হওয়ায় কন্ঠীজোইসজী 
তাকে হাসানে নিয়ে গেছেন এবং সেখানে গিয়ে সে সেরে উঠেছে । এখন অক্কম্মা ভেবে দেখল 
কন্ঠীজোইসজীর জন্য অপেক্ষা করে কোন লাভ নেই, হোন্না এবং পুট্টভট্ের সাহায্যেই জিনিষপন্ধ 
সমেত পো-পোয়াতিকে বাড়ি নিয়ে যেতে হবে। প্রথমে সে নিজে বাড়িতে গিয়ে ছুতোর ডেকে 
তালা ভাঙাল। ভিতরে ঢুকে দেখে, ঘরের মধ্যে বুম্টির জল পড়ে মাটির মেঝে কাদায় প্যাচপ্যাচে 
হয়ে রয়েছে। ছাদের কড়ি-বরগা সমস্ত ভিজে । কেউ বলে না দিলেও অক্কম্মা পরিস্কার বুঝল 
কেউ বজ্জাতি করে পাথর ছণড়ে ছাদ ভেঙেছে । কিন্তু এ সব নিয়ে খোঁজ-খবর করার এখন সময় 
নেই। মই লাগিয়ে ছাদে উঠে হোন্না কোন মতে খাপরাগুলো আবার ঠিকঠাক করে সাজিয়ে ছাদ 
মেরামত করল। সমস্ত দরজা জানলা খুলে দেওয়া হল-__যাতে হাওয়া লেগে মেকেটা শুকিয়ে 
ওঠে, কিন্তু তাতে বিশেষ কাজ হল না, আবার নতুন করে মাটি ও বালি ফেলে মেঝে ডিক করাতে 
হল। যাহোক, অনাদের থেকে চারদিন দেরী হয়ে গেলেও অন্ধশ্মা শেষ পর্যন্ত ভালভাবেই প্রসূতি 
ও শিশুকে বাড়িতে নিয়ে এল। নন্জুর প্রসবের পর একমাস কেটে গেছে। সে আজকাল একটু 
আধটু কাজ কর্ম করতে চায়, অক্কম্মা ওকে কিচ্ছটি করতে দেবে না। ঘরদোর ঝাঁট দেওয়া 
থেকে শুরু করে গরু দোয়া পর্যন্ত সমস্ত কাজ অব্রশ্মা করে একলা হাতে । 

এরা বাড়িতে ফিরে আসার চতুর্থ দিনে দুপুর তিনটের সময় ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে 
কন্ঠীজোইসজী বাড়ি এসে পৌ'ছলেন। প্রথমেই অক্তশ্মা ও নন্জুকে জানালেন কল্লেশ ভাল আছে। 
এরপর ওর নজর পড়ল ঘরের মেঝের দিকে । প্রশ্ন করলেন, এ আবার কি£ নতুন করে 
মেঝে তৈরী হয়েছে দেখছি, কি দরকার পড়েছিল £, 

“ওরে দেখ, কেউ নিশ্চয় ছাদে পাথর ছ-ডেছিল, আর নয়ত চিল শকুনে টানাটানি করে খাপরা- 
গুলো ওলট পালট করেছে, তাইতে রুম্টির জল ঘরের মধ্যে পড়ে সারা ঘরের মেঝে একেবারে 
ধানের খেত হয়ে গিয়েছিল, পা রাখার উপায় ছিল না। হোন্নাকে দিয়ে মেঝে মেরামত করিয়ে, 
তবে তো জিনিসপন্ত্র নিয়ে এখানে আসতে পারলাম । 

“ব্যাটার মা চাঁড়ালের --" মজা দেখাচ্ছি ব্যাটাকে" বলতে বলতে বেরিয়ে গেলেন কল্ঠী- 
জোইসজী। কি ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারল না অক্কশ্মা আর নন্জম্মা। 

প্রতিদিন মধ্যাহভোজনের পর গ্রামের কিছু প্রবীণ ব্যক্তি পাটোয়ারী শ্যামন্নার বাড়ির বড় 
বারান্দায় বসে সন্ধ্যা পর্যন্ত দাবা খেলেন । বহুদিন থেকে এই রীতি চলে আসছে । কন্ঠীজোইসজী 
জানতেন শ্যামন্নাকেও এঁ সময় ওখানেই পাওয়া যাবে । সোজা গিয়ে তিনি বারান্দায় উঠে হুঙ্কার 
দিলেন, “হারামজাদা ব্যাটা, রাতের বেলা অন্ধকারে লোক লাগিয়ে আমার বাড়িতে পাথর ফেলিয়ে- 
ছিস? যদি পুরুষ মানুষ হতিস তবে না দিনের বেলা সারা গাঁয়ের সামনে দিয়ে বুক ফুলিয়ে 
আসার সাহস থাকত £ কি ভেবেছিস তুই আমাকে £ আমি পুরুষ মানুষ, তোর মা খানকি 
তোর বোনকে "** 

এই অপ্রত্যাশিত আবির্ভাব এবং গজন শুনে দাবার আসরের লোকেরা অবাক হয়ে চেয়ে রইল । 
শ্যামন্নাও বেশ ঘাবড়ে গেছে । কন্ঠীজোইসজী সোজা ঢুকে গেলেন ওর বাড়ির মধ্যে। দরজার 


গুহভঙ্গ ৪৯ 


ঙ্ 


ওপাশে ছিল উদৃখল এবং তার কাছেই দেওয়ালে ঠেকিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা ছিল উদুখলের মুষলটা । 
বিনা বাক্যব্যয়ে তিনি ডান হাতে মুষল এবং অন্য হাতে আর একদিক থেকে বাঁশের মইটা উঠিয়ে 
নিয়ে বাইরে এলেন। মই লাগিয়ে সোজা উঠে গেলেন ছাদে আর তারপর মুষলের বাড়ি মেরে 
মেরে খাপরাগুলোকে চুর্ণ-বিচূর্ণ করতে আরম্ভ করলেন। চার-পাঁচ ঘা মুষল পড়তেই দাবা 
খেলুড়েদের মাথার ওপরে বারান্দার ছাদের সব খাপরা ভেঙে শেষ হল-_তারপর তিনি অগ্রসর 
হলেন আরো ওপরের দিকে । 

বারান্দার ওপরকার খাপরায় আকমণ শুরু হতেই খেলুড়েরা নেমে এসেছে বাইরে । সাক্ষাৎ 
ভীমসেনের ভঙ্গীতে কন্ঠীজোইস এদের দিকে একবার চেয়ে দেখলেন এবং তারপর আবার গর্জন 
শোনা গেল, “এই কাপুরুষের দল, শুনে রাখ, তোদের সবকটার বৌয়ের মাথা মুড়িয়ে গলার মঙ্গল- 
সূত্র খুলিয়ে তবে ছাড়ব।, বলতে বলতেই খান দুই খাপরা তুলে তাদের দিকে ছু ডুলেন এবং 
সেগুলো গিয়ে দুজনকে আঘাত করল । একজনের মাথা ও অন্যজনের কাঁধ থেকে রক্ত ঝরছে 
দেখা গেল। সমবেত লোকেরা এদিক ওদিক ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল। শ্যামন্নাও ভীতুলোক নয়, 
সে একবার ভাবল ছাদে উঠে কন্ঠীজোইসকে একটু শিক্ষা দিয়ে দেবে, কিন্তু তাতে যথেম্ট বিপদের 
আশঙ্কা আছে এটা বুঝে অন্য উপায় চিন্তা করতে লাগল। 

কে জানে কতদিনের পরিশ্রমে কমোর এ দশ হাজার খাপরা গড়েছিল, কিন্তু কন্ঠীজোইসজীর 
হাতের মুষল মান্র আধঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে সারা বাড়িখানার ছাদের সমস্ত খাপরা চূর্ণ-বিচূর্ণ 
করে ফেলল । এবার ধীরে ধীরে নিচে নেমে মৃষল ও মই যথাস্থানে রেখে তিনি বেরিয়ে এলেন। 
সামনের ঘরের বারান্দায় ছেলেমেয়ে নিয়ে আতঙ্কিত মুখে দাঁড়িয়েছিল শ্যামনার স্ত্রী, তার কাছে 
গিয়ে বললেন, “দেখ বোন, তুমি হলে তুবিনকেরের তম্ময়াজোইসজীর মেয়ে, তাই তোমাকে এ 
কথা বলছি। তম্ময়াজোইসজী আমার গুরুর মতন। জনশূন্য গ্রামে আমি একা আছি ভেবে 
তোমার স্বামী চাকর-বাকর পাঠিয়ে মাঝরাত্রে আমার বাড়িতে পাথর ফেলিয়েছে। কিন্তু দেখছ 
তো আমি যা করার দিনের আলোতেই করলাম । কন্ঠী হচ্ছে পুরুষ মানুষ তোমার স্বামীকে 
বলে দিও আর কখনও যেন অমন কাপুরুষের মত কাজ না করে। এমন কিছু করুক যাতে 
লোকে বলে, “হ্যা পুরুষ বটে ! এঁ হারামজাদা আঁটক্ড়ের ব্যাটা তোমার স্বামীটার সঙ্গে আমি 
কথা বলতে চাই না।” কথাগুলো বলেই তিনি চলে গেলেন নিজের বাড়ির দিকে । হতবাক 
শ্যামন্নার বৌয়ের মুখে একটি কথাও ফুটল না। 

বাড়িতে ফিরেই কন্ঠীজোইসজী সোজা চলে গেলেন রান্নাঘরে । অন্কশ্মা তখন উনুনে চড়ানো 
ভাতের হাঁড়িতে বাসমতী চাল ছাড়ছে। প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে আনা শাক রান্না করে রাখা 
রয়েছে একপাশে । পেছনের দরজা দিয়ে কুয়োতলায় গিয়ে দু'ঘড়া জল তুলে আরাম করে স্নান 
করলেন কন্ঠীজোইসজী। তারপর বিশুদ্ধ উচ্চারণে সন্ধ্যা-বন্দনার মন্ত্রপাঠ করতে করতে গা- 
মাথা মুছে একটি গামছা পরলেন। ঠাকুরের বেদীর কাছে রক্ষিত চন্দন পাটায় বেশ খানিকটা 
চন্দন ঘষে কপালে ও মাথায় লেপন করে, হাত ধুয়ে এবার খেতে বসে গেলেন তিনি। এক সের 
চালের গরম গরম ভাত রান্না হয়েছে, তার সঙ্গে আছে ঘরে তৈরী গাওয়া ঘি। প্রসূতির জন্য 
সেই ঘি প্রস্তত করা হয়েছিল, তার অনেকটা এখনও অবশিম্ট আছে। সুপারি গাছের বাকলের 
পাত্রে ভাত পরিবেশিত হলে মিনিট তিনেকের মধ্যেই শাক দিয়ে মেখে সে ভাত উদরস্থ করে ফেললেন 


৪ 


৫০ গুহভঙ্গ 


শ্ 


কন্ডীজোইস। তারপর দ্বিতীয়বার দেওয়া ভাত আচার আর তেল দিয়ে মাখতে মাখতে অক্কশ্মাকে 
জিজ্ঞাসা করলেন, “নতুন মায়ের জন্য গরুর দুধ কম পড়ছে না তো £ 

“অনেক বেশীই হচ্ছে । হাঁড়ি ভরা ঘি তৈরী রয়েছে । 

“৩ যখন শ্বশুরবাড়ি ফিরে যাবে ততদিনে অন্তত চার হাঁড়ি ঘি তৈরী করে সঙ্গে দিয়ে দিতে হবে 
যাতে ওখানে গিয়েও কিছুদিন ধরে ভাল করে খেতে পারে । কি রকম রেড়ির তেল পিষিয়েছিলে, 
ছোট না বড় £, 

“এত তাড়াতাড়ি পোয়াতিকে রেড়ির তেল মাখিয়ে কেউ ত্রান করায় নাকি £ তাণশ্ডা লেগে 
যাবে নাঠ, 

“ও, আচ্ছা, তা নামকরণ হয়ে গেছে নাকিঠ, 

হ্যা। চেনিগরায় এসেছিল । নাম রাখা হয়েছে পার্বতী ।” 

পাতের দই-ভাতটুক শেষ করে বড়সড় একটি টেঁকুর তুলে এবার উঠলেন কন্ঠীজোইসজী | 
প্রসৃতি যে-ঘরে শুয়েছিল সেই ঘরে গিয়ে এবার বললেন, “কই রে নন্জা, তোর খুকী কোথায় £ 
দে দেখি আমার কোলে, ভাল করে দেখি একটু ।” 

শিশুকে কোলে নিয়ে গুছিয়ে বসলেন দরজার চৌকাঙের ওপর । শিশু বেশ গৌরবর্ণা হাষ্ট- 
পু্ট। এএ তো ঠিক তোরই মত দেখতে হয়েছে রে 2 ঠিক তোর মত বড় কপাল । কি নক্ষত্রে 
জন্ম তা বলেছে ঠ, 

*পু্টভট্টজী কিছু বলেছেন বোধ হয়। কিন্তু জন্মপন্রিকা আপনাকেই তৈরী করতে বলেছেন, 
উন্ন বললেন, আপনি ওর চেয়ে অনেক ভাল জানেন ।” 

“ডিক আছে, কাল আমাকে মনে করিয়ে দিস। জন্ম-সময়টা ঠিকমত লেখা আছে তো? 
এখন আমাকে একট পান দে দেখি । সকাল থেকে তামাক খাওয়াও হয়নি ।, এবার শিশুকে 
কোলে নিয়েই রানাঘরে গিয়ে উপস্থিত হলেন কন্ঠীজোইস, অক্কশ্মাকে বললেন গোলমরিচ মশলা 
ইত্যাদির জন্য টাকার ব্যবস্থা করলে কোথা থেকে £ এই সব ব্যবস্থার কথা তো আমার মনেই 
ছিল না। দীঁড়াও দেখি”__-বলতে বলতে কোটের পকেট থেকে তিরিশট্া টাকা বের করে অব্রম্মার 
হাতে দিয়ে বললেন, “কারো কাছ থেকে ধার করে থাক তো ফিরিয়ে দিয়ে এস। এখন আমি 
ক"দিন গ্রামেই থাকব। পনের বিশ দিন পরে হাসানে গিয়ে যদি দেখি কল্লেশ পুরোপুরি সেরে 
উঠেছে তাহলে তাকে এখানে নিয়ে আসব ।” 

মেয়ের হাতের পানট্টা নিয়ে মুখে পুরে শিশুকে তার কোলে ফিরিয়ে দিলেন, তারপর 
কন্ঠীজোইসজী বাঁ-হাতের চেটোতে কিছু তামাকপাতা নিয়ে ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে সেটা 
বেশ করে চটকে চালান করলেন মুখের ভিতরে । বাইরের নর্দমার কাছে গিয়ে কয়েকবার পিক 
ফেলে এসে তারপর খাটিয়্া পেতে শুয়ে পড়লেন একটু বিশ্রামের জন্য। বিকেলের দিকে উচ্চে 
খেতখামারের দিকটা একবার দুরে এলেন, তারপর রানে বেশ পরিপাটি করে গরম গরম ভাত 
রুটি তরকারী খেয়ে আরাম করে নিদ্রা দিলেন । 


৬ 


মধ্য রাতে মনে হল কে যেন দরজায় ধাক্কা মারছে । কন্ঠীজোইস উঠে দরজার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা 
করলেন, “কে £ উত্তরে যা জবাব শুনলেন তাতে বেশ অবাক হতে হল---তোমার শ্বশুর বাড়ির 
লোক, চট্পট্‌ দরজা খোল ।” 

তেলে-বেগুনে ভ্বলে উঠলেন কন্চীজোইস, ছিউকিনি খুলতে খুলতে গজে উঠলেন, “জানোয়ার 
কোথাকার ! কে তুই, তোর মাথার ঠিক আছে তো দরজা খুলতেই চারজন পুলিশ হড়মুড় 
করে ভেতরে ঢুকে দু-পাশ থেকে বজ্র-মুষ্টিতে ওর দুই বাহু চেপে ধরল। এত জোরে ধরেছে 
যে ঝটকা মেরেও ছাড়াতে পারলেন নানিজেকে। হাবিলদার হুইস্ল বাজাতে ইতিমধ্যে পেছনের 
পাঁচিল টপকে আরো দুটো পুলিশ লাফিয়ে পড়ল উঠোনে । 

ব্যাপারখানা কি£ আমাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে কেন£ হাবিলদার জবাব দিল, “যা 
কিছু জিজ্তাসা করতে হয় থানায় গিয়ে করবেন, চলুন এখন” ইতিমধ্যে নন্জম্মমা ও অক্কম্মা 
জেগে উঠেছে, বাইরে এসে ব্যাপার দেখে তারা কানা শুরু করে দিল। কল্ঠীজোইসজী ওদের 
বুঝিয়ে বললেন, “অক্তম্মা কেঁদোনা, মনে হচ্ছে এ সব এ ব্যাটা শ্যামন্নার কারসাজি । যা হোক, 
চেন্নরায়পটন থেকে একবার ঘুরে আসি। তোমরা সদর দরজাটা বন্ধ করে দাও। আমি 
যতক্ষণ থাকব না তার মধ্যে বাড়ির কাছাকাছি একটা কৃকুরও যদি আসে তো ঝাঁটা মেরে 
তাড়াবে। এরপর ওকে রওনা দিতে হল পুলিশদের সঙ্গে। গ্রামের বাইরে গাড়ি দাঁড়িয়েছিল, 
পুলিশ কন্ঠীজোইসজীকে নিয়ে চলল চেন্নরায়পট্টনের পথে । শ্যামন্না অবশ্য গ্রামেই রয়ে গেল। 

সন্ধ্যার মুখে নিজেদের খেতের দিকে গিয়েছিল অক্রশ্মা। ছেলে কিভাবে শ্যামন্নার বাড়ির 
ছাদের সমস্ত খাপরা চূর্ণ-বিচুরণ করে এসেছে তার বিবরণ সেখানেই শুনল সে, কারণটাও জানতে 
বাকি রইল না। শ্যামন্নাই যে পুলিশে খবর দিয়ে তার ছেলেকে গ্রেপ্তার করিয়েছে এটা বুঝতে 
পেরে বেজায় রাগ হল অন্কম্মার। রান্রে একলা গিয়ে হাজির হল শ্যামন্নার বাড়ির সামনে, তারপর 
পথের ধলো মাটি মুঠো মুঠো তুলে তার বাড়ির দিকে ছু'ড়তে-ছুঁড়তে প্রচণ্ড গালিগালাজের 
ফোয়ারা ছুটিয়ে দিল-__হায় হায়, ছিঃ, ছিঃ তোর মত ছেলের যারা জম্ম দিয়েছে তাদের মুখে 
হেগে দিতে হয়। মাঝরাতে চুপি চুপি আমার বাড়িতে পাথর ফেলতে লোক পাতিয়েছিস হতভাগা 
ভীতু, হারামজাদা কোথাকার ! রাঁড়ের ব্যাটা, তুই কি একটা পুরুষ £ আমার ছেলেকে আমি 
মানুষ করেছি পুরুষ ছেলের মত, বুঝলি £ তাই সে পম্ট দিন-দুপুরে এসে তোর বাড়ি ভেঙেছে । 
ভয় পেয়েছিস বলেই তো তোকে পুলিশ ডাকতে হল? তুই কি শাড়ি পরে থাকিস না-কি £ 
সবংশে নাশ হোক, সগুন্ঠি নিপাত যা তুই। তোর বৌ বিধবা হোক । বেটা রাঁড়ের পৃত, দেখে 
নিস, তোর বৌকেও একদিন আমারই মত মাথা মুড়িয়ে লাল শাড়ী পরতে হবে। বিধবার মুখের 
শাপমান্যি সোজা কথা নয়, এটা মনে রাখিস ---1£ 

ইতিমধ্যে বেশ কিছু লোক জমে গেছে সেখানে । কলহের কারণটা সবাই জানে, কিন্তু কেউ 
এখন মুখ খুলল না। শ্যামন্নার বাড়ির দরজা বন্ধই রইল। এতক্ষণে অক্রম্মার খেয়াল হল, 
বাড়িতে নন্জ্‌, বাচ্চাকে নিয়ে একলা রয়েছে, তাই সে আরো বহুবিধ গালাগাল দিতে দিতে নিজের 
বাড়ির পথে ফিরে চলল। 


৫ গৃহভঙ 


এদিকে চেনরায়পট্টনের পুলিশখানায় পৌছে হাবিলদার মহোদয় জানালেন, “আজ রাতটা 
এখানেই থাকুন, কাল সকালে সাব-ইন্স্পেক্টার সাহেব এলে আপনার বক্তব্য শোনা হবে কিন্ত 
কন্ঠীজোইসজী চুপচাপ এ কথা মেনে নেবার পান্রই নন, তিনি হুঙ্কার দিয়ে উ5লেন, “এক্ষুণি ডেকে 
পাঠাও তাকে । যাজিক্তেস করতে হয়, এখুনই করতে হবে। আমি কিছু চুরি করিনি যে, আমাকে 
এনে থানায় আটকে রাখা হবে! মারধোর করে তাঁর মুখ বন্ধ করাবার সাহস পুলিশদেরও নেই, 
কারণ তাঁর সম্বন্ধে তারাও সব কিছুই খবর রাখে । দেখতে দেখতে সাব-ইনস্পেকটার এসে হাজির 
হল। শ্যামন্না গ্রামের পাটোয়ারী, অর্থাৎ কিনা সরকারী কর্মচারী । সে নালিশ করেছিল যে, 
তার বাড়ির খাপরা ভাঙা হয়েছে এবং বাড়ির ভিতরে ঢুকে পাটোয়ারী কাজের হিসাবপন্ত্রের খাতা 
লুঠ করা হয়েছে । শুধু খাপরা ভাঙার নালিশ শুনে পুলিশ এত চটপট তৎপর হত কিনা সন্দেহ, 
কিন্তু সরকারী খাতাপন্র গায়েব করা অতি গুরুতর অভিযোগ, কাজেই এ অভিযোগের তদন্ত করতে 
পুলিশ দেরী করবে না। শ্যামন্না এই নালিশের প্রতিলিপি তালুকের অমলদারের কাছেও পাঠিয়ে 
দিয়েছিল । 


জোইসজী পরিস্কার বলে দিলেন, “আমি কিছুই জানি না। ওর বাড়িতে আমি যাই-ই নি। 
এ সব মিথ্যা কথা ।” পরের দিন স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট ও অমলদারের সামনেও এই একই কথা 
জানালেন তিনি। পুলিশ মামলার বিবরণ লিখে নিয়ে স্থানীয় নগরপালিকা সমিতির সদস্য 
হনুমন্ত শেট্রির জামিনে কন্ঠীজোইসজীকে মুক্তি দিয়ে দিল। ফিরে এসে গৌঁফে তা দিতে দিতে 
সারা গ্রামখানা একবার ঘুরে এলেন কন্ঠীজোইস। 


শ্যামন্নাকে ধরে এনে একদিন আশ মিটিয়ে প্রহার করার ইচ্ছেটা খুবই হচ্ছিল, কিন্তু এখন 
মাথার ওপর মামলা ঝুলছে কাজেই মারপিট করা যুক্তিযুক্ত নয় এটা বুঝে কন্ঠীজোইস চুপচাপ 
রইলেন। কিছুদিনের মধ্যে সমন এসে হাজির হল হোলেনরসীপুরের আদালত থেকে। 
কন্ঠীজোইসজী মামলা লড়বার জন্য নিযুক্ত করলেন প্রসিদ্ধ উকিল ভেক্কটরায়কে। এরপর 
সওয়ার হয়ে । 


সাক্ষীদের সাক্ষ্য দেবার দিন সকালেই উকিলের সঙ্গে দেখা করার কথা, তাই রান্রেই কল্ঠীজোইস 
ঘোড়ার পিঠে চড়ে গ্রাম থেকে বেরিয়ে পড়েছেন। চেন্নরায়পট্টন অতিক্রম করার পর দেখা গেল 
নদীতে জল বাড়ছে । এ সময় নদীতে জল বাড়াটা বেশ অপ্রত্যাশিত ব্যাপার, কিন্তু ওকে তো 
যেমন করে হোক নরসীপুর পৌছতেই হবে। তখন মধ্যরান্ত্রি পার হয়ে গেছে। চাঁদের আলোয় 
বেশ বোঝা যাচ্ছে তীব্র ভ্রোত গর্জন করতে করতে ক্রমশই নদীর দুই তট প্লাবিত করে ফেলছে, 
এ অবস্থায় ঘোড়ার পিঠে চড়ে নদী পার হওয়ার চেস্টা খুব বিপজ্জনক । নদীর ধারেই ডাকবাংলো, 
সেখানে গিয়ে চৌকিদারকে ডেকে তুললেন কন্ঠীজোইসজী। সে খবর দিল, দু-দিন থেকে খেয়া 
পারাপার বন্ধ রয়েছে। নদীর এখন বেশ বেসামাল অবস্থা । কিন্তু হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নন 
কন্ঠীজোইস, তিনি চৌকিদারকে একটা টাকা দিয়ে ঘোড়াটাকে দেখাশোনা করতে বলে দিলেন। 
নিজের কাছে যে রূপোর টাকাগুলো ছিল সেগুলো থলিতে ভরে বেশ মজবুত করে বেঁধে নিলেন 
কোমরে । কোট, প্যান্ট, সাট' সব খুলে রুমাল দিয়ে বেধে ফেললেন মাথার ওপর। তারপর 


গৃহভঙ্গ ৫৩ 


চৌকিদারের নিষেধের প্রতি কর্ণপাতও না করে গ্রামের বাইরে কিছুটা উজানের দিকে গিয়ে 
সাঁতার দিতে শুরু করলেন। 

কোণাকুণি ভাবে সাঁতার দিয়ে প্রায় আধ মাইল ভাটির দিকে নেমে এসে শেষ পর্যন্ত ওপারে 
পৌ'ছে গেলেন তিনি। কৌপীন ভিজে গিয়েছিল, মাথার ওপর বেঁধে রাখা জামা-কাপড়ও কিছুটা 
ভিজেছে। আধ মাইল পথ চলতে চলতেই দেহ এবং জামা-কাপড় শুকিয়ে গেল, এবার কোট- 
প্যান্ট ইত্যাদি পরে নিয়ে খালি পায়েই এগিয়ে চললেন জোর কদমে। আরও আট মাইল পথ 
বাকি এখনও । ভোরের মোরগের ডাকের সঙ্গে সঙ্গেই কন্ঠীজোইস পৌছে গেলেন নরসীপূরে। 
নদীর তীরেই প্রাতঃকৃত্য ও সরান সেরে সন্ধ্য-আহিগক সমাপ্ত করলেন, তারপর উকিলের বাড়িতে 
যখন গিয়ে পৌ'ছলেন তখন সবে সর্যোদয় হয়েছে। 

সেদিন ছিল দুই প্রধান সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের দিন। তাদের মধ্যে একজন শ্যামন্নার পত্রী । 
বিচারকের সামনে যে-সব বস্তু স্পর্শ করে সত্যকথনের শপথ নিতে হয় সেগুলি স্পর্শ করানোর 
সময় উকিল তাকে বলল, মিথ্যা বললে তার স্বমী ও সন্তানের মৃত্যু হবে। কথাটা শুনেই অন্কম্মার 
অভিশাপের কথাও মনে পড়ে যাওয়াতে কেদে ফেলল শ্যামননার বৌ। উকিল যখন তাকে ঠিক 
ঠিক কি ঘটেছে বলতে বলল তখন সে ভয়ে ভয়ে বলল, “কল্াজোইদজী আমাদের বাড়িতে ঢুকে 
মুষল দিয়ে খাপরা ভেঙেছিলেন। শুনেছি নাকি, যখন গাঁয়ে লোক ছিল না সেই সময় আমাদের 
ইনি' গুল্লিগ, জুট্রগ ওদের দিয়ে কন্ঠীজোইসজীর বাড়িতে পাথর ফেলিয়েছিলেন; সেই জন্যই 
উনিও অমন করেছিলেন । 

শ্যামন্নাও আদালতে উপস্থিত ছিল। সে এমনভাবে তার স্ত্রীর দিকে তাকাচ্ছিল যেন এখনি 
পারলে তাকে গিলে খায়। জোইসজীর উকিল এবার বললেন, “দেখ বোন, তুমি ঈশ্বরের নামে 
শপথ নিয়েছ সব সত্যি কথা বলবে। এখন বল তো, জোইসজী তোমাদের বাড়িতে ঢুকে 
পাটোয়ারীর খাতাপন্র লুঠ করে এনেছেন একথা মিথ্যা কিনা 

“হিসেবের খাতাপন্্র কিছুই নেননি। আমি সেখানেই দীড়িয়েছিলাম।: 

শোনা যায়, সেদিন গ্রামে ফিরে এসে শ্যামন্না নাকি স্ত্রীর প্রায় দফা সেরে ফেলেছিল। 

শ্রবণবেলগোলার পুলিশ হাবিলদার কন্ঠীজোইসজীর পক্ষ নিয়ে বলল, “সেই দিন দুপুর তিনটের 
সময় আমি হাসান গিয়েছিলাম, সেখানে আমি কল্ঠীজোইসজীকে দেখেছিলাম ।, শ্যামন্নার নালিশ 


ছিল এই যে, উক্ত দিন দুপুর তিনটটের সময়ই কন্ঠীজোইস তার বাড়িতে এসে খাপরা ভেঙেছেন 
এবং খাতা-পন্্র নিয়ে গেছেন। 
আদালতের রায় বের হবার দিন শ্যামন্না এবং কন্ঠীজোইস দুজনেই হাজির। ঠিক বেলা 


পত্র প্রতিবাদী স্পর্শ ও করে নাই। বাদী, প্রতিবাদীর গৃহে রান্ত্রে পাথর বর্ষণ করায় তাহারই প্রতি- 
কিয়াস্বরূপ নাকি প্রতিবাদী, বাদীর গহের খাপারা ভাঙে। কিন্তু এ মোকদ্দমার প্রধান অভিযোগ-- 
সরকারী হিসাবপন্রের খাতা অপহরণ । এ বিষয়ে শ্রবণবেলগোলার হাবিলদারের সাক্ষ্য হইতে 
জানা যায় যে, যে সময় উক্ত ঘটনা ঘটে সে সময় প্রতিবাদী হাসানে ছিল। এই সমস্ত বিষয় 
বিবেচনা করিলে স্পম্ট বোঝা যায় উক্ত অভিযোগের কোনরূপ সত্যতা নাই। বাদী ও প্রতিবাদীর 
মধ্যে দ্বেষবশতঃ সামান্য কলহ হইয়া থাকিবে । সুতরাং এই মোকদ্দমা খারিজ করা হইল, 


৫8 গৃহভঙগ 


৭ 


কন্ঠীজোইসজী পঞ্চাশ টাকা এনেছিলেন উকিলকে দেবার জন্য, কিন্তু উকিলবাবু অন্য কাজে 
ব্যস্ত তাই টাকাটা তাঁর বাড়িতে গিয়ে দিতে হবে। হোটেল থেকে খাওয়া-দাওয়া সেরে টাকাটা 
দিতে যাবেন এই কথা উকিলকে জানিয়ে কন্ঠীজোইস আদালত থেকে বেরিয়ে এলেন । ঘোড়াটা 
বাঁধা ছিল কাছেই একটা গাছে, তাকে খুলে, সওয়ার হয়ে চলতে শুরু করলেন। এক ফার্লং পথ 
যেতেই নজরে পড়ল শ্যামন্না একলা হেঁটে চলেছে । তাকে দেখবামান্র মাথার মধ্যে যেন আগুন 
দ্বলে উঠল কন্ঠীজোইসের। 

এইবার তোর মাকে **** কই কি করতে পারলি আমার কোর্টে গিয়ে? বলতে বলতে 
ঘোড়া থেকে নেমে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। শ্যামন্না বেশ ঘাবড়ে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। 
জোইসজী নিজের ডান পা থেকে জ্তোটা খুলে নিয়ে এক ঘা বসিয়ে দিলেন তার মাথায়। শ্যামন্নাও 
হাত তুলল বটে কিন্তু জোইসজী তার ঘাড় ধরে পিঠের ওপর এমন প্রবল আঘাত করলেন যে মাটিতে 
লুটিয়ে পড়ল। দেখা গেল সে অজ্ঞান হয়ে গেছে এবং মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছে। কন্ঠীজোইসজীর 
এই সময় যেন নিজের ওপর কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তার বৃদ্ধিও যেন ঠিক মত কাজ করছে না, 
একট্রু ঘাবড়ে গেলেন তিনি । এই সময় পিছন থেকে কে যেন বলে উঠল, “মাডার কেস, গ্রেপ্তার 
কর।” পিছন ফিরে দেখেন একটু আগে যাঁর মুখ থেকে মামলার রায় শুনেছেন, সেই বিচারক 
স্বয়ং দাঁড়িয়ে, তিনি পুলিশকে গ্রেপ্তারের আদেশ দিয়েছেন। জোইসজী ঘেমে উঠলেন। পুলিশ 
ছুটে এল কিন্তু তার আগেই বিদ্যুৎ গতিতে ঘোড়ার পিঠে উঠেই চাবুক কষালেন কন্ঠীজোইস। 
ঘোড়া ছুটল তীরবেগে। পুলিশ যদি আর গজ দশেক কাছে থাকত তাহলে হয়ত ধরা পড়তে হত। 
এরপর জোইসজী আর একবারও পিছন ফিরে দেখেননি । 

তীব্র গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে পুল পেরিয়ে ডান দিকের জলাশয়ের দিকে বাঁক নিলেন, তারপর 
যেদিকে পথ পেলেন সেদিক দিয়েই পালাতে পালাতে সন্ধ্যা নাগাদ পৌছেলেন বরগুরের কাছে। 
পুলিশ নিশ্চয় এখনও খুঁজে বেড়াচ্ছে । সরকারের নিয়ম খুনীকে যেমন করে হোক খুজে বার 
করতেই হবে। এবারে নিশ্চয় ফাসী হবে। জজসাহেব স্বয়ং দেখেছেন কাজেই উকিলও আর 
কিছু করতে পারবে না। সুতরাং এ রাজ্যের বাইরে কোথাও পালাতে হবে, এই সিদ্ধান্ত করলেন 
কন্ঠীজোইসজী। তিনি জানতেন এই ঘোড়াটা ব্যবহার করাও এখন বিপজ্জনক, কিন্তু এটাকে 
নিয়ে কি করা যায় এখন £ ডান দিকের পথে আরো চার মাইল গিয়ে নিজেদের গ্রামের দিকের 
পথে ক্লান্ত ঘোড়াটাকে ছেড়ে দিলেন । নাগলাপুর এখান থেকে মান চার মাইল, এ পথও ঘোড়াটার 
পরিচিত, যা হোক করে ও বাড়ি পৌছে যাবে ডিক । যে দেখতে পাবে সেই ওকে বেধে পৌছে দেবে। 
এবার তিনি ঘুরলেন বাঁ দিকের পথে, একটা গ্রামে পৌ ছলেন, নাম বেবীনহল্লী, এ গ্রামও পূব- 
পরিচিত। একটা কাপড়ের দোকানও আছে এখানে । দোকান থেকে কিনে নিলেন একটা 
মোটা ধুতি। পাশের আর একটা ছোট দোকান থেকে কেনা হল এক আনার শু ডো হলুদ ও একটা 
দিয়াশলাই। এবার গ্রামের বাইরে একটা বাগানের মধ্যে ডুকে কৃয়োর জলে ভিজিয়ে নতুন ধুতিটার 
কোর ছাড়ালেন। চুন আর হলুদ মিলিয়ে গেরুয়া রং প্রসস্তত করে ধৃতিখানা ছোপান হয়ে গেল; 
তারপর সেটা মাথায় জড়িয়ে পাড়ি দিলেন উত্তর মুখে । প্রায় মাঝ রাত্রি পার হয়েছে, ধুতিখানাও 


গৃহভজ ৫৫ 


শুকিয়ে গেছে ইতিমধ্যে! একটা পুকুর দেখা গেল পথের পাশে । পুকৃরপাড়ে কিছুটা বালি খুঁড়ে 
কন্ঠীজোইসজী একটা গর্ত করলেন, তারপর গেরুয়া ধুতিখানা পরে, অঙ্গের কোট-প্যান্ট-জামা 
ইত্যাদি সব কিছু খুলে, কাঠ-কুটো যোগাড় করে আগুন দ্ধেলে তাইতে পুড়িয়ে ছাই করে গতের 
মধ্যে পুতে ফেললেন এবং আবার বালি মাটি দিয়ে জায়গাটা সমান করে দিলেন। সঙ্গের টাকা- 
কড়ি সব কৌপীনখানার সঙ্গে বাঁধা রইল। আরসীকেরে এখান থেকে আটমাইল দূর । পথে 
আর দেরী করলে বিপদ ঘটতে পারে, তাই এবার জোর কদমে চললেন কন্ঠীজোইস। 
আরসীকেরে স্টেশনে এসে খোজ নিয়ে জানা গেল হুবৃলী যাবার গাড়ি ভোরের আগে আসবে না। 
অগত্যা ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতেই হল। সকাল বেলা ট্রেন আসতেই তাতে উঠে পড়লেন। 
হরিহর পর্যন্ত এ রাজ্যের সীমা, তারপরই ইংরাজ সরকারের এলাকা । “তারপর আর কেউ আমার 
নাগাল পাবে না” এই কথাই ভাবলেন কলন্ঠীজোইসজী। 


আট মাস ধরে ক্রমাগত চিকিৎসার পরও কলে্লেশের বাম হাতখানা কিছুতেই আর ঠিক হল না। 
হাতের কাঁপুনিটা। সব সময় দেখা না গেলেও সেই হাতে জোর করে কোন কিছুই সে ধরতে পারে 
না। কেবল ডান হাত দিয়ে সাইকেলও ভাল করে চালান যায় না। অর্থাৎ বেশ বোঝা গেল 
পুলিশের চাকরী করা আর ওর পক্ষে সম্ভব নয়। শারীরিক অক্ষমতার জন্য কল্লেশের চাকরী 
গেল। যদিও পুলিশ বিভাগে তার চাকরীট্টা ছিল একেবারেই নিচু তলার, কিন্তু তবু সরকারী 
চাকরী, কাজেই তার আনুষঙ্গিক সুখ-সুবিধা, দাপট ইত্যাদি সব কিছুরই স্বাদ পেয়েছিল সে। কিন্তু 
এখন সে সবই খ্োোয়াতে হল। অবশ্য গ্রামে তাদের যা খেত-খামার. ফলের বাগান ইত্যাদি আছে, 
সেগুলো ঠিক মত দেখাশোনা করলে যা আয় হয়, তাতে দুশ্চিন্তার কোনই কারণ নেই। তাই ও 
নিয়ে কল্লেশ আর বিশেষ চিন্তাও করল না। 

এরই মধ্যে সে খবর পেল, নরসীপুরের আদালতে মামলায় তার বাবা জিতেছেন, কিন্তু তার 
পরেই শ্যামন্নাকে তিনি এমন প্রহার করেছেন যে, সে অড্তান হয়ে যায় ও তার মৃখ দিয়ে রক্ত 
পড়তে থাকে, আর তাই দেখে তিনি কোথাও গা ঢাকা দিয়েছেন। এদিকে শ্যামন্নার কিন্তু প্রাণের 
হানি হয়নি, শুধু জতোর আঘাতটা মুখের ওপর পড়ায় দাত ভেঙে রক্ত পড়ছিল এবং অক্তান হয়ে 
গিয়েছিল। জজ সাহেব ডাক্তার ডাকিয়েছিলেন, কিন্তু ডাক্তার আসার আগেই তার জ্তান ফিরে 
আসে । আবার নতুন করে কন্ঠীজোইসজীর নামে মামলা করার ইচ্ছা শ্যামন্নার আর ছিল না। 
মামলা করলে হয়ত শাস্তি দেওয়ানো যেত, জেল খাটানৌও যেত, কিন্ত জেল থেকে ছাড়া পাবার পর 
যদি কোন মাঝ রাতে এসে বাইরে থেকে দরজায় তালা দিয়ে, তারপর বাড়ির ওপর কেরোসিন তেল 
তেলে আগুন ধরিয়ে দেয়, তখন কে বাঁচাতে আসবে £ এ রকম একটা ভয়াবহ সম্ভাবনার আশঙ্কা 
করে শ্যামন্না চুপচাপ থাকাই শ্রেয় বোধ করল। 

কন্ঠীজোইসজীর ঘোড়াটা ভিক বাড়িতে এসে পৌঁছেছে । ননজম্মাকে ডেকে অক্ষম্মা ঘোড়াটা 
বাধাল। জোইসজী কোথায় গেছেন আর কেনই বা গেছেন সেটা ওরা দু'জনে কিছুতেই বুঝতে 


৫৬ গৃহভ্গ 


পারছিল না। ইতিমধ্যে কল্লেশ বাড়ি এল। বাড়িতে এসে হাতের জন্য সে গৌরসার" চিকিৎসা 
শুরু করল। কন্ঠীজোইসজী কোথায় যে গেছেন, সেও কিছু জানে না। 

এই সময় খবর এল কল্লেশের স্ত্রী কমলা প্রথম খতুমতী হয়েছে । এদিকে ছ* মাস কেটে 
গেছে, এখনও কন্ঠীজোইসজীর কোন সংবাদ নেই। অক্শ্মার অভিমত হল, তার জন্য আর 
অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। দ্বিরাগমন করিয়ে এবার বৌকে ঘরে আনা উচিত। আর দেরী 
করা চলে না। দিন স্থির হল। কল্লেশ রামসন্দ্রে গিয়ে বোন, ভগ্মীপতি ও তাদের শিশুটিকে 
নিয়ে এল। এদের সবাইকে নিয়ে গরুর গাড়িতে করে অক্রম্মা হাসানের পথে রওনা হয়ে পড়ল 
নাত-বৌকে নিয়ে আসবার জন্য। 

কমলা কিন্ত শ্বশুর বাড়িতে এসেও যেন স্বামীর ছোয়াচ বাঁচিয়ে চলতে লাগল । সে রীতিমত 
জিদ ধরে সারা শরীর কুঁকড়ে এক পাশে শুয়ে রাত কাটিয়ে দেয়। কিন্তু কল্লেশ নর-নারীর সম্পর্ক 
সম্বন্ধে অনভিজ্ত মোটেই নয়। সে অনেক মেয়ে দেখেছে । তাছাড়া সাত মাস সে কমলাদের 
বাড়িতেই ছিল, পরিচয় তো তখন হয়েই গেছে । কিন্ত এখন মিষ্টি কথায়, আদর করে, কোন 
কিছুতেই তাকে বশ করা যাচ্ছে না। কথা পর্যন্ত বলে না। বাপের বাড়িতে প্রথম রান্রেই অবশ্য 
বলেছিল, “এ পচা সেকেলে পাড়া-গাঁয়ে আমি যেতে চাই না।, 

কমলার মনের অবস্থাটা বুঝতে কল্লেশের দেরী হয়নি। কিন্তু এ ব্যাপারে কিছুই করবার 
উপায় নেই। আদর করে বুঝিয়ে বলার চেস্টা করেছিল, “পাড়া-গাঁ তো কি হয়েছে £ সেখানে 
দুটো বড় বড় গরু, কত দুধ দেয়। এই শহরের মত সেখানে ঘি-দুধের অভাব নেই। খেত ভরা 
ফসল হয়, দান-দক্ষিণাতেও কত জিনিস পাওয়া যায়।” 

“আমি গাঁয়ে থাকতে পারব না।, 

“আমি তো সরকারী চাকরীই করতাম, কিন্ত কি করব, কপাল খারাপ। কি আর করা যাবে। 
এখন গ্রামেই চাষ-বাস করতে হবে, তাতেই আমরা সুখে থাকব । 

“অন্য কোন সরকারী চাকরীর চেষ্টা কর না" দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়েই জবাব দেয় 
কমলা । 

“দেখতে হবে। এখানে মেডিকেলে “আনফিট” করে দিয়েছে যখন, অন্য কোথাও আর কাজ 
জুটবে কি নাকে জানে ।, 

«ও সব আমি বুঝি না” এই বলে ও স্বামীকে আর কথা বলার সুযোগই দিল না। এই সময় 
কল্লেশের ডান হাতখানা স্ত্রীর মুখের কাছে এগিয়ে এসেছিল, কিন্তু সে সামলে গেল, কারণ ঘরের 
বাইরে শ্বশুর বাড়ির লোকজন, তাছাড়া ওর নিজের ঠাকুমা, বোন, বোনাই সবাই রয়েছে। এখানে 
কোন হৈ-হল্লা হওয়াটা ঠিক নয়। তাছাড়া আরো একটা কথা, সে যখন অসুস্থ ছিল তখন দীর্ঘ 
দিন ধরে এরা সবাই তার সেবা-যত্র করেছে । বিশেষ করে শ্বশুর মশায় তো তাঁর জামাইয়ের বাম 
হাতখানা সারিয়ে তোলার জন্য প্রচুর পরিশ্রম করেছেন, কাজেই তাঁর মনে কম্ট দেওয়া উচিত 
নয়। এইসব ভেবেই চুপ করে রইল ক্লেশ। 

পরের দিন যখন যান্রার আয়োজন চলেছে সেই সময় কমলু তার মাকে গিয়ে বলল, “মা, আমি 
ওখানে যাব না।, 

পুপ কর, লোকে শুনলে হাসবে । অমন কথা বলতে নেই।” 


গৃহভঙ্গ ৫৭ 


শি 


কমলার মা এই নিয়ে আর বিশেষ কথা বাড়ালেন না। তাঁর মনে হল সব মেয়েই তো প্রথম 
শ্বশুর বাড়ি যাবার সময় এমন কথা বলে থাকে, ও নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। মা-বাবা-ভাই-বোন 
সবাই কমলার সঙ্গে নাগলাপুর এসে চার দিন থেকে ফিরে গেলেন। সেই দিনই নন্জুও তার বাচ্চা 
নিয়ে স্বামীর সঙ্গে তাদের গ্রামে ফিরে গেল। 

সে রাতে কমলা আবার শুরু করল এ এক কথা । কল্লেশ বলে, “দেখছ তো, এ বাড়িতে 
কোন অভাব নেই। এত ঘি, দুধ, দই, সব্জী হাসানে কোথায় পাওয়া যায় £ 

ও সব আমি কিছু জানি না" দেওয়ালের দিকে ফিরে আড়ামোড়া ভাঙল কমলা । এতদিন 
শ্বশুর-শাশুড়ীও এখানে ছিলেন, তাই কোন রকমে মেজাজ সামলে রেখেছিল কল্লেশ। আজ আর 
তার সহ্য হল না। উঠে বসে বৌয়ের গালে এক চড় কষিয়ে দিল। ফুঁপিয়ে উঠল বৌ, ফুঁসে 
উঠল-_-চাকরী খোওয়ানো পুলিশের চাকর !, আবার দু-চার ঘা পড়ল পিঠে। অক্কশ্মা শুয়ে 
ছিল বাইরে, সে বলে উঠল, “এ সব হচ্ছে কি তোদের শুনি £ 

“হারামজাদী, ছেনালের কথা শোন একবার। তোর মত মেয়ে যেন আর দেখিনি আমি 
কখনো 2 বলতে বলতে নিজের বিছানা বাইরে এনে বিছিয়ে শুয়ে পড়ে কল্লেশ। ব্যাপার 
শুনে অক্ধশ্মা ঘরে গিয়ে বৌকে বোঝাতে বসে, এমন করছ কেন, এখানে কিসের অভাব তোমার £ 
খাওয়া-পরার কোন কম্ট হবে না এখানে । এমন করতে নেই বাছা, তোমাকে আমরা কোন কম্ট 
দেব না, খুব সুখে থাকবে তুমি । 

“এই শমশানের মত অজ পাড়া-গাঁ আমার ভাল লাগে না” আবার ফুঁসে উঠল বৌ। 

এ মেয়েকে কি করে বোঝান যায় ভেবে পেল না অক্কম্মা। শহরের মেয়ে আনলে এমনটা 
যে হবে, সে ভয় ওর প্রথম থেকেই ছিল। কিন্তু কন্ঠী তো কারো সঙ্গে কিছু পরামর্শ না করেই 
সব ঠিক করে ফেলল। যা হবার তা হয়েই গেছে। এখন কোন রকমে মানিয়ে নিতেই হবে এ 
কথাই ভাবল ব্বদ্ধা। 

কজ্লেশ বাইরে থেকে বলে উঠল, “ওর চুলক্নী হয়েছে । তুমি আর ছুলকোতে যেও না, 
চলে এসো বাইরে । 

তব্‌ অক্কশ্মা যতদুর সাধ্য বোঝাবার চেম্টা করল, অবশেষে বাইরে এসে সেও শুয়ে পড়ল। 
কিছুক্ষণ পরে ঘুম এসে গেল কল্লেশের। সকালে উঠে স্নান করে জলখাবার খেয়ে বাবার ঘোড়াটায় 
চেপে সে বেরিয়ে পড়ল শ্রবণবেলগোলার উদ্দেশ্যে, ওখানে তার পুরোন বন্ধুরা কেউ কেউ থাকে। 


পণ অধ্র্যান 


সাতু পাঁচ মাস গর্ভবতী, তাকে তার বাবা এসে এর মধ্যেই বাপের বাড়িতে নিয়ে গেছেন। এদিকে 
নন্জম্মা আবার অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে। 

তিম্লাপুরের দাবরসায়া, যিনি পাটোয়ারীর কাজ-কর্মের হিসাব লিখতেন তাঁরও বয়স এখন 
ষাটের ওপরে। তাঁর নিজের এলাকার হিসাবপন্র লেখার পর আবার চেন্িগরায়ের হিসাব লেখার 
কাজ সামলান্ে ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে তাঁর পক্ষে । এরজন্য চেনিগরায়ের কাছে তিনি অবশ্য 
পথগশ টাকা করে পারিশ্রমিক পান, কিন্তু তা ছাড়াও এই পরিবারের প্রতি তাঁর কেমন একটা স্নেহ 
জন্মে গেছে। এ বাড়ির মানুষগুলি প্রায় সকলেই মখ, কিন্তু বধ নন্জম্মা বড় শুণবতী মেয়ে, 
তার স্বভাবের জন্যই তাকে উনি বড় ভালবাসেন । 

সেদিন বাড়িতে নন্জম্মা একাই রয়েছে । চেনিগরায় বাড়ির সামনের মন্দিরে বসে তামাক- 
পাতা চিবোতে চিবোতে মহাদেবয়াজীর ভজন শুনছে। অপ্পন্নায়া গেছে জেলে পাড়ায়, সেখানে 
মাটার বাড়িতে হয়ত বিড়ি ফ$কছে বসে বসে। গঙ্জম্মা তেলিদের পাড়ায় ইরক্কার বাড়ির সামনে 
ঘানি থেকে তেল প্রস্ভত করিয়ে আনতে গেছে । এই সময় দাবরসায়াজী এসে বললেন নন্জশ্মাকে, 
“দেখ মা, আমার তো অনেক বয়স হয়ে গেল! আর বড়জোর বছর দুই এ সব কাজ কর্ম করতে 
পারব। এদিকে আমাদের চেন্নিগরায় তো হিসেব-পন্তর লেখার কাজ কিছুই শিখছে না। কি 
করা যায় বল দেখি £ 

“মামাজী, আপনি নিজেই ও'কে অবস্থাটা ভাল করে বুঝিয়ে বলুন ।” 

“এই হিসেব লেখা কি এমন শক্ত কাজ বল্‌ দেখি মাঃ হোন্নবল্লীর সীতারামাইয়াজীর কাছে 
তিন বছর থেকেও যখন কিছুই শেখেনি, তার মানে হল, ওর দ্বারা এ কাজ হবার নয়। এইযে 
এতদিন ধরে আমি এখানে হিসেব লিখে যাচ্ছি, তা ওর কোন চেষ্টাই নেই, সব ভার আমার ওপরেই 
ছেড়ে দিয়ে পড়ে পড়ে শুধু ঘুমাবে । একদিনও কি আমার কাছে বসে লেখার চেম্টাও করেছে £ 
কোন দিনও না। লিখতে লিখতেই তো শেখে লোকে । মাঝে মাঝে যদি আমাকে জিক্তাসা করে 
নেয়, তাহলেই তো হয়। নিজের কাজ নিজেই করা উচিত নয় কি£ কত দিন আর এভাবে 
অন্যকে দিয়ে কাজ চালাবে £ | 

এ সব কথা নন্জশ্মা দু'বছর আগেই ভেবেছে, কিন্তু কি-ই বা করতে পারে সে £ “মামাজী, 
আমার কপাল তো জানেনই আপনি ! আপনিই বলুন আমি কি করব £, 

তুমি তো মা, লিখতে পড়তে পার। তোমার কবিতার খাতা আমি দেখেছি, মুক্তোর মত 
হস্তাক্ষর তোমার । আমি তোমাকেই শেখাব, তুমি হিসেব লিখতে শেখ । বাড়িতে বসেই লিখতে 


গহভজ ৫০ 


এ 


পারবে । চেন্নিগরায় কোট-প্যান্ট পরে বাইরের জমাবন্দীর কাজটা করুক তাহলেই হবে। এ না 
করলে তোমাদের আর কোন উপায় দেখছি না।” 

“কিন্ত মেয়েমানষে সরকারী খাতাপন্ত্র ছু'লে দোষ হবে না 

এ প্রশ্নটার জবাব অবশ্য দাবরসায়াজী চট করে দিতে পারলেন না! এ বিষয়ে সরকারী 
আইনে কি বলে তিনিও ঠিকমত জানেন না। তবুও তিনি বললেন, “তুমি তো আর পাটোয়ারী- 
গিরির চাজ নিচ্ছ না, শুধু ঘরে বসে হিসেবটা লিখবে । ওপরওয়ালা কর্মচারী জানবে কি করে 
যে, এ হিসেব মেয়েতে লিখেছে, না পুরুষে লিখেছে £ কাউকে কিছু বলার দরকার নেই, তুমি কাজটা 
চপচাপ শিখে নাও ।, 

রেজিস্টারে লাইন টেনে এগিয়ে দিলেন দাবরসায়াজী, বললেন, “এই নাও, প্রথমে এইভাবে 
চিহ্ু দাও। এই দেখ, মাথার ওপরের লাল রেখার সঙ্গে সমান্তরালভাবে রুল দিয়ে লাইন টেনে 
যাবে। বাঁ হাতের আঙুল দিয়ে ধীরে ধীরে রুলটা সরাতে থাকবে । নিব থেকে কালির ফোটা 
কাগজের ওপর না পড়ে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে । আচ্ছা, দেখি, আগে লাইন তো টানো ) 

যেমন যেমন বলা হল সেইভাবেই নন্জম্মা কাজ করতে লাগল । ওর মত অত চটপট 
হাত চলছে না বটে, কিন্ত লাইন গুলো বেশ সোজা এবং ঠিক জায়গা মতই টানতে পারছে সে। 

এব ভাল হচ্ছে, দেখতে দেখতে অভ্যাস হয়ে যাবে। সমস্ত খাতাখানায় এবার তুমিই লাইন 
টেনে ফেল”_-এই কথা বলে উনি উঠে গেলেন পুস্করিণীর দিকে । নন্জম্মার কাছে এ একটা 
নতুন অভিজ্ঞতা । ছোটবেলায় নিজের গানের খাতায় সে শ্লেটের সাহায্যে লাইন টানত বটে, কিন্তু 
রুল দিয়ে সরকারী হিসেবের খাতায় লাইন টানতে টানতে ওর মন একটা অপূব আনন্দে ভরে 
উচছিল। তার ওপর প্রথম চেম্টাতেই সে নির্ভুলভাবে কাজটা করতে পেরেছে । অনেকবার 
শুনেছে সে, পাটোয়ারীরা বলাবলি করে থাকে, পাটোয়ারীগিরি ছেলেখেলা নয় ! ঠিক মত লাইন 
টানা শিখতেই তো লেগে যায় অন্ততঃ ছ' বছর, আর সেই সময় রুলের বাড়ি খেতে থেতে হাতের 
ছাল-চামড়া উঠে যায় ।” 

নন্জম্মা লাইন টেনে চলেছে---এই সময় অপ্পনায়া এসে পৌঁছল । বৌদিদির কাণ্ড দেখে 
প্রথমটা তো রীতিমত ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল সে। তারপর দারুণ চটে গেল, সোজা তেলিপাড়ায় 
গিয়ে মায়ের কাছে নালিশ করল, “গ্র দেখ গিয়ে, সমস্ত হিসেবের খাতার দফা শেষ করে ফেলল ।” 

“কে রে 

“তোমার বড় বৌ, আবার কে £ খাতায় লাইন টানছে বসে বসে । 

“সে আবার কি কথা£ নিপাত যাক হতচ্ছাড়ি, ছেনাল কোথাকার !' বলতে বলতেই 
উধ্বশ্বাসে ছুটে বাড়ি চলে আসে গঙ্গম্মা। ততক্ষণে দাবরসায়াজীও পুকুর ধার থেকে ফিরে 
এসেছেন, বারান্দায় বসে নস্যি ঠসছেন নাকের ফুটোয় । বৌ ঘরের মধ্যে বসে লাইন টানছে। 
গঙ্গম্মা ভিতরে এসে চিৎকার করে ওঠে, “ওরে ছেনাল, তোর মাথার ঠিক আছে তো ঃ 
করছিস কি তুই বসে বসে ৮ কথাগুলো কানে যেতে দাবরসায়াজী ভিতরে এসে জিক্তাসা করেন, 
“কেন, কি হয়েছেটা কি£ 

“এই যে হিসেবের খাতা-পত্তর ছু য়েছে, এটা কি উচিত হয়েছে £ 

“ওকে আমিই লাইন টানতে বলেছি । আমার শরীর ভাল যাচ্ছে না। হিসেব লেখা সময় মত 


৬০ গুহভঙ্গ 


শেষ করতে হবে তো£ চেন্নিগরায় তো কিছুই করবে না।" 

“ছেনাল মেয়েমান্ষকে দিয়ে কেউ হিসেব লেখায় না কি কোন কালে £ 

“শুধু শুধ মুখ খারাপ করছ কেন বোন। ছুঁলে কোন দোষ হয় না।, 

“এ কাজ ছিল আমার স্বামীর। তাঁর হাতে লেখা এইসব খাতা এর কি ছোয়া উচিত হচ্ছে £ 

“এ তো তাঁরই পুত্রবধূ, পর তো আর নয় ইতিমধ্যে নন্জম্মা খাতা-কলম-রুল ইত্যাদি 
সেইখানেই ফেলে রেখে উঠে চলে গিয়েছে। তাকে ডেকে দাবরসায়াজী বললেন, “নন্জম্মা, 
উঠে গেলে কেন£ তুমি তোমার কাজ করে যাও। আমি তোমার শাশুড়ীকে বলে দিয়েছি । 

গঙ্গম্মা মন্দিরে গিয়েছিল ছেলেকে ডেকে আনতে । এসে দেখে নন্জশ্মা আবার বসে বসে 
লাইন টেনে চলেছে। তাকে দেখিয়ে বলে ওঠে গজম্মা, “এ দেখু তোর বৌকে । তোর সঙ্গে সঙ্গে 
পাটোয়ারীগিরি করতে বেরোবে এবার ।, 

দাবরসায়াজী নিজেই এবার বলেন চেন্নিগরায়কে. “দেখ পাটোয়ারীজী, আমার শরীর ভাল নেই। 
বসে বসে রুল দিয়ে লাইন টানতে টানতে পিঠে যন্ত্রণা শুরু হয়ে যায়। খাতা বাঁধাই, লাইন টানা, 
ডান দিকের হিসেব লেখা, এসব কাজের জন্য আমিই ওকে অনুমতি দিয়েছি । তোমার স্ত্রী দিব্যি 
সোজা লাইন ট্রানে। সুন্দর হস্তাক্ষরে লিখতেও পারে। এখন সোজাসুজি বলে দাও যে ওকে 
একাজ তোমরা করতে দেবে, না তুমি নিজে করবে! না হলে আমি এবার চললম আমার নিজের 
গ্রামে ।? 

মুশকিলে পড়ে গেল চেন্িগরায় ।  মিনিটখানেক ভেবে বলল, “এ ছেনালটাকে দিয়েই করিয়ে 
নিন কাজটা, আমি এখন ভজন শুনতে যাচ্ছি।” এরপর কেটে পড়ল সে। গালাগাল দিতে দিতে 
মাও ফিরে গেল আবার তেলি পাড়ায়। অগ্পন্নার মনে হল একলা বাড়িতে বসে থাকাটা তার পক্ষে 
অপমানজনক, সুতরাং সেও আবার বেরিয়ে পড়ল জেলে পাড়ার উদ্দেশ্যে। 

দাবরসায়াজী নন্জম্মাকে বললেন, “এ বাড়ির হালচাল আমি বহুদিন থেকেই জানি, মা। 
এটি তোমার শ্বশুরমশায়ের দ্বিতীয় বিবাহ, সে সময় তাঁর বয়স ছিল চলিলশেরও ওপরে । সেই 
কারণেই তোমার শাশুড়ীর স্বভাবটা এই রকম হয়ে গেছে। ওদের যা খুশি করুক, কিন্তু তুমি 
হিসেবের কাজটা মন দিয়ে শিখে নাও। এ ছাড়া আর কোন উপায় নেই। তোমার শ্বশুর যখন 
পাটোয়ারী ছিলেন তিনি একবার আমাকে খুব সাহায্য করেছিলেন । তাই হিসেব-পত্তরের কাজ 
আমি যেটুক্‌ জানি, সব আমি তোমাকে শিখিয়ে দেব। এখন যেমন যেমন বলব, ঠিক সেইভাবে 
কাজ করে যাও। 


২ 


আর তিন মাস পরে বৎসারান্তিক হিসাব সম্পর্ণ করতে হবে। পাটোয়ারীদের কাছে এ কাজটির 
গুরুত্ব খুব বেশী, কারণ এই হিসেব যদি নিভূল হয় তবেই আগামী বছরের হিসেবেও ভুল হবার 
সম্ভাবনা বিশেষ থাকবে না। দাবরসায়াজী নিজের গ্রামে ফিরে গেছেন। যাবার আগে বলে 
গেছেন, ঈশ্বর তোমায় প্রচুর বুদ্ধি দিয়েছেন মা, অন্যেরা তো চার বছর কাজ শেখার পরও ডান দিক, 
বাঁ দিক ঠিকমত বুঝে লিখতে পারে না। কাজটা বেশ কঠিন, কিন্তু আমি যেমন বলে দিয়েছি 


গৃহভজ ৬১ 


ঠিক সেইভাবে লিখে যাও। এরপর তোমাকে ব€সরান্তের হিসেব লিখতে শিখিয়ে দেব।' যা 
যা বলে গেছেন সেইসব হিসাব উনি গ্রাম থেকে ফিরে আসার আগেই লিখে শেষ করে রাখতে হবে। 
নন্জম্মা এখন ছ' মাস অন্তঃসত্া। এদিকে সাতম্মা প্রসব হতে বাপের বাড়ি গেছে । তার প্রসব 
হয়ে গেছে কি না সে খবর এরা কেউই জানে না। শরীরের এই অবস্থায় সংসারের সব কাজ-কর্ম 
সেরে এত হিসেব লেখার কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে নন্জম্মা। কিন্তু গম্মা যেন 
মনে মনে প্রতিক্তা করে ফেলেছে রান্নার কাজটুকও সে করবে না। “ছেনাল মেয়েমানুষ, পুরুষের 
মত বসে বসে হিসেব লিখবে, আর আমি করে মরব ঘরের কাজ £_-এই হচ্ছে তার মনোভাব । 

একদিন দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর নন্জন্মমা বসে বসে লিখছে। সেই বারান্দারই এক পাশে 
শুয়ে চেনিগরায় আর অপ্পন্নায়া পাল্লা দিয়ে নাক ডাকিয়ে চলেছে । গক্পম্মা দরজার পাশে বসে 
তার রান্রের ফলাহারের উসল্‌ একে রকম খাবার) তৈরী করার জন্য মুগ বেছে পরিম্কার করছে 
আর শিশু পার্বতী ঘুমিয়ে রয়েছে ঘরের মধ্যে। বাইরে বেঁধে রাখা গরুটিকে আজ কেউ চরাতে 
নিয়ে যায়নি, বেচারাকে একটু ঘাস-জলও দেওয়া হয়নি। গরুটা বার দুই জোর গলায় ডেকে 
খুটিটার চার পাশেই ঘুরপাক খেতে লাগল। নন্জম্মা স্বামীকে উদ্দেশ করে বলে উঠল, “শুনতে 
পাচ্ছ 2 

স্বামীর ঘুম ভাঙল না, কিন্তু অপ্পন্নায়া পাশ ফিরল। নন্জম্মা এবার তাকেই বলল, 
“অগ্পন্নায়া, তোমার ঘুম ভাঙল £ 

“”-_বলেই সে আবার চাদর মুড়ি দিয়ে ফেলল। 

“আমরা সবাই পেট ভরে খেলাম, এদিকে গোমাতা উপোস করে আছেন। ওকে একটু চরিয়ে 
আনা উচিত নাঃ 

আবার এক লঙ্বা নিঃশ্বাসের সঙ্গে শোনা গেল শুধু-__উ”। 

মিনিট দশেক পরে নন্জশ্মা আবার বলল, “দিনে দ্বার করে দুধের দরকার আছে, অথচ 
গরুর সেবা-যত্র কেউ করবে না। এত অলস হলে ভগবান তাদের অন্ন যোগাবেন কি করে £ 

গঙ্গশমা রেগে গেল কথাটা শুনে,_কি, বকছিস্‌ কি তুই £ 

“কিছু অন্যায় কথা তো বলিনি। উপোসী গরুটা বাঁধা রয়েছে সেই কথাই বলছি । 

“তা, যা না তুই-ই চরিয়ে নিয়ে আয় !, 

“তাহলে এই হিসেব লিখবে কে? 

“আ-হা-হা-হা মরে যাই, হিসেব লিখে উনি একেবারে রাজা হয়ে যাবেন। মাথায় চড়ে নাচছে 
একেবারে, হতচ্ছাড়ি, ছেনাল কোথাকার !” 

কন্ঠীজোইসজী বহু দিন হল নিরুদ্দেশ, তাঁর ফিরে আসার সম্ভাবনাও বিশেষ দেখা যাচ্ছে না, 
সতরাং আজকাল বধূর প্রতি কটু ব্যবহার করতে গম্মা আর বিন্দুমান্তরও ভয় পায় না। তাছাড়া 
“ছেনাল”, “রাঁড়' ইত্যাদি সম্ভাষণ শুনতে শুনতে এতদিনে বেশ অভ্যাস হয়ে গেছে নন্জম্মার। 

মায়ের চেঁচামেচিতে ঘুমটা ভেঙে গেল অপ্পন্নার। দুপুরের কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় পাশ 
ফিরতে ফিরতে ক্র দ্ধ কন্ঠে সে প্রশ্ন করল, “কি, হয়েছে কি £ 

“তোরা খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ে আছিস আর উনি হিসেব লিখে সুবেদারী করছেন, তাই হকুম 
হয়েছে, যা গিয়ে গরু চরিয়ে আয়, বুঝলি রাঁড়ের পুতরা £ 


৬২ গৃুহভ 


তেলে-বেগুনে ভ্বলে উঠল অপ্পন্নায়া। উঠে বসে বলল, “বলেছিস্‌ এই কথা £ মাথার ঠিক 
আছে তো তোর £ 
“মিছে কথা কেন বলছেন মাঠ ভগবানের নামে শপথ নিয়ে বলুন তো, আমি কি এর কথা 
বলেছি £ | 

“দেখ্‌ অগ্পন্না দেখু, আমাকে বলে কিনা ভগবানের দিব্যি খাও £ মিথ্যে বলি তো আমি ভাত 
নাখেয়ে গু খাই! তোদের মাকে মিথ্যেবাদী বলছে আর তোরা চুপ করে দেখছিস £ ছেনালট্াকে 
দু'লাথি লাগাতে পারিস্‌ না? গঙ্গশ্মার কথা শেষ হতে না হতেই অপ্পন্নায়া উঠে বৌদিদির পিঠের 
ওপর সজোরে ডান পায়ের লাথি কষিয়ে দিল। সে জুটিয়ে পড়ল সেইখানেই। দ্বিতীয় লাথিটির 
জন্য পা উচিয়ে গর্জে উঠল অপ্পন্না, আর কখনও আমার মাকে যদি এমন কথা বলতে শুনি তো 
গত গুড়ে জ্যান্ত পুতে ফেলব ।, 

হঠাৎ এই সময় দেখা গেল কয়েকজন পুলিশ এসে হাজির। খাকি জামা, খাকি টুপী, পায়ে 
জতো, হাতে চামড়ার ব্যাগ, কালো কোট, নিশ্চয় পুলিশের লোক । এদের সঙ্গে আরো দু'জন, 
তাদের পায়ে পটির মত জড়ানো খাকি মোজা, হাতে তাদের হাতকড়ি, লোহার শিকল ইত্যাদি আরো 
কি কি জিনিস রয়েছে। বুকের ভেতরটা ধড়াস্‌ করে উঠল অপ্পন্নায়ার। হায়, হায়, আর 
রক্ষা নেই” বলে এক চিৎকার দিয়েই সে ছুটে পালাল। পাশের গলিতে ঢুকতেই সেখানকার 
কৃকৃরগুলোও সমস্থরে টেচাতে শুরু করল তাকে দেখে । 

এদের দেখে গলম্মাও দিশাহারার মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপছে । অপ্পন্নায়ার চিৎকারে 
ঘুম ভেঙে যাওয়ায় চেনিগরায় উঠে বসেছে তখন ঘরের ভিতর শিশু জেগে উঠে কান্না জড়েছে। 
ননজম্মা বসে বসেই ঘাড় ঘুরিয়ে আগন্তকদের দেখতে পেল। তারপর শিশুর কান্না শুনে তাড়াতাড়ি 
উঠতে গিয়ে অনুভব করল কোমরে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। বোধ হয় মচকে গেছে অথবা কোন 
শিরায় টান ধরেছে । সে কোন রকমে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে ঘষতে ঘষতে ভিতরে চলে গেল। 
চেন্িগরায় ভয় এবং সন্দ্রমের সঙ্গে বলে উঠল, “মশাইরা, দ-দয়া ক-করে বসুন ।” 

“আচ্ছা, আপনারই নাম পাটোয়ারী চেনিগরায় £ 

হ্যা, স্যার। 

“ওটি কি আপনার ভাই, যে নিজের স্ত্রীকে লাথি মারছিল ? 

“ও আমার স্ত্রী, স্যার” 

“আচ্ছা! তার মানে বৌদিদিকে লাথি মারছিল £ 

“'আক্তে না স্যার।? 

“কি ব্যাপার £ সরকারী চাকরী করেও মিথ্যা কথা বলা হচ্ছেঃ নিজের শ্ীকেও ঠিক মত 
দেখাশোনা করার ক্ষমতা নেই £ 

ততক্ষণে গজম্মার সারা শরীরে ঘাম ছুটছে । আগন্তকরা আর কোন কথাবাতা বলছে না। 
চেন্নিগরায় বারান্দায় একটা মাদুর বিছিয়ে দিয়ে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছে। এই ফাঁকে 
গঙ্গম্মা চুপি চুপি বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা মাটার বাড়িতে গিয়ে হাজির, তাকে জিজ্ঞাসা করতে 
সে ফিস ফিস করে কানে কানে বলল, “ছাদের ওপর নারকেল পাতার গাদায় ওকে লুকিয়ে রেখেছি 
গজম্মা মই লাগিয়ে উঠে এল ছাদের ওপর। ছেলের কাছে এসে খুব নিশ্নস্বরে বলল, “ওদের 


গৃহভঙ্গ ৬৩ 


হাতে কি আছে দেখেছিস £ মোটা দড়ির মত শেকল! এতবড় কোদালের মত লোহার পাত ! 
তোকে যদি একবার ধরতে পারে, এ শেকল দিয়ে বেধে গত খুঁড়ে পুঁতে দেবে, নয় তো ফাঁসীও দিতে 
পারে। ওর ভাই তো পুলিশেই কাজ করত, ওই দিক থেকেই এসেছে মনে হচ্ছে। তুই চুপচাপ 
বাগানের দিক দিয়ে পালা। মাস পাঁচ-ছয় আর এদিক মাড়াস নে। বরং জাবগল্নুর দিকে 
চলে যা। 

“এখন কি হবে মা 2 ভীষণ রকম ঘাবড়ে গিয়ে প্রশ্ন করে অপ্পনায়া। 

ণটপট পালিয়ে যা বাবা । উঃ, কি অশুভ ক্ষণেই এ ছেনাল বেতী এ বাড়িতে পা দিয়েছিল। 
সেই থেকে আমাদের যেন সাড়ে সাতিষ্* লেগেছে ।” নারকেল পাতার গাদার মধ্যে থেকে বেরিয়ে 
সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল অপ্পনায়া, তারপর পিছনের দরজায় এসে দু' পাশটা একবার ভাল করে দেখে 
নিয়ে লম্বা লম্বা ঘাসবনের মধ্য দিয়ে নিচ হয়ে গা ঢাকা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। জলাশয়ের বাঁধের 
ওপর থেকে নেমে চোখের আড়ালে না যাওয়া পর্যন্ত গজম্মা পিছনের জানলা দিয়ে উৎ্কন্ঠিত 
ভাবে চেয়েছিল। এতক্ষণে যেন একটু ভরসা হল তাঁর মনে। 

ওদের বাড়িতে যারা এসেছিল তারা হল আসলে সরকারী আমীন। রেভেন্য কমিশনার 
হুকৃম দিয়েছেন রাজ্যের সমস্ত ব্যবসায়ী-জমি নতুন করে মেপে তার ম্যাপ ও তালিকা প্রস্তুত করতে 
হবে। এই মাপজোকের জন্য যে কর্মচারী নিযান্ত হয়েছিলেন তিনি স্বয়ং এসেছিলেন আমীনদের 
সঙ্গে। এরা প্রায় তিন মাস রামসন্দ্র গ্রামে তাঁবু ফেলে থেকে গেল, কারণ আশে-পাশের সমস্ত গ্রামেই 
এদের জমি মাপতে হচ্ছিল। এদের থাকার ব্যবস্থা, চৌকিদার, চাকর-বাকর সব কিছু যোগাড় 
করে দেবার দায়িত্ব গ্রামের পাটোয়ারীকেই নিতে হল। 


৯১১, 


অক্কশ্মা নিজে গাড়ি নিয়ে এসে নন্জশ্মাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল তার দ্বিতীয় বারের প্রসবের জন্য। 
এতদিনে কল্লেশের বাঁ হাতখানা অনেকটা ঠিক হয়ে গেছে। দু" হাত দিয়ে গাছের গুড়ি আকড়ে 
ধরে সে এখন গাছে চড়তে পারে। খেত-খামারের কাজ-কর্মেও সে কিছু কিছু হাত লাগাতে শুর 
করেছে । তার বৌ অবশ্য এই গ্রাম-জীবন একেবারেই পছন্দ করছে না, কিন্তু কল্লেশের পক্ষে 
সরকারী চাকরী পাওয়া আর সম্ভব নয়। কলেলশ নিজেও আর চাকরী করতে চায় না। কমলা 
কিন্তু গ্রামের জীবন যাত্রার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছে না কিছুতেই । তার স্বভাবটাই 
এমন যে, বেচারা ঠাক্মা আর তার নাতি দু'জনেই এক দ্ শান্তিতে থাকতে পারে না তার 
ভ্বালায়। 

এখন নন্জু এসেছে প্রসবের জন্য, সঙ্গে এসেছে তার আড়াই বছরের মেয়ে পার্বতী । কল্লেশ 
তাকে কোলে তুলে আদর করে প্রায়ই । সেদিন কল্লেশ খেতের কাজে চলে যাবার পর কমলা 
নিজের মনে অথচ বেশ সবাইকার শুতিগোচর ভাবেই মন্তব্য করে, “শুয়োরের মত ক্রমাগত 
বিইয়ে গেলে চলে কখনও ! শ্বশ্তর বাড়ির লোকে আঁতুড় তুলতে পারবেই না যদি তো পোয়াতি 


* শনির দশা 


৬৪ গৃহডঙগ 


হওয়া কেন বাপঃ বাপের বাড়িতে যত্র-আত্তি পাওয়া যায়, তাই বলে কি কেবল তাদেরই চুষে 
খেতে হবে £ 

কথাটা কানে যায় নন্জ্র। সে ভাবে আমার ভাগ্যটাই এমন, না জুটল ভাল শাশুড়ি আর 
না পেলাম মনের মত ভাই-বৌ। এই তো মোটে সাত মাস চলছে, প্রসব হয়ে বাচ্চা অন্ততঃ তিন 
মাসেরটি না হলে তো যেতেও পারব না। তার মানে এখনও অন্ততঃ পাঁচ-ছ" মাস থাকতে হবে 
এখানে। ও গ্রামে ফিরে যাওয়াই উচিত বোধ হয়! কিন্ত সেখানেও তো শাশুড়ি যন্ত্রণা দেবে। 
প্রসব হতে বাপের বাড়ি এসে, এখন যদি এমনি করে ফিরে যাই, কত খোঁটা যে শুনতে হবে। স্বামীও 
তো তেমন নয় যে আমার হয়ে দুটো কথা বলবে! যাক্‌ গে, বাচ্চাটা তো হোক আগে ।” ভাবতে 
ভাবতে চোখ দিয়ে টপ্‌ প্‌ করে অশ্র ফোটা ঝরতে থাকে নন্জ্র। 

কমলার কথাগুলো অন্কশ্মার কানে গেছে । ভাল মানুষ নাতনী এ বাক্যবাণ নিঃশব্দে মুখ- 
বুজে সহ্য করল। কিন্তু তার চোখের জল দেখে অক্কম্মা আর চুপ করে থাকতে পারল না, সোজা 
কমলার সামনে গিয়ে বলে বসল, “দ্বিরাগমনের পর বছর ঘুরতে চলল, এখনও তো তোর পোয়াতি 
হওয়ার কোন লক্ষণ দেখছি নে। তুই ওকে শুয়োর বলিস কোন্‌ আক্কেলে শুনি? সেই যে বলে 
না, “বাঁধেও জল নেই, পেটেও ছেলে নেই”। তোর মত পাপী মেয়েমানুষের পেটে সন্তান আসবে 
কেন£ 

“দেখ বুড়ি, তোর নাতি তো যত ছেনালের বাড়ি শুতে যায়। তাহলে আর ঘরের বউয়ের 
পেটে ছেলে আসবে কোথা থেকে শুনি £ যেমন হারামজাদা ছেলে তোমাদের, কেমন মা ওর জন্ম 
দিয়েছে কে জানে !, 

নির্লজ্জের মত কথা বলবি না বলে দিচ্ছি, ছেনাল কোথাকার ! ঘরের বৌ যদি স্বামীর কাছে 
শোয় তাহলে কি আর পুরুষ মানুষ বাইরে যেতে চায় £ তুই সত্যি মেয়েমানুষ কিনা তাতেই আমার 
সন্দেহ হয় ! 

নন্জম্মা এ সব কথা এই প্রথম শুনছে । সে তাড়াতাড়ি কাছে এসে বলে, “অক্কশ্মা, আস্তে 
বল, পাড়ার লোকে শুনতে পাবে যে? 

“আর পাড়ার লোক! এই ছেনাল মেয়েটার কীর্তি-কাহিনী জানতে কারো বাকি নেই এ গাঁয়ে । 
এখানে আসার এক মাসের মধ্যে ও আমাদের বাড়ির মান-ইজ্জত ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। 
পুকরে জল আনতে গিয়ে ও গাঁ-সুদ্ধ লোকের কাছে ঘরের কথা ঢাক পিটিয়ে বলে আসে । সদ্বংশের 
মেয়ে হলে এমন করে কেউ কখনো £ 

এই ছেনাল বুড়ি! আমার বাপের বাড়ি তুলে খোটা দেওয়া হচ্ছে? সে বাড়ির নাইবার 
ঘরের নোংরা নালার জলে স্নান করলেও তোর পুণ্যি হবে বুঝলি £ 

“অঙ্কম্মা, তুমি আর কথা বোল না, চলে এসো” নন্জু ঠাকুমার হাত ধরে ঘরের মধ্যে নিয়ে 
যায়, তারপর আবার বেরিয়ে এসে ভাজকে বলে, “বৌদিদি, একটু নিচু গলায় কথা বলতে পার না? 
এ সব ঘরের কথা বাইরের লোক শুনলে আড়ালে হাসাহাসি করবে যে ! 

“যাও, যাও, তুমি আর আমাকে শেখাতে এসো না। স্বামীর ঘরে পেট ভরে খাওয়া জোটে না 
তাই তো আঁতুড় তোলাতে এসেছ এখানে ।” 

আর কথা না বাড়িয়ে নন্জ্ও সরে যায় সেখান থেকে । এবার নিজের শোবার ঘরে ঢুকে 


গুহভঙ্গ ৬৫ 


মাদুরের ওপর আছড়ে পড়ে কমলা । ঠিক যেন গৌসা-ঘরে কৈকেয়ী-_ মাথার চুল এলোমেলো 
সির্থির সিঁদুর মোছা, ফোলা গাল আরও ফুলিয়ে মাদুরের ওপর পড়ে রইল সে। ব্যাপার দেখে 
কেউ আর ওর সঙ্গে কথা বলার চেস্টা করল না। 

কল্লেশ বাড়ি ফিরল বেলা একটা নাগাদ, এসে স্নান করল । স্ত্রীকে যে দেখা যাচ্ছে না ধারে- 
কাছে, এ ব্যাপারটা সে খেয়ালই করল না। কাজে কাজেই কমলার পক্ষেও আর সম্ভব হল না 
চুপচাগ থাকা । ঘরের মধ্যে থেকে সে বিড়বিড় করে গালাগালি শুরু করে দিল। এবার টনক 
নড়ল কল্লেশের, সে এসে দাঁড়াল আধখোলা দরজাটার সামনে । প্রতি মিনিটে প্রায় একশটা শব্দের 
বেগে গালিবর্ষণ চলেছে, বিড়বিড় করে বললেও স্পম্ট শোনা যাচ্ছে, “এই ছেনালের পুতেরা নিপাত 
যাক, বংশ লোপ হোক, ঘরদোর ধসে পড়ক! মরুক, মরুক ছেনালের পৃতরা **** এতক্ষণ 
দুপুর রোদে তেতে-পুড়ে কাজ করে এসে এইসব শুনে হেকে ওঠে কল্লেশ, এই ছেনাল, কাকে 
গাল দিচ্ছিস তুই £, 

“ছেনালের পুত, ছেনালের পুত, ছেনালের পুত --* মন্ত্রপাঠের মত করে বলে চলেছে কমলা, 
আর সঙ্গে সঙ্গে দুই হাতের আঙলগুলো এমন সশব্দে মটকাচ্ছে যে মনে হচ্ছে যেন পটকা ফাটছে। 

ধ্যাৎতেরি শা---? বলতে বলতেই ডান হাতে একখানা মোক্ষম ঘুসি বসিয়ে দিল কল্লেশ 
স্ত্রীর পিঠের ওপর। 

মুখ ফিরিয়ে সে বলে উঠল, “ওরে ছেনালের পৃত, আমাকে মারা হচ্ছে? বাঁ-হাতখানা যেমন 
পড়ে গেছে ডান হাতখানাও ওমনি পড়ে যাবে। আমার অভিশাপ না ফলে যাবে কোথায় ॥? আর 
এক ঘুসি পড়ল পিঠের ওপর। দম নিয়েই বৌ আবার চেচিয়ে আরম্ভ করল, অসুখের ছুতো করে 
আট মাস আমার বাবার অন্ন ধ্বংস করেছে, হ্যাংলা কোথাকার ! আমাকে মারতে হাত ওঠে কি 
করে? এ হাতে পোকা পড়ক।, 

ইতিমধ্যে নন্জ ছুটে এসেছে । মারধোরের শব্দ শুনে কান্না জুড়ে দিয়েছে পার্বতী । ভাইয়ের 
হাত ধরে টানতে টানতে নন্জ বলে, “ভাইয়া, তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছেঃ বৌকে কেউ 
এমন করে মারে £ যদি কিছু বিপদ ঘটে যায়? যাও এখন চুপচাপ গিয়ে খেয়ে নাও ।” 

“ছেড়ে দে আমার হাত, এই বেহায়া-বজ্জাত মেয়েকে আজ উচিত শিক্ষা দিতে হবে” এক 
ঝট্কায় হাত ছাড়িয়ে নেয় কন্লেশ। 

শায়িতা কমলা মুহৃতে জ্যা-মুক্ত ধনুকের মত খাড়া হয়ে উঠে দীঁড়ায়, পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে বলে 
ওঠে, “মারতে চাও, দেখি কত মারতে পার ! যতক্ষণ নিজের হাত না ভাঙে ততক্ষণ মেরে যাও। 
আজ তোমায় ফাঁসীতে লটকে তবে ছাড়ব আমি। যা হবার আজই হয়ে যাক, শুরু করে 
দাও মার ॥ 

নন্জ প্রাণপণ শক্তিতে এবার ভাইয়ের হাত ধরে টানতে থাকে । সেও যথেস্ট শক্তিশালিনী 
মেয়ে। এদিকে কজ্লেশও দারুণ বলবান। দু'জনেই তো কন্ঠীজোইসজীরই সন্তান। হাত 
না ছাড়িয়ে কলে্লেশ বাঁ পা তুলে এক লাথি কষিয়ে দিল কমলার কোমরে । লাথি খেয়ে লুটিয়ে 
পড়ল সে। “আর কখনও এমন করবি তো আবার শিক্ষা দেব, বলতে বলতে ঘর থেকে বেরিয়ে 
এল সে। ভেতর থেকে কমলার উত্তর শোনা গেল, “তোমাকে ফাঁসীতে চড়িয়ে ছাড়ব ।” 

এতক্ষণে খেতে বসল কল্লেশ। এই ধরনের ঘটনা এ বাড়িতে নতুন নয়, তবে আজ একটু 


৬৬ গৃহভঙ্গ 


শু 


বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে । কি করে এই বউকে শায়েস্তা করা যায় সেই উপায় ভাবতে ভাবতে কল্লেশ 
রুটির টুকরো ছিড়ে ছিড়ে তরকারীতে ডুবিয়ে দলা পাকিয়ে মুখে পুরছিল। নন্জ ওর সঙ্গে খেতে 
বসেনি। সে পরে খাবে বলে পেছন দিকে কয়োতলায় কাপড় কাচতে বসেছিল। অব্কম্মা বসে 
বসে রুটির পাত্রে জল মাখাচ্ছিল যাতে রুটিগুলো শুকিয়ে না যায়। হঠাৎ বাড়ির পেছন দিক 
থেকে নন্জ্র চিৎকার শোনা গেল, “ভাইয়া, শীগগির এসো, বৌদিদি কয়োয় ঝাঁপ দিয়েছে ।, 

মুখের গ্রাস ফেলে উধ্বশ্বাসে কল্েশ ছুটে এল কৃয়োতলায়। বয়সের ভারে ঝুঁকে পড়া অক্রশ্মাও 
যথাসাধ্য দ্রুত ছুটে এল। কয়োর কাছেই ছিল দড়ি। দড়ির একটা প্রান্ত নন্জুর হাতে ধরিয়ে 
দিয়ে অন্য প্রান্তটা কৃয়োর মধ্যে ফেলল কজ্লেশ, তারপর নন্জকে শক্ত করে দড়িটা ধরতে বলে 
সড় সড় করে দড়ি বেয়ে কয়োর মধ্যে নামতে শুরু করল সে। কয়োর উ“চ পাড়ের গায়ে পা 
লাগিয়ে প্রাণপণ শক্তিতে দড়িটা টেনে ধরে থাকল নন্জ। 

পাশের বাড়ির কপিনীপতয়াজীর স্ত্রীও শুনতে পেয়েছিল নন্জর চিৎকার। সেনিজের স্বামীকে 
খবরটা দিয়ে তাকেও যেতে বলল এবং নিজেও ছুটে এল ঘটনাস্থলে । কপিনীপতয়াজীও চিৎকার 
করে ছুটে এসেছেন এবং আশে-পাশের আরো অনেকে সেই চিৎকার শুনে এনে জমা হয়েছে। 
খবরটা যেন বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। 

কমলা একবার ভেসে উঠেই আবার ডুবে গেল। যখন ভেসে উঠেছিল, বাঁচবার চেষ্টায় 
সে দুই হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল ওপর দিকে । আসলে, মরবার জন্য তো আর সে কয়োয় ঝাঁপ 
দেয়নি। স্বামীকে কোন মতে ফাঁসীকাঠে চড়াবে ভেবেই এই কাণ্ড করে বসেছে । বাঁচবার 
বাসনা তার যথেম্টই ছিল। প্রথমটা ডুবে যাবার পরই ভেসে উঠে প্রাণভয়ে তাই চিৎকারও করে 
উঠেছিল, কিন্তু কেউ শুনতে পাবার আগেই আবার সে ডুবে গেল। এবার যেন অন্তিমবারের মত 
“মা গঙ্গা” দয়া করে আবার তাকে ভাসিয়ে তুললেন এবং কল্লেশ সঙ্গে সঙ্গে তার চুলের গোছা চেপে 
ধরল। কুয়োর পাশে তখন কপিনীপতয়াজী ইত্যাদি অনেকেই রয়েছে । কল্লেশ চেচিয়ে বলল, 
দড়িটা একটু টানো”। বাঁ হাত দিয়ে সে দড়ি ধরে আছে, ডান হাতে কমলার চুলের গোছা । সে 
এখন বুক জলে রয়েছে, আর কমলার গলাটুক শুধু জলের ওপর। বাঁ হাতে কল্লেশ দড়িটা বেশ 
শক্ত করে ধরতে পারছে না। এই অবস্থায় কেবল এক হাতে কমলার সমস্ত শরীরের ভার বেশী- 
ক্ষণ বহন করা খুব কঠিন। কৃয়োর দেওয়ালে ওঠা-নামা করার জন্য ছোট ছোট গত করা ছিল, 
সেইগুলো খুঁজে খুজে তাইতে পায়ের ভর রেখে সে নিজের অবস্থাটা কিছুটা নিরাপদ করার চেস্টা 
করল। কমলা তখন বিড়বিড় করে বলছে, “ও মাগো, আমার বড় ভয় করছে, তাড়াতাড়ি ওপরে 
তোল না!» 

ইতিমধ্যে ওপরের লোকেরা একটা ছোট রঙীন দোলনা যোগাড় করে সেটা মজবুতভাবে 
দড়িতে বেঁধে কুয়োর মধ্যে নামিয়ে দিয়েছে। দোলনাটা কাছে আসতে কল্লেশ কমলাকে উচিয়ে 
তার মধ্যে বসিয়ে দিল। এবার কল্লেশ বলল দড়ি টানতে । কিন্ত কমলা আবার ভয় পাচ্ছে, 
“না না আমি পড়ে যাব, ভয় করছে'। কল্লেশ ভাবল, “ভয়ের চোটে যদি দোলনা থেকে সত্যিই 
আমার ঘাড়ের ওপর পড়ে তো আমি সুদ্ধ মরব।” সে তখন নিজের পরনের ধূতিখানা খুলে তাই 
দিয়ে কমলাকে দোলনার সঙ্গে বেধে দিল এবং গায়ের গেঞ্জিটা খুলে পরে ফেলল কৌপীনের মত 
করে। এবার আস্তে আস্তে দোলনা ওপরে উঠতে শুরু করেছে, চারজন লোক মিলে টেনে তুলছে 


গুহভঙ্গ ৬৭ 


চপ 


দোলনাটা। যেসব গ্রামে পুকুর নেই সেখানে গৌরী উৎসবের দিনে “গীরম্মা'কে যেমনভাবে 
কয়োয় ডূবিয়ে তোলা হয়, ঠিক সেইরকমভাবে, দোলনার মধ্যে ন'গজ ধুতি দিয়ে বাঁধা কমলাও 
ধীরে ধীরে ওপরে উঠে এল । তার পেছন পেছন উঠে এল কল্লেশ। কমলা প্রচুর জল খেয়েছে। 
ভয়, ভাবনা, লজ্জা সব মিলিয়ে ওর চোখ দুটো লাল টকটক করছে । কৃয়োয় পড়ার সময় কয়োর 
দেওয়ালে ধাক্কা লেগেছিল, তার ফলে হাত, পিঠ, মাথা ইত্যাদি থেকে রক্ত পড়ছে। তাকে উপুড় 
করে শোওয়ানো হল এবং কনলেশ কোমরের ওপর চাপ দিতেই মুখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসতে 
লাগল। যেসব জায়গা কেটে-কুটে গিয়েছিল সেগুলোর রক্ত মুছে ওষুধ লাগাতে ই কমলা “বাবারে 
মারে" করে বুক চাপড়াতে শুরু করেছে। 

যারা ভীড় করে দীঁড়িয়েছিল এবার কল্লেশ তাদের উদ্দেশ্যে বলে, আপনাদের এখানে তো 
আর কিছু করার নেই, সবাই বাড়ি যান।” কিন্তু কারোই বিশেষ নড়বার ইচ্ছা নেই। অবশেষে 
অন্ধকম্মা, কল্লেশ এবং আরো দু-একজন প্রতিবেশী মিলে সবাইকে বিদায় করলেন। 

কপিনীপতয়াজীর স্ত্রী পৃষ্টম্মা বললে, গরম গরম এক ঘটি কফি খাইয়ে দাও ওকে ।' 

এ ছেনালকে আবার কফি খাওয়াবে, ওর মাকে ধরে ***” বলতে বলতে ধৃতি পরার জন্য 
ঘরের মধ্যে চলে যায় কল্লেশ। পুলিশের চাকরী করার সময় কফি খেতে শিখেছিল সে, তবে 
রোজ কফি পানের অভ্যাস ছিল না। কিন্তু হাসানের মত বড় শহরের পোম্টম্যানের মেয়ে কমলুর 
শ্বশুর বাড়িতে কফি জুটবে না এ কি হতে পারে £ হ'লই বা পাড়া-গাঁ! বাড়িতে কফি পাউডার 
ছিল। নন্জ তাড়াতাড়ি এক ঘটি কফি তৈরী করে এনে রাখল বৌদিদির সামনে । এক চুমুক 
খেয়েই ঘটিটা ঠক্‌ করে মাটিতে নামিয়ে রেখে কমলা বলে উঠল, থুঃ! এইসব গেঁয়ো মেয়েমানুষ 
কফিটাও ঠিক করে বানাতে পারে না। কফি খেতে জানলে তবে তো শিখবে !, কল্লেশ কথাটা 
শুনতে পেয়েই বেরিয়ে এল এবং ঘটি সুদ্ধ কফি তেলে দিল কমলার মাথার ওপর। এবার আর 
কোন কথা বলল না সে। কল্লেশ আবার ভেতরে ঢুকে গেছে । এবার অন্কম্মা ডেকে বলে, 
“ওঠো, উঠে শাড়ীটা বদলে নাও” । দুজন পুরুষ মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল, এখন তারাও চলে গেছে। 
শুধু কয়েকজন মহিলা রয়েছে । কিন্ত তবু কমলা উঠল না, ভিজে শাড়ীও ছাড়ল না, কুয়োতলাতেই 
গুটিসূটি হয়ে বসে রইল। 

সে রাত্রে কমলা কিছু খেল না। কলেলেশ খেয়ে নিল। নন্জুও খেতে চাইছিল না, কিন্তু 
সে পোয়াতি মেয়ে তাই অক্ম্মা জোর করেই খাওয়াল তাকে । অন্কম্মা নিজে তো বান্রে কিছুই 
খায় না। হজম হয় না বলে রাত্রের ফলাহারও সে ছেড়ে দিয়েছে প্রায় দশ বছর হয়ে গেল। 

কমলা নিজের শোবার ঘরেই পড়েছিল। অন্কশ্মা আর নন্জনম্মা দুজনকেই কল্লেশ বলে 
দিয়েছে তারা যেন বাড়ির সদর আর খিড়কি দুই দিকের দরজা আগলে শোয়। সে এক কালে 
পুলিশের চাকরী করেছে সুতরাং কমলা মাঝ রাতে উঠে আবার কৃয়োয় ঝাঁপ দিতে পারে এ রকম 
একটা আশঙ্কা তার মনে দেখা দিয়েছে । যা হোক, ওরা দুজনেই দুই দরজার সামনে শুয়েছে, 
এখন এ দরজা খুলে কারো বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়। কল্লেশ নিজে ঘরের দরজার সামনে 
বিছানা পেতে শুয়ে পড়ল কিন্তু চু করে ঘুম এল না তার। কত রকম চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক 
খাচ্ছে। নিজের বাবার ওপরেও রাগ হচ্ছিল তার, উফ্‌, কি একখানা মেয়েই যে যোগাড় করেছেন 
তার জন্য! আরো কত কথাই মনে পড়ছিল। বহুক্ষণ পরে চোখের পাতা বুজে এল তার। 


৬৮ গুহভঙজ 


হঠাৎ চমকে জেগে উঠল কল্লেশ, রান্নাঘরে মনে হল যেন আলো ত্বলছে। শুয়ে শুয়েই 
মাথা তুলে ঘরের ভেতরটা দেখল, কমলা ঘরের মধ্যে নেই । বেড়ালের মত নিঃশব্দ পায়ে সে এসে 
হাজির হল রান্নাঘরের সামনে । উনুনের সামনে বসে আছে কমলা, মাথার অবিন্যস্ত কেশরাশি 
চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। ঠাকুরের বেদীর ওপর প্রদীপ ভ্লছে। মনে হচ্ছে কমলা যেন 
কিছু খাচ্ছে। নিঃশব্দে আরো এক পা অগ্রসর হতেই দেখা গেল, সন্ধ্যারান্ত্রে যে মেয়ে রাগ করে 
অনাহারে থাকবে ঘোষণা করেছিল, সেই এখন ভাতের হাঁড়ির মধ্যেই সম্ধর ঢেলে গোগ্রাসে আহার 
করছে, মাঠার* ঘটিও রাখা রয়েছে পাশেই। 

কোন শব্দ না করে ফিরে এসে চুপচাপ শুয়ে পড়ল কল্লেশ। ক”দিন ধরেই কমলা রাগ করে 
খাওয়া-দাওয়া ত্যাগ করেছে দিনের বেলা । কিন্ত দেখা যাচ্ছে রান্তরে সবাই ঘুমোলে দে বেশ খাওয়া- 
দাওয়া করে এবং তারপর যেন কিচ্ছ্টি জানে না এইভাবে ঘুমিয়ে থাকে । সকালে উঠে হাতের 
আঙ.ল মটকে মটকে গাল দিতে থাকে, “সারাটা রাত আমাকে উপোসী রেখেছে; এদের সর্বনাশ 
হোক, ইত্যাদি, ইত্যাদি।” রান্রের ঢেকে রাখা খাবার অদৃশ্য হয়ে যাওয়াটাই কমলার “নিশা 
ভোজনের' স্প্ট প্রমাণ। তাছাড়া আজ তো কলেলশ নিজের চোখেই সব কিছু পরিস্কার দেখল। 
মনে মনে ভাবতে লাগল সে,-__-এই নীচ, চোর, ইতর মেয়েটাকে দূর করে দিয়ে আরেকটা বিয়ে 
করে ফেলাই উচিত বোধহয় । এই সময় হঠাৎ বাইরে মোটরের আওয়াজ শোনা গেল। কে 
এল, কার বাড়িতে এল, এইসব ভাবতে ভাবতেই শোনা গেল গাড়ির আরোহীরা তাদেরই বাড়ির 
সামনে নেমে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে । “কে? বলে হাঁক দিয়ে উঠে বসল কল্লেশ, তারপর প্রদীপ 
ক্রেলে দরজার সামনে শায়িতা অক্কম্মাকে উঠিয়ে দরজা খুলে দিল। দেখা গেল, কল্লেশের শ্বসুর- 
শাশুড়ী এবং তাঁদের আরো জন-চারেক আত্মীয় এসেছেন। ডাইভারটিকে চিনতে পারল না সে, 
তবে এদের দেখে বেশ অবাক হয়ে গেল কল্লেশ। 

“আমার কমলু কেমন আছে? ডুকরে ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে শাশুড়ীঠাকরুণ ভেতরে 
ঢুকলেন। 

“রান্নাঘরে গিয়ে দেখুন” জবাব দেয় কল্লেশ। 

কিন্তু রান্নাঘরে গিয়ে কাউকে দেখা গেল না। তবে ঠাক্রের বেদীর প্রদীপটা যে এই মান্র 
নেভানো হয়েছে সেটা গন্ধতে বোঝা যাচ্ছিল। “আরে, গেল কোথায় £ বলতে বলতে ঘরে এসে 
কজ্লেশ দেখে কমলা উপুড় হয়ে শুয়ে এমনভাবে ঘুমোচ্ছে যে, দেখলে মনে হবে যেন বহকাল 
তার ঘুমই ভাঙেনি। 

“দেখবেন আসুন ! আপনারা যখন এলেন তখনও রান্নাঘরে ভাতের মধ্যে সম্ধর ঢেলে খাচ্ছিল 
বসে বসে। এখন প্রদীপ নিভিয়ে চুপচাপ এসে শুয়ে পড়েছে যেন কিছুই জানে না। আপনারা 
নিজের চোখেই দেখে যান” প্রদীপ হাতে করে ও দের রান্নাঘরে নিয়ে যায় কলেলশ। 

“যাক গে, যেতে দাও । কি হয়েছিল কি? এখন ভাল আছে তো £ শ্বশ্তর মশাই প্রশ্ন করেন 
এবার। ভূতপূর্ব পুলিশ কনস্টেবল কল্লেশ এবার পাল্টা প্রশ্ন করে, “কিন্ত ব্যাপারটা কি? 
আপনারা হঠাৎ এলেন যে? 


* মাখন তোলা ঘোল। 


গৃহভঙ্গ ৬৯ 


“কমলা কুয়োয় পড়ে গেছে খবর দিয়ে আমাদের আসতে বলা হয়েছিল। তুমিই তো টেলিফোন 
করিয়েছিলে, তাই না 

“আচ্ছা, কে টেলিফোন করেছিল বলুন তো? আমি তো তাড়াহুড়োতে ভুলেই গিয়েছিলাম ।, 

“যেই করুক না কেন, তাতে হয়েছেটা কি ৮ চড়া গলায় ঘরের মধ্যে থেকে বলে ওঠে কমলা । 

এট্ুক বোঝা যায় যে টেলিফোনটা কমলাই করিয়েছে, কিন্তু কাকে দিয়ে করালো সেটা কেউ 
বুঝতে পারে না। থাক্‌, সেটা জানতে বিশেষ অসুবিধে হবে না, এই ভেবে উপস্থিত কল্লেশও 
প্রশ্নটা নিয়ে আর মাথা ঘামাল না। সে সোজা গিয়ে প্রতিবেশীদের ডেকে তুলল। মোটরের 
শব্দে সবাইকারই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। কপিনীপতয়া আর পুট্রশ্মা এবং আরো এক প্রতিবেশী 
পরিবারকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে এল সে, তারপর বলল, “আমার কথা হয়ত আপনারা বিশ্বাস করবেন 
না, তাই এ দেরই জিক্তাসা করুন। কপিনীমামা, আপনি এদের সমস্ত ঘটনা খুলে বলুন । 

প্রতিবেশীরা অবশ্য কিছু বললেন না, শেষ পর্যন্ত কল্লেশকেই সমস্ত বিবরণ দিতে হল। 
কমলাকে সে মেরেছে সে কথা অস্বীকার করল না, তবে লাথি মারার কথাটা চেপে গেল । প্রতি- 
বেশীরা সাক্ষ্য দিলেন কলেলশ যা যা বলেছে সব সত্যি কথা । শাশুড়ী সব শুনে বললেন, “তা যাই 
হোক, আমরা খাইয়ে পরিয়ে এত বড়টি করে আপনাদের গ্রামে মেয়েকে পাঠিয়েছি, আপনাদের 
তো উচিত ছিল ওকে একটু বৃঝিয়ে সুঝিয়ে মানিয়ে নেওয়া £' 

শ্বশুর মশাই, অর্থাৎ পোস্টম্যান রঙ্গন্নাজী কিন্তু চুপ করে মাথা নিচু করে বসে রইলেন। কল্লেশ 
এবার তাঁকে বলল, “আপনি এবার বলুন তো, কোন হারামজাদা আপনাকে টেলিফোন করেছিল ? 

“আমার মুখ থেকে মিথ্যা বেরোয় না। ফোনটা এসেছিল চেন্নরায়পন্টন থেকে । শুনলাম 
ওখানকার ইলেকট্রিক বিভাগের ক্যাম্প থেকে হাসানের ক্যাম্পে ফোন এসেছিল যে, পোম্টম্যান 
রঙ্গম্নাকে যেন অবিলম্বে খবর দেওয়া হয়। চিঠি বিলি করতে আমি রোজই ওদিকে যাই, তাই 
সবাই চেনে আমাকে । ইলেক্ট্রকের ফোরম্যান এসে আমাকে এইসব খবর দিয়ে বললে, কল্লেশ 
নামে একটি লোক নাকি টেলিফোন করেছিল। কি ঝামেলা দেখ দিকিন্। শুনেই নগদ পঞ্চাশ 
টাকা ভাড়ায় গাড়ি ঠিক করে ছুটতে ছুটতে এসেছি । 

“যখন এসেই পড়েছেন, সঙ্গে গাড়িও রয়েছে, মেয়েকে নিয়েই যান আপনাদের সঙ্গে, ওর এখানে 
ভালও লাগে না।' 

“তা বেশ তো, দু-চারদিন চনুক না, একটু জিরিয়ে আসবেখন" শাশুড়ীঠাকরুণ বলে ওঠেন। 

কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে শ্বশুর জবাব দেন, “না, না, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ার মধ্যে মেয়েকে নিয়ে যাওয়া 
উচিত নয়। মন-মেজাজ যখন ভাল থাকবে তখনই আসা-যাওয়া করা ভাল ।” 

তাঁর স্ত্রী তক করেন, “আমার মেয়েকে আমি দু'দিন বাপের বাড়ি নিয়ে যাব, তাতে দোষটা 
কিসের শুনি £ 

স্বামী ধমকে ওঠেন, “ক বোঝ তুমি? চুপ করে থাক দেখি। এ সময়ে যাওয়া চলে না।' 

“আমি যাবই যাব", বলতে বলতে কমলা উঠে এসে এবার মায়ের পাশে দাঁড়ায় । 

বাপ বোঝাবার চেম্টা করেন, “আমার কথা শোন মা, এখন তোমার যাওয়া উচিত নয়। 
কিন্ত মেয়ে কথাশোনার পান্রীই নয়। রঙ্গন্াজী বুঝলেন আর দেরী করা উচিত নয়, তিনি উঠে 
দাঁড়িয়ে সঙ্গীদের বললেন, “চল সব, গাড়িতে উঠে বস, এবার ফিরতে হবে ।” ওর স্ত্রী আবার 


90 04 


বলার চেস্টা করেন, “কিন্ত, আমার মেয়ে --**। রঙ্গনা রেগে বলেন, “এতদিন তোমার কথা 
শুনেই এই অবস্থা হয়েছে । এখন মুখ বন্ধ কর দয়া করে ।” সবাই গাড়িতে উঠে বসে। কমলুও 
গাড়িতে ওঠার চেস্টা করে কিন্তু র্গনাজী জোর করে হাত ধরে নামিয়ে দেন তাকে । নন্জু ততক্ষণে 
ভাইয়ের শাশুড়ীর সামনে সিঁদুর কৃঙ্কুম নিয়ে এসেছিল, কিন্তু পরিস্থিতি বৃঝে ড্রাইভার গাড়িতে তখন 
স্টাট দিয়েছে। নন্জু শুনতে পেল রঙ্গনাজী বলছেন, “শুধু শুধু পঞ্চাশটা টাকা জলে গেল, দেড় 
মাসের রোজগার ! টাকা আসবে কোথা থেকে £ 

প্রায় বিশ গজ এগিয়ে গাড়িটা থেমে গেল। শ্বস্তর মশাই ডাকলেন, “কলেলশ, একবার শুনে 
যাও।” কল্লেশ এগিয়ে গেল গাড়ির কাছে। শ্বশুর গাড়ি থেকে নেমে এসে তার হাতখানা 
নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে মিনতির সুরে বললেন, “দেখ, রাগ কোর না, লোকে দুষ্ট গরুকেও কোন 
রকমে চরায় আর গোয়ালে বেঁধে রাখে । ওর কথা না ভাবতে চাও, আমার কথা একটু ভেবে 
দেখো ।” কথাগুলো বলতে বলতে ও র দুচোখ বেয়ে উপ্‌ টপ্‌ করে জল ঝরছিল। 

এদিকে স্ত্রী, স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন, “তুমিও যেন ছেলে মানুষের মত কথা বলছ। 
সেকি এমন দোষ করেছে শুনি 2 

“কথা বলে কোন লাভ নেই, বলতে বলতে আবার গাড়িতে ওছেন রঙ্গন্নাজী। গাড়ি জোরে 
চালিয়ে দেয় এবার ডাইভার । 

প্রতিবেশীরা যে-যার বাড়ি গিয়ে শুয়ে পড়েছে । কজ্লেশের বাড়ির লোকেও শুয়ে পড়ল । 
কথা বললে তো এখন কথার পাহাড় হয়ে যেতে পারত, কিন্তু কেউই কিছু বলল না। শুধু অন্কশ্মমা 
দু-চারবার বলল, “মুখপুড়ী, একেবারে মিটমিটে শয়তান! নন্জু চিরদিনই মুখ বুজে থাকে। 
কল্লেশও একেবারে চুপ, কাজেই অক্কশ্মা আর কথা বলার সুযোগ পেল না। শ্বস্তর মশায়ের 
চোখের জল ঝরে পড়েছে কল্লেশের হাতের ওপর, সেই কথাটাই ওর মনকে বিচলিত করে তুলছে । 
সে যখন প্লেগের কবলে পড়ে, উনিই তখন নিজের সন্তানের মত স্লেহে তার সেবা যত্র করেছিলেন । 
ও'কে সে সত্যিই শ্রদ্ধা করে। নিজের স্ত্রীকে মেরে মেরে তার হাড়গোড় ছর্ণ করে দিতে ইচ্ছা 
করছিল কল্লেশের, কিন্তু শ্বশুরের চোখের জল যেন ওকে নিজের বিছানার সঙ্গে জোর করে বেধে 
রেখেছে । কিছুই সে করতে পারল না, চুপ করে শুয়ে রইল। 


মন্চ অধ্র্যানন 


প্রায় ছ"'মাস পরে এক মাঝরাতে গ্রামে ফিরে এল অগ্পন্বায়া। জেলে পাড়ার মাটার বাড়িতে এসে 
দরজায় ধাক্কা দিল সে। মাটা উঠে দরজা খুলেই অপ্পন্নায়াকে দেখে মহা আশ্চর্য হয়ে গেল, 
প্রশ্ন করল, “হুজুর, আপনি কোথায় চলে গিয্সেছিলেন £ 

“পুলিশের লোক আমাকে খোজাঙুজি করেছিল কি£ 

“কোথাকার পুলিশ, হজুর £ 

“সেই যে, সে দিন ---1? 

এতক্ষণে সমস্ত ঘটনা মাটার মনে পড়ল, সে বললে, “তারা তো, শুনলাম পুলিশের লোক ছিল 
না। তারা সব জমি জরিপ করার আমিন । এ গাঁয়ে তারা তিন মাস ছিল। তা, আপনি এতদিন 
কোথায় লুকিয়েছিলেন হজুর £ ছেলে কোথায় চলে গেল বলে মা-জী তো ভেবে অস্থির ।" 

“তাহলে আমি এখন বাড়ি যাই £ 

“হ্যা হ্যা, চলুন হুজর।" 

“ভয় করছে, তুমি এস আমার সঙ্গে । সেই মাঝরাতে মাটাকে সঙ্গে নিয়ে এসে অস্পন্নায়া 
অধীরভাবে নিজের বাড়ির দরজায় ধাক্কা দিতে শুরু করল। ভেতর থেকে প্রশ্ন হল, এত রাতে 
কে দরজা ধাল্কাচ্ছে রে £ মাটা সাড়া দিল এবার। তার গলা শুনে গজম্মা উচ্ে কেরোসিনের 
বাতি ত্রেলে দরজা খুলেই ছেলেকে দেখে অবাক, “কোথায় ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলি বাছা এতদিন £ 
বলতে বলতে চোখ দিয়ে জল পড়তে থাকে তার। মাটাও এসে বসে ভেতরে । নন্জম্মা প্রসব 
হতে নাগলাপুর গেছে । চেন্িগরায়ের ঘুম সহজে ভাঙবার নয় । গঙ্গম্মা ছেলেকে প্রশ্ন করতে 
থাকে, হ্যারে, কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ালি এতদিন £ পেট চালাতিস্‌ কি করে £ 

“আমার অত ভয়-ডর নেই। যেখানেই গেছি দিব্যি চালাকের মত থেকেছি ।” বীর পুন্র এবার 
নিজের সাহসের গল্প শোনাতে াকে, প্রথমে এখান থেকে গেলাম জাবগল্ | পথে বিদরে সন্না- 
গৌড়ের বাড়িতে গিয়ে ব্রাক্মণ বলে পরিচয় দিয়ে রান্নার বাসন চাইলাম । সে দু*সের চাল, বরবটি, 
লঙ্কার শু'ড়ো, মাখন ইত্যাদি দিল। খেয়ে-দেয়ে যা বাঁচল পুঁটিলি বেঁধে নিয়ে পৌ ছে গেলাম জাবগল্ল। 
ওখানে ছিলাম এক মাস ।” সেই পোড়ারমুখী বেঙ্কটরামের বৌ কেবলই জিক্তাসা করে, “এখন 
হঠাৎ এলে যে? গায়ে ওরা সবাই কেমন আছে £ ওরা এল না কেন খালি এইসব কথা । 
একদিন রাতে ওখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম আরসীকেরের পথে । তারপর ্ুরতে ঘুরতে বাণাবর, 
কড়ুরু হয়ে শেষে পৌ'ছলাম শিবমোগগা । সেখানে নদীর ধারে আছে বেক্কিন কঠললন মঠ । সেখানে 
থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে। 

“খাওয়ার কি ব্যবস্থা করলি £, 


৭২ গৃহভঙ্গ 


“ওখানকার ইস্কুলের লোকেরাই বলল যে, তারা লিঙ্গায়েত, কাজেই আমি তাদের রানা খেতে 
পারব না। তা, সে গাঁয়ে একটা পাড়া আছে, সেটা “বড় ব্রাক্মণ পাড়া'। সেখানে সব বড় বড় 
লোকেরা থাকে । সেখানে রোজ ভিক্ষা পাওয়া যেত। মা, তুমি যাই বল না কেন, যত ভাল 
রান্নাই হোক, ভিক্ষান্নের কাছে কিছুই লাগে না। ভিক্ষার ঝুলি ভরে ভাত আর পান্র ভরে সম্বর 
নিয়ে এসে নদীতীরে একখানা পাথর ধুয়ে তারই ওপর ঢেলে দিব্যি খেয়ে নিতাম । 

“ভিক্ষান্ন কাকে বলে হুজুর £ মাটা জিক্তাসা করে। 

ঠিক খাওয়ার সময় সব বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলতে হয় “ভবতি ভিক্ষাং দেহি” যে 
দেখবে সেই এসে ঝুলিতে ভাত, আর ভিক্ষার পাত্রে সম্ধর, কটি, শাক, চাটনী যা হোক দিয়ে যাবে। 
ব্যস, সেইসব একসঙ্গে মেখে খাও, সে ভারি চমৎকার লাগে রে। 

“তা চমৎকার তো লাগবেই, সেই কথায় বলে না, পরের বাড়ির কড়ি আর রাঁড়ের বেটি দু-ইই 
বেশী ভাল লাগে'__বলতে বলতে জিবে জল এসে যায় মাটার। 

“সেই হতচ্ছাড়া শিবমোগ্গা গ্রামে দিনের পর দিন ভাত খেয়ে খেয়ে মুখে অরুচি ধরে গেছে 
মা, আমাকে মড় য়ার রুটি করে দাও, পেটে যেন আগুন ভ্কলছে।' 

“এত রাতে £ 

“আজ রাতে তো আমার খাওয়াই হয়নি ।” 

“সে ছেনাল দুটোর একটাও যদি এখানে থাকত তো করে দিতে বলতাম, এখন যে কেউ নেই। 
তোর বৌয়ের মেয়ে হয়েছে অপ্পন্না, নামকরণের সময় নিমন্ত্রণ এসেছিল, সে আজ চার মাস হয়ে 
গেল। যা, এবার গিয়ে বৌকে নিয়ে আয়, রাঁধতে রাঁধতে আমার প্রাণ গেল*__ বলতে বলতে উঠে 
পড়ে গজম্মা। 


হ্‌ 


প্রথম দিন-চারেক অপ্পন্নায়া বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ালো গ্রামের পথে পথে, তারপর স্ত্রী ও শিশু- 
কন্যাকে আনতে নুগ্গীকেরের উদ্দেশ্যে রওনা হল। পুটলিতে রুটি আর চাটনী বেঁধে নিয়ে, হেটে 
তিপটুর পথন্ত গিয়ে ট্রেন ধরে কডুর পৌ'ছল, তারপর আবার ন"মাইল হেঁটে শেষ পর্যন্ত এসে 
পৌছল শ্বশুর বাড়ির গ্রামে । তার মেয়ের বয়স এখন চার মাস, তার নাম রাখা হয়েছে জয়লক্ষমী। 

অপ্পন্নায়া যখন পৌঁছল তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। দেখা গেল সাত এখনও সূতিকাগূহেই 
রয়েছে। শিশুকে কোলে নিয়ে আদর করল অপপনায়া, স্ত্রীর সঙ্গেও কথাবাতা হল । কিন্তু রাতে 
খাওয়া-দাওয়ার পর মাঝের ঘরে শ্বশুরের বিছানার পাশে তার বিছানা পাতা হয়েছে দেখে মন 
খারাপ হয়ে গেল বেচারার। বিছানায় এসে বসার পর শ্বশুর জিজ্ঞাসা করলেন, “নামকরণের 
সময় নিমন্ত্রণ পাঠিয়েছিলাম, কোথায় গিয়েছিলে তখন £, 

এশিবমোগ্গা, না, না জাবগল্ল।? 

“এ সময় স্ত্রীর প্রসবের দিন পড়বে তা কি জানতে না£ কাউকে কিছু না বলে হঠাৎ গ্রাম 
থেকে কোথায় চলে গেলে £ 

একটু কাজ ছিল ।” 


গুহভঙ্গ ৭৩ 


আঁতুড় ঘর থেকে সাতু বলে উঠল, “কি এমন কাজ ছিল, বাজে কথা বলছে কেন? সত্যি 
কথাটা বলুক না! বৌদিদিকে লাথি মেরে তারপর পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে গাঁ থেকে 
সরে পড়েছিলে, তাই নাঃ 

কোন উত্তর না দিয়ে অপ্পন্নায়া মাথা নত করে বসে রইল। সাতু আবার বলল, “তোমার 
মায়ের কথাতে লাখি মেরেছিলে, তাই নাঃ এ কদুলে মেয়েমানুষটি মরলে তবে যদি তোমার 
আক্কেল-বুদ্ধি ঠিক হয় ।” 

নিজের মায়ের নিন্দা স্তনে খুবই রাগ হচ্ছিল অপপনায়ার, কিন্তু এ সময় কিছু করা সম্ভব নয়। 
বৌদিদির মত ভাল মানুষ শান্ত স্বভাবের মেয়ে সাতু মোটেই নয়। কাজেই উপস্থিত অপ্পনায়া চুপ 
করে রইল। ঘরের মধ্যে থেকে সাতু আবার বলে ওঠে, “তোমার মায়ের সঙ্গে, এক সঙ্গে আমি 
থাকতে পারব না, বাড়ির পেছনে যে খালি জায়গাটা আছে সেখানে ছোট-খাট একখানা ঘর তোল 
আগে, তারপর আমাকে আর বাচ্চাকে নিয়ে যেও। আমরা আলাদা থাকব । 

“সে কি করে হবে? কোনমতে গলাটা সাফ করে বলে অপ্পন্ায়া । 

“না হবার কি আছে? খুব ছোট-খাট ঘর তোল, দুই ভাই সব কিছু ভাগ করে নাও । বিয়েতে 
যে বাসন-পন্্র পেয়েছি তাতেই কাজ চলে যাবে, না হয় আরো কিছু নিয়ে যাব ।, 

অপ্পন্নায়া কোন উত্তর দেয় না। সাতু এবার বলে, “তোমাদের আলাদা হবারও দরকার 
নেই, দুই ভাই এক সঙ্গেই থাক। আমি দিদির সঙ্গে বেশ থাকব। কিন্ত তোমার মাকে আলাদা 
থাকতে হবে। ও"র জন্য আলাদা একখানা ঘর করে দাও, তারপর এসে আমাকে নিয়ে যেও । 

মাপের নিন্দা শুনতে শুনতে অপ্পন্নায়ার মুখ-চোখ রাগে লাল হয়ে উঠেছে দেখে তার শাশুড়ী- 
ঠাকরুণ এবার কথা বলেন, “আমাদের অপপন্ায়ার স্বভাবটা বড় ভাল। সাতু তো সর্বদাই বলে 
ও একেবারে খাঁটি সোনা। তা শাশুড়ী বৌতে যদি বনিবনা নাই হয় তাহলে তোমরা না হয় 
আলাদাই থাক । সাতু না হয় তোমার মায়ের ঘরের কাজকর্মেও কিছুটা সাহায্য করে দেবে ।' 
কথাগুলো শুনে এবার অপ্পন্নায়ার মুখটা খুশি খুশি হয়ে ওতে। 

এতক্ষণে শ্বস্তর মশাই বলেন, “আসল কথা হল, তোমাদের স্বামী-্ত্রীর সুখে-শান্তিতে থাকা 
দরকার। ভোর না হতেই উনি “ছেনাল", “রাঁড়” এইসব কৃৎসিত গালিগালাজ যাতে শুরু না করেন 
তার উপযুক্ত ব্যবস্থা করে তারপর স্ত্রীকে নিয়ে যেও। আমার তো এ সবেধন নীলমনি একটিমাত্র 
মেয়ে। এখন তো আমার কাছে ছেলেও নেই মেয়েও নেই। 

অপ্পন্নায়া আট দিন থেকে গেল শ্বশুর বাড়িতে । এ ক'দিন সে স্ত্রীকে গালিগালাজ করেনি 
রং খুশি হয়ে শিশুকে আদর করেছে, খেলা দিয়েছে । কিন্তু তার উদ্ধত দাস্তিক স্বভাব সবাইকার 
চোখেই বেশ বিসদূশ লাগে । একদিন সাতু নারকেলটা ঠিক করে ভাঙতে পারেনি দেখে রেগে 
গিয়ে অপ্পন্নায়ার মুখ দিয়ে “তোর মায়ের **-* কথাটা বেরিয়েই গেল। আরেক দিন বাগানে 
গরুটা যেই শিং নাড়া দিয়েছে সে বলে বসল, “দুত্তোর, তোর মায়ের ****॥ শাশুড়ী কাছেই 
ছিলেন, কথাটা তাঁর কানে গেল। এ ছেলেকে শুধরে ফেলা অতি কঠিন তা তিনি বুঝেছিলেন। 
মেয়ের ভাগ্যের কথা ভেবে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়ল তাঁর। 

গ্রামে ফিরে আসার দিন খাওয়া-দাওয়ার সময় সাতু আবার আলাদা থাকার কথাটা পাড়ল। 
অগ্পন্নায়া সম্মতি দিয়ে ফেলল এবার। এরপর কড়ুর পর্যন্ত হেটে এসে ট্রেন ধরল। তিপটুরে 


৭৪ গুহভঙ্গ 


এসে নামল ট্রেন থেকে । এরপর বাড়ি পর্যন্ত আবার ষোল মাইল হাটা-পথ। আজকাল মুদালিয়র 
কোম্পানী অবশ্য বাস চালাতে শুরু করেছে, কিন্তু সেও দুদিনে একবার, অর্থাৎ সোম, বুধ আর 
সুকুবারে চলে। বাসে চড়ার মজাটা কি রকম তা অপ্পন্নায়া ইতিমধ্যেই একদিন চেখে দেখেছে, 
তার একটুও ভয় করেনি । যে একলা ট্রেনে ঘোরাফেরা করে, মোটরে তার আবার ভয় কিসের £ 
কিন্তু আজ শুকবারের সন্ধ্যা, কাজেই আগামী দুদিন মোটর চলবে না। অবশ্য পায়ে হাটা এমন 
কিছু কঠিন কাজ নয়, কিন্তু মোটরে চড়ার মজাটা তো মাটি হল ! 

সন্ধ্যা হয়ে গেছে দেখে অপ্পন্নায়া তিপট্ুরেই থেকে গেল। হোটেলে গিয়ে “আলুকান্দা” সম্বর, 
বেগুনের তরকারী, পাঁপড়, কতী, মাঠা সব কিছু দু*তিনবার চেয়ে চেয়ে ঠেসে খাওয়া-দাওয়া করতে 
খরচ হল ছ'আনা। ধর্মশালার বারান্দায় রাত কাটিয়ে সকালে পুক্রপাড়ে প্রাতঃকৃত্য সেরে সে 
আবার গেল হোটেলে, এবারে খেল একটা মশলা-দোসা। শিবমোগগাতেও সে দুদিন দোসা খেয়েছে 
কিন্তু তার স্বাদ এত ভাল ছিল না। কাঁচা লঙ্কা, নানা রকম মশলা, আলু, চাটনী ইত্যাদি দেওয়া 
ঝাল ঝাল এই দোসা তার এতই অপূর্ব লাগল যে, পর পর আরো ছ*খানা দোসা খেয়ে ফেলল সে। 
খরচ হল সাত আনা। এবার পাকদণ্তভীর পথ ধরে রওনা হয়ে পড়ল রামসন্দ্র গ্রামের উদ্দেশ্যে । 
মাইল দুই পথ চলতে চলতেই দারুণ পিপাসা বোধ করতে লাগল সে। মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল 
গালাগালি, “দুত্তোর, তোর মায়ের -** এ সেই দোসা খাওয়া তেস্টা, এতক্ষণে জানান দিচ্ছে । 
এবার সে রাস্তার ধারে কোন নারকেল গাছ আছে কিনা খুঁজতে লাগল, কিন্তু একটাও নজরে পড়ল 
না। অগত্যা চুপচাপ বেড়া টপকে কারো বাগানে ঢুকে একটা ছোট গাছ থেকে গোটা তিনেক ডাব 
পেড়ে নিল। একটা কাঠের টুকরো দিয়ে ডাব ফুটো করে ঢক্তক্‌ করে জল খেয়ে কোন মতে 
তৃষ্চা মিটল। ভেতরকার কচি শাঁসটাও খাবার ইচ্ছা ছিল খুবই কিন্তু ধরা পড়ে যাবার ভয়ে 
তাড়াতাড়ি বেড়া টপকে পথে এসে এবার জোর পায়ে বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করল সে। পথে 
গরু চরাচ্ছিল এক গোয়ালা, তার কাছ থেকে জ্টে গেল একটা বিড়ি। অপ্পনায়া কখনো বিড়ি 
কিনে খায় না। আখের খেতে আগুন লাগাবার পর অনেকদিন বিড়ি খাওয়াই ছেড়ে দিয়েছিল, 
কিন্তু এখন বিনা পয়সায় বিড়ি জুটে গেলেই টান দিয়ে শেষ করে ফেলে । 


৩ 


বিকেল চারটে নাগাদ গ্রামে পৌ'ছল অপ্পন্নায়া। সে বাড়িতে পৌ'ছবার কিছুক্ষণ আগেই প্যাটেল 
শিবেগৌড় ও তার শালা ভুতপৃব পাটোয়ারী শিবলিঙ্গে গৌড় এসে বসেছিল তাদের বাড়িতে । 
অপ্পন্নায়া বাড়ি ুকতে না তুকতেই কথা শুরু করল সে। বলল, গঞ্জশ্মা, দেখো অপ্পনায়াও 
ঠিক এমন সময়ে এসেছে যেন ওকে ডেকে আনা হয়েছে । তা যাক, আমার টাকাটার কি করলে £ 
ভুলেই গিয়েছ নাকি £ 

প্রথমটা মিনিট দুই গম্মা তো বুঝতেই পারল না কোন টাকার কথা বলা হচ্ছে। শিবে- 
গৌড় এবার মনে করিয়ে দিল, “মূলধন দু'হাজার, সাত বছরের সুদ এক হাজার আটশ' আশী। 
এতকাল ধরে সুদটাও তো দাওনি, সেই সবের হিসেব ধরলে আরো ছ'শ টাকা । সব মিলিয়ে 
মোট আমার পাওনা হল চার হাজার ছ'শ আশী টাকা । আজ থেকে এক মাসের মধ্যে আমার 


গৃহভঙ্গ ৭৫ 


টাকা দিয়ে দিও। জময় বহুদিন পার হয়ে গেছে। টাকা না পেলে এবার আমাকে কোর্টে যেতে 
হবে। 

“ছেলেমানুষ অসাবধানে কবে কি করে ফেলেছিল তারজন্য এখন আমি এত টাকা কোথায় 
পাব শিবেগৌড় £ 

“ছেলেমানুষে করেছে! আর আমি যে টাকাটা দিয়েছিলাম সেটা কি মিথ্যে £ কি বলতে 
চাও তুমি£ চেন্নেয়া, তুমি তো পাটোয়ারীগিরি কর, তুমিই বল, আমি যে টাকা দিয়েছিলাম সেটা 
তো আর মিথ্যে নয় ?£, 

চেন্নিগরায় চুপ করে রইল । “আজ থেকে আট দিনের মধ্যে টাকা না পেলে আমি কেস্‌ করব। 
তখন আমার আর কোন দায়িত্ব থাকবে না তা বলে যাচ্ছি কিন্তু, হঃ *... বলতে বলতে শিবেগৌড় 
শালাকে নিয়ে উঠে চলে গেল। 

এখন কি হবে চেন্নৈয়া £ জিজ্ঞাসা করে গঙ্ম্মা। 

“আমি কি করে জানব মা? 

“তুই পাটোয়ারী, তুই কিছু জানিস না 

অপ্পন্নায়া বলে ওঠে, “দেখা যাক কি করে ও টাকা নেয়। সোজা বলে দাও “দেব না।: 

“তাই বলে দেব £ 

হ্যামা!।, 

“আগে খেতে দাও মা, বেজায় খিদে পেয়েছে। ও আমাদের কি কেড়ে নিতে পারে সে কথা 
পরে ভাবা যাবে । অপ্পন্নায়ার কথা শুনে গঙ্শ্মা উঠে ভেতরে যায় খাবার পরিবেশন করতে । 

এই ব্যাপারে কার সঙ্গে পরামর্শ করা যায় সেই কথাই ভাবছিল গঙ্গশ্মা। হঠাৎ মনে পড়ল 
রেবন্নাশেট্রীর কথা । গাঁয়ের লোকে তো রেবন্নাশেট্রীকে উকিল বলেই ডাকে । কত রকম মামলা 
নিয়ে সে প্রায়ই তিপটুর যায়। লোকে বলে. বড় বড় উকিলরাও যেসব কথা বোঝেন না, রেবন্া 
তা পরিস্কার বৃঝে ফেলে। গল্ম্মা সোজা গিয়ে হাজির তাঁর বাড়ি। কিন্তু রেবন্নাশেট্রীর স্ত্রী 
বলে, উনি তো এখানে নেই, কোডীগ্রাম গিয়েছেন ।, 

“কি করতে গেছেন £ 

“ওঃ আপনি জানেন না বুঝি গজম্মাজী ?” 

“তাস খেলতে বুঝি £ আন্দাজে বলে গজম্মা। 

“তা আপনি হঠাৎ এলেন যে£ বসুন বসুন, মাদুর পেতে দিই” 

শুছিয়ে বসল গঙ্গম্মা। শিবেগৌড়ের আগমন এবং জমি বাঁধা দেওয়ার ইতিবৃত্ত জানাল সে। 
সবক্ধা শুনে বলে উঠল, “জমি বাঁধা দেওয়ার কথা তো গাঁসুদ্ধ লোক জানে। অনেক আগেই ও 
টাকা শোধ করে দেওয়া উচিত ছিল। এতদিন চুপচাপ বসেছিলেন কেন £ 

“দু'্চার টাকার ব্যাপার তো নয় ঠ কোথা থেকে দেব অত টাকা £ 

এরপর আর কি বলা যায় ভেবে পেল না সর্বক্কা। তার বয়স মোটে তিরিশ বছর, পাঁচটি 
সন্তানের মা হয়েছিল, তার মধ্যে তিনটি ইতিমধ্যেই গত হয়েছে । গত দু" বছর থেকে সে আর 
অন্তঃসত্ত্বা হয়নি। সেই যখন অগ্পন্নায়া আখের খেতে আগুন লাগায়, সেই সময় তার স্বামী 
আখের খেতের ডাঁটাগুলোর জন্য পঁচিশ টাকা ক্ষতি পূরণ পেয়েছিল এটুকু তার মনে আছে। যে 


৭৬ গৃহভজ 


লোকটা আগে বলেছিল, “আর কখনও আখের ডাঁটগলো খেতে ফেলে রাখব না, অন্য কিছু চাষ 
করব” সেই আবার যখন এ ডাঁটার জন্য পয়সা আদায় করে তখন সবক্কা প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিল 
যে, এটা অন্যায় হচ্ছে । তার ফলে তাকে গালে চড় খেতে হয়েছিল তাও মনে আছে। 

কিছুক্ষণ এটা সেটা নিয়ে আলাপ করার পর রেবন্নাশেন্টী এসে পৌ'ছল । রেবন্নার পরনে বকের 
পালকের মত সাদা ধপধপে ধূতি, ইস্ত্রি করা কামিজ, পায়ে রবারের চটি, গলায় সোনার হার দেখা 
যাচ্ছে, হাতের আঙুলে ঝকঝক করছে তিনটে লাল পাথর বসানো আংটি, মুখের ওপর দিব্যি বাহার 
দেওয়া গোঁফ জোড়া-_-এইসব দেখে শুনে গঙ্গশ্মার দুঢ বিশ্বাস হল শিবেগৌড়ের মামলাটা এ নিশ্চয় 
জিতিয়ে দিতে পারবে । 

সব কথা শুনে রেবন্না বলে, এ তো মহাঅন্যায় কথা! ব্যাটা কি ভেবেছে কি£ কোটে' 
যাব বলেছে £ ওকে বলে দিন, “যাও, গিয়ে দেখ আমার কাছে কি আদায় করতে পার।" 
তিপটুরের বড় বড় উকিলদের সঙ্গে আমার চেনা আছে ।, 

আশান্বিত হয়ে গশ্মা বলে, “তবে তাই বলে দিই ওকে গিয়ে, ঠিক বলছ তো রেবন্না £ 

হ্যা, হ্যা বলে দিন। কোন ভয় নেই। এরপর কি করতে হবে সে আমি দেখছি । 

“তুমিও চল না আমার সঙ্গে £ 

“না, না, আমার যাওয়াটা ঠিক হবে না। আমাকে আড়াল থেকেই কাজ করতে হবে। 
আপনি ভয় পাচ্ছেন কেন£ জানেন, লোকে বলে, গঙ্গম্মার মত সাহস আশে-পাশের চৌষ টা 
গাঁয়ের কোন হারামজাদা পুরুষের নেই! ভয়টা কিসের আপনার ?, 

এই কথায় চমৎকার কাজ হল। “আমি তেমন ভীতু ছেনাল মেয়েমানুষ নই” বলতে বলতে 
উঠে দাঁড়াল গম্মা, তারপর সোজা শিবেগৌড়ের বাড়ির সামনে গিয়ে জোর গলায় শুরু করল, 
“আমার স্বামী যখন পাটোয়ারী ছিলেন তখন তুমি তো ছিলে একটা পুঁচকে ছেলে, তাই না গৌড়? 
আর আজ তুমি আমার ঘাড়ে অন্যায় জরিমানা চাপিয়ে দিয়ে এখন কোটে” যাবার ভয় দেখাচ্ছ ! 
কোর্ট কেন, একেবারে দেওয়ানজীর দরবার পযন্ত চলে যাও। আমিও উকিল লাগাচ্ছি। এক 
পয়সাও তুমি পাবে না আমার কাছে! মেয়েমানুষ বলে আমি কি কাউকে ভয় করি নাকি £, 

শিবেগৌড় বাইরে এসে প্রশ্ন করে, “ব্যাপার কি গঙ্গম্মা £ এইতো দু" ঘন্টা আগে দিব্যি ন্যায্য 
কথা বলছিলে, এর মধ্যে আবার উল্টো গাইছ কেন £ 

“কেন গাইব না শুনি£ বিপদে আপদে আমাকেও সাহায্য করার লোক আছে । আমি তো 
আর এ গায়ে বিদেশী নই!” কথাগুলো শুনিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে এল গঙ্গম্মা। 

এসে দেখে রেবন্নাশেট্টী ইতিমধ্যেই এসে বসে আছে। গজম্মার মুখ দেখেই শেট্রী বুঝে 
ফেলল শিবেগৌড়ের সঙ্গে কি ধরনের বাক্যালাপ হয়েছে তার। সে বলল, “গঙ্গশ্মাজী, দুই ছেলেকে 
নিয়ে গরুর গাড়ি করে বার চারেক আপনাকে তিপট্রুর যাওয়া-আসা করতে হবে। জজ সাহেবের 
সামনে বেশ স্পম্ট করে জানাবেন এটা কতখানি অন্যায়, তাহলেই মামলার রায় আপনার সপক্ষে 
হবে দেখবেন। সব মিলিয়ে শ'পাঁচেক খরচ পড়বে আপনার ।” 

অপ্পন্নায়া জানতে চাইল, “তিপটুরে খাওয়া-দাওয়ার কি হবে £ 

“কেন হোটেল নেই নাকি £" 

হোটেলের নাম শুনেই জিভে জল এসে গেল অপ্পন্নায়ার। আহা, সেই আলুকান্দা, সম্বর, 


গৃহভঙ্গ ৭৭ 


ভাজা ছোলা মেশানো সুগন্ধী চাটনী, ঘোল তারপর জলখাবারে মশলা দোসা। সে চট করে সিদ্ধান্ত 
নিয়ে ফেলল, “রাজি হয়ে যাও মা, তিপটুরে গিয়ে কেস্‌ লড়া যাক । 

মা এবার জানতে চায়, 'পাটোয়ারীর কি মত £ চেন্নিগরায় জবাব দেয়, “কোন বিক্ত লোককে 
জিজ্ঞাসা করা উচিত? 

যাক, শিবেগৌড় তো মামলা ঠুকে দিল। এরা তিনজনে রেবন্নাশেট্টীর সঙ্গে তিপটুরে গিয়ে 
তার নির্দেশমতই উকিল নিযুক্ত করল মহাস্তায়াজীকে। মামলাটা রেবন্নাশেট্রী তাঁকে এইভাবে 
বোঝাল যে,_গ্রামের কিছু লোক মিলে আখের খেতে আগুন লাগিয়েছিল, তারপর এই অনভিজ্ত 
বেচারাদের ঘাড়ে জরিমানা চাপিয়ে দেওয়া হয়। এদের পৈতৃক সম্পত্তি বন্ধক রাখানো হয়, 
তাতে সই করেছে নাবালক পুন্র। বন্ধকের সমস্ত কাগজ-পন্র তৈরী করিয়ে সই করিয়ে নিয়েছে 
এবং তার জন্যও পয়সা নিয়েছে এ অভিযোগকারীর নিজের শালা। এইসব মাল-মশলা থাকা 
সত্ত্বেও কি এ কেস্‌ জেতা যাবে না হুজ্র£ 

“না জিতে ছাড়ব নাকি ৮ জবাব দেন উকিল বাবু। 

প্রথম দিনের খরচের জন্য সোনার গহনা বিকী করে এরা দু'শ টাকা যোগাড় করেছিল । 
রেবন্নাশেট্রী তারমধ্যে একশ" পচাতর টাকা চেয়ে নিয়ে গেল, কারণ উকিল বাবু নাকি সবাইকার 
সামনে পয়সা নেবেন না। সে একাই উকিলের বাড়ি থেকে হিসাব-পন্র মিটিয়ে ফিরে এল । 
অপ্পন্নায়া হোটেলে দুপুরে খেতে গিয়ে তার সঙ্গেই খেয়ে ফেলল তিনটে মশলা দোসা। আর 
পাটোয়ারী চেনিগরায়তো হোটেলের সম্বন্ধে সবই জানে। বছরে অন্তত চারবার দাবরসায়াজীর 
সঙ্গে তিপটুরে আসতে হয় তাকে । সে মৈশুর পাক, সুজির লাড্ডু ইত্যাদি মিষ্টি-মিঠাই খেল 
পেট ভরে। বিধবা গঙ্গশ্মা গ্রাম থেকে এনেছিল ছাতু আর কলা, তাই দিয়েই সে সেরে নিল 
ফলাহার। 


৪ 


নন্জুর এবার ছেলে হয়েছে । চেন্নিগরায় নামকরণ" উপলক্ষ্যে এসেছিল, সে তার স্বর্গাঁয় পিতার 
নাম অনুসারে ছেলের নাম রেখেছে “রামন্না'। তার মা তাকে এই নামই রাখতে বলে দিয়েছিল। 
এবার কিন্তু বেশীদিন শ্বশুর বাড়িতে থাকল না চেন্নিগরায়। শালা কল্লেশকে দেখলেই ওর কেমন 
ভয় করে। তাছাড়া, কল্লেশের বৌ কমলাও ভারি খিটখিটে মেজাজের মেয়ে । 

প্রসবের তিন মাস পরে শ্বস্তর বাড়িতে ফিরে এল নন্জ। এখানে আসার পরের দিনই প্যাটেল 
শিবেগৌড়ের সঙ্গে মামলা চলার খবরটা শুনল সে। শিবেগৌড়ের কাছে ধার নেওয়ার কথাটা 
সে আগেও শুনেছিল। আখের খেতে আগুন লাগানোর জন্য গাঁয়ের লোকেদের ক্ষতিপূরণ দিতে 
হয়েছিল। তারজন্য জমি বাঁধা রেখে দু* হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে, এসব কথা সে নতুন বৌ 
হয়ে আসার পরই গ্রামের পুকুর-ঘাটে বাসন মাজতে মাজতে প্রতিবেশিনীদের মুখে শুনেছে । বাড়িতে 
এসব কথা কাউকে জিক্তাসা করা সম্ভব ছিল না। একদিন স্বামীকে জিজ্তাসা করে উত্তর পেয়েছিল, 
“বেশী ওস্তাদি মারতে এস না, একদম চুপচাপ থাকবে । 

পাটোয়ারীর হিসাব লেখা শুরু করার পর থেকে সে বেশ বুঝতে পারছিল এইভাবে জমি বাঁধা 


৭৮ গৃহভঙ্গ 


দিয়ে খণ করার পরিণাম কি হতে পারে। এ সম্বন্ধে একদিন আলোচনা করা দরকার এটা তার 
প্রায়ই মনে হত। কিন্তু ঠিক এই সময়ই অপ্পন্নায়া তাকে লাথি মেরে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে 
গেল। এরপর শাশুড়ী কমাগত বলতে শুরু করলেন, “এ হতচ্ছাড়ি, রাক্ষুসীর জন্যই আমার 
কোলের ছেলেটা বিবাগী হয়ে গেল গো” সুতরাং এই সময় ওসব কথা তুললে আবার হয়ত 
প্রচুর গালা-গাল শুনতে হবে সেই ভয়ে সে চুপ করেই রইল। তারপর তো প্রসবের জন্য বাপের 
বাড়ি চলে যেতে হল। ফিরে এসে শুনল কোটে কেস্‌ চলছে। কি ব্যবস্থা হবে জিক্তাসা করাতে 
স্বামী মহাদাপটের সঙ্গে জবাব দিল, “ব্যাটাকে এক পয়সাও দেব না আমরা, উল্টে কোট থেকে 
হুকুম করিয়ে ওর কাছ থেকেই পয়সা আদায় করব? । 

“কিন্ত মামলায় তোমরাই যে জিতবে এমন কথা কে বলেছে £ 

“বলেছে রেবন্নাশেট্রী ।, 

“রেবন্নাশেট্রীর কথায় বিশ্বাস করলে £ তোমরা কি জান না সে কি ধরনের লোক £, 

“লক্ষমীছাড়ি ছেনাল কোথাকার ! তাকে গাল দিস তুই£ দাঁড়া কালই ওকে বলে দেব, 
তুই এইসব কথা বলেছিস, তারপর দেখ্‌ কি হয়।, 

স্বামীর যে বুদ্ধি-বিবেচনা নেই এটা নন্জু তো জানেই। কিন্তু তবু এই সীমাহীন অবিবেচনা 
দেখে তার দুই চোখ জলে ভরে ওঠে । আর কথা বাড়ায় না সে। কিন্ত মনে মনে চিন্তার শেষ 
থাকে না তার-_-“সবাই বলে রেবন্নাশেট্টী মদ খায়, তাস খেলে, পথে-ঘাটে মেয়েদের ওপর কুদুষ্টি 
দেয়, ঘরে তার বৌ সবক্কা মোটেই সুখী নয়, এসব কথা তো সারা গ্রাম জানে । পরের দিন পুকুর- 
ঘাটে বাসন মাজতে গিয়ে নন্জু দেখল রেবন্নাশেট্টীর বড় মেয়ে রুদ্রাণী ওর পাশের পাথরটায় 
বসেছে। জিজ্ঞাসা করল, “রুদ্রাণী, তোমার মা বাড়িতে আছে £ 

হ্যা, আছে) 

“আর, বাবা কোথায় £, 

“বাবা কোডীহল্লী গেছে। সবাই জানে, তার মানে সে গেছে জয়া খেলতে । 

“যা দেখি, চট করে একবার বাড়ি গিয়ে তোর মাকে ডেকে নিয়ে আয়। বলিস, আমি ডেকেছি, 
বাসনগুলো এখানে থাক, আমি নজর রাখছি । তুই বাড়িতে থাক্‌, আর মাকে এখানে পাঠিয়ে দে ।” 

মিনিট দশেক পরে সবক্লা এল। প্রথমে দু-একটা কশল প্রশ্নের পর নন্জম্মা চারদিকে চেয়ে 
ভাল করে দেখে নিল কেউ কোথাও আছে কি না, তারপর চুপিচুপি বলল, “শুনুন, একটা বিশেষ 
গোপনীয় কথা জানতে চাই, আপনি বলবেন কি £ 

কি কথা শুনিই নাঃ, 

“আপনার কর্তা তো আমাদের বাড়ির এদের মামলা লড়তে পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্ত এ 
মামলায় সত্যিই কি জিত হবে £ 

“নন্জম্মা, ওসব পুরুষ মানুষদের ব্যাপার, আমি কি ওসব বুঝি £ আমাদের ও কথায় 
কাজ কি? ছেড়ে দাও ওসব চিন্তা ।” 

“না, না, আপনি যা কিছু জানেন আমাকে বলতেই হবে । 

সবক্কাও ঘাড় ঘুরিয়ে একবার চার-পাশটা দেখে নেয়, তারপর বলে, আমার বাড়ির লোক টের 
পেলে আমাকে খুন করে ফেলবে । তুমি মা গঙ্গার নামে দিব্যি কর যে কাউকে কিছু বলবে না?” 


গৃহভঙ্গ ৭৯ 


শু 


পুকুর থেকে অঞ্জলি ভরে জল নিয়ে নন্জম্মা বলে, “মা গঙ্গার নামে শপথ করছি কাউকে 
বলব না।' 

“বল্গেরল্লীর নিগপ্পাদের বাড়িতে যখন ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া বাধে, ইনিই উকিল ঠিক করে 
দিয়েছিলেন। লোকে বলে তাদেরও জিতিয়ে দেবেন বলে অনেক পয়সা নিয়েছিলেন, কিন্ত শেষ 
পর্যন্ত মামলায় হার হল। তারপর তারা এসে একদিন আমাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বাপ মা 
তুলে গাল-মন্দ করে গেল, ছেলে-পেলেদের শাপমন্যি দিয়ে মুঠো মুঠো ধুলোমাটি ছুড়ল বাড়ির 
দিকে। তাস আর জয়ার পয়সা জোটাবার জন্যই এইসব করে বেড়ান উনি । 

নন্জম্মা যা যা অনুমান করেছিল সেই কথাগুলোই শুনল সবক্কার মুখে । কোনরকমে 
কোট-কাছারির কবল থেকে মুক্ত হয়ে বাকি জমিটুক্‌ কি করে বাঁচানো যায় সেই চিন্তায় মগ্ন হয়ে 
পড়ে নন্জম্মা। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে সবক্কা বলে, “দেখ নন্জম্মা, তোমার আর আমার কপালটা 
ঠিক একরকম। আমার স্বামীর হল ঘর ভাঙানোর বৃদ্ধি আর তোমার স্বামীর তো বৃদ্ধির 
বালাই-ই নেই। আমরা দু'জনেই তাই অসুহী। যা বললাম, কাউকে বোল না যেন, মা গঙ্গার 
নামে শপথ করেছ।' বাসনের গোছা তুলে নিয়ে এবার বাড়ির দিকে চলে যায় সবক্কা । 

সারা রাত ঘুমোতে পারল না নন্জশ্মা। সকালে উঠে একখানা কাগজ নিয়ে ভাইকে চিঠি 
লিখতে বসল । কৃশল প্রশ্নাদির পর লিখল, “এ বাড়ির সমস্ত জমি বাঁধা পড়েছে, এখন কোটে 
কেস চলছে। তুমি যত শীঘ্ব পার একবার এস।” চিঠি আর বাসনের গোছা নিয়ে সে চলল 
পৃকুর-ঘাটে। আশা করছিল পৃক্র-ঘাটে কাউকে পেলে চিঠিখানা বাপের বাড়িতে পৌছে দিতে 
বলবে, কিন্তু তেমন কাউকে দেখতে পেল না নন্জ্। খানিক প্রে দেখে মন্দিরের মহাদেবায়াজী 
পূজোর ফুল ও বিল্বপন্ত্র ধুয়ে নেবার জন্য সে সব ঝোলায় ভরে নিয়ে এদিকেই আসছেন। 
নন্জশ্মা ওকে অত্যন্ত শ্রদ্ধাকরে। ইদানীং উনি ওদের বাড়িতে বড় একটা আসেন না, কিন্তু এই 
বড় বৌকে মহাদেবায়াজীও খুবই স্নেহ করেন। নন্জু ওকে ডাক দেয়, “অইয়াজী, একবার 
এদিকে আসবেন £ এদিক ওদিক দেখে নিয়ে শাড়ীর আঁচলে বাঁধা চিঠির মোড়কটা এমনভাবে 
ফেলে দেয় যাতে সেটা ও র কাছে গিয়ে পড়ে । মুখে বলে, শিটা পড়ে দেখলেই সব বুঝতে পারবেন । 
যাহোক করে এ চিষিটা আমার ভাইয়ার কাছে পাঠিয়ে দিন আপনি । কেউ যেন টের না পায়। 
এরপর সে খুব মন দিয়ে বাসন মাজতে শুরু করে, যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে । 

মহাদেবায়াজী দলা পাকানো কাগজটা তুলে নিজের গেরুয়া জামার পকেটে রেখে বলেন, 
“ঠিক আছে মা* তারপর ঝোলার ফুল পাতা ধুয়ে শুদ্ধ করে নিয়ে চলে যান। দেদিন আর গ্রামের 
পথে ও কে ভিক্ষা করতে দেখা গেল না, কেউ কেউ বলে শিবগেরের দিকে দু-একটা গ্রামে নাকি 
ভিক্ষায় গিয়েছিলেন । 

পরদিন দুপুরে কল্লেশ হেঁটেই চলে এল বোনের বাড়ি। বাড়িতে বসে ভাইকে সব কিছু 
খুলে বলা মুশকিল। কিন্তু পরে নন্জুর মনে হল আড়ালে গিয়ে কথা বলার চেয়ে সামনা-সামনি 
কথা হওয়াই ভাল। সে সবাইকার সামনেই কথাটা পেড়ে, সব কিছু বলার পর, এখন কি করা 
উচিত সে বিষয়ে পরামর্শ চাইল ভাইয়ের কাছে। 

গঙ্গম্মা ঠিক সন্দেহ করেছে, ষে নিশ্চয় কোন রকমে খবর পাঠিয়ে নন্জ্‌ ভাইকে আনিয়েছে। 
কিন্তু কল্লেশ আবার এককালে পুলিশে কাজ করত, তাই গঙ্গম্মা উপস্থিত চুপ করে থাকাই ভাল 


৮০ গুহভজ 


মনে করল। বন্ধকী দলিলে কি লেখা হয়েছিল তা ক্লেশ জানে না। তাই পাটোয়ারী ভগ্মী- 
পতিকে জিজ্ঞাসা করায় সে বলল, “সে সব আমি জানি না। যা লেখবার শিবলিঙ্গে লিখেছিল ।” 

“কিছু না জেনেই আপনারা মামলা লড়তে চলে গেলেন কি করে £ এ প্রশ্নের উত্তরে জবাব 
হল, “রেবন্নাশেট্ী আর উকিল সব জানে । তারা মিখ্যে বলবে কেন £ কেস্‌ আমরা জিতবই।, 

নন্জম্মা ধীরভাবে রেবন্নাশেট্টীর ইতিরত্ত সব জানিয়ে বলল, “ওর ওপর বিশ্বাস করলে 
সপরিবারে ডুবতে হবে। এখন যা বুঝছি, নিজেদের কি করা উচিত ভেবে ঠিক করতে হবে, 
পরের পরামর্শে চললে চলবে না।, 

কল্লেশ বলল, “জামাই, চলুন তো আমার সঙ্গে, শিবেগৌড়ের বাড়িতে গিয়ে জানতে হবে দলিলে 
কি কি লেখা আছে।, 

কিন্তু পাটোয়ারীমশায়ের সেখানে যেতে বেজায় ভয় করছে। সে যদি বলে বসে, “এখানে 
এসেছ কেন £ যা করতে হয় কোটে গিয়ে কর না, যাও”___তাহলে £ কাজেই চেন্নিগরায় বলে, 
“সে হারামজাদার বাড়ি কেন যাব শুনি £ কেস্‌ আমরা জিতবই। আমি কি এটুকুও বুঝি না 
নাকি £ 

কল্লেশ একাই গেল শিবেগোড়ের বাড়ি। যা প্রত্যাশিত ছিল সেই জবাবই পেল শিবেগৌড়ের 
কাছে। নন্জশ্মা ভাইকে বলল, তিম্লাপুরে গিয়ে দাবরসায়াজীর কাছে খোজ নিতে । সেই 
গ্রামের পথ-ঘাটের হদিশ নিয়ে চটিটা পায়ে গলিয়ে আবার বেরিয়ে পড়ল কললেশ। সে চলে যাবার 
মিনিট দশেক পরে গঙ্গম্মা বউকে প্রশ্ন করল, “কার হাত দিয়ে খবর পাঙিয়ে ও হতভাগাকে ডাকা 
হয়েছিল শুনি £ আজ রাতে না হয় তার কাছেই শুতে যা!” 

কথাটা শুনে নন্জম্মার অসহ্য রাগ হল বটে কিন্তু সেই সঙ্গে অদ্ভূত একটা সাহস এসে গেল 
মনে। সে বলে উঠল, “মনে হচ্ছে আপনি বোধহয় এ রকমটাই করতেন। তাই আপনার 
মুখ দিয়ে এইসব কথা বেরোয় । মুখ সামলে কথা বলবেন। ছোটবেলায় ভাল শিক্ষা-দীক্ষা 
পেলে আপনিও এমন হতেন না, আপনার ছেলেরাও এইরকম হত না। 

“শুনলি চেনৈয়া শুনলি£ ওঠ, উঠে এ হারামজাদীর কোমরে আচ্ছা করে কষে এক লাথি 
মার।, 

“আমার পেছনে লাগবেন না শুধু শুধু। ভাইয়া সন্ধাবেলাই ফিরে আসবে এখানে ।” 

স্রীকে লাথি মারার ইচ্ছার অভাব বা আলস্য যে কারণেই হোক, দেখা গেল চেন্নিগরায় উল 
না। গক্গম্মা ছোট ছেলেকে আর ও আদেশ করল না। করলেও দ্বিতীয়বার এ কাজ করতে 
তার আর সাহস হত কিনা সন্দেহ। 

কল্লেশ পরদিন আসতে পারল না। এল দু'দিন পরে, সঙ্গে দাবরসায়াজীও এলেন। গত 
পরশু রাত্রে সে দাবরসায়াজীর বাড়িতেই ছিল। তাঁকে নিয়ে তিপটুরে গিয়ে শিবেগৌড়ের উকিলের 
সঙ্গে দেখা করেছে । তিনি বলেছেন, এদের সমস্ত জমিই বন্ধক আছে । যদি সুদে-আসলে সমস্ত 
টাকা ও কোট খরচ দিয়ে দেওয়া হয় তাহলে তিনি বিরোধী পক্ষকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আপস করিয়ে 
মামলা তুলে নেওয়াতে চেস্টা করবেন। 

গঙ্গম্মা, চেল্লিগরায় ও অপ্পন্নায়াকে একন্র বসিয়ে কল্লেশ বোঝাল, “মূলধন বা আসল কেউ 
ছেড়ে দেবে না। কোর্টে যা খরচ হয়েছে তাও কেউ ছাড়বে না। সুদটা কিছুটা কমাবার জন্য 


গুহভঙজ ৮১ 


ঙ 


অনুরোধ করা যেতে পারে। যদি হাজার পাঁচেকে রাজি হয় তো একটা বড় খেত বিক্রী করে, বা 
এ পক্ষকেই খরিদ্দার হিসাবে লিখিয়ে নিয়ে অন্ততঃ বাকি জমিটা রক্ষা করা যেতে পারে। চলুন, 
ওদের বাড়ি যাওয়া যাক । 

পরামর্শটা গঙ্গশ্মার পছন্দ হল না। কিন্তু কল্লেশও ছাড়বার পান্তর নয়। দাবরসায়াজীও 
অনেক বোঝালেন চেন্নিগরায়কে। অবশেষে মা, দুই ছেলে এবং কজ্লেশ ও দাবরসায়াজী পাঁচজনে 
মিলে শিবেগৌড়ের বাড়ি রওনা হল। কিন্তু বিনা আমন্ত্রণে প্রতিপক্ষ এভাবে বাড়িতে আসায় 
শিবেগৌড়ের প্রতি কথায় দন্ত যেন ফটে বেরোতে লাগল। কল্লেশ আর দাবরসায়াজী যথেষ্ট 
ধৈর্যসহকারে তার কথাগুলো হজম করে নিয়ে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আপসের চেম্টা করছিলেন। এরই 
মধ্যে শিবেগৌড় একবার গ্শ্মার দিকে ফিরে প্রতিহিংসার আনন্দে বলে উঠল, “কি দিদি, বড় যে 
'পচকে ছেলে” বলে গাল দিয়েছিলে £ এক পয়সাও আমাকে দেবে না বলে জীঁক দেখাচ্ছিলে £ 
সেই তো আমার দরজায় এসে দাঁড়াতে হল? লজ্জা করছে না এখন £ 

দাবরসায়াজী তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, “বোন, তুমি ধৈর্য হারিও না যেন”। কিন্তু গঙ্গম্মা 
ততক্ষণে দপ্‌ করে আগুনের মত ক্লে উঠেছে-_-“হ্যারে, গৌড়, তুই আমাকে অপমান করিস £ 
কোথাকার কে তুই, কিসের এত তেজ তোর শুনি £ কৃতা, ছেনালের *-*; 

“তা পারিস যদি জমি আমার হাত থেকে এখন ছিনিয়ে নে না দেখি কত ক্ষমতা! 

“ভালয় ভালয় না দিস তো কোট-কাছারি করেই ছিনিয়ে নেব। ছেনালের বেটা, তুই আমাকে 
তুই তোকারি করিস, এত আঙ্পর্ধা! এই চেন্ৈয়া, অগ্পন্না, ওহ্‌, চল বাড়ি চল। উঠছিস্‌ না কেন 
শুনি তোরা কি তোদের বাপের বাটা নস ঠ, 

অপ্পন্নায়া চটপট উঠে এবার মায়ের পাশে এসে দাঁড়ায়। চেন্নয়াকে ডেকে মা বলে ওঠে, 
“তুই এখানেই বসে থাকবি নাকি £ তোকে কি তোর বাপে জম্ম দেয়নি হতভাগা, জাত খোয়ানো 
রাঁড়ের পৃত£ ওহ্‌, উঠে দাঁড়া বলছি এখুনি । 

পাটোয়ারী চেন্পিগরায়ও এবার উদ্ধতভাবে উঠে দীঁড়াল। শালা কল্লেশ, দাবরসায়াজী, প্রাতি- 
পক্ষ শিবেগৌড়, তার ঘর ভরা লোকজন ইত্যাদির সামনে দেখাতে হবে তো যে সেও সত্যি সত্যিই 
“বাপকা বেটা । কাজেই সেও মা এবং ছোট ভাইয়ের সঙ্গে হাঁটা দিল বাড়ির পথে । কল্লেশ 
আর দাবরসায়াজী কিন্তু গেলেন না, ওরা আলোচনাটা চালাতে চাইছিলেন কিন্তু শিবেগোড় ওদের 
সে সুযোগ আর দিল না, বলল, “এ মেয়েমানুষটার যদি এতই তেজ, তো আমার ভারি বয়ে গেল। 
এই অক্তক্ত হারাম-খোরদের আমিও দোরে দোরে ভিক্ষে করিয়ে ছাড়ব, আমিও তেমনি বাপের 
ব্যাটা, হ্যা! আদালতে যদি আমার জিত না হয় তখন আমায় “শালা বাঞ্চোৎ' বলে গাল দেয় যেন, 
জতো পেটা করে যেন! বড় আদালত পর্যন্ত যাক মামলা, একেবারে খোদ মহারাজের দরবার 
পর্যন্তই যাক না দেখি, মামলায় জয় আমার হবেই । গলার মাদুলীটা ডান হাতে টেনে ধরে দিব্যি 
করে সে, “এ বেটা চশমখোর রেবন্নার ভরসায় ও'রা আমার পেছনে লাগতে গেছেন! আমাদের 
বংশের তেজ দেখিয়ে দেব এবার । 

এরপর মিটমাটের সম্ভাবনা সুদূরপরাহত এটা বুঝে কল্লেশ এবং দাবরসায়াজী ফিরে এলেন। 
বারান্দায় বসে বসে গঙ্গম্মা তখনও নিজের মহিমা কীতন করে চলেছে । পাটোয়ারী বসে 
বসে পান, দোক্তা চিবোচ্ছে আর মাতৃভক্ত অগ্পন্নায়া আস্ফালন করে বলছে কি করে শিবেগৌড়ের 


৮২ গৃহডঙ 


স্ত্রীর মাথা মুড়িয়ে দেওয়া হবে। কজ্লেশ দারুণ চটেছে। বারান্দা থেকে নামতে নামতে সে 
বলে ওঠে, “সব মুখ্যর দল, কারো ঘটে এতট্রুক্‌ বৃদ্ধি নেই। আমরা এসে একটা উদ্ধারের উপায় 
করছিলাম, তাতেও বাগড়া দেওয়া হল। দেখ বুড়ি, তুই না মরলে এদের আর নিস্তার নেই। 
আমার বাপেরও কর্মভোগ, তাই এই বাড়িতে মেয়ে দিয়েছিল !, 

গঙ্গশ্মা এমনিতেই খেপে ছিল। তার ওপর এই ধরনের কথা শুনে তাও আবার কৃটুমের 
ছেলের মুখে, যে কখনও ভুলেও একটা প্রণাম পর্যন্ত করে না, সে একেবারে ভ্বলে উঠল-_-“ওরে 
হাভাতে, রাঁড়ের পৃত, আমাকে এতবড় কথা বলা? কে ডেকেছে তোকে এখানে ? যে চুপিচুপি 
ডেকেছে, যা তার সঙ্গেই শো গিয়ে, সেইজন্যই তো এসেছিস তুই। এই অপ্পন্না, এটাকে ধরে দুই 
লাখি মার মুখে ।” 

কিন্তু অত সাহস অপ্পন্নায়ার মোটেই নেই। কল্লেশ আবার বলে, ইতর কোথাকার! যে 
মুখে এসব খারাপ কথা বেরোচ্ছে সেই মুখ বোবা হয়ে যাবে । শিবেগৌড়ের কাছ থেকে পাটোয়ারী- 
গিরি ছিনিয়ে নেবার তো ক্ষমতা ছিল না, তখন তো খুব খোসামোদ করা হয়েছিল, কোথায় ছিল 
তখন এত পৌরুষ £ 

ভেতরে এসে বোনকে বলে কল্লেশ, “হ্যারে নন্জ, এই হতচ্ছাড়াদের সংসারে তুই থাকিস 
কি করেঃ ছেলেমেয়েদের নিয়ে চল আমার সঙ্গে। ঈশ্বর যা দিয়েছেন আমাদের তাই ভাগ 
করে খাবি। 

চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে নন্জ। কল্লেশ আবার বলে, “দাঁড়িয়ে আছিস যে? চল্‌ আমার 
সঙ্গে, 

“ভাইয়া, রাগের মাথায় কিছু করে বসা উচিত নয়, এস, শান্ত হয়ে বস একটু ।” 

“এই রাক্ষুসীর বাড়িতে এক ঘটি জলও ছোঁব না আমি । খুঁটির গায়ে ঝোলানো লিটা পেড়ে 
নিয়ে, চটিটা পায়ে গলিয়ে রওনা হয়ে পড়ে কলেলশ। বোন ডাক দিয়ে বলে, “ভাইয়া, এ কি করছ 
তুমি £ কিন্ত সে আর দীড়ায় না। শিবেগৌড়ের বাড়ির ঘটনা ননজম্মাকে শোনাতে গেলে এখন 
বারান্দায় যারা বসে আছে তারা আবার খেপে উঠবে এটা আন্দাজ করে দাবরসায়াজীও চুপচাপ 
নিজের গ্রামের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন ।, 


€ 


নন্জম্মা যেন মৃূর্তিমতী ধৈর্যের-প্রতিমা। আবার একটা আশার আলো দেখতে পায় সে। সাতুর 
বাবাকে যদি একটা খবর পাঠানো যায় তিনি হয়ত এদের বোঝাতে পারবেন। কলন্লেশ তো 
মায়ের পেটের ভাই, তাকে চটু করে চিঠি লিখে ফেলেছিল, কিন্তু একে লেখা যায় কি করেঃ তা, 
ইনিও তো তার পিতৃতুল্য, এই ভেবে একদিন দুপুরে সবাই ঘুমোচ্ছে দেখে সে বসল কাগজ-কলম 
নিয়ে। পার্বতী বাইরে খেলা করছে। ঠিকানা জানাই ছিল, কড়ুর জেলা, কসবা তালুক, গ্রাম 
নৃগ্ণীকেরে, শ্যামভট্ট। কম্বনকেরে থেকে পোস্টম্যান বাসপ্পাজী সপ্তাহে একবার এ গ্রামে আসে 
এবং তার আগমনের প্রমাণস্বরূপ পাটোয়ারী চেন্নিগরায়কে দিয়ে কাগজে সই করিয়ে নিয়ে যায়। 
নন্জম্মার সঙ্গে তাই পরিচয় আছে তার। 


গুহভজ ৮৩ 


এবার বাসপ্পা যখন এল তখন বাচ্চারা ছাড়া বাড়িতে আর কেউ ছিল না। নন্জম্মা তাকে 
ডেকে বলল, “বাসপ্পাজী আমার একটা লেফাফা চাই, পয়সা তো নেই, দ্ব'টুকরো নারকেল দেব, 
তাতে হবে £ 

“যখনই আসি, তোমার এখানে খেয়ে যাই বোন। তোমাকে একটা লেফাফা দিয়ে তার বদলে 
আবার নারকেল নেব £ আমি কি এমনই মুখ্য £ এই নাও।” 

“এ কথা কাউকে বলবেন না যেন। এ বাড়ির মামলা চলছে তা তো জানেন, সেইজন্যই 
আমার দেওরের শ্বশুর মশাইকে আসতে লিখেছি” ব্যাপারটা বুঝিয়ে চিঠিটা বাসপ্পার হাতে দিয়ে 
দেয় নন্জ। চিঠি ডাকে ফেলে দেবে এই আশ্বাস দিয়ে নিজের খাকি কোটের পকেটে ভরে নেয় 
বাস্পা। পাটোয়ারীজী এখন নিশ্চয় গ্রামের বাইরে বীরাচারীর ধুনির পাশে আর নয়ত 
মহাদেবায়াজীর মন্দিরে বসে দোক্তা চিবোচ্ছে। সেইখানেই তার সইটা নিয়ে নেবে এই বলে 
বিদায় নেয় বাসপ্পা। 

সে চলে যাবার পর মনে হয় নন্জ্র- কাজটা বোধহয় ঠিক হল না। অপ্পনায়া গ্রামে 
ফিরে এসেই মাকে জানিয়েছিল, শ্বশুর বলেছেন, ্ত্রী-কন্যাকে যদি নিয়ে যেতে চাও তো মাকে 
আলাদা করে দিতে হবে ।” শুনে গঙ্গম্মা বেশ কিছু দিন ধরে গজরে ছিল, “কডুরের ঘর ভাঙানে 
পুরুত ব্যাটা আমার সংসার ভাঙবার চেস্টায় আছে।, তারপর তো তিপটুর যেতে হল এবং অন্য 
ব্যাপারে মনোযোগ দিতে হল, কাজেই বেয়াইয়ের কথাটা আর খেয়াল ছিল না। কিন্তু রাগটা 
তো মনে মনে আছেই, এই সময় তিনি এখানে এলে, ইনি কখনই মুখ বুজে থাকবেন না। এইসব 
কারণে নন্জম্মার মনে হতে লাগল, সে ভদ্রলোককে খবর পাঠিয়ে হয়ত আবার একটা কলহের 
কারণ সৃম্টি করে বসল। কিন্তু তা হলেও, ও তো অন্যায় কিছু করেনি, এই ভেবেই নিজের 
মনকে বোঝাল নন্জ । 

বাসপ্পাজীর হাতে চিঠি পাঠাবার প্রায় বারো দিন পরে একদিন বিকেল চারটের সময় শ্যামভট্ট 
একাই এসে পৌ'ছলেন। গঙ্ম্মা তখন পুকুর পাড়ে গিয়েছিল শাক তুলতে । গরুর পেছনে 
বাছুরটির মত অপ্পন্নায়াও গিয়েছিল মায়ের পিছু পিছু । চেন্নিগরায় বাড়িতেই ছিল। অতিথিকে 
হাত-পা ধোবার জল দিল নন্জশ্মা। তারপর তাকে খেতে বসিয়ে মামলা-সংক্রান্ত সমস্ত কথা 
খুলে বলল। কল্লেশের আসার কথাও বাদ দিল না। স্ত্রী সব কথা বলে দিচ্ছে দেখে পাটোয়ারী 
মশায়ের রাগ হচ্ছিল খুবই, কিন্তু কৃটুম্বের সামনে তাকে গালমন্দ করতেও সাহস হচ্ছিল না, 
সঙ্কোচও বোধ করছিল একটু । উঠোনে বসে বসে তামাকপাতা চিবোতে চিবোতে পিকটা বাইরে 
না ফেলে মুখের মধ্যেই রাখার চেস্টা করছিল সে। 

আহারাদি সেরে শ্যামভট্র তখন হাতের মধ্যে নস্যি ডলছেন, গঙ্গম্মা ঝুড়ি ভরা শাক নিয়ে 
বাড়িতে এসে তুকল। গরুর দড়ি ধরে তার পেছন পেছন এল অপ্পন্নায়া। বেয়াইকে দেখেই 
মেজাজ চড়ে গেল গঙ্গম্মার--আমার ছেলেকে ভিন্ন হবার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে! ঘর 
ভাঙানে, রাঁড়ের পুত, বেহায়া আবার এখানে এসে হাজির হয়েছে! দেখাচ্ছি মজা* বলতে বলতে 
রান্নাঘরে শাকের টুকরাঁটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে বেয়াইয়ের সামনে এসে ফেটে পড়ল সে, _বলি, 
হ্যারে পৃজুরী বামুন, আমার ছেলেকে ভিন্ন করাতে এসেছিস বুঝি £ 

বেয়ান ঠাকরুণের জিভের কোন লাগাম নেই এটা জানা ছিল শ্যামভট্টর, কিন্তু তাঁর সঙ্গেও 


৮৪ গহভজ 


খু 


এইভাবে আলাপ শুরু করবেন বেয়ান এটা তিনি কল্পনা করতে পারেননি । মিনিট দুই তিনি 
একেবারে অবাক হয়ে গঙ্গম্মার দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “একটু ভেবেচিন্তে কথা 
বনুন। আপনার ছেলে আপনার সঙ্গেই থাক, আমার তাতে কিছুই বলবার নেই। কিন্তু কোট'- 
কাছারি করে আপনারা পৈতৃক সম্পত্তি খোয়াতে বসেছেন, সেটা যাতে রক্ষা পায় সেইজন্যই বিশেষ 
করে আমি এসেছি। এখন খুব বিবেচনা করে কাজ করতে হবে ***? 

কথাটা শেষ হবার আগেই গজশ্মা, এর আগমনের পেছনে কার হাত আছে সেটা মুহর্তে বুঝে 
ফেলে খেপে আগুন হয়ে উঠল । রান্নাঘরের দরজার দিকে মুখ করে বধূর উদ্দেশ্যে চিৎকার 
করে উঠল, “ওরে বাজারী মেয়েমান্ষ, কদিন আগে তো নিজের ভাইটাকে ডেকে পাশে শুইয়েছিলি, 
এবার এই পুরুত বামুনটাকে আনিয়েছিস £ আজ এর সঙ্গেই মাতন চলবে নাকি £ লাজ-লঙ্জার 
মাথা খেয়ে একেবারে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিস দেখছি !” 

বারান্দার কোণে এসে পচ্‌ করে পানের পিক ফেলেই ছেলের কাছে গিয়ে চেচিয়ে উঠল, “ওরে 
রাঁড়ের পৃত, তুই কি বাপের ব্যাটা নস £ তোর বৌ একে চিঠি লিখিয়ে আনিয়েছে। তুই আজ 
বারান্দায় শুয়ে থাকিস, ঘরে খাটের ওপর একে শুতে দিস্‌ ওর সঙ্গে । 

শ্যামভট্ট এইসব শুনতে শুনতে দুই কানে হাত চেপে রাম নাম জপতে জপতে বেয়ানের মুখের 
দিকে চেয়ে রইলেন। কিন্তু গঙ্গম্মা আর দাঁড়াল না, অগ্পন্নায়াকে সঙ্গে নিয়ে সোজা চলে গেল 
রেবন্নাশেট্টীর বাড়িতে । 

শ্যামভট্র এতক্ষণে কান থেকে হাত সরিয়ে চেন্নিগরায়কে বললেন, “আপনি বাড়ির কর্তা, তাই 
আপনাকেই বলছি। এতখানি বয়স হয়েছে এখনও যদি ইনি এইভাবে যা তা কথা বলেন তাহলে 
সংসার টিকবে কি করে£ সাতুর কাছেই শুনেছি আপনার স্ত্রী নন্জশ্মা গুণবতী, বৃদ্ধিমতী। 
মেয়ের বয়সী, তার ওপর বাড়ির বড়-বৌ, তাকেই আমার সামনে এইভাবে বললেন, আমার ছেলে- 
মানুষ মেয়েটাকে আরো কত কি শুনতে হয় তা তো আন্দাজেই বুঝতে পারছি। জাবগল্লের এক 
আত্মীয়ের কথায় আমি এ বাড়িতে মেয়ে দিয়েছিলাম। এখন তো কোন মতে সবাইকে মানিয়ে 
চলতেই হবে, আমার কথাটা বুঝছেন তো £ 

“আর দুটো পান দিয়ে যা দেখি” বৌকে হকৃম করেন পাটোয়ারী মশাই। নন্জম্মা পান এনে 
দিলে চুন লাগিয়ে মুখে পুরে দোক্তাসহ চিবোতে চিবোতে বলেন “হা । 

“আপনাদের পৃথগন্ন করতে আমি চাই না। কিন্তু বাড়ির পুরুষদের অন্ততঃ বুঝে-সুঝে চলা 
উচিত। মহাজনের সঙ্গে মিটমাট করে ফেলুন। নন্জম্মা যেমন বলছে সেইভাবে দু'একখানা 
খেত বিকী করে খণমুক্ত হোন, এবং বন্ধকী-দলিলে সাক্ষী ডেকে সে কথা লিখিয়ে নিন। যা 
অবশিম্ট থাকবে তাই দিয়েই কোন মতে সংসার চালাতে হবে। 

পাটোয়ারী মশায়ের মুখে পান দোক্তাটা বেশ মজে এসেছে। এদিকে শ্যামভট্ট উত্তরের প্রতীক্ষা 
করছেন, তাই তিনি আবার বলেন, “ঠিক কথা বলছি কি না বলুন £ চেন্নিগরায় এবার উধ্বমুখ 
হয়ে কোন মতে উত্তর দেবার জন্য মুখ খোলে কিন্তু মুখ ভর্তি পানের রসের জন্য কথা বেরোয় না। 
তার পিক্‌ ফেলে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করে শ্যামভট আবার বলেন, “এবার কিছু একটা বলবেন 
তো 2, 

কিন্ত কোন কথা বলতে চেন্নিগরায়ের ভয় করছে। শেষে বহ কম্টে একটা সিদ্ধান্ত করে 


গৃহভঙ্গ ৮৫ 


বলে ফেলে, “আমি কিছু জানি না, আপনি আছেন আর আমার মা আছেন” এইটুকু বলেই সে বাইরে 
পালায় । 

শ্যামভট্ট এবার নন্জশ্মাকে ডেকে বলেন, “কথা শুনলে তো মাঃ, 

নন্জশ্মা বাইরে এসে বলে, “এর স্বভাব তো আপনি জানেন না। আপনার জামাইকেই না 
হয় বলুন। সে যদি জিদ ধরে বলে নিজের নিজের অংশ আলাদা করে নেওয়া হোক, তাহলে 
দু'জনেই অর্ধেক করে খণ চুকিয়ে দিতে পারবে, এইভাবে হয়ত একটা উপায় হতে পারে । 

“সে যোগ্যতা ওর আছে কি? তুমি তোচেন ওকে । কোটের ব্যাপার আমার জানা ছিল না 
কিন্তু এর আগেই আমি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমার একমান্ত্র মেয়ে, ভগবান যা দিয়েছেন 
তাই খেয়ে-পরে থাকবে । কিন্তু এই শাশুড়ীর কাছে মেয়েটাকে পাঠাব কোন প্রাণে ঃ সেইজন্যই 
তো প্রসবের পর এতদিন রেখে দিয়েছি।, 

কি বলবে ভেবে পেল না নন্জম্মা, সে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। এই সময় বাড়িতে ঢুকল 
গঙ্গম্মা, বৌকে দেখেই খিঁচিয়ে উঠল, “বেজম্মাটার সঙ্গে মজা লোটা হচ্ছে, ওদিকে তোর স্বামী 
গিয়ে বসে আছে মন্দিরে ।” 

নন্জম্মার রাগের মাথায় সাহস এসে গেল মনে, সেও বলে উঠল, “আপনি এ রকমই করেন 
বোধহয়, তাই ভদ্র ঘরের মেয়েদের কৃকথা বলতে মুখে আটকায় না। মুখে পোকা পড়বে শেষে, 
এখন একটু চুপ করে থাকন দেখি, 

“লক্ষমীছাড়ি ছেনাল, আমাকে কথা শোনাচ্ছিস তুই £ দাঁড়া, ছেলেদের বলে তোর গলা থেকে 
আমি মঙ্গলসূত্র খলে নেব, তবেই আমি জাবগল্লর মেয়ে 1” গঙ্গম্মা ছুটতে ছুটতে মন্দিরে গিয়ে 
হাজির, ছেলের সামনে দাঁড়িয়ে গর্জন করে উঠল সে, “যদি সত্যি বাপের ব্যাটা হোস তো চল্‌, বৌয়ের 
দাঁতের পাটি ভেঙে গুড়ো করে দিয়ে মঙ্গলসূত্রটা কেড়ে নে। কুলটা মাগী বলে কিনা আমার মুখে 


পোকা পড়বে! 
মহাদেবায়াজী একতারা বাজিয়ে গাইছিলেন, “সাপে কাটার আগেই জেগে ওঠ ভাই *-*। 
কথাগুলো কানে যেতেই গান থামিয়ে ফেললেন । ইতিমধ্যে দ্বিতীয়বার গজন হল, “সত্যি করে 


বল তোর বাপ তোকে জম্ম দিয়েছে কি না? যদি সত্যি হয় তো উঠে গিয়ে মঙ্গলসূন্রটা কেড়ে 
নে।” নিজের জন্মের পবিভ্রতা সম্বন্ধে নিশ্চিত হবার জন্যই বোধহয় চেন্নিগরায় মিনিট দুই 
ভাবল, তারপর সাহস করে দাঁড়িয়ে উঠল । মহাদেবায়াজী পাশেই ছিলেন, হাত ধরে টেনে 
তাকে ফের বসিয়ে দিয়ে বললেন, “পাটোয়ারীজী, এতদিন ধরে ভজন শুনেও বুদ্ধি-শুদ্ধি কিছুই 
হল নাঠ 

কিছু না বুঝেই চেন্নিগরায় বলে ফেলল, “যাক গে থাক, ভজন শুরু করুন, শুনি ।, মহাদেবায়াজী 
একতারাটা তুলে নিয়ে এ গানটা আবার শুরু করতেই গঙ্গম্মা তেড়ে উঠল, “ওরে রাঁড়ের পুত, 
ভিখিরির কথা শুনে চলিস তুই £ ছেনাল বৌয়ের ভেড়া-পুরুষ, নিজের বাপের ইজ্জতটাও রাখতে 
পারিস নে তুই ৮ বলতে বলতে সে চলে গেল রেবন্নাশেন্রীর বাড়ির দিকে । 

এদিকে শ্যামভন্টজী নন্জম্মাকে বললেন, “আমার এখানে আসায় কোন লাভ হল না মা। 
আমি এখন যাই। আঠারোটা গ্রামে পৌরোহিত্য করি আমি । মেয়ে আর নাতনীকেও দেখাশোনা 
করতে হবে ।” পুঁটলি আর ছাতাটা তুলে নিলেন হাতে । কিছু ভেবে না পেয়ে নন্জ্‌ বলে উঠল, 


৮৬ গুহভজ 


পিক আছে, যা হবার হবে। তা সাতুকে পাঠিয়ে দেবেন তো £ উত্তরে শ্যামভট্ট বললেন, “কি 
করে পাঠাব £ সবই তো জান তুমি ।, 

আর কিছু না বলে নন্জু প্রণাম করল। “দীর্ঘ সুমঙ্গলী ভব, সকল সন্মঙগলানি ভবন্ত' আশীবাদ 
করে রওনা হয়ে গেলেন শ্যামভট্র। দরজার কাছ থেকে নন্জশ্মা বলল, “তিপটুরের কাছে তিম্লা- 
পুর গ্রামে পাটোয়ারী দাবরসায়াজী থাকেন, রাতটা তাঁর বাড়িতে কাটিয়ে সকালে বাড়ি যাবেন। 
অন্ধকার হবার পর তিপটুর যাবেন না, পথে বুক্কার টিলায় চোর-ডাকাত থাকে । তারা দু-দুটো 
গাড়ি একসঙ্গে থাকলেও হামলা করতে ছাড়ে না। মেরে ধরে সব কিছু ছিনিয়ে নেয় ।, 


সপ্তম অধ্যাম্ন 


ছেলে রামনা দেড় বছরেরটি হয়েছে, এইসময় নন্জম্মা আবার গভভবতী হয়ে পড়ল। এতদিনে 
সে মনে মনে বেশ বুঝেছে যে, এই সর্বনাশা মামলায় সমস্ত জমি-জেরাত খোয়াতে হবে । “নিজেদেরই 
দুঃখের শেষ নেই, এরমধ্যে আবার বাচ্চা কেন £' এই চিন্তায় বেচারীর মনটা হতাশায় ভরে ওঠে । 
কিন্তু আবার মনে হয়, ভাইয়ার বিয়ে হয়েছে এত বছর হয়ে গেল, তার তো একটিও সন্তান হল না 
এখনও, কাজেই এ সবই ভাগ্যের লিখন । ঈশ্বরের দান, এতে আপত্তি করলে চলবে কেন? এই- 
সব ভেবে মনকে সান্ত্বনা দেয় সে। 

এই সময় দুটো ঘটনা ঘটে গেল প্রামে। প্রথমে এল প্লেগের মড়ক, এটা অবশ্য এ অঞ্চলে 
কিছু নতুন ব্যাপার নয়। প্রতি দু-তিন বছর অন্তর গ্রাম ছেড়ে বাইরে কুঁড়ে তৈরী করে থাকা এদের 
অভ্যাস আছে। কিন্ত দ্বিতীয় ঘটনাটার একটু বিশেষত্ব আছে । সেটা হচ্ছে, কাশিমবদ্দি নামে 
একটি লোক এসে গ্রামে মহাজনী ব্যবসা শুরু করল, সে সোনা, রূপো, তামা, পিতল ইত্যাদির জিনিস 
বাঁধা রেখে টাকা ধার দিয়ে, প্রতি টাকায় প্রতিদিন এক পয়সা করে সুদ নেওয়া আরম্ভ করল। 
এই ধরনের মহাজনরা মালাবার প্রদেশের মানিল্লা য্সলমান। এরা যাযাবর বেদেদের ঘাঘরার 
মত পাড়ওয়ালা লুঙ্গী ও মাথায় ঝালরওয়ালা টুপী পরে। এই লোকটির বয়স আন্দাজ পঞ্চাশ 
বছর। শিবেগৌড় এর জন্য সবাইকার কাছে সুপারিশ করে বলল, “এক পয়সা সুদ এমন কিছু 
বেশী নয়, দরকারের সময় টাকাটা পাওয়া যায়, সেটাও তো দেখতে হবে!” শিবেগোড়ই এই 
বিদেশীকে থাকার আস্তানাও দিল। এ গ্রামে তার তিনখানা বাড়ি। তার মধ্যে রাস্তার ধারের 
বাড়িটায় মস্ত বড় এক লোহার সিন্দুক বসিয়ে মহাজন শুরু করে দিল তার কাজ-কারবার। শোনা 
গেল সে নাকি মাসে পঞ্চাশ টাকা বাড়ি ভাড়া দিচ্ছে। শিবেগোড় সবাইকে স্পম্ট করে জানিয়ে 
দিল, এই মহাজনী কারবারের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই। 

কাশিমবদ্দি মহাজন গ্রামে এসে বসার দু-এক মাসের মধ্যেই দেখা গেল প্রায় গ্রামসুদ্ধ লোক 
তার কাছে টাকা ধার করেছে। লোকে বলে, দরকার পড়লে শিবেগৌড়ও ওর কাছ থেকেই ধার 
নিয়ে থাকে। লোকটা কথার খেলাফ করে না, মিথ্যা বলে না, ঠকাবার চেস্টা করে না। সুদের 
হিসার রাখতেও কোন অসুবিধা নেই- প্রতিদিন প্রতি টাকায় এক পয়সা! এইভাবে সারা 
গ্রামের লোকের কাছে মহাজন এক অপরিহাষ ব্যক্তি হয়ে পড়ল। প্লেগের প্রকোপের সময় 
কাশিমবদ্দিও বাড়ি ছেড়ে শিবেগোৌড়ের বাগানে গিয়ে কুড়েতে বাস করতে লাগল । লোহার সিন্দুক- 
টাও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল, সেখান থেকেই কারবার চালাবে বলে । 

গঙ্গম্মাদের পরিবারও অন্যান্য বারের মতই গ্রামের বাইরে নিজেদের বাগানে কুঁড়ে বেঁধে 
ফেলল। নন্জম্মার এখন তিন মাস চলছে, খুব বমি হচ্ছে তার। তা সত্বেও বাড়ির সমস্ত 


৮৮ গৃহভঙ্গ 


জিনিসপত্র বাঁধাছাঁদা করে নিয়ে যাবার কাজটা তাকেই করতে হল। মহাদেবায়াজীকেও যেতে 
হল গ্রামের মন্দির ছেড়ে। জলাশয়ের ঢালু পাড়ের ওপর পাথরের তৈরী পুরোন মন্দিরে স্থাপিত 
ছিল চোলেশ্বর শিবের মূল লিঙ্গ। লোকে বলে এ মন্দির গড়েছিলেন জকণাচারী* । এ মন্দিরে 
নাকি অনেক সাপ আছে একথাও শোনা যায়। “সাপ আবার কিঃ সাপ তো মহাদেবের গলার 
হার, সাপ আমার কি করবে £ এই কথা বলে মহাদেবায়াজী তাঁর ভিক্ষার ঝুলি, তানপুরা, 
একতারা, পাদুকা, সামান্য ধানের সঞ্চয় ইত্যাদি নিয়ে সেই পুরোন মন্দিরেই গিয়ে আশ্রয় নিলেন। 
গজশ্মাদের কুঁড়ে এ মন্দির থেকে বেশ কিছুটা দুরে, তাই চন্িগরায় ঘন ঘন এখানে আসতে পারে 
না। কাশিমবদ্দি মহাজনও তামাকপাতা চিবোয় তাই চেনিগরায় তার কূঁড়েতেই গিয়ে হাজির 
হগ্ন। মাঝে মাঝে শিবেগোড়ের সঙ্গেও দেখা হয়ে ঘেত সেখানে । বাক্যালাপ তো বন্ধ ছিল না, 
হাজার হোক, একজন হল গ্রামের প্যাটেল অন্যজন পাটোয়ারী। তাছাড়া আসল লড়াইটা তো 
গঙ্গম্মা আর শিবেগৌড়ের মধ্যে। কিন্তু গঙ্গ₹মা এদের সাক্ষাতের খবর পেলেই ছেলেকে বেধড়ক 
গালাগাল দিতে ছাড়ত না। 

লোকে গ্রাম ছাড়ার আগে এ বছরের প্লেগে খুব বেশী প্রাণহানি হয়নি, মোটে দুটি শিশু আর 
ছ'জন বয়স্ক লোক প্লেগের কবলে প্রাণ হারিয়েছে । গ্রামবাসীরা তাড়াতাড়ি মারীমাতার পূজো 
দিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছে । রোগ আর মৃত্যু ভয়ের হাত থেকে নিম্কৃতি পাওয়া গেছে বটে 
কিন্তু এভাবে গ্রামের বাইরে পড়ে থাকায় অসুবিধাও যথেম্ট। কিন্তু তা সত্তেও এভাবে বাইরে 
কুড়ে বেধে থাকতে কেউ আপত্তি করে না। 

শোনা যাচ্ছে গজশ্মা আর শিবেগৌড়ের মামলা নাকি সমাপ্তির পথে। দুই তরফের উকিলই 
নিজের নিজের বক্তব্য শেষ করেছেন। “আমার উকিলের বক্ততা শুনে জজ সাহেব পধযন্ত মাথা 
নেড়েছেন'_ রেবন্নাশেটীর এই মন্তব্য গ্রামের কারো স্তনতে বাকি নেই। প্রতিবাদ জানিয়ে 
শিবেগৌড় বলেছে, “আমার উকিলের যুক্তি শুনে গজম্মার উকিলের একেবারে মুখ চুন হয়ে গেছে ।” 
দুই পক্ষই মহা-উৎসাহে তিপটুর যাতায়াত করছে। অপ্পন্নায়া তো সবার আগে গাড়ি থেকে 
নেমেই হোটেলের দিকে ছোটে। চেন্নিগরায়ও ছোট ভাইয়ের থেকে খুব বেশী পিছিয়ে থাকে না। 
শিবেগোড় সঙ্গে নিয়ে যায় মড়য়ার রুটি আর তিলের শুকনো চাটনী, তাই খেয়ে কাজ শেষ হলেই 
ফিরে আসে । 

জজের রায় বেরোবার দিন দু* পক্ষই গরুর গাড়িতে তিপটুর গেল। নিজের বুকে হাত রেখে 
গঙ্গশ্মা শুনল মামলার ফলাফল,-__“শিবেগৌড়ের কাছে অপর পক্ষ টাকা নিয়েছিল। সেই 
টাকার সুদ, সেই সুদের সুদ আর কোটে র খরচ, সব মিলিয়ে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা আদালতে 
জমা দিতে হবে। না দিলে আদালত থেকে এদের জমি নিলাম করিয়ে মহাজনের ধণ শোধ 
করা হবে। 

“তোর বৌয়ের হাতের চুড়ি ভাঙক, ওরে রাঁড়ের পুত'- জজের উদ্দেশ্যে গালাগালটা গন্গম্মার 
জিভের আগায় উঠে এসেছিল কিন্তু কোর্টের দরজায় দাঁড়ানো পুলিশ দুটোর দিকে চেয়ে কোন মতে 
সে মুখ বুঝেই রইল। 


* কর্ণাটকের অমর শিল্পী 


গৃহভঙ্গ ৮৯ 


কোটে র বাইরে এসে মহান্তায়াজী উকিল বললেন, “তুষকরের আদালতে আপীল করা যায়, 
তবে তাতে খরচ আছে। পয়সা-কড়ি কিছু এনেছেন কি £ 

“উকিল সাহেব, বাড়িতে সোনা, রূপো, বাসন-কোসন যা কিছু ছিল সব বাঁধা পড়েছে । আমি 
বিধবা মানুষ আর টাকা কোথায় পাব £ ইতিমধ্যে শিবেগৌড়ের উকিলও সেখানে এসে হাজির। 
দুই উকিলে কিছুক্ষণ ইংরিজীতে বাতালাপ হবার পর গঙ্গম্মাকে তার উকিল বলেন, “দেখ বোন, 
শিবেগৌড়ের কাছ থেকে তোমাদের আরো কিছু টাকা পাইয়ে দিচ্ছি, তাই দিয়ে ধারগুলো শোধ করে 
দাও। “আমাদের কিছুই নেই” এই বলে সমস্ত জমি-জমা শিবেগৌড়ের নামে লিখে দাও। 
তোমাদের প্রতি যাতে অন্যায় না হয় তা পরে দেখা হবে। 

গঙ্গশ্মা প্রশ্ন করে, “সব জমি দিয়ে দিলে পেট চলবে কি করে উকিল সাহেব 2 চেন্িগরায় 
কোন কথা বলে না, তার মুখ পানের রসে ভরা । 

“তা না হলে ওপরের কোটে যেতে হবে, তার জন্য এখন হাজার টাকা চাই। টাকা যদি যোগাড় 
করতে পার তো ভাল কথা ।” 

সুতরাং বোঝা গেল আর কোন উপায় নেই। শিবেগৌড়কে সেখানে ডেকে আনা হল। সে 
আরো দু'হাজার টাকা দিতে রাজি হল। তার ভয় ছিল যে, যদি কোট থেকে নিলাম করানো হয় 
তাহলে গ্রামের অন্য লোকেও নিলামে ডাক দিতে পারে। গঙ্গম্মা একেবারে দিশাহারা হয়ে 
পড়েছিল। শিবেগৌড় তর্ক্ষণাৎ স্থানীয় নারকেলের দোকান থেকে এনে দিল দু'হাজার টাকা । 
দুই উকিলে বসে তৈরী করে ফেলল কাগজপন্র। মহান্তায়াজী উকিল জানালেন তাঁর আরো একশ, 
টাকা পাওনা আছে। কারণ রেবন্নাশেটী নাকি তাঁকে শেষবারের “ফিস্টা দেয়নি । 

গঙজম্মা শপথ করে বলল, “আপনাকে দেবার জন্য আমি তো আট'শ টাকা দিয়েছি । 

উকিল জানালেন, “আমি তো পেয়েছি মোটে দেড়শ" টাকা । 

রায় বেরোনর দিন রেবন্নাশেট্রী বলেছিল সে সকালের মোটর-বাসে চলে আসবে, এরা যেন 
গরুর গাড়িতে আসে । দেখা গেল সে আসেইনি। কাজেই উকিলকে দিতে হল আরো একশ' 
টাকা। দ্বিতীয় দিন দলিল রেজিম্ট্রী করিয়ে সবাই ফিরে এল গ্রামে। এক হাজার ন'শ টাকার 
পুটলি কোলের কাছে চেপে ধরে গন্গম্মা গাড়িতে বসেছিল, সারা পথ সে একবারও চোখ 
বোজেনি। 

মামলার ফলাফলের কথা গঙ্জম্মা কাউকে না বললেও, শিবেগৌড় তো চুপ করে থাকার পাত্র 
নয়। কাজেই মামলার খরচের জন্য যারা যারা গজম্মাকে টাকা ধার দিয়েছিল সবাই ছুটে এল 
গঙ্গম্মার কুঁড়ে ঘরে । এদের ধার শোধ করতে খরচ হল আটশ' টাকা । বাকি টাকা গজম্মা 
এখন নিজের বিছানার নিচে রেখে শোয় । এর মধ্যে একদিন সে রেবন্নাশেটীর বাড়িতে গিয়ে 
বলল, “হ্যা রেবন্না, উকিল সাহেব যে বললেন তুমি নাকি ও'কে সব টাকা দাওনি 2 উনি আমার 
কাছে আরো একশ" টাকা নিলেন ।, 

“কে বলেছে এ কথা 

“উকিল সাহেব নিজেই বলেছেন । 

“ব্যাটা বেজশ্মা কোথাকার! চলুন তো, আমার সামনে কেমন বলে দেখি, জতো পেটা করব 
না ব্যাটাকে £ রেগে লাল হয়ে চোখ ঘোরাতে থাকে রেবন্নাশেট্রী। আর কিছু বলতে সাহস 


৯০ গৃহভজ 


হয় না গঙ্গম্মার। ভয়, হতাশা অথবা রেবন্নার সততার প্রতি বিশ্বাস, কিসের জন্য কে জানে, 
গজম্মা চপ করে থাকে। 

“আচ্ছা রেবন্না, উকিল সাহেব তো বলেছিলেন নিশ্চয় জিতিয়ে দেবেন। তবে হার হল কেন £' 

“শুনছি নাকি এর হারামজাদারা জজকেও ঘুষ খাইয়েছিল, শিবেগৌড় আগের দিনই গিয়ে 
দ্র'হাজার টাকা দিয়ে এসেছিল। আমি আগেই খবর পেয়েছিলাম. আমার কাছে দু'হাজার টাকা 
থাকলে আমিও ঘুষ দিয়ে আসতাম । কিন্তু আমি তো জানি আপনাদের কাছে আর কিছু নেই, 
তাই রায় বেরোনর দিনটা আর যাইনি ।, 

গঙ্গম্মা আর কোন কথা না বলে নিঃশব্দে বাড়ি ফিরে আসে । 


২ 


অনেকেই গজম্মার কঁড়েতে এসে শিবেগৌড় আর জজ সাহেবকে গালমন্দ করে গজম্মার প্রতি 
সহানুভূতি জানাতে লাগল। অইয়াশাস্ত্রীজীও এলেন এক দিন। শিবেগৌড়ের উদ্দেশ্যে কিছু 
গালি দেবার পর তিনি বললেন, “গজম্মা, আমার স্ত্রীর কিছু কথা আছে তোমার সঙ্গে, তুমি একবার 
আমাদের ঝুঁড়েতে চল।” গঞ্জম্মাকে নিয়ে গেলেন অইয়াশান্ত্রী, সেখানে তাঁর স্ত্রীও শিবেগৌড়কে 
অভিসম্পাত দিতে শুরু করল । অইয়াশাস্ত্রী পাঁজি-পুঁথি দেখে ঘোষণা করলেন উক্ত জজ সাহেবের 
নাকি স্ত্রী, পুত্র, কন্যা সবাইকার মৃত্যু অবশ্যস্তাবী। 

গঙ্গাবোন, তুমি রেশমের কাপড় পরে এখানেই খাওয়া-দাওয়া কর, কে কি বলবে তোমায় £" 
শাস্ত্রীজীর স্ত্রী সুব্বম্মার এই মন ভেজানো কথা শুনে গঙ্গশ্মা এবার প্রাণ খুলে ছেলের বৌয়ের নিন্দা 
শুরু করল-_-এ ছেনাল রাক্ষুসী যেদিন আমার বাড়িতে পা দিয়েছে সেদিন থেকেই যত কম্টের 
শুরু । এখন জমি-জিরেত সমস্ভই গেল। কথাতেই আছে, নবজাত শিশু আর বাড়ির নতুন 
বৌ যে ভাগ্য নিয়ে আসে তা কখনও মিথ্যে হয় না! 

গঙ্গম্মা সান করে রেশমের কাপড় পরে কপালে বিভূতি লাগিয়ে তিনবার আচমন করল । 
ততক্ষণে শাস্ত্রীজী অপপন্নায়াকেও ডেকে এনেছেন । শাস্ত্রীজীর জ্যাঠামশায়ের নাতি অন্নাজোইসও 
এসেছে। সুব্বম্মা এদের সবার জন্যই রান্না করেছিল-__চালকুমড়োর কটি, মড়ুয়ার রুটি, ভাত 
আর মাঠা। সবাইকে খাবার পরিবেশন করার পর অইয়াশান্ত্রী কথা শুরু করলেন, “এ সময় 
রামন্নাজী বেঁচে থাকলে কি ভালই হত! আহা, তাঁর ব্যাপারই ছিল আলাদা । এদের জিক্তাসা 
কর, এখনও তাঁর জন্য আমার মনটা কি রকম উতলা হয়ে পড়ে । তিনি চলে গিয়ে পহান্ত এ গ্রামের 
যেন সমস্ত গৌরবই শেষ হয়ে গেছে । 

“যা হতচ্ছাড়ি ছেনাল সব বৌ জুটেছে আমার কপালে--তাতে আর তিনি থাকবেন 
কি করেঃ, 

এবার সুব্বম্মা প্রশ্ন করে, গঙ্গম্মা, তোমার মাদিক খতু বন্ধ হয়ে গেছে আজ প্রায় দু-বছর 
হয়ে গেল, তাই নাঠ 

“তিন বছর হয়ে গেছে ।, 

শাস্ত্রীজী ব:লন, “দেখছ তো, তোমারও কত বয়স হয়ে গেল। তুমি তো সব রকম দান-ধ্যান, 


গৃহভঙ্গ ৯১ 


ব্রত-নিয়ম সবই করেছ, তা এই সময় স্ত্রীলাকদের খষিপঞ্চমীর ব্রত করতে হয়। এতে তোমার 
সর্ব প্রকার দুঃখমোচন হবে ।, 

অন্নাজোইসের শাস্ত্র ভান তার কাকার চেয়ে বেশী। সে সিন্ধঘট্রের স্রণাজোইসজীর শিষ্যগিরি 
করেছে, কাজেই শাস্ত্র থেকে মন্ত্র পাঠ করে সে খষিপঞ্চমী ব্রতৈর মহিমা বোঝাতে লাগল । 

“যাহোক করে এ ব্রতটা তুমি করেই ফেল। না হয় এই কঁড়ে ঘরেই হবে, তাতে কোন ক্ষতি 
নেই। যা সাহায্য দরকার সব আমরা করে দেব। এখানেই একটা চালা তুলে দেওয়া যাবে 
এখন; এ অরণীতলার কুঁড়ের সামনে বড় দেখে একটা চালা বাঁধলেই হবে। তোমাদের কুঁড়ের 
সামনে নানা রকম উপদ্রব, ওখানে ছোয়াছু"য়ি বাঁচানো যাবে না” মন্তব্য করল সুব্বশ্মমা। 

রুটি শেষ করে মাঠা আর কি দিয়ে ভাত মাখতে মাখতে ছেলেকে জিজ্ঞাসা করে গ্ম্মা, 
“কি রে অপ্পন্না, ব্রতটা করব না কি£ চেনেনহল্লীর বেঙ্কটচলায়াজীর মায়ের খষিপঞ্চমী ব্রতে 
নিমন্ত্রণ খেয়েছিল অপ্পন্ায়া। কটি, পরণপোলি, কাঁচা আম দিয়ে ভাত, এমন চমত্কার সব 
রান্না হয়েছিল সেখানে যে, ভাবলেই জিভে জল এসে যায়। সেই ভোজের কথা মনে পড়তেই 
অপ্পন্না তার সামনে রাখা মাঠা আর কির জায়গায় সেই কাঁচা আম আর মশলা দেওয়া ভাত এবং 
পুরণপোলির স্তূপ যেন মনশ্চক্ষে দেখতে পেল। 

“করেই ফেল মা, বেঙ্কটাচলের চেয়ে আমরাই বা কম কিসে £ 

সুতরাং স্থির হয়ে গেল ব্রত করা হবে। সুব্বশ্মা বলে উঠল, গঙ্গম্মাকে তোমরা কি ভেবেছ 
কিঃ ওর যে কথা সেই কাজ। স্বয়ং ব্রহ্মদেবের বাপ এলেও ওকে ওর কথা থেকে টলাতে 
পারবে না। 

কাজেই গঙ্গম্মা অটল রইল । না থাকলে ওর নাম থাকে কি করে? খাওয়া-দাওয়ার পর 
অন্নাজোইস পাঁজি দেখে এবং দুই হাতের কররেখা ইত্যাদি বিচার করে দিন স্থির করে ফেলল। 
চেন্েনহল্লীর বেহ্কটচলায়ার মায়ের খষিপঞ্চমী ব্রতের চেয়ে এখানে ধুমধাম যদি কম হয় তাহলে 
গঙ্গম্মার মান থাকবে না, সুতরাং জিনিসপত্র বেশী করে আনাতে হবে। অহইয়াশাস্ত্রী কাগজ-কলম 
নিয়ে তখনই ফর্দ করে ফেললেন। গ্রামের দুই পুরোহিতের জন্য রেশমের চাদর, মেলুকোটের 
পাড়ওয়ালা ধুতি এবং তাঁদের স্ত্রীদের জন্য পঞ্চাশ পঞ্চাশ টাকার শাড়ী। বাড়িতে যে গরু আছে 
তাতেই গোদানের কাজ চলে যাবে । এছাড়া মিহি চাল, ডাল, চিনি, সুজি ইত্যাদি চাই, এসব আনতে 
গরুর গাড়ি নিয়ে তিপটুর যাওয়া দরকার । স্থির হল অন্নাজোইস এবং অইয়াশাসত্রী দু'জনে মিলে 
যাবেন বাজার করতে । এই সুযোগে অপ্পন্নায়াও আরেকবার তিপটুর ঘুরে আসার সম্ভাবনায় 
ভারি খুশি । 


৯১১. 


মহাসমারোহে সুসম্পনন হল খাষিপঞ্চমী ব্রত। স্থির করা হয়েছিল যে, নিমন্ত্রিতিরা সব আট দিন 
পরে নিজ নিজ গ্রামে ফিরে যাবে। ব্রতের জিনিসপত্রের মধ্যে সুজি, চিনি, ঘি ইত্যাদি কিছু কিছু 
তখনও অবশিম্ট ছিল। এরই মধ্যে একদিন পুন্রবধুকে জানিয়ে দিল গঙ্গম্মা, “তুই এ সংসারে 
পা দেওয়ার পর থেকেই আমাদের দুর্দশা শুরু হয়েছে। জমি-জমা সব খোয়াতে হল। এবার 
গ্রামে ফিরে তুই তোর ছেলে-পিলে নিয়ে আলাদা থাকবি, আমরা থাকব বাড়িতে ॥ 


৯২ গৃহভঙ্গ 


তুই আর তোর ছেলে-পিলে' কথাটা ঠিক বুঝল না নন্জম্মা, তাই সে প্রশ্ন করল, “কোন 
বাড়িতে থাকবেন £ 

“কোন বাড়িতে আবার £ আমার স্বামী যে বাড়ি তৈরী করে গেছে সেই বাড়িতে !, 

নন্জুর ইচ্ছা হল বলে, শিবেগৌড় তোমাদের সে বাড়িতে ঢুকতে দিলে তবে তো! কিন্তু কিছু 
বলল নাসে। মনে মনে সে অনেক আগেই বৃঝেছিল যে, সমস্ত সম্পত্তিই মামলার ফলে হাতছাড়া 
হয়ে যাবে। শিবেগৌড়ের কাছে আরো দু'হাজার টাকা পাওয়া যাবে এটা নন্জু আশা করেনি । 
কিন্তু এ টাকাটা পাওয়া গেছে জানার পরও সে কোন পরামর্শ দেবার চেস্টা করেনি, কারণ জানত 
যে, কোন কথা বলতে গেলেই অনর্থক ঝগড়া হবে। অনেক খারাপ কথা শুনতে হবে তাকে। 
এখন সে ছ"মাস অন্তঃসত্তী। ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছে এ সময়ে খারাপ কথা শুনতে নেই, 
খারাপ চিন্তা করতে নেই। সর্বদা সৎ-প্রসঙ্গ শুনতে হয়, মন প্রফুল্ল রাখতে হয়। প্রথম দু'বার 
গভাবস্থায় এসব কথা বিশেষ মনে আসেনি, কিন্তু এবার এটা বেশী করে মনে পড়ছে যেন। 
প্রত্যহ তাই দে কোন না কোন সময়ে প্রুবচরিত, ভক্ত প্রহ্লাদ, রামের রাজ্যাভিষেক প্রভৃতির 
গানগুলো নিজের মনেই গুনগুন করে গায়। এসব কাহিনীর মধ্যেই মনকে নিবিষ্ট রাখতে 
চেম্টা করে। 

সেদিন দুপুরে স্বামী যখন শুয়েছে শাশুড়ীর আদেশটা তাকে জানিয়ে নন্জ্‌ জিক্তাসা করল, 
“উনি তো বলে দিলেন আলাদা থাকতে, তা কোথায় থাকবে, কি করবে সে সব ভেবেছ কিছু £ 

“তোর গুণের বহর দেখেই তো ওকথা বলেছে মা। তোর ছেলে-পিলেদের নিয়ে তুই যা খুশি 
কর-গে যা” 

“আমার আবার কি গুণের বহর! সারা গ্রাম আমকে জানে । এখন ওসব কথা থাক, 
এবার কি করা উচিত তাই বল।” 

“আমি তো বলেই দিয়েছি, আমি আমার মায়ের সঙ্গে থাকব 1 

নন্জুর ভারি রাগ হল এবার,_-“কি বলছ কি তুমি £ মাথার ঠিক আছে তো £ 

“দূর হয়ে যা এখান থেকে হতচ্ছাড়ি ছেনাল কোথাকার । আমাকে ঘুমোতে দে এখন ॥ 

আর কথা বলল না নন্জম্মা। আলাদা থাকতে তার আপত্তি ছিল না, কিন্তু শাশুড়ী যে তাঁর 
ছেলেকেও নিজের কাছে রেখে নেবেন এটা সে কল্পনা করতে পারেনি । “যাক, এখন তো জমি- 
জমাও নেই আর, দেখা যাবে কতদিন ছেলেকে কাছে রাখেন, মনে মনে ভাবে নন্জু। ছেলে-পিলে 
নিয়ে তাকেই শেষ পর্যন্ত সমস্ত পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে হবে এটা সে আগেই আন্দাজ 
করছিল, কিন্তু ভেবে পাচ্ছিল না কিভাবে সেটা করবে । কিন্তু মনে মনে এটুকু সে স্থির করে নিয়েছিল 
যে, যত কম্টই হোক না কেন কাঁদবে না সে, কিছুতেই মনকে বিচলিত হতে দেবে না, কারণ সে 
যে এখন গর্ভবতী । 

স্বামী ঘুমোলে সে রামন্নাকে কাঁধের ওপর তুলে, মেয়ে পাবতীর হাত ধরে জলাশয়ের উ“চু পাড়ে 
উঠতে শুরু করল। জলাশয়ে জল নেই এখন, মিহি মাটির গুঁড়ো বাঁধের ওপরের পথটাকেও 
ধূলি-ধুসর করে তুলেছে, তার ওপর প্রখর রৌদ্র। ধীরে ধীরে সে মন্দির প্রাকারের দরজার কাছে 
এসে পৌ'ছল। দেখা গেল মহাদেবায়াজী এইমান্র স্নান সেরে এসে গেরুয়া ধৃতিখানা রৌদ্রে মেলে 
দিচ্ছেন। ইটের উনুনে মাটির হাঁড়িতে ভাত ফুটছে। নন্জম্মাকে দেখে বলে উঠলেন, “এস 


গৃহভঙ্গ ৯৩ 


মা এস, তোমাদের কঁড়ের দিকে যাব ভাবছিলাম, কিন্তু তোমার শাশুড়ী আবার কি বলে বসবেন 
তাই ইতস্ততঃ বোধ করছিলাম !” 

“শাশুড়ী আর কিছুই বলতে পারবেন না। আমি নিজেই চলে এসেছি* জবাব দিল নন্জ। 

এই পরিবারের এমন কোন ব্যাপার নেই যা শুধু মহাদেবায়াজী কেন, সারা গ্রামসুদ্ধ লোক 
জানে না। কাজেই নতুন করে বলার কিছু ছিল না। তবে তাকে আলাদা করে দিতে শাশুড়ীর 
আদেশ, এবং এ প্রসঙ্গে স্বামীর জবাব দুই-ই সে জানাল মহাদেবায়াজীকে। 

“যে দু'হাজার টাকা পাওয়া গেল তাতে ধার শোধের পরেও তো হাজার টাকা উদ্বত্ত ছিল। 
জোইসজীর কথায় নেচে সে টাকাটাও নম্ট করে ফেলল, তুমি চুপ করে সব দেখলে কেন বল তো £ 

“অইয়াজী, সবই গেছে, তাই ওটুকও গেল। আমি বারণ করলেও উনি শুনতেন না, শুধু 
শুধু খানিকটা ঝগড়া হত। 

“সে কথা অবশ্য ঠিক ।” 

মহাদেবায়াজী একটা এল্যমিনিয়মের থালায় ভাত ও বরবটির বিচির ডাল ঢেলে আহার করে 
নিলেন। রোজ মধ্যাহেন লিঙ্গায়েতদের বাড়ি থেকে ভিক্ষান্ন এনে আহার করেন। মধ্যাঙ্ছের 
সূর্য পশ্চিমে লে পড়লে আর ভিক্ষা গ্রহণ করেন না। আজ সোমবার দূর গ্রামে ভিক্ষা করতে 
গিয়েছিলেন। ফিরতে দেরী হয়ে গেছে, তাই এসে রান্না করতে হল। নন্জম্মা আর পার্বতীকে 
একটু গুড় আর নারকেল খেতে দিয়ে মহাদেবায়াজী চিন্তামগ্রভাবে বসে রইলেন। 

“অইয়াজী, আমার বাপের বাড়ির সব খবর আপনি জানেন কি না জানি না। নিজেদের 
ঘরের কথা বাইরে বলে লাভ কি£ তাই কাউকে কিছু বলি না আমি। আমার বৌদিদির স্বভাব 
ভাল নয়। প্রসব হবার জন্য বা অন্য কোন কারণেই আর আমি সেখানে যাব না। ভেবেছিলাম, 
ঠাকমাকেই এখানে আনিয়ে নেব, তিনিই আমার সেবা-যত্র করতে পারবেন। অবশ্য তাঁরও বয়স 
হয়েছে পচাত্তরের ওপর, বেশী খাটতে পারেন না এখন, তবু হাত-পা বেশ শক্ত আছে। কিন্ত থাকার 
একটা আশ্রয় আর দু'মুঠো অন্ন তো চাই। এই সময় স্বামী যদি ত্যাগ করে তাহলে কি করব 
আমি বলুন তো£, 

একটু চিন্তা করে মহাদেবায়াজী বললেন, “চেন্নৈয়া তো দুদিন পরেই ছুটে আসবে, ওর জন্য 
কোন চিন্তা নেই। করুবরহল্লীর প্যাটেল গুপ্ডেগৌড়জীকে জান তো? তিনি তোমাকে সাহায্য 
করতে পারেন। এ গ্রামে কোন হিতৈষী পাবে না তুমি । 

করুবরহল্লী এদেরই পাটোয়ারী এলাকার অন্তর্গত। সে গ্রামের চলিলিশ ঘর অধিবাসী 
সবাই জাতিতে মেষপালক। গুণ্ডেগৌড় গত চল্লিশ বছর ধরে সে গ্রামের প্যাটেলের পদে আছে, 
আশে-পাশের গ্রামের লোক তার নাম দিয়েছে ধর্মরাজ'। নন্জম্মাও শুনেছে এর কথা । 
লোকে বলে, তিনি যেদিন থেকে প্যাটেল হয়েছেন সেদিন থেকে সে গ্রামে চুরি, ডাকাতি, ব্যভিচার 
কিছুই হয়নি, আর ক্ষুধার ত্বালায় গ্রাম ছেড়ে কাউকে চলে যেতেও হয়নি । 

অইয়াজী বললেন, “পেছনের পাড়ায় ও'র একটা খালি বাড়ি পড়ে আছে। সেখানে থাকতে 
দেবার জন্য যদি অনুরোধ জানাও তো উনি “না” করবেন না।” 

নন্জম্মারও মনে পড়ে গেল, রামসন্দ্র গ্রামে গুশ্ডেগৌড়ের একখানা বাড়ি আছে বটে, কেউ থাকে 
না সেখানে । সে বাড়িটা পেলে আশ্রয়ের চিন্তাটা অন্ততঃ দূর হয়। তাঁকে সে দেখেছে বটে তবে 


৯৪ গৃহভজ 


বিশেষ পরিচয় নেই। তাদেরই পাটোয়ারী এলাকার মধ্যে থাকেন বলে প্যাটেল হিসাবেই কাজের 
জন্য তাদের বাড়ি কয়েকবার এসেছেন। নন্জনম্মা প্রতিবারই পরিবেশন করে খাইয়েছে তাঁকে । 
ঘন-পাকা গোফ, লম্বা-চওড়া চেহারা, ডান হাতের কবজীতে মোটা সোনার ব্যাণ্ড লাগানো ঘড়ি। 
কোট পরেন বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে পরেন মুচির হাতের তৈরী চপ্পল ও গোড়ালি ঢাকা মোজা । 

“কাল বেলা নটা-দশটার মধ্যেই ক্রুবরহল্লী চলে যাও। আমিও ভিক্ষা করতে যাব। 
গিয়ে গৌড়জীর সঙ্গে কথা বল, আমি নিজেও বলব। উনি কখনই আপত্তি করবেন না। চেনৈয়া 
মায়ের সঙ্গে থাকবে, সে কথা ওখানে বলার দরকার নেই।” মহাদেবায়াজীর উপদেশ নিয়ে 
নন্জম্মা কুড়েতে ফিরে আসতেই গঙ্গশ্মা গালাগাল দিয়ে উঠল, “রাঁড় কোথাকার, পাড়া বেড়াতে 
যাওয়া হয়েছিল।” নন্জম্মা কোন উত্তর দিল না সে কথার । 

পরদিন সকালে উঠে নন্জশ্মা স্নান করল । বাচ্চাদের ফরসা জামা-কাপড় পরাল। রুটি 
তৈরী করে বাচ্চাদের খাইয়ে নিজেও খেয়ে নিল। তারপর চুল বেঁধে কপালে আঁকল সিঁদুরের 
টিপ। রামন্নাকে কাঁধে তুলে পাবতীর হাত ধরে বেরিয়ে পড়ল সে। কুঁড়ের সামনেই গাছতলায় 
বসেছিল গল্সশ্মা, চেচিয়ে বলে উঠল, “কোন পিরীতের নাগরের কাছে যাওয়া হচ্ছে শুনি £ 
কোন উত্তর না দিয়ে এগিয়ে গেল নন্জম্মা। কিছু দুর গিয়ে সে একবার পেছন ফিরে দেখে 
নিল শাশুড়ী, স্বামী বা দেওর কেউ পিছু নিয়েছে কি না। 

রামসন্দ্র গ্রাম থেকে কুরুবরহল্লীর দূরত্ব দু'মাইল। পথে একটা টিলায় উঠে আবার নামতে 
হয়। একলা যেতে নন্জম্মার কোন ভয় ছিল না, কিন্তু শরীরের এই অবস্থায় ছেলেকে কাঁধে 
নিয়ে টিলায় চড়তে তার হাঁফ ধরে গেল, বুক ব্যথা করতে লাগল। চার বছরের শিশু পাবতীও 
হাঁফিয়ে পড়েছে, তবু সে কাঁদতে কাঁদতে চলেছে মায়ের হাত ধরে। হঠাৎ নন্জম্মারও খুব 
কান্না পেয়ে যায়, ছেলেকে নামিয়ে সে বসে পড়ে মাটিতে । প্রাণভরে কিছুক্ষণ কেদে সে আঁচলে 
চোখ মুছে ফেলে। মুহ্ের জন্য একবার তার মনে হয়েছিল, বাচ্চা দুটোকে কোন পুকুর বা 
কুয়োতে বিসরজন দিয়ে সেও যদি ডুবে মরতে পারত ! কিন্তু না না, এসব কৃ চিন্তা মনে আসতে 
দেওয়াই উচিত নয়! কথাটা মনে পড়তেই সাহস ভরে উঠে পড়ল সে। ছেলেকে এবার অন্য 
দিকের কাঁধে তুলে, পার্বতীর হাত ধরে আবার এগিয়ে চলল। টিলার ওপর থেকে দেখা যায় 
করুবরহল্লী। গ্রামের মাঝখানে নন্দীর মন্দিরও দেখা যাচ্ছে। মন্দিরের পাশেই নাকি 
গুণ্ডেগীড়ের বাড়ি। টিলা থেকে নামতে নামতে নন্জম্মা মনে মনে প্রার্থনা করতে থাকে, 
_ “হে ঠাকুর, গুণ্ডেগীড়জীর মনে আমার প্রতি একটু করুণা জাগিয়ে দিও ঠাকুর !, 

গৌড়জী বাইরের দালানে বসে তামাক খাচ্ছেন, তাঁকে দেখতে পেয়ে বাড়ি চিনতে আর অসুবিধা 
হল না নন্জম্মার । গৌড়জী ওকে দেখে উঠে দাঁড়ি,য় বললেন, “এসো এসো, মা লক্ষ্মী এসো। 
আহা, এই রোদে এতটা পথ ছেলে নিয়ে এসেছ £ বাড়ির ভেতর দিকে মুখ ফিরিয়ে ডাক দিলেন, 
“ওরে ও লড়গ্যা আমাদের পাটোয়ারিন্‌ এসেছেন যে, তাড়াতাড়ি মাদ্ররটা পেতে দে।” বলতে বলতে 
তিনি ভেতরে নিয়ে গেলেন এদের | ছেলেমেয়েদের নিয়ে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে পড়ল নন্জম্মা। 
গৌড়জী বসলেন বারান্দার থামের পাশে । তাঁর স্ত্রী লক্কশ্মা রোরুদ্যমানা পার্বতীর হাতে একটু 
গুড় আর নারকেল দিয়ে তাকে শান্ত করতে চেস্টা করেন। 

“আমাদের বাড়ির সব ব্যাপার শুনেছেন কি আপনি £ 


গুহভজ ৯১৫ 


“সবই জানি মা। হাত থেকে ছুটে যাওয়া মশালের মতই তোমাদেরও সবস্ব হাতছাড়া 
হয়ে গেছে। সম্পত্তি যতক্ষণ থাকে, মশালও ততক্ষণই জ্বলে, মশাল হাতছাড়া হলেই সব গেল ! 
তা সেই মশালই যদি কেউ হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় তাহলে তার আর বাকি রইল কি? 
তোমার শ্বশুরমশাইও এই আমার মতই বোকা ছিলেন। ওটিকে ঘরে এনেই নিজের সর্বনাশ 
করলেন, তোমাদের সংসারের ভিত উপড়ে দিল একেবারে । এখন যেটুক আছে তা তোমাকেই 
রক্ষা করতে হবে মা।' নিজের স্ত্রীর দিকে ফিরে এবার বলেন, “পাটোয়ারী কাজের সমস্ত হিসেব- 
নিকেশ এই মা লক্ষমীই লেখেন, তা জান তোঠ এসব কি এ চেন্ৈয়ার দ্বারা হয় কখনো £ 
ওটা তো একটা ধর্মের ষাঁড়। জিক্তেস কর, ও যাঁড়, ঘাস খাবে £ তা বলবে “হ”, জল খাবে ? 
তাতেও “হ** চরতে যাবে £ তাতেও “হ* বলে ঘাড় নাড়বে। কিন্তু যদি বল “খেতে লাঙল 
চষতে হবে” তক্ষুনি “না না” করে শিং নেড়ে পিট্টান দেবে! তোমার স্বামীর গুণ-কীতন করছি, 
রাগ কোর না মা। 

নন্জ বলে, “রাগ করব কেন £ এ রকমই তো করেন উনি ।” 

এইসব আলাপের মধ্যেই একবার ভেতরে গিয়ে লন্কম্মা তিনটি ঘটিতে করে নিয়ে আসে গরম 
দুধ, তাতে উৎকৃষ্ট গুড় আর ঘি গলিয়ে মিশিয়ে দিয়েছে । নন্জম্মা আপত্তি জানিয়ে বলে, আমি 
এখন দুধ খাব না।” লক্কম্মা বলে ওঠে, ণপোয়াতি-মেয়ে দুধ খেতে “না” বলতে নেই, খেয়ে ফেল 
ওটুব:।” 

“গৌড়জী, আপনার বাড়িতে দুধ খেতে আপতি করব না, কিন্ত আপনি কথা দিন আমাকে সাহায্য 
করবেন £ 

“কি ব্যাপার, বলত মাঠ, 

“আমার শাশুড়ী কাল আমাকে বলেছেন আলাদা থাকতে । এখন আমার কোন আশ্রয় নেই । 

“আরে, আশ্রয়ের ভাবনা কি£ আমার বাড়ি তো পড়ে আছে, সেখানেই থাকবে । নাও 
এখন দুধটুক খেয়ে নাও । 

যে প্রাথনা নিয়ে এসেছিল, চাওয়ার আগেই তা পর্ণ করে দিলেন গুণ্ডেগৌড়। একটা কটু- 
কথা নয়, একটু তর্ক নয়, এমনভাবে দান করলেন যে, বেশ বোঝা গেল ও র মনে এ বিষয়ে এক- 
বিন্দুও দ্বিধা নেই। বাচ্চাদের দুধ খাইয়ে নন্জশ্মাও পান করল গরম দুধ। গৌড়জী নিজের 
স্ত্রীকে উদ্দেশ করে বললেন, “দেখছ তো, আমি তোমাকে বলেছিলাম কিনা, এই মা-লক্ষমীর মুখখানি 
দেখলে চোখ ফেরে না, যেন সাক্ষাৎ সীতাদেবী, তাই না 

ইতিমধ্যে মহাদেবায়াজীও ভিক্ষা করতে এসে পৌ"ছলেন, নন্জম্মাকে দেখে তিনিও বসলেন 
এসে । লঙ্কম্মা পাটি পেতে দিল। তিনি যেন কিছু জানেন না এইভাবে নন্জম্মার আগমনের 
কারণ জিক্তাসা করলেন। তার থাকার ব্যবস্থা হয়ে গেছে শুনে মহাদেবায়াজী বললেন, “আশ্রয় 
তো আপনি দিলেন গৌড়জী, কিন্তু এদের পেট চলবে কি করে£ ঘরের মধ্যে অনাহারে পড়ে 
থাকতে হবে শেষ পর্যন্ত ।: 

“কেন পাটোয়ারী কাজটা আছে তো£ একটু খাটতে পারলে পাটোয়ারী কাজের মত ভাল 
উপাজন আর কিছুতে আছে নাকি £ 

“সে কেমন পুরুষ মানুষ তা তো জানেন? 


৬ গুহভজ 


“ওটা তো একটা শিখণ্তী- কিন্তু গাড়ির এক জোড়া বলদের মধ্যে একটা দুর্বল হলেও 
অন্যটা যদি সবল হয় তাহলেই কাজ চলে যায়!” গৌড়জী নন্জম্মার দিকে ফিরে বলেন, 
এ ধর্মের যাঁড়টাকে বলে দাও, তুমি যেমন বলবে সেইভাবে চলতে হবে ওকে । ব্যস, 
তাহলেই পেট চালাবার কোন ভাবনা থাকবে না।” 

মহাদেবায়াজী বললেন, “সে কথা চেন্নৈয়া শুনলে তবে তো! 

“কপালে যা আছে ভুগতে হবেই বলে লক্কশ্মা। 

বেলা দ্বিপ্রহর পেরিয়ে গেছে। এদের না খাইয়ে ছাড়তে চান না গৌড়জী ও লব্বম্মা। 
বাড়ির ভেতর থেকে পিতলের বাসন ও দুটি ঘড়া আনা হল, মন্দিরের সামনের কুয়োতলায় 
বসে মহাদেবায়াজী ও নন্জু নিজের নিজের বাসন মেজে নিল তৈতুল দিয়ে। মন্দিরের 
আঙিনাতেই গৌড়জীর ছেলে তিনখানা করে পাথরের টুকরো দিয়ে উনুন তৈরী করে ফেলল 
দেখতে দেখতে । তারপর নন্জম্মা আর মহাদেবায়াজী নিজের নিজের ভাত ফুটিয়ে নিলেন। 
নারকেল আর নুন মেশানো মাঠা দিয়ে খাওয়া-দাওয়া সমাপ্ত হল, বাচ্চারাও আবার দুধ খেল 
একটু । গরুর গাড়ির ব্যবস্থা করে গৌড়জী গর্ভবতী নন্জ্‌ আর তার শিশুদের গাড়িতে করে 
বাড়ি পাঠালেন। ভিক্ষার ঝুলিটা নিয়ে মহাদেবায়াজীও উঠে বসলেন সেই গাড়িতে । 


৪ 


কুঁড়ে ঘর ছেড়ে গ্রামে ফিরে এল গঙ্গম্মা। নিজেদের বাড়িতে তালা খুলে ঢুকে অপ্পন্নায়াকে নিয়ে 
সবেমান্র মাঝের ঘরখানার ধুলো ঝাড়তে শুরু করেছে এমন সময় শিবেগৌড়ের চাকর মুরুব এসে 
হাজির, হাতে তার মস্ত এক তালা-চাবি। সে জানাল, “গৌড়জী বলেছেন, আপনাদের জিনিসপন্র 
এখান থেকে নিয়ে যান। এ বাড়িতে তালা লাগিয়ে দিতে পাঠালেন আমাকে । 

“কোন রাঁড়ের পুত একথা বলেছে শুনি £ 

“শিবেগৌড়জী বলেছেন । 

“হা কপাল! ভিটে থেকেও উচ্ছেদ করবে 2 জমি-জমা তো নিয়েই নিয়েছে, এখন 
বাড়িখানাও ছাড়তে বলছে, এ কি ওর বাপের ভিটে নাকি £ গঙ্গম্মা এবার শিবেগৌড়ের বাড়ির 
সামনে গিয়ে চেচাতে আরন্ত করে, হহ্যারে গৌড়, ওটা কি তোর বাপের ভিটে £ আদালতে তো 
জমি দেবার কথাই হয়েছিল !, 

“ইচ্ছে হয় তো তিপটুরে গিয়ে জেনে এস। তুমি আর তোমার ছেলেরা যে খরিদ-পত্রে সই 
করেছ সেটা লোহার সিন্দুকে তোলা আছে, বার করে এনে দেখাব নাকি £ বলতে বলতে গৌড় 
বাইরে বেরিয়ে আসে। 

“হা কপাল, সগুষ্টি নিপাত যা তুই এছাড়া আর কিছু বলতে পারে না গঙ্গম্মা। 
একটু চুপ করে থেকে প্রশ্ন করে, “তা গাঁয়ের প্যাটেল তুমি, তুমিই বলে. দাও কোথায় 
থাকব আমরা £ 

“যাদের চাল-চুলো নেই তাদের জন্য বাড়ি তৈরী করা তো প্যাটেলের কাজ নয়? চুপচাপ 
সরে পড় এখান থেকে । দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দেয় শিবেগোড়। 


গৃহতঙ্গ ৯৭ 


“ওর ঘর-দোর ধসে পড়ক, তার ওপর আমি রেড়ির চাষ করব। ধাপ্পা দিয়ে সম্পত্তি 
হাতিয়ে নিয়ে রাঁড়ের ব্যাটার বড় তেল হয়েছে। আমার কি কেউ নেই নাকি £ গজরাতে গজরাতে 
গ্ম্মা রেবন্নাশেট্রীর বাড়িতে গিয়ে হাজির । সব ঘটনা তাকে জানিয়ে বলে, তোমাদের গোয়ালের 
উঠোনে একট্র জায়গা আছে, সেখানে একটা চালা তুলে আমি আর আমার দুই ছেলে থাকব, 
থাকতে দেবে তো ঠ 

গঙ্গশ্মাজী আমার মোষটা বিয়োলে তাকে বাঁধবারই জায়গা থাকবে না, তা ওখানে আপনারা 
কোথায় থাকবেন £ আপনাদের অইয়াশান্ত্রীজীকে জিক্তেস করে দেখুন না? 

“এই রাঁড়ের পৃত কেবল আমার টাকাগুলো খাবার তালে ছিল' বলতে বলতে সে এবার 
চলল অইয়াশাস্ত্রীর কাছে। কিন্তু তাঁর গোয়ালেও জায়গা নেই। 

“যখন আমার বাড়ি পেটপূজোর সুবিধে ছিল তখন আমার কথা খুব মনে পড়ত, এখন 
চার গজ জমিও ছাড়তে পারছে না ভিখিরি পূরুত বামুন" ব্যঙ্গতিক্ত স্বরে বলে গম্মমা। 

শান্ত্রীজী একটু অস্থম্তিবোধ করেন বটে কিন্তু গঙ্জশ্মার কথার ফাঁদে পড়ে তাকে আশ্রয় 
দেবার বিন্দুমান্রও ইচ্ছা নেই তার। কাজেই তিনি তাঁর ভাইপো অন্নাজোইসের কাছে 
খোঁজ নিতে বলেন। গ্রামের পর্বকোণে হনুমান মন্দির আছে, ইট-পাথরে গড়া গোটা- 
চারেক কামরাও আছে তাতে, দরজায় তালাও লাগানো চলে। সেখানকার পুরোহিত 
অন্নাজোইসজী। সেখানে থাকতে মা এবং ছেলেদের কোন আপত্তি নেই, কিন্তু থাকার 
জন্য গ্রামের প্রধান ব্যক্তিদের অনুমতি প্রয়োজন। গ্রামের প্যাটেল, পাটোয়ারী, পঞ্চায়েত- 
এর অধ্যক্ষ এবং সদস্যেরা, এদেরই বলা হয় প্রধান ব্যক্তি। অন্য সবাইকে রাজি 
করানো কিছু কঠিন নয় কিন্তু শিবেগৌড়ই হল প্যাটেল এবং পঞ্চায়েত অধ্যক্ষ, সেকি 
সম্মতি দেবে 2 অহইয়াশাস্্রীজী এবার বোঝাতে চেস্টা করেন, “তুমি একটু জিভে লাগাম 
টানো গঙ্গম্মা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে এভাবে ওকে হারামখোর, রাঁড়ের ব্যাটা এ-সব বলে গাল- 
মন্দ কোর না। উত্তরে তেড়ে উঠল গঙ্গশ্মা, “কোনো ব্যাটা রাঁড়ের পুতকে ভয় করি আমি 2 
ছেড়ে দিন ওসব কথা ।' 

দুই পূরোহিত মিলে শিবেগৌড়ের কাছে আবেদন করতে গেলেন। শিবেগৌড় রাজি 
হত কিনা সন্দেহ। কিন্ত তার স্ত্রী গৌরম্মার প্রাণে ভয় ঢুকেছে । গঙ্শ্মার মুখ বড় 
খারাপ, লোকে বলে ওর জিভে নাকি কালো তিল আছে। ক্ষণে-অক্ষণে ওর মুখ দিয়ে 
শাপমন্যি বেরোয়, পথে দাঁড়িয়ে ধুলো-মুঠি ছুঁড়ে ছুড়ে অভিসম্পাত দেয় আবার! তাছাড়া 
হনুমান মন্দির তো ব্রাহ্মণদেরই, ওদের নিজের জাতের কাউকে আশ্রয়ে আপত্তির কি আছে? 
গৌরশ্মা স্বামীকে বাড়ির মধ্যে ডেকে এনে কথাগুলো চুপি চুপি বলে। শিবেগৌড় রাজি হল 
কিনা ঠিক বোঝা যায় না। তবে বাইরে এসে সে পুরোহিতদের বলে, “আচ্ছা, আচ্ছা, ঠিক 
আছে যান ।” 

এরা হনুমান মন্দিরে আসার ফলে অন্নাজোইসজীর একটু সুবিধা হল। পুজারীর 
জন্য মন্দির সংলগ্ন পাঁচ একর বাগান এবং এক একর খেত আছে। অন্নাজোইস এই 
জমি ভোগ করে। কিন্ত একা হাতে রোজ মন্দির ধোয়া-মোছা, হনুমানজীর সআ্রান-পুজো 
ইত্যাদির সব কাজ সে করে উঠতে পারত না। যে দিন সে দান-দক্ষিণা আদায়ের জন্য 

ন 


৯৮ গৃহতঙ্গ 


অন্য গ্রামে যেত সেদিন তো হনুমানজীর ত্রানই হয়ে উঠত না। দিনের পর দিন ঘর- 
গুলোয় ঝাঁট না পড়ায় পাখির বিষ্ঠা জমে দুর্গন্ধ বেরোত। কয়েক বার প্যাটেল পুরোহিতের 
কাজের গাফিলতির জন্য ওপরে নালিশও লিখেছে । মন্দিরের সামনের জানলা দিয়ে 
পরিল্কার দেখা যায় ঠাকুরের বেদী। যেদিন হনুমানজীর মূর্তিতে ফুল-জল পড়ে না 
সেদিন গ্রামের লোক পুজো হয়নি দেখে পুরুতকে গালাগাল দিতে থাকে । 

এখন অন্নাজোইস, অপ্পন্ায়াকে বলল, “দেখ, মন্দিরে তোমাদের আশ্রয় দিয়েছি। রোজ 
দেওয়াল ঘরের মেঝে সব ভাল করে ঝাঁট দিয়ে ধুতে হবে, কোথাও যেন এতট্রুকু ময়লা 
না থাকে। হলুদ করবীর ফুল তুলে, মৃর্তিকে সান করিয়ে শ্ুদ্ধাচারে পুজো করবে, কিন্তু 
খবরদার কাউকে বলবে না যে, তুমি পুজো করেছ। যদি বলেছ, সেই দিনই মন্দির থেকে 
দূর করে দেব। মাঝে মাঝে আমিও পুজো করব অবশ্য। 

রাজি হয়ে গেল অপ্পন্না। ভগবানের পুজোয় গঙ্গম্মারও কোন আপত্তি নেই, দেবতার 
প্রতি তার অগাধ ভক্তি । তা ছাড়া চেন্নিগরায় তো পূজো-পাঠ মন্ত্র ইত্যাদি কিছু কিছু জানেও। 


€ 


বিয়ের সময় নন্জম্মা বাপের বাড়ি থেকে পেয়েছিল বাজবন্ধ, কোমরের গোট, একজোড়া চুড়ি 
আর রূপোর পাঁয়জোর। পাটোয়ারীর হিসাবের খাতা রাখার বাক্সটায় একেবারে নিচে 
এক কোণের দিকে রাখা থাকত গহনাগুলো। এখন এগুলো অন্ততঃ ফেরত চায় নন্জম্মা। 
স্বামীকে জিক্তাসা করে কোন স্প্ট উত্তর পাওয়া গেল না। দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করায় সে 
বলে উঠল, “বাপ দিয়েছিল তো কি হয়েছে, সে তো এখন আর তার সম্পত্তি নয়£ সে 
খরচ হয়ে গেছে! 

“কিসে খরচ হল £ কি করেছ সেগুলো দিয়ে £ 

“মামলায় খরচ হয়েছে।? 

“কি করেছ সেগুলো £ 

“কাশিমবদ্দির কাছে পঞ্চাশ টাকায় বাঁধা দেওয়া হয়েছে । চাও তো ছাড়িয়ে আন 
টাকা দিয়ে। 

“কত দিন আগে বাঁধা দিয়েছ £, 

গতবছর দেওয়ালির সময় 1? 

অর্থাৎ প্রায় সাত মাস কেটে গেছে । সুদই হয়েছে পঞ্চাশ টাকার ওপর। এখন একশ টাকা 
সংগ্রহ করে সে গহনা ছাড়িয়ে আনা এক রকম অসম্ভব ব্যাপার। 

“আমাকে না জানিয়ে আমার বাপের বাড়ির গহনায় হাত দিলে কেন £ 

“মা বলল, তাই আমি বাঁধা দিয়ে এলাম । 

“কিছুতেই ধৈর্য হারাব না” এ প্রতিজ্ঞা নন্জ আর টিকিয়ে রাখতে পারল না। বাসন- 
পন্রও কিছুই দেননি শাশুড়ী। তার বিয়ের সময় পাওয়া হাঁড়ি কড়াই খালা বাটি ইত্যাদি 
কিছুই তাকে দেবেন না সোজা বলে দিয়েছেন। অন্ততঃ এই সোনটুক্‌ থাকলেও দুর্দিনে 


গুহভঙ্গ ৯৯ 


কাজে লাগত। নতুন করে সংসার পাতবার জন্য এখন একটা ঘটি-বাটি পর্যন্ত নেই। 
বাচ্চাদের দু"খানা রুটি গড়ে দেবার মত এক মুঠো মড়য়ার আটাও নেই ঘরে। তার 
ওপর পেটে রয়েছে সন্তান। প্রসবের জন্য বাপের বাড়ি যাওয়ার কথা সে চিন্তাও করে 
না। যা একখানি বৌ এসে জুটেছে সে বাড়িতে ! 

রাগে আগুন হয়ে সে এবার স্বামীকে ধিক্কার দিয়ে বলে, “পুরুষ মানুষে রোজগার 
করে নিজের বৌকে গহনা গড়িয়ে দেয়। সে সব তো দূরের কথা, আমার বাবার দেওয়া 
গহনাটুকুও মা-বেটায় মিলে চুপি চুপি ভোগা দিয়ে নিয়ে নিলে, লজ্জা করল না তোমাদের £ 

স্বামীদেবতার মুখে কথাটি নেই। ভেড়ার মত চুপ করে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। 

“এখন ছেলে-পিলে খাবে কি তাই বল£ঃ হাজার-বার বারণ করা সত্তেও তো বস্, 
জমি-জেরাত কোটে” গিয়ে খুইয়ে এলে !, 

এসব কথার কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে চটে গেল চেন্নিগরায়। কষে গাল দিতে 
ইচ্ছা হল, কিন্ত নতুন কোন খারাপ কথাও মনে এল না, অগত্যা ভেংচি কেটে বার বার 
“ছেনাল ছেনাল” বলতে বলতে সেখান থেকে কেটে পড়ল সে! রাগ নন্জম্মার হয়েছিল 
খুবই। মিনিট দশেক কেদে সে আঁচলে চোখ মুছে ফেলল। আস্তে আস্তে মনটা শান্ত 
হয়ে এল তার। 

সেই দিনই মন্দিরে গিয়ে মহাদেবায়াজীর কাছে পাঁচটা টাকা ধার চেয়ে আনল সে। 
দ্বিতীয় দিন স্বামীকে বাচ্চাদের দিকে একটু নজর রাখতে বলে তাঁতিপাড়ার পুষ্টব্বাকে সঙ্গে 
নিয়ে চলে গেল সন্বেনহল্লী। রামসন্দ্র থেকে মাইল তিনেক দূরের এই গ্রামটায় কেবল 
ক্মোরদের বাস। পুটব্বা যে বাড়িতে নিয়ে গেল সেখান থেকে নন্জম্মা রান্নাঘরের জন্য 
কিছু দরকারী বাসন-পত্র কিনে ফেলল--জল তোলার ঘড়া, জল গরম করার হাঁড়ি, রুটি 
সেঁকার তাওয়া ইত্যাদি । পুট্রব্বা অনেক দর-দস্ভর করায় সমস্ত জিনিস-পত্রের জন্য বারো 
আনার বেশী খরচ হল না। বাসনগুলোর কিছুটা পুট্টববা আর কিছুটা নন্জশ্মা বহন 
করে নিয়ে এল। চড়া রোদের মধ্যে হাঁটতে হাটিতে ওরা যখন গ্রামে ফিরে এল দ্বিপ্রহরের 
সূর্য তখন ঠিক মাথার ওপর। জিনিস-পন্র গুপ্তেগীড়জীর বাড়িটায় নামিয়ে দরজায় 
তালা দিয়ে কুঁড়ের কাছে ফিরে গেল। শাশুড়ী আর দেওর ততক্ষণে নিজেদের জিনিস-পত্র 
হনুমান মন্দিরে নিয়ে গেছে। রামন্না কান্না জড়েছে ঘরের সামনে বসে, পার্বতীকে দেখা 
যাচ্ছে না কোথাও । আর চেন্নিগরায় যে কোথায় তা কেউ জানে না। ছেলেটাকে কোলে 
তুলে নিয়ে নন্জ্‌ পাশের ডোবটায় গিয়ে হাত পা ধুয়ে এল। ভাগ্যে ছেলেটা ডোবায় গিয়ে 
পড়েনি! কিন্তু পার্বতী গেল কোথায় £ সবাই এখন কুঁড়ে থেকে গ্রামের বাড়িতে জিনিস- 
পত্র নিয়ে যেতে ব্যস্ত। মেয়েটা কোথায় গেল কে জানে 2 জন্মদাতা বাপ, নিজের ছেলে- 
মেয়ের জন্য তার কি এতটুকুও হ'শ থাকতে নেই £ রামন্নাকে নিয়ে আবার ফিরল বেচারী 
গ্রামের দিকে। মহাদেবায়াজীও জিনিস-পন্র নিয়ে আসছেন পূর্বের আস্তানায় । দেখা গেল 
চেন্নিগরায় সেখানেই মন্দিরের বারান্দায় বসে মুখ ধুচ্ছে মুখের তামাক পরিস্কার করার 
জন্য। নন্জম্মা তার কাছে গিয়ে প্রশ্ন করল, পার্বতী কোথায় 2 মুখের পান ফেলতে 
ফেলতে উত্তর হল, “আমি কি জানি £ খুঁজে দেখ্‌ না গিয়ে ।” 


১০০ গহভঙ্গ 


'অইয়াজী দেখুন, ছেলে-মেয়েদের দিকে একটু নজর রাখতে বলে আমি সন্নেনহজলী 
গিয়েছিলাম বাসন কিনতে । এসে দেখি পার্বতী নেই। জিজ্ঞাসা করছি তো বলছে “আমি 
কি জানি?” দেখছেন তো আপনি ! 

পক হে, সকাল থেকে তো এখানেই বসে আছ, মেয়েটা গেল কোথায় ৮ অইয়াজীর 
প্রশ্ন শুনে চেন্নিগরায় বলে, “কে জানে কোথায় গেছে পোড়ারমুখী, এক জায়গায় চুপ করে 
বসবে না তো কিছুতে ॥” 

এক দিকে নন্জম্মা খুঁজতে বেরোল, আর এক দিকে গেলেন মহাদেবায়াজী। একজন 
খবর দিল তাঁতি পাড়ার দিকে নাকি দেখেছে। নন্জম্মা ছুটল সেখানে । সৌভাগ্যক্রমে 
দেখা গেল একজনদের বারান্দার নিচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে মেয়েটা। সবাই নিজের 
নিজের জিনিস-পন্র এনে গোছগাছ করতে ব্যস্ত, তাই কার বাচ্চা, কেউ খেয়ালই করেনি । 

মেয়ের হাত ধরে বাড়ি ফিরল নন্জম্মা। বাড়ির অবস্থা তো জানা আছে, কাজেই 
মহাদেবায়াজী একটা কুলোয় করে দু'সের মড়ুয়ার আটা, কিছুটা বরবটির বিচি, লঙ্কা, 
লবণ, তেঁতুল, নারকেলের চূর্ণ ইত্যাদি দিয়ে গেলেন। দুটো বাচ্চাই খিদের স্বালায় ছট্ফট্‌ 
করছে। নন্জম্মার নিজেরও খিদে পেয়েছে খুব। এই রোদে ছ"মাইল পথ হেটে ক্ান্তও 
হয়ে পড়েছে। সে যথেষ্ট শক্তিমতী হলেও এতটা পথ হাঁটেনি আগে কখনো। তাছাড়া 
শরীরের এই অবস্থায় পথ চলা বেশ কম্টকর। 

ক্লান্তি যতই থাক, বসার উপায় নেই। নতুন ঘড়ায় জল ভরে আনল কুয়ো থেকে । 
ঘরের মধ্যে উনূন পাতা ছিল, তাতে দিল জল-ছড়া। মহাদেবায়াজী কিছু শুকনো নারকেল 
পাতার ডাঁটা ইত্যাদি এনে দিলেন। মাটির দুটো হাঁড়ি ধুয়ে একটাতে বরবটির ডাল, 
অন্যটায় মড়য়ার আটা মেখে দলা পাকিয়ে সিদ্ধ করতে বসিয়ে দিল, নতুন হাঁড়ির রান্নায় 
হয়ত মাটির গন্ধ হবে, কিন্তু উপায় কি£ রান্না শেষ হতে বেজে গেল বিকেল চারটে। 
খিদের জালায় পার্বতী কোনরকমে সেই মড়্‌য়ার ডেলার আধখানা ডাল দিয়ে গিলে ফেলল 
কিন্ত রামন্নার পছন্দ হল না এই খাবার। সে বেচারার বয়স এখনও দু'বছর পূর্ণ হয়নি । 
এক টুকরো মুখে নিয়ে ভাল করে চিবোতে না পেরে “আর খাব না' বলে কানা শুরু করে 
দিল। আধসের আটা তখনও রাখা ছিল, তার থেকে দু”মুঠো নিয়ে নন্জম্মা তাড়াতাড়ি 
একটু নুন দিয়ে মেখে একখানা রুটি সেঁকে তাই ডাল দিয়ে খাওয়াল ছেলেকে । আধখানা 
রুটি খেয়ে কান্না থামল ছেলের । 

এইসময় দেখা গেল স্বামী এসে ঢুকছে এ বাড়িতে । মিনিটখানেক রান্নাঘরের 
দরজায় দাঁড়িয়ে তারপর উকি মারল ভিতরে । কার বাগান থেকে কে জানে, বড় এক- 
খানা কলাপাতা কেটে এনেছে। উনুনের সামনে বৌয়ের কাছে পাতাখানা পেতে দিব্যি 
বসে গেল চেন্নিগরায়। রান্না করার সময় নন্জম্মা ভাবতেও পারেনি স্বামী এখানে খেতে 
আসবে। ক্ষুধার্ত ছেলে-মেয়ের চিন্তাই ছিল তার সমস্ত মনটা জড়ে। এখন ছেলে-মেয়ে 
শান্ত হয়েছে, কিন্তু স্বামী এসেছে কেন? ওর তো নিজের মায়ের কাছে থাকার কথা 
ছিল। মায়ের বাড়িতে কি আজ উনুন ভ্রলেনি নাকিঃ না, মা বলে দিয়েছে, “যা বৌ-এর 
কাছে খেয়ে আক্*! হয়ত নিজে থেকেই এসেছে! কিন্তু আজ সকাল থেকে একবারও 


গহভঙগ ১০১ 


তো খোজ নেয়নি বেচে আছি না মরেছি! ছেলে-পিলেকেও দেখেনি । মহাদেবায়াজী আটা, 
ডাল এনে দিলেন, তখন তো রাম্নার জনা এক ঘড়া জল তুলে দিয়েও সাহায্য করেনি। 
এখন খাবার আশায় পাতা কেটে এনেছে, তাও কেবল মাত্র নিজের জন্য এক-খানা । 
ওকে খেতে দেবে কিনা ভেবে ঠিক করে উঠতে পারল না নন্জম্মা। বাচ্চাদের তুলে 
নিয়ে সে বাইরে বেরিয়ে এল। দুটো বাচ্চাই ঘুমে ঢুলছে, ওদের শোয়াবার মত একটা 
মাদুরও নেই। নিজের একখানা পুরোন শাড়ি পেতে ছেলে-মেয়েকে শুইয়ে দিল। তার 
নিজেরও শরীর ভেঙে পড়ছে ক্লান্তিতে। বাহুতে মাথা রেখে রামন্নার পাশে নন্জম্মাও 
শুয়ে পড়ল এবার । একবার মনে হল উঠে গিয়ে স্বামীকে খাবার বেড়ে দেয়, আবার 
ভাবল, “থাক, ডাকলে তখন দেখা যাবে । শুয়েই থাকল সে। সারা সকালের খাট্ুনী, 
তারপর খাওয়াও হয়নি, ক্লান্তিতে ঘুম এসে গেল চোখে । 

ঘুম যখন ভাঙল তখন বাইরে রোদ পড়ে গেছে। অর্থাৎ এক ঘন্টার ওপর ঘুমিয়েছে 
সে। স্বামী শেষ পর্যন্ত খেয়েছে, না রাগ করে চলে গেছে কে জানে 2 রান্নাঘরে গিয়ে দেখল, 
রান্নার বাসন গুলোর ওপর বিকেলের মরা রোদ এসে পড়েছে, এ টো পাতাখানাও পড়ে আছে। 
সবসুদ্ধ পাঁচখানা মড়য়ার ডেলা বানিয়েছিল, তার মধ্যে আধখানা মাত্র পার্বতী খেয়েছে, 
সাড়ে চারখানা ছিল হাঁড়ির মধ্যে, এখন পড়ে আছে আধখানা মান্র। অন্য হাঁড়িটার 
তলায় মান্ত্র হাতা-খানেক ডাল অবশিষ্ট আছে। নন্জম্মা ভাবতে লাগল, “ওট্ুকুকি আমার 
জন্য দয়া করে ছেড়ে গেছে, না পেটে আর জায়গা ছিল না বলে£ তার নিজেরও এখন 
পেটের মধ্যে আগুন জ্বলছে যেন, সেই আধখানা মড়,য়ার ডেলা খাওয়ার জন্য হাঁড়ির মধ্যে 
হাত দিয়েই মনে পড়ল, বাচ্চারা রাতে কি খাবে? কাজেই কিছুটা রেখে অল্প একটু বার 
করে নিল। একটু মড়য়ার আটা এখনও আছে রুটি সেঁকার মত, কিন্তু শরীরে এখন আর 
শক্তি নেই। বাইরে গিয়ে খামে ঠেস দিয়ে বসে পড়ল সে। 

বাচ্চারা ঘুমোচ্ছে এখনও । সর্যাস্তের সময় শুয়ে থাকতে নেই, তাই ওদের ডেকে 
তুলল ননজম্মা। এতক্ষণে মনে পড়ল, আজ সারাদিনে বাচ্চাদের এবং তার নিজেরও 
স্ান করা হয়নি। সন্বেনহল্লী থেকে ফিরে এসে মুখ হাত ধুয়েছিল কিন্তু সিঁদুর পরা 
হয়নি। সিঁদুরের থালাটাও রয়েছে শাশুড়ীর কাছে, তিনি আবার সেটা দেবেন কিনা কে 
জানে! রাত্রে আলো ক্রালাবার জন্য তেল, বাতি কিছুই নেই। সম্বল তো মান সওয়া 
চার টাকা। দরজায় তালা দিয়ে ছেলে-মেয়েকে নিয়ে আবার বেরোল সে, চেন্নশেটীর 
দোকান থেকে দুটো বাতি, এক বোতল কেরাসিন তেল ও এক বাক্স দিয়াশলাই কিনল, 
খরচ হল সাড়ে তিন আনা। বাচ্চাদের কিনে দিল ছ'পয়সার বাতাসা। বাড়িতে ফিরে 
নিজের শাড়ী ছিড়ে সলতে বানিয়ে বাতিতে লাগিয়ে তেল ভরল সন্ধ্যার আবছা আলোয়, 
তারপর বাতিটা ভ্বেলে ঘরের মধ্যে এনে সেই আলোতে অন্য বাতিটাতে সলতে পরিয়ে 
তৈরী করে রেখে দিল। এবার কি করতে হবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না, শরীরেও 
যেন শক্তি নেই আর এতট্রুক। বারান্দার থামে ঠেস দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে পড়ল নন্জম্মা । 
দুই ছেলে-মেয়ে তার দুই উরুতে মাথা রেখে আবার শুয়ে পড়ল। নতুন জায়গায় এসে 
তারাও যেন আড়ূ্ট হয়ে রয়েছে। 


২১০৭ গুহভঙ 


একটু পরে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ঘরের মধ্যে এল সে। দুপুরের অবশিষ্ট আধখানা 
রুটি রামন্নাকে আর আধখানা মড়য়ার ডেলা পার্তীকে দিল খেতে। দু'জনের কেউই 
পুরোটা শেষ করতে পারল না, ওদের ভুত্তাবশিষ্ট রুটি ও মড়য়ার ডেলার টুকরোগুলো 
হাঁড়ির তলানি ডালটুকু দিয়ে খেয়ে নিল নন্জম্মা। এখনও একটু মড়য়ার আটা বাকি 
আছে, তাই দিয়ে রুটি গড়ে খেয়ে নেওয়া যায় অবশ্য, কিন্তু কিছুই করতে ইচ্ছা করছে 
না তার। অদ্ভুত একটা বিষাদে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছে মনটা। বাতিটা তুলে নিয়ে 
মাঝের ঘরে এসে ভাবছে কোথায় শোয়াবে ছেলে-মেয়েকে, এমন সময় দেখা গেল বিছানার 
বোঝা ঘাড়ে নিয়ে স্বামী এসে ঢুকছে । যাক, বিছানার চিন্তাটা অন্ততঃ দূর হল, মনটা 
একটু প্রফুল্ল হল তার। বিছানার বাগ্ডিল খুলে দেখা গেল তার দ্বিরাগমনের সময় বাপের 
বাড়ি থেকে পাওয়া দুখানা কম্ল, দুটো সতরঞ্চি, দুখানা বালিশ ও কালো শালখানা 
এসেছে । কম্বলের মধ্যে একখানার তো পাবতী আর রামন্না ভিজিয়ে ভিজিয়ে প্রায় দফা 
শেষ করে ফেলেছে । অন্যটাও বেশ জীর্ণ হয়ে এসেছে । বাচ্চাদের একটা কম্বল পেতে 
শুইয়ে, ওদের পাশেই নিজের জন্য একটা সতরঞ্চি ও বালিশ বিছিয়ে নিল সে। স্বামীর 
বিছানা পেতে দিল পাশের ঘরে। 

চেলিগরায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল সব, সে এবার বেশ রাগত স্বরে বলে উঠল, 
“আমার বিছানাটা এখানে করা হল না কেন শুনি £ 

কোন উত্তর দিল না নন্জম্মা, সে রামন্নাকে থাবড়ে থাবড়ে ঘুম পাড়াচ্ছিল। 

“এত কম্ট করে বিছানাগুলো বয়ে আনলাম কি আলাদা শোবার জন্য নাকি £ 

এ কথারও কোন উত্তর হল না। 

“এই ছেনাল, চুপ করে আছিস যে বড় £ 

কিছুতেই ধৈর্য হারাবে না এই প্রতিজ্ঞা করে নন্জম্মা শান্তভাবে বলল, “আমার ছ"মাস 
পর্ণ হয়ে গেছে।” 

“তাতে হয়েছে টা কি শনি? বলতে বলতে চেম্নিগরায় পাশের ঘর থেকে নিজের 
বিছানা তুলে এনে ফেলল স্ত্রীর সতরঞ্চির পাশে । তারপর বাতি হাতে নিয়ে রান্নাঘরে 
গিয়েই চিৎকার করে উঠল, “আমার জন্য কিছুই রাখা হয়নি, না? 

“দুপুরে কিছু বাকি রেখেছিলে কি£ ঘরের থেকে জবাব দিল নন্জম্মা। চেম্নিগরায় 
এবার আর কথা না বলে ডালায় তখনও যে আটাট্রুক্‌ ছিল সেটা নূন দিয়ে মেখে ফেলল, 
তারপর উনূুন ত্বেলে কোন রকমে সকল মোটা মোটা দুখানা রুটি। গরম গরম রুটি 
উদরস্থ করে বেশ খানিকটা জল খেয়ে, বাতি হাতে মাঝের ঘরে যখন ফিরে এল ততক্ষণে 
বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়েছে । স্ত্রীরও দু'চোখ মুদ্রিত। চেন্নিগরায় শুয়ে পড়ল নিজের নরম 
বিছানায়। নন্জম্মা ঘুমোয়নি, ঘুম আসা সম্ভবও নয়। সকাল থেকে কিছুই প্রায় খাওয়া 
হয়নি, তীব্র ক্ষুধার আগুন জ্বলছে পেটে। নিজের অসহায় অবস্থার চিন্তায় মন ভারাকান্ত, 
নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে সে, মোটে একদিন রসদ না যোগালেই পোড়া পেট এমনভাবে 
ভ্বলে কেন£ঃ এত ক্ষুধা, তা সত্বেও পেটের ভার যখেষ্ট। পোয়াতিদের উপোষ করতে 
নেই। আমি না হয় না খেলাম, কিন্তু গর্ভের খোরাক তো যোগাতেই হবে। দুপুরে সেই 


গৃহভঙ্গ 2১০৩ 


আধখানা মড়য়ার ডেলাটা আমার খেয়ে নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তাহলে রান্রে পার্বতী 
কি খেত£ খাইনি, ভালই হয়েছে । বাকি আটাটুকুর রুটি সেঁকে যদি খাই তো সকালে 
উঠে বাচ্চারা কাঁদলে কি খেতে দেব£ ওদের কথা ভেবেই রেখে দিলাম, তা এখন ওদের 
জন্মদাতা বাপই সেটুকু খেয়ে শেষ করলেন! এই তো বিকেল বেলাই চারখানা মড়ুয়ার 
ডেলা খেয়ে গেছে, এত তাড়াতাড়ি খিদে পায়ই বা কি করে£ কারো কারো হজমশক্তি 
খুব বেশী হয়। দুপুরবেলা তো পাতা পেতে নিজেই খাবার বের করে খেয়েছে, তখন 
কি একবার মনেও পড়েনি, “বৌটা কি খাবে 2 এখন রুটি গেলবার সময়ও মনে পড়ল 
নাঃ খেয়েদেয়ে দিব্যি পাশে এসে শুয়ে পড়ল! আমার শরীর কেমন আছে, ক"মাস 
চলছে, সকাল থেকে খাওয়া হয়েছে কি না, শরীরে শক্তি আছে কিনা এসব কিছুই কি 
জানার দরকার নেই? সোজা বলে দিতে ইচ্ছে করে, “আমার কাছে আসতে হবে না, 
দূরে গিয়ে শোও।, আবার ভাবে, এই স্বামীই বলেছিল মায়ের কাছে থাকবে, কিন্তু 
দ্ূপরেও এখানে খেয়েছে, রাতেও এখানে রুটি খেয়ে এখন বিছানা নিয়ে এসেছে আমার 
কাছে শোবে বলে। যদি কাছে ঘেসতে না দিই তাহলে বাচ্চাদের ও আমাকে হয়ত ত্যাগ 
করে মায়ের কাছেই চলে যাবে। বোধহয় এই দিকটা ভেবেই মহাদেবায়াজী বলেছিলেন, 
ও মায়ের কাছে দু'দিনের বেশী থাকবে না, এখানেই ছুটে আসবে । সুতরাং নিজের সন্তান- 
দের বাঁচাতে হলে মুখ বুজে এই স্বামীর আবদার সহ্য করতেই হবে। সন্নেনহল্লী 
যাতায়াতের পরিশ্রম, সকাল থেকে সংসারের খাটুনী, খিদের স্বালা, তার ওপর গভের ভার, 
সব মিলিয়ে নন্জম্মার দেহটা পড়ে রইল অর্ধমৃতের মত। কিন্তু তাই বলে চেন্নিগরায়ের 
তো ক্লান্ত হবার কোন কারণ ঘটেনি ! 

আজ হঠাৎ নিজের বাবাকে মনে পড়ে গেল নন্জশ্মার। বাবার ছিল দৈত্যের মত 
স্বভাব. একেবারে বেপরোয়া । রেগে গেলে স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, মা কারো সম্বন্ধে কোন হশ 
থাকত না, চোখ কান বুজে প্রহার করে বসতেন। কিন্তু আবার কারো কম্ট দেখলে 
মন গলে যেত তাঁর। লোকে বলে কল্লেশের যখন প্লেগ হয়েছিল, সারারাত তিনি ছেলের 
মাথা কোলে নিয়ে বসেছিলেন। তা, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া-ঝাঁটি তো হতেই পারে, কিন্তু 
স্ত্রী খেতে পেয়েছে কি না, ছেলে-মেয়েদের খাওয়ার ব্যবস্থা ঘরে আছে কি না, এটুকু জানার 
ইচ্ছাও যে স্বামীর নেই তার সঙ্গে কি ঘর করা যায়ঃ এমন সংসারে কি বাচতে ইচ্ছা 
করে? অক্রম্মার কথা মনে পড়ল। জন্মের পর মায়ের দুধও জোটেনি ভাগ্যে । তাকে 
জন্ম দিয়েই চোখ বুঁজেছে মা, অক্ষঙ্মাই তো মানুষ করে তুলেছে । সত্যি যদি কারো 
প্রাণের টান থাকে তো সে এ অক্কম্মারই আছে। পচান্তরের ওপর বয়স হয়ে গেল তার 
ও'কেই এখানে আনিয়ে নেওয়া উচিত। কিন্তু নিজেদেরই তো খাওয়া জোটে না, অক্কশ্মাকে 
এনে খাওয়াবে কি£ কিন্তু তাহলে প্রসবের সময় দেখবেই বা কে£ এখন নাগলাপুর 
যাওয়া আর সম্ভব নয়। অক্কশ্মা এলে মাসখানেক অন্তত তার ও বাচ্চাদের একটু সেবা- 
যত্র হবে। কিন্তু বাড়িতে যে খাবার কিছুই নেই! একফোটা রেড়ির তেল, এতটুকু 
সিকাকাই-এর গুঁড়ো পর্যন্ত নেই। এইসব ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ল, হাঁড়ি তো খালি, 
সকালে উঠেই বাচ্চাদের কি দেওয়া যায়ঃ নিজেরও পেটের ভিতরটা যেন ভ্বালা করে 


১০৪ গৃহভঙ্গ 


উঠল। একপাশ ফিরে শুয়ে-শুয়ে শরীরের ডান দিকটা ব্যথা করছে । বাঁদিকে পাশ 
ফিরতেই চোখে পড়ল স্বামীদেবতা হাত-পা ছড়িয়ে নাক ডাকাচ্ছেন। দৃশ্যটা অসহ্য মনে 
হল তার। অন্ধকারেই নিজের সতরঞ্চি আর বালিশ তুলে নিয়ে বাচ্চাদের ওপাশে গিয়ে 
পার্বতীর গায়ে একখানা হাত রেখে শুয়ে পড়ল নন্জশ্মা। 


৬ 


সকালে উঠে ঘড়ার জলে মুখ হাত ধুয়ে বাচ্চাদের মুখ ধোয়াল নন্জশ্মা, তারপর শাড়ীর 
আঁচল দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিল তাদের। রান্নাঘরে গিয়ে উনূনের ছাই বার করে পোড়া 
কয়লা আলাদা করে নিয়ে সেই ছাই দিয়ে আগের দিনের রান্নার বাসনগুলো মেজে ফেলল । 
রুটির পান্রটায় রান্তরে জল তেলে রাখা হয়নি, তাই আটা শুকিয়ে রয়েছে, জল ঢালল তার 
মধ্যে। মাঝের ঘরে স্বামী তখনও পথের দিকের দরজা জুড়ে পা ছড়িয়ে নাক ডাকাচ্ছেন। 
কোনরকমে দরজাটা আধখোলা করে সামনেটা মুছে নিল। রঙ্গোলীর গুঁড়ো নেই বাড়িতে, 
প্রতিবেশিনী চেন্নাশট্রীর বৌয়ের কাছ থেকে একটু গুঁড়ো চেয়ে নিয়ে দরজার সামনে “মঙ্জল- 
চিহ” একে তারপর চুপচাপ বসে রইল। কেউ কোথাও নেই। আজ সবাইকার পেটের 
জ্বালা শান্ত করার কি ব্যবস্থা হবে কিছুই ভেবে পেল না সে। 

পথে একটা মোষের ডাক শুনে ঘুমটা ভেঙে গেল চেন্নিগরায়ের-_“দুত্তোর, তোর 
মায়ের *-**, * বলতে বলতে উঠে বসল সে। বিছানায় বসে বসেই দুহাত ঘষতে ঘষতে 
“কোশল্যা সুপ্রজা রাম” ইত্যাদি বলে তারপর *পঞ্চকন্যা স্মরেগ্রিত্যং উচ্চারণ করে শম্যা-ত্যাগ 
করল এবং চলে গেল বাঁধের দিকে । নন্জন্মা বিছানা তুলছে, এমন সময় মহাদেবায়াজী এসে 
হাজির, কাঁধে এক মস্ত ঝোলা । থামের পাশে ঝোলাটা নামিয়ে বললেন, “আমি দূরে ভিক্ষায় 
যাচ্ছি আজ। এতে বিশ সের মড়়া আর চার সের বরবটির ডাল রইল।, আজকের জন্য 
ঘরে কোন সংস্থান ছিল না, এখন খাদ্যের ব্যবস্থা হল দেখে মনটা খুশি হলেও নন্জশ্মাও 
বলে উঠল, “অইয়াজী, আপনি কালও দিয়েছেন, আজকেও এত জিনিস এনেছেন। আপনিও 
তো গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করেন, এ সব আমি শোধ করব কি করে £ 

“আমার আর কিসের খরচ মা, তুমি তো জান সবই। গ্রামে আমার মত কোন 
সাধু-সন্যাসী এলে তাঁদেরই কিছু কিছু দিই। এতে তোমাদের আট-দশ দিন চলে যাবে। 
রান্না শুরু করে দাও। এরপর ঈশ্বর একটা ব্যবস্থা নিশ্চয় করবেন।, মহাদেবায়াজী 
ভিক্ষায় বেরিয়ে পড়েন। 

গতকাল মহাদেবায়াজী যে কুলোখানা এনেছিলেন সেটা বাড়িতেই রয়েছে, সের দুই মড়য়া 
তাইতে করে ঝেড়ে বেছে পিষতে বসে যায় নন্জম্মা। জাঁতা একটা রয়েছে এ বাড়িতে । 
কিন্তু একটু পিষতে না পিষতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে সে, কাল সারাদিন তো পেটে কিছু পড়েনি । 
মিনিট পাঁচেক জিরোতে থাকে । ইতিমধো স্বামী ফিরেছে। মড়য়া এল কোথা থেকে? 
কে আনল? এসব সম্বন্ধে তার কোন আগ্রহই নেই। বেশ নিশ্চিন্ত মনে বারান্দায় বসে 
পকেট থেকে পান ও তামাকের কৌটো বার করল সে। 


গহতঙগ ১০৫ 


নন্জশ্মা বলে উঠল, “আমি পিষতে পারছি না, এই মড়য়াটা পিষে দেবে একটু £ 

কোন উত্তর পাওয়া গেল না। দ্বিতীয়বার বলায় চেন্নিগরায় ধিঁচিয়ে উঠল, “ছেলেরা জাঁতা 
ঘোরায় কখনো £ আমাকে কি মেয়েমানুষ পেয়েছিস ?, 

কিছুতেই ধৈর্য হারালে চলবে না, সেই প্রতিজ্ঞা স্মরণ করে আর কথা বাড়াল না 
নন্জম্মা। তাঁতীপাড়ায় গিয়ে ডেকে আনল পুট্টববাকে। দু পয়সায় এক কলো ভর্তি 
মড়,য়া পিষতে রাজি হয়ে জাঁতার সামনে বসে পড়ল পুট্রব্বা। নন্জম্মা গেল চেন্নাশেট্রীর 
দোকানে, লঙ্কা, ধনে, নুন, তেল ইত্যাদি মোট এক টাকার জিনিসপত্র কিনে ফিরে এল । 
তারপর রাধতে বসল সে। বেলা এগারটা নাগাদ বরবটির ডাল, মড়য়ার ডেলার “লোন্দা" 
আর রামন্নার জন্য রুটি তৈরী হয়ে গেল। গতকাল কারো স্মান হয়নি। আজ কয়ো 
থেকে জল তুলে বাচ্চাদের ম্লান করিয়ে, নিজে নেয়ে ধুয়ে শাড়ী বদলে ভিতরে এসে দেখে 
স্বামী আজও কেবল নিজের পাতাটি পেতে লোন্দা ভোজনে বসে গেছে। বাচ্চাদের ও তার 
নিজের জন্য কিছু অবশিষ্ট রাখবার কথা নন্জশ্মা মুখ ফটে বলল না। সাতখানা 
লোন্দা করেছিল সে, দেখা গেল তিনখানা মানত পড়ে আছে। নন্জম্মা পার্বতীকে নিয়ে, 
ডাল বের করে খেতে বসল। পার্বতী আধখানা মানত খেল, সে নিজে কোনমতে সেই 
মড়য়ার ডেলা দেড়খানা খেল। ওদিকে রামন্না আর রুটি খেতে চাইছে না, ভাত খাব, 
বলে কান্না জড়েছে। “দোকান থেকে দেড় আনায় এক সের চালও আনা উচিত ছিল”, 
ভাবতে ভাবতে খাওয়া শেষ করল নন্জম্মা। মড়য়ার ডেলা খেয়ে কেমন যেন বমি 
পাচ্ছে তার, বারান্দায় সতরজজিটা পেতে শুয়ে পড়ল সে। 

রাত্রের রান্নার জন্য কাঠ নেই। কাল মহাদেবায়াজী যা এনে দিয়েছিলেন শেষ হয়ে 
গেছে। চেন্নিগরায় আড় হয়ে শুয়ে পড়ে আছে। নন্জম্মা তাকে বলল, “উঠে একটু 
কাত এনে দাও ।? 

“কোথায় এখন কাঠ খুজব আমি £ পারব না। 

এমন করলে চলে কখনো £ কারো বাগানে গিয়ে একটু নারকেলের শুকনো ডাঁটা, 
পাতা চেয়ে একটা বোঝা বেধে নিয়ে এস ।; 

“অত যদি দরকার থাকে, নিজেই যা না। আমার দ্বারা হবে না ওসব” মড়ুয়ার 
লোন্দা হজম করার চেস্ট্ায় নিদ্রাদেবীর আরাধনা শুরু করে চেন্িগরায়। কারো বাগানে 
কাঠ খুজতে গেল না নন্জশ্মা। প্রতিবেশিনী চিনৈয়ার বৌকে বলতেই সে একটা ঝুড়ি 
ভরে নারকেলের ডাঁটা, পাতা, বেশ কয়েকটা ছোবড়া ইত্যাদি দিল। এবার চেম্নাশেটীর 
দোকানে গেল সে চাল কিনতে-_ 

“চালের দর কত চেন্নাশেট্রী £ 

“মিহিচাল টাকায় ন'সের, মোটা চাল টাকায় বারো সের। 

চার আনায় তিন সের মোটা চাল কিনে বাড়ি ফিরে এল। রাত্রের জন্য আধ সের 
চালের ভাত হল। পাবতী আর রামন্না ভারি খুশি। চিনৈয়ার বৌ রঙ্গশ্মা আধ হাঁড়ি 
মাঠাও দিয়েছে । বাচ্চাদের খাওয়া-দাওয়া হয়ে যাবার পর এল চেন্িগরায়। কি ভাগ্য 
যে ওদের খাওয়ার আগেই সে এসে হাজির হয়নি । 


১০৬ গহভঙ্গ 


মহাদেবায়াজী যা দিয়েছেন তাতে আট-ন” দিন চলে যাবে, কিন্তু তারপর £ ভেবে 
কোন ক্ল-কিনারা পাওয়া যায় না। আগামী কাল রামসন্দ্রের হাট বসবে। নন্জম্মা 
স্থির করল কিছু বাসন-পন্ত কেনা দরকার। পরদিন খাওয়া-দাওয়া পর ছেলে-মেয়েকে 
নিয়ে সে চলল হাটের উদ্দেশ্যে। গ্রাম থেকে প্রায় পৌনে মাইল দূরে বড় গাছ গুলোর 
তলায় তিপটুরের মুসলমান ব্যাপারীরা এন্যুমিনিয়মের বাসন বেচতে আসে, কথাটা শোনা 
ছিল। একে ওকে জিজ্ঞাসা করতে করতে ঠিক জায়গায় পৌছে গেল সে। খাবার থালা, 
চারটে গেলাস, একটা হাতা, স্নানের ঘটি ইত্যাদি কিনতে খরচ হল মোট সওয়া টাকা। 
বাচ্চাদের কান্না থামাতে পাই পয়সা দিয়ে চিনির মিঠাই আর একটা করে ঝুমঝুমি কিনে দিল। 
ফেরার পথে প্যাটেল গুণ্ডেগৌড়জীর সঙ্গে দেখা, জিজ্ঞাসা করলেন, “খবর ভাল তো মাঃ, 

“সব ভাল । চলুন, বাড়িতে চলুন ।, 

গৌড়জী বানের বোঝা নিয়ে নিলেন ওর হাত থেকে । রামন্নাকে কাঁধে তুলে ও'র পিছু 
পিছু বাড়িতে এসে তালা খুলল নন্জম্মা। এদিক ওদিক দেখে গৌড়জী বললেন, “পেট 
চালাবার মত কিছু ব্যবস্থা হয়েছে কি £ 

“সেই কথাই তো বলতে চাই আপনাকে । 

“সে দিনই বললে না কেনঃ বিশ-পঁচিশ সের মড়য়া দিয়ে দিতাম ।” 

“কিন্তু সে রকমভাবে ক'দিন চলতে পারে একট্রু ভেবে নন্জশ্মা আবার বলে, 
“ওভাবে সাহায্য করবেন না। আমি একটা উপায় বলি? তাতে আপনারও অসুবিধা নেই, 
আমাদেরও উপকার হবে । 

“কি উপায় বল তো মাঠ, 

“আপনার দেয় খাজনা তো আশি টাকা, তাই না£, 

হ্যা, তাতে কি 

এক কাজ করুন, “এ বছরের খাজনার পঞ্চাশ টাকা পেয়েছি, এই মর্মে এর কাছে 
একটা রসিদ লিখিয়ে নিন। সেই পঞ্চাশ টাকায় আমাকে মড়ুয়া, বরবটির ডাল, লঙ্কা আর 
সম্ভব হলে কিছুটা ধান দিন, তাতেই আমাদের সংসার চলে যাবে ।, 

“রসিদ লিখিয়ে নেব, কিন্তু তারপর সরকারী খাজনার টাকা পুরো করবে কি করে £ 

বর্ষাসনের একশ কুড়ি টাকা আমরা পাই তোঠ তার থেকেই সরকার কেটে নেবে 
এঁ টাকাটা ।' 

গৌড়জীর বেশ পছন্দ হল কথাটা, খুশি হয়ে বললেন, “তোমার তো একেবারে দেওয়ান- 
গিরি করার মত বুদ্ধি আছে দেখছি।” স্বামী এখন নিশ্চয় মহাদেবায়াজীর মন্দিরে বসে 
আছে, পার্বতীকে দিয়ে নন্জম্মা খবর পাঠালো, বাড়িতে গুস্তেগৌড়জী এসেছেন, চেনিগরায়কে 
ডাকছেন। এলো চেন্নিগরায়, এসেই গৌড়জীর কাছে তামাকপাতা নিয়ে চিবোতে শুরু করল । 
লৌড়জী জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার খাতাপন্র কোথায় £ 

“সে সব তো এখানে নেই।, 

“তবে কোথায় আছে £& 

“সে সব তো মায়ের কাছে ।? 


গহতভঙ্গ ১০৭ 


“কি মুশকিল ! পাটোয়ারী কাজটা কি ছেলেখেলা পেয়েছ না কিঃ তমি যেখানে আছ, 
খাতাপত্রও সেখানে থাকার কথা । খাতাপন্র রাখার জন্যই তো বাড়িখানা দিয়েছি তোমায় 
_-সরকারী আইন জান তো? যাও চটপট গিয়ে খাতাগুলো নিয়ে এস।, 

পাট্োয়ারীজীকে যেতে হল হনুমান মন্দিরে। কিন্ত গঙম্মা খাতার বোঝা কিছুতেই 
দেবে না। প্যাটেল গপগ্ডেগৌড়জী খাতা নিয়ে যেতে বলেছেন শুনে সে নিজেই চলে এল 
এ বাড়িতে । সরকারী আইনের কথা বলতেই গক্জশ্মা বলে উল, “তাহলে আমিও এখানে 
এসে থাকব ।? 

“তা থাকুন না, আমার কি!” গৌড়জী বলেন। 

কিন্তু এবার আপত্তি জানায় নন্জশ্মা, সে বলে, তা হবে না। আপনিই আগে আমাদের 
আলাদা করে দিয়েছেন, তাড়িয়ে দিয়েছেন। এখন আপনি আলাদাই থাকুন, আমরাও 
আলাদা থাকব। 

“দেখছ গুগ্ডেগৌড়জী, শুনছ তো এই ছেনালের কথা 

“দেখ গঙ্ম্মা, পাটোয়ারী কাজের সমস্ত হিসাব লেখে এই মেয়ে, সরকারী রেকড 
রাখার জন্য এ বাড়ি আমি একেই ব্যবহার করতে দিয়েছি, অন্য কাউকে নয়। তুমি 
শুধু শুধু মুখখারাপ কোর না। গৌড়জীর এই কথাগুলো শুনে আরো উচ্চৈঃস্বরে গালা- 
গাল দিতে দিতে গঙ্গশ্মা ফিরে যায় হনুমান মন্দিরে । চারবার যাতায়াত করে খাতার 
বোঝা মাথায় চাপিয়ে এ বাড়িতে নিয়ে এল চেম্লিগরায়, কিন্তু যে বাক্সটায় খাতাগুলো 
রাখা থাকত সেটা কিছুতেই হাতছাড়া করল না গঙশ্মা। সব খাতা এসে পৌছবার পর 
গৌড়জী বললেন, “ওহে বোকারাম, এত বছর পাটোয়ারীগিরি করছ আর এটা জাননা যে 
সরকার কুলি খরচা দেয় £ 

পাটোয়ারী কোন উত্তর দিল না। প্যাটেল আবার বললেন, “এই এতগুলো খাতা তুমি 
মাথায় করে বয়ে নিয়ে এলে£ কলির মাথায় চাপিয়ে আনতে পারতে তোঃ নিজের 
অধিকার কতটা তাও খবর রাখ না! নাও, এখন কাগজ-কলম নিয়ে বস। হ্যা, কি 
কি লেখাতে চাও মা, তুমিই বলে লিখিয়ে নাও ।? 

কলম হাতে নিল পাটোয়ারী । স্ত্রী বলে গেল, “রামসন্দ্র উপবিভাগ করুবরহল্লীর 
প্যাটেল গুণ্েগোড়জীর নিকট হইতে তাঁহার বাষিক রাজস্বের মধো পঞ্চাশ টাকা পাইয়াছি। 
আদায়ের সময় এই অঙ্ক বাদে বাকি রাজস্ব আদায় করিয়া আপনার হিসাবে লিখিয়া দিব। 
_-পাটোয়ারী চেন্নিগরায়। তারিখ **** ॥” যাযা বলা হল সব লিখে পাটোয়ারী গৌড়জীর 
হাতে দিল কাগজখানা। কি লেখা হল এবং কি তার মানে, সেটা বুঝতে চেন্নিগরায়ের প্রায় 
দশ মিনিট সময় লাগল। তারপর হঠাৎ খেয়াল হল, “তা টাকাটা কই মশাই £ 

“টাকা ঠিক আছে, সে তোমায় ভাবতে হবে না, এখন চুপ করে থাক । গৌড়জীর 
জবাব শোনার পরও চেনিগরায় অনেকক্ষণ ধরে গজ গজ করল মনে মনে। 

পরদিন গাড়ি ভরে জিনিসপন্ত্র এনে বাড়িতে নামিয়ে দিলেন গুপ্ডেগৌড়। ননজম্মাকে 
ডেকে বললেন, “এই দেখে নাও মা, চার খণ্ডি মড়য়া চব্বিশ টাকা, বরবটি আট টাকা, 
এক মন লঙ্কা তিন টাকা, কত হল মোট?, 


১০৮ গৃহভঙ্গ 


“পঁয়তিরিশ টাকা ।” 

এরই নাও আরো পাঁচ টাকা, চল্লিশ হল তো? আর বাকি দশ টাকার নারকেল দিয়ে 
যাব। ধান এবার আমার থাকবে না কিছু, তুমি দোকান থেকে চালটা কিনেই নিও । 

খুব খুশি হল নন্জম্মা। এই পাঁচটা টাকা, আগেকার দু'টাকার সঙ্গে মিলিয়ে ন্যাকড়ায় 
বেধে কড়িকাঠের ফাঁকে লুকিয়ে রেখে দিল। 


৭ 


গরের আটমাস চলছে এখন। দুপুরবেলা নন্জম্মা বসে বসে মরুমশ্তমারীর খাতায় লাইন 
টানছিল। পেটটা এত বড় হয়ে পড়েছে যে, উপুড় হয়ে বসে রেখা টানা মুশকিল। বেচারা 
বার বার বসার ভঙ্গি বদলে বদলে বহু কম্টে কাজ করে যাচ্ছে, ওদিকে পাশের ঘর থেকে 
শোনা যাচ্ছে চেন্নিগরায়ের নাসিকা গর্জন । 

হঠাৎ গঙ্গম্মা এসে হাজির। সেই যেদিন গুণ্ডেগৌড়জী খাতাপন্ত্র আনিয়েছিলেন তারপর 
থেকে আর কোনদিন এ বাড়িতে আসেনি সে। আজ হঠাৎ এসেই, বলা নেই, কওয়া 
নেই, চটপট একটা পান্রে থলি থেকে মড়ূয়া বের করে ভরতে শুরু করে দিল। মিনিট- 
খানেক দেখার পর নন্জম্মা বলল, “এটা কি করছেন মা” 

“কি আবার করব, মড়য়া নিচ্ছি। তুই জিক্তেস করবার কে শুনি? 

“আগে থলি রাখুন, তারপর ওদিকে দাঁড়িয়ে কথা বলুন। আমাকে না বলে আমার 
ভাঁড়ারে হাত দিয়েছেন কেন £ 

এটা কি তোর বাপের তৈরী বাড়ি? এই শিখস্তী, রাঁড়ের পুত, শুনতে পাচ্ছিস নে 
তুইঃ আজ ঘরে কিছু নেই, তাই উনুন ত্বলেনি আমার। একটু মড়য়া নিতে এসেছি 
তাইতে কথা শোনাচ্ছে! যেন ওর বাপের দেওয়া জিনিস। ক্রুবরহল্লীর গুগেগোড় 
আমাদের প্যাটেল। বিনা পয়সায় দিয়ে গেছে বলেই তোর মড়ুয়া হয়ে গেল নাকি? 

ইতিমধ্যে ঘুম ভেঙে উঠে চেন্নিগরায় বলে, “যাক গে, নিচ্ছে তো নিক। দুত্তোর তোর 
মায়ের *"' 

“গুগডেগৌড়জী বিনাপয়সায় দেননি । খাজনা থেকে পয়সা কেটে নেবেন বলে কথা 
দিয়ে আমি আনিয়েছি।, 

“পাটোয়ারীর কাজটা আমার স্বামীর ছিল, তোর বাপের নয়, বুঝলি রে হতঙচ্ছাড়ি 
ছেনাল ? শাশুড়ী বলে। 

“ঘোড়ায় চড়ে এসে আমার বাবাই সেটা পাইয়ে দিয়েছিল। না হলে কোনদিনও এ- 
কাজ হাতে আসত না, তাও জেনে রাখবেন। চোখে তেল দিয়ে দিয়ে রাত জেগে হিসেব 
লিখি আমি। আমার বাড়ির ভাঁড়ারে হাত লাগালেই আমি ওগ্ডেগৌড়জীকে খবর পাঠাব |, 

“সকাল থেকে আমার খাওয়া হয়নি, এখন কি করব বলতে পারিস ছেনালের বেটি £ 

নন্জম্মা বলে ওঠে, “কেন শিবেগৌড় নয়ত কাশিমবদ্ধির কাছে যান না। নয়ত 
রেবন্নাশেট্টীর কাছে চেয়ে দেখুন । 


গুহভজ ২১০৯ 


কথাটার ব্যঙ্গ ধরতে পারে না গঙ্গশ্মা। সে গিয়ে হাজির হয় শিবেগৌড়ের বাড়ি । 
এদিকে শাশুড়ী চলে যাবার পর অস্বস্তি বোধ করে নন্জম্মা। সকাল থেকে উপোষ 
করে আছেন শুনেও খালি হাতে ফিরিয়ে দেওয়াটা উচিত হয়নি তার। একটা কলোয় 
তিন সের মড়য়ার আটা ঢেলে, স্বামীকে বলে শাশুড়ীকে দিয়ে আসতে । চেন্নিগরায় কুলোটা 
নিয়ে চলে যায় মায়ের আস্তানার দিকে। 

এদিকে গঙ্গম্মা সোজা শিবেগৌড়ের বাড়িতে এসে ঘোষণা করে, “আজ সকাল থেকে 
আমার উনুন ভ্বলেনি। পঁচিশ সের মড়য়া দাও আমাকে ।' 

“মাথা খারাপ হয়েছে নাকি তোমার £ হঠাৎ পঁচিশ সের মড় য়া দেব কোথা থেকে ? 

“ওরে রাঁড়ের পুত, তোর সর্বনাশ €হাক। আমার সবস্থ হাতিয়ে নিয়ে এখন এই 
কথা£ দেখে নিস, বংশ-লোপ হবে তোর। 

“তোমার সম্পত্তির জন্য পয়সা খরচ হয়নি আমার £ মুখ সামলে কথা না বললে 
ঘাড় ধরে দূর করে দেব ।' 

এবার শিবেগোড়ের স্ত্রী গৌরম্মা মধ্যস্থতা করতে আসে। স্বামীকে বলে, “ও এ সব 
বলছে বলে তুমি শুদ্ধ মুখখারাপ করছ কেন£ তুমি চুপ করে যাও।, 

গৌরম্মার আশঙ্কা এ বুড়ি পথে দাঁড়িয়ে মাটি ছ:ড়ে ছুড়ে শাপ-শাপান্ত করবে এবং 
তার ফলে তার সংসারে কিছু না কিছু দুর্ঘটনা ঘটবে নিশ্চয়। পাাটেলেরও গঙ্গম্মার 
সঙ্গে কলহের বাসনা ছিল না। সে স্ত্রীর কথামত চুপ করে গেল। চগ্পলটা পায়ে গলিয়ে 
বাড়ির পিছন দিকে ঘুরতে গেল সে। গৌরম্মা দু'কুলো ভর্তি মড়য়া একটা চুবড়িতে ঢেলে 
গঙ্গম্মার সামনে এনে রেখে বলল, "ও'র কথায় কিছু মনে করবেন না, এটা নিয়ে যান 
আপনি । 

রাগের মাথায় গঙ্গশ্মা ঠিক করতে পারছিল না মড়,য়াটা নেবে কি না। কিন্তু গৌরম্মার 
দ্বিতীয়বার অনুরোধের পর সে চবড়ীটা মাথায় তলে নিয়ে হনুমান মন্দিরে নিজের আন্তানার 
দিকে রওনা দিল। 

চেন্নিগরায় ততক্ষণে মড়য়ার আটা ভরা কুলোটা অপ্পন্নায়ার কাছে দিয়ে মহাদেবায়াজীর 
মন্দিরে গিয়ে বসে পড়েছে । নন্জশ্মা আবার মাথা নিচু করে খাতায় লালকালির রেখা 
টেনে চলেছে, এমন সময় কার যেন ছায়া পড়ল দরজার কাছে। মাথা তুলে দেখে মড়ুয়ার 
আটার কুলোটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে গঙ্গ্মা। কি ব্যাপার জিজ্তাসা করবার আগেই 
সে আটার রাশি বৌয়ের মাথার ওপর ঢেলে দিয়ে কলোটা সজোরে ছুঁড়ে মারল তার মুখে-_ 
“তুই কি ভেবেছিস, তোর দেওয়া ভিক্ষের আটা খাব আমি? ছেনাল কোথাকার, কি মনে 
করিস তুই গঙ্গম্মাকে £ চেঁচাতে চেঁচাতে চলে গেল সে। 

মাথা, হাত, পা, খাতা, লালকালির দোয়াত সব আটায় মাখামাখি । নন্জম্মার 
একবার ইচ্ছা হল শাশুড়ীকে ধরে আনে, তারপর পাঁচজনকে ডেকে দেখায় অবস্থাটা । 
কিন্ত না, ঘরের কলহ বাইরে বলতে নেই। শুধু শুধু শ্রামের লোকের হাসির খোরাক 
যোগানো হবে। আজও হয়ত কত লোক হেসেছে। চুপচাপ থাকাই ভাল। উঠে শাড়ি- 
খানা ঝাড়ল সে। ভাগ্য ভাল যে, সমস্ত আটা তালপাতার চাটাইটার ওপরেই পড়েছে, 


১১০ গৃহভঙ্গ 


সেই চাটাই পেতে ও বসেছিল। খাতাটা ঝেড়ে পরিচ্কার করল। সমস্ত আটা একর 
করে তুলে ফেলল। তারপর কালির দোয়াত আর কলম ধুয়ে রেখে নিজেও স্নান করল। 
চেন্নাশেট্টীর দোকান থেকে তিন পাইতে দুটো লাল কালির মোড়ক কিনে এনে আবার নতুন 
করে কালি গুলে নিয়ে বসে গেল লাইন টানতে । 


৮ 


এই ঘটনার দিন তিনেক পরে সকালবেলা নন্জম্মা রান্নায় ব্যস্ত, বেলা প্রায় দশটা হবে, 
এমন সময় হঠাৎ বাইরে ডাক শোনা গেল “নন্জ্‌”। মনে হচ্ছে যেন অক্কম্মার গলা? 
ছুটে বাইরে এল নন্জু-_যা ভেবেছে ঠিক তাই, মাথায় একটা শাড়ীর পৌটলা নিয়ে কঁজো 
হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে অন্ধম্মা। তার পিছনে দু'জন মুটে, তাদের ঘাড়েও মস্ত মস্ত বস্তা। 
নাতনীকে দেখেই অন্ধম্মা মুটেদের বোঝা নামিয়ে রাখতে বলে। তারপর অভিযোগ 
করে, হ্যারে নন্জু, ছেলে-পুলে হবে, তা আমাকে একটা খবর দিতে নেই£ এসব সুখ- 
দুঃখের কথা কি লূকোতে আছে রে? 

“এই তো খবর পাঠাব ভাবছিলাম । চলো চলো ভেতরে এসো। কাপড় বদলাবে তো 

“সে সব পরে হবে'খন। তোর রান্না হয়েছে কি? তাহলে এদের দু'জনকে খেতে 
বসিয়ে দে! ওরা আবার গ্রামে ফিরে যাবে ।, 

ডাল ফুটছিল। আটার ডেলার লোন্দা তখনও হয়নি। রান্নাঘরে গিয়ে উনুনের 
আঁচটা জোর করে দিল নন্জু। মিনিট পনের পরেই খাবার তৈরী। মটেরা ততক্ষণে 
পুকুর থেকে হাত-পা ধুয়ে এসেছে । নন্জ তাদের পরিবেশন করতে লাগল। অক্কম্মা 
বলে, “মাঠা নেই বুঝি £ 

“কোথা থেকে আসবে £ জবাব দেয় নন্জু। 

লোক দুটির খাওয়া হয়ে যাবার পর অক্কশ্মা তাদের একজনকে ডেকে বলে দেয়, 
'দেখ হোন্ন, লঙ্কাকে যা বলতে হবে মনে করিয়ে দিস। আর গিয়েই কলজেলশ বলবি, 
এখানে দুধের দরকার, গরু নেই। পোয়াতির জন্য দুধ চাই। বাড়িতে যে সাদা গরুটা 
আছে নাঃ যেটার একমাস আগে বাচ্চা হয়েছে, সেই গরুগটা যেন পাঠিয়ে দেয়। নন্জ্র 
বিয়ের সময় এঁ গরুটার মাকে দান করা হয়েছিল, কিন্তু তখন এখানে পাঠানো হয়নি । 
কল্লেশকে বলবি যে, আমি বলেছি, এখন অন্তত সেই গরুর সন্তান নন্জুর কাজে লাগুক 1 

মুটেরা চলে যাবার পর ঠাণ্ডা 'জলে স্বান করে ভিজে লাল শাড়ী পরেই কপালে বিভতি 
লাগায় ও তিনবার আচমন করে নেয় অক্কশ্মা। তারপর ভিজে শাড়ীখানা শুকোবার 
জন্য রান্নাঘরে গিয়ে উনুনের সামনে বসে পড়ে। নন্জু জিজ্ঞাসা করে এবার, “তুমি খবর 
পেলে কি করে? 

আমাদের গাঁয়ের তাঁতী তম্ময়া শেট্টীর বাড়িতে এ গ্রামের একটি মেয়ের বিয়ে হয়েছে। 
সাত-আট দিন আগে পুকুর ঘাটে তিরুমলম্মার সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। তার কাছে 
গল্প করেছে, তোরা নাকি এখন ক্রুবরহল্লীর প্যাটেলের বাড়িতে রয়েছিস, সাত-আট মাস 


গহভজ ২১২০ 


পোয়াতি । শাশুড়ী নাকি একখানা বাসন-কোসনও দেয়নি তোকে £ কল্লেশ তো আগেই 
বলেছিল আমাকে যে, জমি-জেরাত সবই যাবে । 

গ্রাম থেকে কবে রওনা হয়েছ তুমি £ 

“কালই বেরিয়েছি। বিকেলবেলা ঝড়-জল এল, তাই টিলার ওপারে হবিনহল্লীর 
প্যাটেলের বাড়ির বারান্দাতেই শুয়ে রাত কাটিয়েছি তিন জনে। প্যাটেলের বউ ওদের 
দু'জনকে রান্রে খাইয়েছে, আর আমাকেও নারকেল কোরা আর গুড় দিয়েছে ।, 

বাচ্চারা এতক্ষণ বাইরে খেলছিল, এবার ভিতরে এল দু'জনে । রামন্নার মনে থাকার 
কথাও নয়, কিন্তু পার্বতীর বেশ মনে আছে অক্কশ্মাকে। দেখতে দেখতে আধ ঘন্টার মধ্যে 
বাচ্চাদের সঙ্গে খুব ভাব হয়ে গেল অক্কম্মার। চেন্নিগরায়ের দেখা পাওয়া গেল 
খাবার সময়। “ভাল আছেন তো? এইট্ুকর বেশী আর কিছু বাক্যালাপ হল না 
দিদিশাশুড়ীর সঙ্গে। অন্কশ্মাও বিশেষ আমল দিল না তাকে । খাওয়ার পর আজ আর 
বাড়িতে না শুয়ে মহাদেবায়াজীর মন্দিরের বারান্দায় চলে গেল চেনিগরায়। অক্কশ্মা 
এবার সঙ্গে আনা বস্তাগুলো খুলে ফেলল। একটাতে তামা ও পিতলের বাসন ভরা-- 
চারটে বড় ও ছোট পরাত, পিতলের দুটো ঘটি, একটা ছড়া, তামার পঞ্চপান্তর, দুটো ডেকচি, 
হাঁড়ি সব আছে। একটা লোকে যতখানি বয়ে আনতে পারে ততটা বাসন এনেছে অক্কশ্মা। 
অন্য গাঁঠরিতে চিড়ের পোহা, মুড়ি, গুড়ের ভেলি ইত্যাদি আহার্য। তা ছাড়া আছে পনের 
সের ভাল বাসমতী চাল। 

“এত সব কেন আনলে, অক্রম্মা £ 

“কল্লেশ বলল, “ছেলেপিলের বাড়ি, চিড়ে, মুড়ি সব ভেজে নিয়ে যাও। তাছাড়া খেতে 
শুড় তো তৈরীই হচ্ছে। গণেশ-ভেলিতে বাড়ির তিনটে বড় বড় ঘড়া ভরে গেছে। ওই-ই 
তো চাল আর গুড় বেধে দিল।” 

“আর এই এত বাসন £ 

কল্লেশ যখন পুলিশে চাকরী করত, দেই সময়ে দানে যে বাসন পেয়েছিল, সেগুলো 
আমি পিপের মধ্যে ভরে ছাদের ঘরে রেখে দিতাম, কেউ জানতে পারেনি । তোর এই 
অবস্থা শোনার পর থেকে রোজ কমলা যখন ঘাটে যায় সেই সময় একটু একটু করে 
বাসন বার করে হোনার বৌয়ের কাছে পাঠিয়ে দিতৃম। এখন আসার পথে সবাইকার 
নজর বাঁচিয়ে লক্কাকে দিয়ে চৌডেনহল্লীর পথে হোন্নার কাছ পর্যন্ত পৌছে দিতে বলেছিলাম ।” 

“কিন্তু এসব তোমার আনা উচিত হয়নি অক্রশ্মা। টের পেলে কল্লেশভাইয়া কখনো 
চুপ করে থাকবে না। 

“সে টেরই পাবে না, তুই চপ করে থাক। কন্ঠীও দানে বাসন পেয়েছিল” বলতে 
বলতে ছেলের কথা মনে পড়ে যাওয়ায় বুড়ির দু'চোখে জল ভরে আসে। নে বলে ওঠে, 
“হতভাগাটা কোথায় যে চলে গেল! কি যে করে বসল! চিরকালটা এই করে বেড়ালো, 
ঘরে দু*দণ্ড স্থির হয়ে বসে ভগবান যা দিয়েছেন তাই নিয়ে খুশি থাকবে, তা তো হবার নয়! 

বাবার কথা মনে পড়তে নন্জ্রও মন কেমন করে ওঠে,_-বাবার কি কোন খবরই 
পাওয়া যায়নি ? 


২১১২ গ্হভজ 


“কিচ্ছ না, লোকে বলে, সে কি আর আছে£ হয়ত মরেই গেছে। কিন্তু সে কখনো 
মরতে পারে £ সে যে ভোজরাজের মত বীরপুরুষ। 

“কক্ষণো মরেনি, ওসব বাজে কথা” নাতনীর এ কথায় অক্তম্মা একটু ভরসা পায়। 

অক্লশ্মা বেশ ক্লান্ত। কিন্তু ঘরে তো মাদুর নেই। আচার পরায়ণা অক্কশ্মা আবার 
তালপাতার চাটাইতে শোবে না। অগত্যা মেঝেতেই শুয়ে পড়ল সে। ননজ্‌ জিক্তাসা 
করল, 'বৌদিদির খবর কি ?, 

ন্বভাব কখনো বদলায় £ তোর বাপের অযথা তাড়া-হুড়োর ফলে এইটি হল। কি 
আর বলব! অগ্রপশ্চাৎ কিছুই চিন্তা করলে না, কোথাও একটু খোজখবর পর্যস্ত করলে 
না। এখানে এল আর হুট করে তোর বিয়ে দিয়ে ফেলল। ওখানে গেল. আর হট করে 
এ বৌ নিয়ে এল। সে খেয়েদেয়ে বেশ আছে। দুধ দুয়ে রাখি, চুরি করে দুধ খায়। 
চুরি করে মাখন গেলে এত এত। হপ্তায় একবার খুব কষে তেল মাখে, নিজেই জল 
তুলে মাথায় ঢালে, আমাকে ঢালতে দেয় না। তা এত সব করেও ছেনাল মেয়েটার পোয়াতি 
হবার তো কোন লক্ষণই নেই। 

“স্বামী-্রীর মধ্যে বনিবনা আছে তো, 

“বনিবনা! ছোটঘরে শুয়ে সমানে গাল দেয়। মাঝে মাঝে ধরে খুব ঠ্যাঙায়। বৌ 
তখন আমাকেই শাপান্ত করতে থাকে, আমি নাকি নাতিকে মারতে শিখিয়ে দিয়েছি। 
ছেলেটাকে যদি বলি, “হ্যারে, বৌকে অমন করে মারধোর করাটা ঠিক নয়।” তা আমাকেই 
খিঁচিয়ে ওঠে “এ ছেনালকে না পিটিয়ে টিট করা যাবে না। তুমি চুপ করে থাক ।” সেই 
কেম্পীকে মনে আছে তোর? সেই যে অচ্ছতকালার মেয়ে £ 

হ্যা, হ্যা, মনে থাকবে না কেন? 

“লোকে বলাবলি করছে কল্লেশ নাকি তার সঙ্গে আখের খেতে মেলামেশা করে। 
তাঁতীপাড়ার মায়গ মরে গেছে আজ তিন বছর হল। তার বৌ আর দুটো ছোট ছোট 
বাচ্চা আছে। সেখানে গিয়েও বসে থাকে শুনি। আরো কত কথাই বলে লোকে । এক- 
দিন জিড্তাসা করেছিলাম, “এ সব কি হচ্ছে?” তাতে খেপে উঠল, “কোন রাঁড়ের ব্যাটা 
বলেছে তোমায় £ এমন জতোপেটা করব তাকে যে, মাথার চুল পযন্ত উড়ে যাবে।” আমি 
আর খোচাতে যাইনি বাপু, চপ করেই থাকি ।” 

“ঘরে তো বো আছে, তবু এমন করে কেন £, 

“ওটা যে একটা মহা পাজী মেয়েমান্ষ। বিয়ে হয়েছে, স্বামীর সঙ্গে ভালভাবে থাকলে 
সে কখনো অমন করে বেড়ায় 2 তুই-ই বল নাঃ, 

ঠাকৃমা এবার নাতনীর সুখ-দুঃখের খবর নেন। আসার পর থেকে রান্নার ভারটা 
তিনিই নিয়েছেন। নন্জুর আটমাস পূর্ণ হয়ে গেছে। রান্রে সে অন্ধশ্মার কাছে চাটাই 
বিছিয়ে শোয়। দুই ছেলেমেয়েও দু* পাশ থেকে সেঁটে থাকে অক্রশ্মাকে। যতক্ষণ ঘুম 
না আসে, নানারকম গল্প চলতে থাকে ঠাক্মা আর নাতনীর মধ্যে। বাড়ির বিছানা 
চেন্নিগরায়ের কাছে যেন কন্টকশয্যা হয়ে উঠেছে । একদিন রান্রে খাওয়ার পর সে নিজের 
বিছানাটা উঠিয়ে নিয়ে চলে গেল মন্দিরের বারান্দায় । 


গুহভঙ্গ ১১৩ 


অকরুম্মার আসার আট দিন পরে কল্লেশ নিজেই সাদা গরু ও তার বাছুরটাকে নিয়ে 
এল এবং দু'দিন বোনের বাড়িতে থেকে ফিরে গেল গ্রামে। ন'মাস পূর্ণ হবার পর 
নন্জশ্মার একটি পুন্রসন্তান জন্মাল, শিশু বেশ হাম্টপুষ্ট এবং সুলক্ষণ। নামকরণের 
উৎসব করার মত সংস্থান নেই, কিন্তু নিয়মরক্ষা করতে হবে তো! চাল আর গুড় 
অক্রম্মা নিয়ে এসেছে, তাছাড়া পাঁচটা টাকাও আছে। তাই দিয়েই গ্রামের দু'চার জন 
ব্রাক্ষমণ ও দুই পুরোহিত পরিবারকে নিমন্ত্রণ করে শান্ত্রবিধি অনুসারে শিশুর নাম রাখা 
হল বিশ্বনাথ । নামকরণের দিন গঙ্গম্মা আর অপ্পন্নায়া গ্রামে ছিলই না, আগের দিনই 
তারা চলে গিয়েছিল অন্য গ্রামে । 


অহ্টঘ অধ্যাম 


দীর্ঘ চার মাস ধরে নাতনীর সেবাযত্র করল অক্ষম্মা। নাতনীকে সে কোন কাজকর্মই করতে 
দিতনা। কিন্তু দ্বিতীয় মাসেই আঁতুড় ছেড়ে উঠে পড়েছিল নন্জশ্মা কারণ রায়শুমারীর খাতায় 
লাইন টেনে হিসেব লেখার কাজ তো শেষ করতে হবে। যে সব খেতে সেচ ব্যবস্থা নেই তার 
খবরাখবর চেন্নিগরায় ঘুরে ঘুরে যোগাড় করে এনেছে, মর্দূমর্তমারী খাতায় তার বিবরণ লিখে 
রাখার কাজও ফেলে রাখলে চলবে না। 

কল্লেশ এসেছে অক্লশ্মাকে নিয়ে যেতে, পরের দিন সকালেই রওনা হবার কথা, এই সময় 
গ্রামের চৌকিদারের কর্মচারী এসে খবর দিল, দোকানী চেম্নাশেট্ীর বাড়িতে পঞ্চায়েত ডাকা 
হয়েছে, সেখানে পাট্োয়ারীজীকে যেতে হবে। 

“কিসের পঞ্চায়েত £ 

“চেন্নাশেন্টী তার পুত্রবধূর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে, তাই তার স্বামী পঞ্চায়েত ডেকেছে 

“বেশ কথা । সব প্রধানদের যেতে বল। আমার বাড়িতে এখন অতিথি রয়েছেন, তাই 
আমি যেতে পারব না।, 

কিন্ত সবাই বলেছে পাটোয়ারীজীকে আসতেই হবে। 

গ্রামের বিচারকার্ষে পঞ্চায়েতের মিটিং-এ পাটোয়ারীকে উপস্থিত থাকতে হবে, এটাই রীতি। 
অবশ্য ন্যায়বিচারের অ-আ-ক-খও চেনিগরায়ের জানা নেই, সেকথা সবাই জানে। কিন্ত সে 
যাই হোক, পাটোয়ারী তো বটে ! অগত্যা বেরিয়ে পড়ল চেন্নিগরায়। ভগ্রীপতির সঙ্গে কলেলশও 
গেল, এই ধরনের বিচারকার্ষে জিজ্ঞাসাবাদ করার অভিজ্ঞতা তার যথেম্ট আছে। 

চেম্নাশেট্রীর অন্দরের উঠোনে গ্রামের প্রধানরা সবাই হাজির। প্যাটেল শিবেগৌড়, তার শালা, 
ভৃতপূর্ব পাটোয়ারী শিবলিজে, পঞ্চায়েতের চারজন সদস্য: দুই পুরোহিত ছাড়াও উপস্থিত রয়েছে 
আরো দশ-পনের জন। সভার মাঝখানে পান-স্তপারী, তামাক, বিড়ি ইত্যাদি রাখা হয়েছে সকলের 
জন্য। পঞ্চায়েত শুর করার আগে প্রশ্ন উঠল, “ন্যায়পীতে' বসবে কে £ একজন পাটোয়ারীর 
নাম করায় শিবেগৌড় বলে উল, এ বোকাটা কিছু বোঝে নাকি £ প্যাটেলের নাম প্রস্তাবিত হল, 
কিন্তু রেবন্নাশেন্রী এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলল, “এ কাজটা স্থানীয় লোকের দ্বারা না হওয়াই 
ভাল।” শেষে, মুদ্দইগিরিয়া বলল, “কল্লেশ জোইশ পুলিশে কাজ করেছে, তাছাড়া পাটোয়ারীজীর 
শালাও বটে, সুতরাং তাকেই এ পদে বসানো হোক |” এ প্রস্তাব সকলেরই মনোমত হওয়ায় 
সর্বসম্মতিকূমে কল্লেশ বিচারকার্ষের কেন্দ্রস্থানে বসল। তামাক মুখে পুরে প্রশ্ন শুরু করল সে-- 
“নালিশটা কিঃ কার প্রতি অন্যায় হয়েছে? সব কথা পঞ্চায়েতের সামনে খুলে বলা হোক ।” 


গৃহভঙ্গ ২১৫ 


শু 


গিরিয়াশেন্রী জানাল, “আমার বাপ আমার স্ত্রীর সঙ্গে শুয়েছে। দুজনকারই শাস্তি হওয়া 
উচিত । 

“কোনজন তোমার পিতা £ 

থামের পাশে এক কোণে নতশিরে বসে থাকা চেন্নাশেট্রীর দিকে আঙ্গুল তুলে গিরিয়া বলে, 
এ তো, এ কোণে বসে আছে নীচ ইতরটা ।” 

আরো বিস্তারিতভাবে প্রশ্ন করে কল্লেশ জানতে পারে--গিরিয়া যায় খেতে লাঙ্গল চষতে 
আর চেন্নাশেট্টী দোকানে বসে ব্যবসা করে। নিজেদের বাড়ির বারান্দাতেই দোকান । গিরিয়ার 
স্ত্রী নরসী এই বাড়িতেই থাকে, তার বিয়ে হয়েছে আজ আট বছর। 

কল্লেশ বলে এই ধরনের বিচারে দুই তরফেরই বক্তব্য শোনা দরকার। 

চেন্নাশেট্রীর স্ত্রী মারা গেছে প্রায় বিশ বছর হয়ে গেল। সে আর দ্বিতীয়বার বিবাহ করেনি । 
মায়ের স্েহ-মমতা না পেয়েই বড় হয়েছে গিরিয়া, কাজেই সে একট্ু বেয়াড়াই হয়ে উঠেছে বলা চলে। 

কল্লেশ এবার চেন্নাশেট্রীকে তার বক্তব্য শোনাতে আদেশ করে। মাথা নত করে সে বলতে 
শুরু করে, “মশাইরা, আমি এক কৃলাঙ্গারের জন্ম দিয়েছি । আমাকে বেইজ্জত করার জন্য, 
অন্যদের কথায় নেচে আমার ছেলে এই পঞ্চায়েত ডেকেছে । আমার দোকানের আয় থেকে এক 
পয়সাও আমি এই মুখ্যটাকে দেব না, জমিজমাও দেব না ওকে । 

“আমার মায়ের দিব্যি, আমি মিথ্যা কথা বলছি না। “স্বচক্ষে দেখেছি আমি” গিরিয়াশেট্রী তার 
অভিযোগ প্রমাণ করার চেস্টা করে। 

ন্যায়পীঠ থেকে কল্লেশ আদেশ দেয়, বেশ, এবার তোমার স্ত্রীর বক্তব্য শুনতে হবে। ডাকো 
তাকে । 

অইয়াশাস্ত্রীজী ডাক দেন, “বোন এদিকে এসো 1” কিন্তু সামনে আসতে চাইছে না নরসী। 
আবার ডাকলেন তিনি, “পঞ্চায়েত ডাকছে, তোমাকে সামনে আসতে হবে ।, পাটোয়ারী চেন্িগরায়ের 
মুখে এখন পানের পিক নেই, তবু সে মুখ না খুলেই হী, হ” করে। নরসী রান্নাঘরের দরজার 
কাছে এসে দাঁড়ালো । এ গ্রামে এমন কেউ ছিল না যে তাকে দেখেনি । কল্লেশ তো তাকে দেখে 
হকচকিয়ে গেল। গোলাপী, গোলগাল মুখ, উন্নত বক্ষ, দীর্ঘদেহী মেয়েটি এমন ভঙিতে দাঁড়িয়ে 
আছে যে তাকে দেখে কল্লেশ ভেবেই পেল না কি ন্যায় বিচার শোনাবে । নরসীকে দেখে 
অইয়াশাস্ত্রীজী বললেন, “দেখ, শ্বশুর পিত্তুল্য, তুমি তাঁর কন্যাস্থানীয়া, তা সত্ত্বেও যদি এমন ব্যাপার 
ঘটে থাকে তাহলে সেই পাপে এ গ্রামে অনাবৃষ্টি হবে, ফসল ফলবে না। আমার কথা বুঝতে 
পারছ তো£ চেন্নাশেতী তুমিও শুনছ £, 

নানাবিধ মন্ত্র উচ্চারণ করে অইয়াশাস্ত্রী ধর্ম আর অধর্মের ব্যাখ্যা শুরু করেন। দুই পুরোহিতের 
শাস্ত্র ব্যাখ্যার মধ্যে অন্যেরাও কথা বলতে শুরু করে দিয়েছে । পাটোয়ারী চেন্নিগরায় এখানে যে 
তামাকটা পাওয়া গেল ভাল করে তার রসগ্রহণ করার চেস্টা করছে। ইতিমধ্যে রেবন্নাশেট্রী বলল, 
“অন্যদের কথা থাক। এই বোন কি বলেন, এর বক্তব্যই শোনা উচিত।” কল্লেশও বলে ওঠে, 
হ্যা, হ্যা, তোমার কি বলবার আছে বল বোন । 

আপনারা তো এত কথা বলছেন, আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দেবেন £ দুই পুরোহিতের 
দিকে চেয়ে প্রশ্নটা করে নরসী। 


১১৬ গৃহডজ 


“নিশ্চয়, নিশ্চয়, বল কি বলবে? দুই পুরোহিত সমস্থরে বলে ওতে। 

“বারো-মানুষ গভীর একটা কুয়োর মধ্যে ছ-মানুষ লম্বা একটা দড়ি ফেললে সে দড়ি নিচে 
পৌ'ছাবে কি £ 

এযাঠ কথা খুজে না পেয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান অইয়াশাস্ত্রীজী। পঞ্চায়েতের অন্য 
লোকেরাও একেবারে স্তদ্ধ। রেবন্নাশেট্রী এবার কল্লেশকে অনুরোধ করে, “ফয়সলাটা শুনিয়ে 
দিন এবার সকলকে ।, 

গিরিয়াশেট্রী জোরগলায় তার শেষ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়, “এর কলটা ছেনাল মেয়েমানুষকে 
নিয়ে আর আমি ঘর করব না।, 

মিনিট পাঁচেক চিন্তা করে কল্লেশ, তারপর রায় দেয়, "স্বামী বলছে সে এই স্ত্রীর সঙ্গে বাস 
করবে না। ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে এই স্ত্রীর সঙ্গে থাকতে বলা অনুচিত। সে বলছে শ্বশুর এবং 
পুত্রবধূর মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক আছে, কিন্তু চেন্নাশেট্টী বলছে এ অভিযোগ মিথ্যা। কারো ওপর মিথ্যা 
দোষারোপ কারও উচিত নয়। কিন্তু সবাইকার সন্তোষের জন্য এক্ষেত্রে শ্বশুর এবং পুন্রবধূকে 
আলাদা আলাদা জায়গায় থাকতে হবে। স্বামী যেহেতু স্ত্রীর সঙ্গে থাকতে গররাজি, সেইহেত্‌ 
স্রীকে একা আলাদা বাড়িতে থাকতে হবে। মেয়েটি চেন্নাশেট্রীর পুত্রবধূ, সুতরাং চেন্নাশেট্রীকেই 
তারজন্য একটি আলাদা আস্তানা তৈরী করে দিতে হবে। পিতা এবং পুন্র তাদের যেমন ইচ্ছা 
সেইভাবে থাকতে পারে । 

এই ফয়সলার যুক্তিুলো অনেকেই বুঝল না। শিবেগোড় প্রশ্ন করল, “এ কেমন ন্যায় বিচার 
হল £ কিন্ত রেবন্নাশেট্ী নরসীর দিকে ফিরে বলল, “আমরা কক্লেশজীকে ন্যায়পীঠে বসিয়েছি, 
উনি যা বলবেন তাই শুনতে হবে, এখন ও"র ওপর অন্য কারো কথা চলবে না। বোন, আমি 
বলছি, তুমি চুপচাপ এই ফয়সলা মেনে নাও ।, 

নরসীও এই ব্যবস্থা মেনে নিয়ে বলল, “আপনারা পাঁচজনে যা বলবেন তা আমাকে তো মানতেই 
হবে। 

আর কোন কথা ওঠার আগেই উঠে দাঁড়াল রেবন্নাশেন্রী, কল্লেশও উঠে পড়ল ন্যায়পীঠ 
থেকে। 

বাড়ি ফিরে এসে কল্লেশকে জিজ্ঞাসা করে চেন্লিগরায়, “ও মেয়েটা কি বলল বলতো 

“বুঝতে পারনি নাকি ? 

নাতো! 

এ জন্যই তো তোমায় ন্যায়পীঠে বসানো হয়নি । না বৃঝেছ তো আর বুঝে দরকার নেই। 
কি হবে ওসব কথা ভেবে £ যেতে দাও !, 

চেন্নিগরায় আরেক দলা তামাকপাতা চটকে মুখে পুরে ফেলল। 


২ 


রেবন্নাশেট্রী নিয়মিতভাবে তাস খেলতে যাক কোডীহল্লীতে। সেখানকার প্যাটেল 
চিন্কেগোড়ের গোয়ালঘরের ছাদটি তাসের আড্ডার পক্ষে চমৎকার জায়গা । চির্েগৌড় আর 


গহভঙ্গ ১২৭ 


রেবনম্নাশেট্রী ছাড়া সেখানে আসে কম্বনকেরের অধ্যক্ষ লিঙ্গদেব, তাড়ীর ঠিকাদার চিন্স্বামী 
এবং চামড়ার কারবারী হায়াত সাবী। 

সেদিন রেবন্নাশেট্টী চিক্কেগোড়কে বলল, “পঞ্চাশটা টাকা হবে কি£ থাকে তো দিন, 
নারকেল বেচে শোধ করে দেব । 

“এ পযন্ত কত নিয়েছ সে খেয়াল আছে £ এখন কিছু নেই আমার হাতে |! 

“অমন কথা বলবেন না, দিয়ে দিন না টাকাটা ।” অবশ্য ধার দিয়ে কখনও লোকসান হয় না 
চিন্বেগোড়ের । বেশ কিছুটা তো খেলা থেকেই উসুল হয়ে যায়। টাকা ধার দেবার ফর্ম, রেভেন্য 
স্ট্যাম্প ইত্যাদি সবই চিন্কেগৌড়ের কাছে মজ্দ থাকে । কাগজে পঞ্চাশ টাকার অঙ্ক লিখে, তারিখ 
ও রেবন্নাশেট্টীর স্বাক্ষর বসিয়ে নিয়ে, এক বছরের সুদ ছণ'্টাকা কেটে চুয়াজিলিশ টাকা দিয়ে 
দিল সে। কিন্তু টাকাটা রেবন্নাশেন্রীর পকেটে ঢোকার আর সুযোগই পেল না। যে চাটাইতে 
খেলার আসর বসেছিল সেইখানেই রাখা হয়ে গেল। চুয়ালিলশ টাকা খুবই সামান্য, কাজেই 
তিন পাতির খেলায় সে রাজি হল না। প্রতি দানে এক টাকা হিসাবে আঠাশের খেলা শুরু হল। 
সেদিন আর কেউ খেলতে আসেনি, তাই খেলা চলছিল শুধু চিক্কেগৌড় ও রেবন্নার মধ্যে। 
বিকেল ছ'টার মধ্যে চুয়ালিলশ টাকার সবটাই চলে গেল আবার চিন্কেগৌড়ের পকেটে । কিন্তু 
রেবন্নাশেট্রীর জিদ চেপেছে, সে আজই খেলায় জিতে এঁ টাকাটা আবার আদায় করে নেবে। 
গৌড় আর ধার দিতে চাইল না। “দুত্তোর খেলার নিকৃচি করেছে, যা হয় হবে, দিন আরো পঞ্চাশ, 
এক্ষ্ণি লিখে দিচ্ছি। আবার কাগজে সই করে চুয়ালিলিশ টাকা নেওয়া হল এবং খেলা চলল 
রাত এগারটা পর্যস্ত। এবারও সমস্ত টাকাটা জিতল চিক্কেগীড়। এতক্ষণে রুমালখানা ঝেড়ে 
ঝুড়ে কাধের ওপর ফেলে বাড়ির দিকে রওনা দিল রেবন্নাশেন্রী। 

বাড়িতে পাঁচটি ছেলেপেলে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল সবক্কা। দরজা ধাক্কা দিয়ে তার ঘুম 
ভাঙিয়ে খাবার দিতে বলল। কিন্তু কাঁসার থালায় ঠাগডা লোন্দা আর পালং শাক দেখেই 
ক্ষেপে গেল রেবন্না, খাবারটা গরম গরম দিতে পার না।' 

গরম গরমই তো করে রেখেছিলাম, এত দেরী করলে, তাই জড়িয়ে গেছে ।, 

“দুত্তোর তোর মায়ের **** আমি কখন আসি, না আসি তুই জিজক্তেস করবার কে শুনি £ 
হতচ্ছাড়ি কোথাকার, মারব এক লাখি !---বলতে বলতে লোন্দা ছিড়ে মুখে পোরে। কিন্তু ঠাণ্ডা 
মড়য়ার ডেলা গেলা বেশ শক্ত, সুতরাং উঠে বৌয়ের পিঠে এক লাথি কষিয়ে দিয়ে বলে, 
গরম খাবার নিয়ে আয় শিগ্গীর ।” 

“চাল নেই ঘরে'_ ফুঁপিয়ে ওঠে সবক্কা। 

“সর্বদাই শোন কেবল “নেই” আর “নেই”, হাভাতে ছেনাল কোথাকার” আর একটা 
লাথি ঝেড়ে সেই ঠাণ্ডা খাবারই কোনমতে গিলে খাটে গিয়ে শুয়ে পড়ে রেবনা। এটো 
থালা ধুয়ে রেখে, নিচে মেঝেতে ছোটছেলে রুদ্রেশের পাশে এসে শোয় সবক্কা। 


৯১১. 


হিসেব লিখতে বসে কিছু বুঝতে না পারলে খাতাপন্র পাটোয়ারীর কারিন্দা বা চাকরের 
ঘাড়ে চাপিয়ে নন্জশ্মা নিজেই চলে যায় তিম্লাপুর। দাবরসায়াজী সব বুঝিয়ে দেন, 


২২১৮ গৃহভঙজ 


ভুলচুক ঠিকঠাক করে দেন। উতুল আদায় করার সময় সাধারণতঃ গ্রামের প্যাটেল 
সঙ্গে থাকে । রামসন্দ্র গ্রামের আদায় উশুল তো পুরোপুরি শিবেগৌড়েরই হাতে । তার 
ধারণা খাজনা আদায় করাটা প্যাটেলেরই কাজ। প্যাটেল যেমন বলবে পাটোয়ারী সেই- 
ভাবেই হিসাব লিখবে । শিবেগৌড়ের সঙ্গে টক্তর দেবার ক্ষমতা গ্রামে কারো নেই, কাজেই 
এতকাল ধরে এই নিয়মই চলে আসছে । জমির খাজনা আদায় করে প্যাটেল, সুতরাং 
পাটোয়ারী পরিবারের এ থেকে এক পয়সাও আমদানি হয় না। কোন খরিদ-বিকীর 
দলিল লেখাতে হলেও লোকে যায় আগেকার পাটোয়ারী শিবলিজের কাছে, চেন্নিগরায়ের 
কাছে কেউ আসে না। সবাই জানে চেন্িগরায় দলিল লিখতে পারে না। তাছাড়া 
প্যাটেল সবাইকে এই বলে ভয় দেখিয়ে রেখেছে যে, এ স্ত্রীলোকটাকে দিয়ে দলিল লেখালে 
সইটা কাকে দিয়ে করাবে £ রেজিস্ট্রী করানোর দলিলপন্র নন্জম্মা শিবলিঙ্গের চেয়ে 
অনেক ভাল লিখতে পারলেও গ্রামের লোকের ধারণা সরকারী কাগজে মেয়েমানুষের হাতের 
লেখা থাকলে নাকি অমঙ্গল হবে। এই সব কারণে রামসন্দ্র গ্রাম থেকে নন্জম্মাদের 
এক পয়সাও আয় নেই। 

করুবরহল্লীর ওপর ভরসা করা যায়। সেখানে চেনিগরায় খাজনা আদায় করতে 
যায়, সঙ্গে থাকেন গুশ্ডেগৌড়জী। তিনি প্রধান প্রধান ব্যক্তিদের কাছে খাজনা আদায়ের 
সময় পাটোয়ারী দস্তরীটাও পাইয়ে দেন এবং নিজেও দেন দুগ্টাকা। এই গ্রামটি থেকে 
নন্জম্মাদের প্রায় চল্লিশ টাকা আয় হয়। গৌড়জী ভরসা দিয়েছিলেন দ্বিতীয় ফসল 
উঠলে তার থেকে আরো এক খণ্ডি মড়য়া ও পঞ্চাশ সের বরবটি দেবেন, সেটাও কিছু কিছু 
করে পাওয়া যাচ্ছে। তবে কুরুবরহল্লী গ্রামে খরিদ, বিক্রী, বন্ধকী কারবার বিশেষ হয় না, 
কাজেই এসব দিক থেকে এখানে উপাজনের আশা কম। 

এদের এলাকার লিঙ্গাপুর গ্রামে তিরিশটি পরিবার বাস করে, সবাইকারই অবস্থা বেশ 
ভাল। শিবেগৌড়ের সঙ্গে এ গ্রামের লোকেদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়তা আছে, কাজেই 
শিবেগৌড় তাদেরও বুঝিয়েছে, পাটোয়ারীকে দস্তরী দেওয়ার দরকার নেই। এখানকার প্যাটেল 
পুরদপ্পা দাবী করে যে দস্ভরী তারই পাওয়া উচিত। চেন্নিগরায়ের পিতা রামন্নাজীর আমলে 
এ গ্রামের প্রত্যেকটি পরিবার থেকে এক টাকা করে দস্তরী দেবার প্রথা ছিল। গ্রামের বৃদ্ধ 
ব্যক্তিরা এখনও একথা বলেন। কিন্তু এখন দিনকাল বদলে গেছে, কাজেই এ গ্রাম থেকেও 
কিছুই আমদানি নেই। 

ক্রুবরহল্লীর খাজনা আদায়ের সময় নন্জম্মাও যায়। অন্য দুই গ্রামে সেখানকার 
প্যাটেলরাই ও কাজটা করে। আর হিসাব লেখার কাজটা তো হয় বাড়িতে বসেই। খেত- 
খামারে ঘুরে রায়শুমারী আর মদুমস্তমারীর তথ্যাদি যোগাড় করে আনে চেন্নিগরায়। 
তারপর সেই খসড়া থেকে জমাবন্দীর হিসাব লেখাটা নন্জশ্মার দায়িত্ব । কিছু গোল- 
মেলে ব্যাপার দেখলেই সে চলে যায় তিমলাপুর। চেন্নিগরায় যখন কোট পরে, মাথায় 
ফেটি বেঁধে, গলায় চাদর জড়িয়ে জমাবন্দীর হিসাব নিয়ে শহরে যায়, তার হাত-পা 
কাঁপতে থাকে । হেড ক্রাককে ঘুষ-টুস দিয়ে কোনমতে সাহেবের সইটা করিয়ে নিয়ে 
তারপর বৃক ফুলিয়ে গাঁয়ে ফিরে আসে । এলাকাদার বা আমলাদার কখনো গ্রাম সফরে 


গৃহভজ ২১১০৯ 


এলে নন্জম্মা বেচারী বাচ্চাদের না খেতে দিয়ে জমিয়ে রাখা ঘি, ভাল চালের ভাত, 
ভাল ডাল, উৎ্কম্ট সব্জী, পাঁপড় ইত্যাদি খাইয়ে যথাসাধ্য আপ্যায়ন করে তাঁদের। তারপর 
বিনয়ের সঙ্গে বলে, “আমরা বড় গরীব। হিসাবে যদি কিছু ভুলচুক থাকে দয়া করে 
শুধরে দেবেন।' কিন্তু আজ পর্যন্ত সে এদের কাউকে বলেনি যে সমস্ত হিসাব সে নিজেই 
লেখে। 

এতসব খাট্রুনীর মধ্যে স্বামীদেবতাটিকে সামলে রাখা তার আর একটা বড় কাজ। 
সারা বছর খেটে-খুটে হিসাব তৈরী করে দিল সে। বর্ষার সময় বর্ষাসনের হিসাব নিয়ে 
চেন্নিগরায় সেই যে শহরে গেল তারপর পনের দিন আর কোন খবরই নেই। অবশেষে 
ফিরল যখন, জানা গেল মাত্র পাঁচ টাকা এনেছে। তাও নন্জম্মার হাতে না দিয়ে, 
তিপটুর থেকে আনা টিনের বাক্সটায় রেখে তালা বন্ধ করে চাকীটা নিজের পৈতার সঙ্গে 
বেঁধে রাখে । আমলাদার, হেডক্লার্ক, তালুক ক্লার্ক, চাপরাসী সবাইকার প্রাপ্য দিয়েও অন্তত 
একশ" টাকা থাকার কথা। তার থেকেও গোড়জীর কাছে আগাম নেওয়া পঞ্চাশ টাকা 
কেটে নিলে তবুও পঞ্চাশটা টাকা ঘরে আসার কথা । “বাকি টাকা কোথায় গেল £' প্রশ্ন 
শুনেই খিঁচিয়ে ওঠে চেন্নিগরায়, “রোজ তোর এ রুটি, বরবটি আর ঘ্যাট খেয়ে খেয়ে মুখে 
চড়া পড়ে গেছে বুঝলি রে ছেনাল£ পনের দিন হোটেলে আলুকান্দা, ভাজা বড়া, দোসা, 
মৈসুরপাক এইসব খেয়ে তাই মুখ বদলে এলাম ) 

তুমি তো অনেক কিছুই খেয়েছ কিন্তু ঘরে বাচ্চাগুলো কোনদিন মৈসুরপাক চোখেই 
দেখেনি, ওদের কথা একবার মনে পড়ল না তোমার £ 

উত্তর খুঁজে না পেয়ে গালাগালির ফোয়ারা ছুটিয়ে দিল চেনিগরাযস, “ছেনাল, ছেনাল, 
তোর মায়ের :--* ইত্যাদি বকতে বকতে মহাদেবায়াজীর মন্দিরে গিয়ে আশ্রয় নিল। 

কিন্তু এখন সারা বছর পেট চলবে কি করে £ তৃতীয় সন্তান আট মাসের, ইতিমধ্যেই 
পেটে আর একটি এসে গেছে। বর্ষাসস বছরে একবারই আসে । সেই টাকা এভাবে 
উড়িয়ে দিলে ছেলেপেলের উপোষ ছাড়া গতি নেই। দিনে অন্তত দুটো মড়ূয়ার ডেলা না 
জটলে তাদের কারোরই শরীর টিকবে না। বরধাসনের টাকা সোজাসুজি ওর হাতেই 
দেবার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করলে হয় নাঃ চেনিগরায় তাহলে কি করবে 
কে জানে! কিন্তু এ ছাড়া আর উপায় কিঃ দু'দিন ভেবে একটা উপায় স্থির করল 
নন্জম্মা। 

পরদিন সকালে উঠে শম্ান করে, বাচ্চাদের স্বান করিয়ে, রুটি আর চাটনী খাইয়ে 


তাঁতীপাড়ার পুট্টব্বার কাছে পৌছে দিল পার্বতী আর রামন্নাকে। তারপর বিশ্বকে কোলে 
নিয়ে চলে গেল কুরুবরহল্লী। ওুভ্তেগৌড়জীর বাড়িতে পৌছে দেখে ভিতরের উঠোনে 


বসে আছে গঙ্গম্মা। তার প্রসারিত লাল শাড়ীর আঁচলে গৌড়জীর স্ত্রী লঙ্কশ্মা মড়ূয়া তেলে 
দিচ্ছেন। দেওয়ালের কাছে বসে গৌড়জী তাঁর পান-শুপারীর থলিটার মধো হাত ঢুকিয়ে 
কি যেন খ্ুঁজছেন। বউকে দেখেই চটে গেল গজম্মা,_-আমি ভিক্ষে মেগে খাচ্ছি, তাতেও 
বাগড়া দিতে এসেছিস কূলটা কোথাকার £ চেচিয়ে উঠল সে। নন্জম্মা কোন কথা 
না বলে দাঁড়িয়ে রইল চুপ করে। 


১২০ গৃহভঙ্গ 


গৌড়জী ডেকে বললেন, “এসো মা, বস। সে মাদুরে এসে বসতেই, গঙম্মা আচলে 
মড়ূয়াটা বেঁধে নিয়ে উঠে পড়ল এ বাড়ি থেকে। 

লক্কম্মা এবার বলে উঠল, “তোমার শাশুড়ী এতক্ষণ বসে বসে তোমার নামে ঝুড়ি 
ঝুড়ি নিন্দে করে গেল। তুমি নাকি ওকে দেখতে পার না, বরকে তো তুমি তুড়ি দিয়ে 
নাচিয়ে বেড়াচ্ছ, পুরুষের মত রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াও-_আরও কত কি কথা! 
পাটোয়ারীর রোজগারের ভাগের কথাও বলছিল ।” 

গৌড়জী বলে উঠলেন, “যা খুশি বলতে দাও ওকে, তুমি চুপ কর এখন", তারপর 
নন্জম্মাকে জিক্তাসা করলেন, “কি সংবাদ বল মা, বর্ষাসন পেয়ে গেছে তো? 

“সেই কথা বলতেই তো এলাম গৌড়জী*, নন্জম্মা এবার স্বামীর কীতি-কাহিনী বর্ণনা 
করল। 

শুনে লক্কশ্মা বলে ওঠে, ধরে আচ্ছা করে মার লাগাতে হয়।? 

“মার খেলে ওর কিছুমান্র শিক্ষা হবে না। কি করা যায় তুমিই বল মা, তুমি তো 
আমার চেয়ে বেশী চেন ওকে। 

“বর্ধাসনের টাকাটা ওর হাতে যদি না পড়ে তবেই সব দিক রক্ষা হয়।' 

“কিন্তু সরকার তোমার হাতে টাকা দেবে কি? র 

“তার দরকার নেই। মোট একশ কুড়ি টাকা বর্ষাসন হয়। তারমধ্যে আমলাদের, 
কেরাণী, চাপরাসী এদের দিতে হয় প্রায় পনের টাকা। সে কটা টাকা ছেড়ে দিয়ে বাকি 
একশ' টাকার জন্য গতবারে যেমন রসিদ লিখিয়ে নিয়েছিলেন, এবারেও তাই নিয়ে নিন। 
আশি টাকা তো আপনার কাছেই আদায় হয়, বাকি কড়ি টাকা অন্য কারো নামে রসিদ 
লিখিয়ে নিন। ওকে যখন বর্ষাসন দেওয়া হবে তখন ওগুলো কাটা যাবে। তাহলেই 
ওর হাতে আর টাকা থাকবে না। সেই টাকা থেকেই আমার দরকার মত আপনি 
আমাকে মড়য়া, ধান-লঙ্কা আর মাঝে মাঝে পাঁচ দশ টাকা করে দেবেন ।” 

“বেশ, বেশ, সত্যি মা, তুমি দেওয়ানগিরি করতে পার। এ ষাঁড়টাকে যে সামলে 
রাখতে পারে সে গোটা মহীশর রাজ্যও শাসন করতে পারে। কাল পরশ্ুর মধ্যেই গিয়ে 
আমি লিখিয়ে নেব? 

লক্কম্মা অনেকবার অনুরোধ করল মন্দিরে বসে রান্না করে খেয়ে যেতে, কিন্তু ছেলে- 
মেয়েদের রেখে এসেছে বলে সে অনুরোধ রাখা সম্ভব হল না। নন্জম্মা বাড়ির পথে 
রওনা দিল। ওর ছেলেমেয়েদের জন্য লক্মম্মা গুড় আর নারকেল দিয়েছে, সেগুলো বেধে 
নিল শাড়ীর আঁচলে । যাবার আগে কোলের ছেলে বিশ্বনাথ ও নন্জম্মা দু'জনকেই ঘি 
আর গুড় মেশানো দুধ খাওয়ালো লক্কমা। 

বাড়ি ফিরতে চেন্নিগরায় তাকে জিক্তাসাও করল না কোথায় গিয়েছিল সে। কিন্তু 
সময় মত রানা হয়নি দেখে খানিকটা রাগারাগি করল। তারপর স্ত্রীর আঁচলে বাঁধা 
গুড় আর নারকেল দেখতে পেয়ে তাই খুলে শুরু করে দিল খেতে । বেচারা পার্বতী আর 
রামন্না পৃট্টববার বাড়ি থেকে ফিরে আসার আগেই তাদের ভাগের খাবারটুকু খেয়ে নিয়ে 
হাত ধুয়ে ফেলল তাদের বাবা। 


গৃহভঙ্গ ১২১ 


পরের দিনই এসে গেলেন গুণ্ডেগৌড়জী। তাঁর কথামত দোয়াত কলম এনে সামনে 
রাখল নন্জম্মা। গৌড়জী আদেশ করলেন চেন্নিগরায়কে, “যা যা বলা হচ্ছে লিখে যাও।” 
নন্জম্মা বলে যাচ্ছিল, “করুবরহল্লীর প্যাটেল গুণ্ডেগৌড়ের নিকট রাজস্ব আদায়ের দরুণ 
মোট আশি টাকা প্রাপ্ত হইলাম", হঠাৎ কলম থামিয়ে পাটোয়ারী প্রশ্ন করে বসল, “কেন, 
এ কথা কেন লিখব £ আমি লিখব না। বধাসনে তাহলে আমার হাতে কিছুই আসবে 
না যে।' 

গৌড়জী খুব চটে বললেন, “কে বলেছে আসবে না! মুখ বন্ধ করে এখন চুপচাপ 
লিখে যাও যা বলা হচ্ছে। কিন্তু পাটোয়ারী তবু কলম তোলে না। গৌড়জী ভয় দেখান, 
"লিখবে না তুমি £ এরপর তাহলে আমার গাঁয়ে যেও, ঠ্যাং ভেঙে রেখে দেব । 

“আমার খরচ জটবে কি করে £ 

“সে আমি দেব, লেখ এখন 1: 

যা হোক শেষ পর্যন্ত একশ" টাকার রসিদ লিখে তাতে সই করে দেয় চেন্নিগরায় । 
তারপর বলে, “তাহলে দিন আমায় কিছু !, 

কোমরের কষি থেকে দুটো টাকা বার করে তার দিকে ছ.ড়ে দিয়ে গৌড় বলেন, এই নে, 
জমিচ্ঙ্গির টাকাটা তোকে এখনই দিয়ে দিলাম ।, 

টাকা দুটো চটপট পকেটে ভরে ফেলে পাটোয়ারী । গৌড়জী এরপর ফিরে যান নিজের 
গ্রাম। পরদিন শুকবার। চেন্নিগরায় সকালবেলাই রুটি খেয়ে কম্বনকেরের সাপ্তাহিক 
বাজারে গিয়ে হাজির। তিপটুর থেকে দোকানীরা এসে এই সাপ্তাহিক বাজারেও হোটেল 
খোলে। তিপটুরের মতই এখানেও আলুর বড়া, মশলা দোসা, মৈসুরপাক, কলাভাজা 
ইত্যাদি সবই পাওয়া যায়। 


৪ 


নন্জশ্মা বেশ বুঝতে পারছিল, শুধু পাটোয়ারী কাজের উপার্জনে সংসার চলা কঠিন। 
পৈতৃক সম্পত্তি না থাকলে, শুধু এইটুকৃতে খাওয়া-পরা চালানো সম্ভব নয়। কিন্তু আর 
কি করা যেতে পারে? তিম্লাপুরে সে দেখেছিল দাবরসায়াজীর প্রতিবেশীরা পলাশের 
পাতা জুড়ে জুড়ে খাওয়ার পাতা, দোনা এসব তৈরী করে। তারা সেগুলো বাণ্ডিল বেঁধে 
রাখত এবং তিপট্রুরে পাঠাত। তিপট্রুরের দোকানদাররা নাকি ছ”আনা শ"' হিসাবে ওগুলো 
কিনে নেয়। নন্জম্মার মনে হল, বাড়ির কাজকর্ম সেরে অবসর সময়ে যদি কিছু কিছু 
এ রকম পাতা বানাতে পারি তাহলেও কিছু উপার্জন হবে। 

রামসন্দ্রের ব্রাক্ষমণেরা চোলেশ্বর টিলার পাশের নালাটার ধারের জঙ্গল থেকে পলাশ 
পাতা নিয়ে আসেন। জায়গাটা গ্রাম থেকে তিন মাইল দূর। চোলেশ্বরের টিলা নন্জম্মার 
বাপের বাড়ি নাগলাপুর যাবার পথেই পড়ে। এবার ফাল্গুন মাসে তাজা পলাশ পাতার 
মরশুমে সে বেরিয়ে পড়ল পাতা সংগ্রহ করতে । একা স্ত্রীলোকের পক্ষে এতটা পথ যাওয়া 
উচিত নয়, কিন্তু কে যাবে ওর জঙ্গেঃ স্বামীকে বলে দেখল একবার। তৎ্ক্ষণাঞ্চ 


১২২৭ গহভজ 


জবাব হল, “পেট চালাবার জন্য অত যার ছটফটানি সেই যাক, আমার কি দরকার £ 
সুতরাং তাঁতীপাড়ার পুট্টব্বাকে নিয়ে নন্জম্মা একদিন ভোরে কাক-গক্ষী ডাকার আগেই 
বেরিয়ে পড়ল। বাচ্চাগুলোকে রেখে এল প্রতিবেশী চেন্নাশেট্রীর বাড়িতে। পুটব্বা দিনে 
তিন আনা মজুরী পায়। খুব দ্রুতপায়ে হেঁটে দুজনে সূর্যোদয়ের আগেই পৌছে গেল, 
তারপর চটপট পাতা তুলতে শুরু করে দিল। এইভাবে রোজ ওরা পাতা তুলে নিজেদের 
পিঠের থলি বোঝাই করে। বেশ কিছুক্ষণ পরে খিদে পেলে সঙ্গে-আনা রুটি চাটনী খেয়ে 
নিয়ে আবার কাজ শুরু করে। চেপে চেপে থলি ভর্তি করে ছুটতে ছুটতে ফিরে আসে 
গ্রামে। বাড়িতে ফিরে থলি থেকে পাতাগুলো বার করে পার্বতীকে একটা মোটা ছণচ 
আর সুতো দিয়ে বসিয়ে দেয়, সে পাতাগুলোকে বৌটার কাছে গেথে গেথে মালার মত 
তৈরী করে। মাঝে মাঝে ছোট্র রামন্না পর্যন্ত এক একটা পাতার মালা বানিয়ে ফেলে। 
এই অবসরে রান্নাটা সেরে ফেলে নন্জশ্মা। খাওয়ার সময় দেখা দেন বাড়ির কর্তা। 
কাঁচা সবুজ পলাশ পাতায় আহার তাঁর বড়ই পছন্দ। একটা বড় পাতাকে দোনার মত 
করে মুড়ে নিয়ে উবু হয়ে বসে আশ মিটিয়ে খেয়ে দেয়ে দিবানিদ্রায় গড়িয়ে পড়েন তিনি । 
বাসনপন্ত্র ধুয়ে মেজে নন্জম্মাও বসে বসে কিছু পাতা গাঁথে। বাকি পাতাগুলো বিকেলের 
পড়ন্ত রোদে শুকোতে দেয়। এইভাবেই কেটে যায় দিন। পরদিন সকালের, নিজেদের 
জন্য, বাড়িতে স্বামী ছেলেমেয়েদের জন্য রুটি গড়ে চাটনী পিষে রাখতে হবে। অন্ধকার 
থাকতে উঠতে হবে, রাতেও তাই তাড়াতাড়ি শোয়া দরকার। 

প্রথম বর্ষা নামলেই পলাশ পাতাগুলো জীর্ণ ও ফুটো ফুটো হয়ে যায়। তার আগেই 
নন্জম্মা শ'দেড়েক বাগ্ডিল বানিয়ে ফেলল। মনে মনে হিসাব কষল, যদি ছ,আনা করে 
এক বাণ্ডিলের দাম হয় তো দু'শ বাণ্ডিল বানাতে পারলেই অন্ততঃ পঁচান্তর টাকা রোজগার 
হবে, অবশ্য খাটতে হচ্ছে খুব, কিন্তু মেহনত না করলে কি পেট চলে? পাতা তুলে জমা 
করতে করতেই খাজনা আদায়ের সময় এসে গেল। চতুর্থ কিস্তিতে করুবরহল্লীর 
লোকেরা দস্তরী দেয়। এতদিনে ওর গর্ভেরও ছ"'মাস হয়ে গেছে। স্বামী তাকে ধমকে 
উঠল, “তোর যাবার দরকারটা কি শুনিঃ আমি আদায় করে আনতে পারি না নাকি 
সে কথার কোন উত্তর না দিয়ে বেরিয়ে পড়ল নন্জম্মা। দসন্তরীর সমস্ত টাকা গুণ্ডে- 
গৌরজী সংগ্রহ করে রেখেছেন নিজের কাছে। পাটোয়ারীর হাতে পাঁচটি টাকা দিয়ে তিনি 
বলেন, যখন তোমার দরকার পড়বে তখন টাকা চাইবে । এখন এর বেশী আর কি 
দরকার £ চেনিগরায় এমন দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকায় যেন গিলে খাবে। গালাগালটা 
মুখে উঠে আসে, কিন্তু উচ্চারণ করতে সাহস হয় না। বাড়ি গিয়ে অবশ্য নন্জম্মা ও 
গুণ্ডেগীড়ের নামে ব্যভিচারের ইঙ্গিত করে প্রচুর গালাগাল দিয়ে নিজের গায়ের ত্বালা 
মেটায়। যাক, পাঁচটা টাকা তো পাওয়া গেছে, তিপটুরে গিয়ে কি কি মজা লুটবে তারই 
চিন্তায় মশগুল হয়ে যায় পাটোয়ারী। লোকে বলে তিপটুরে নাকি গব্বিবীরপ্রর নাটক 
হয়, তার দৃশ্যপট এমন চমৎকার যে মনে হয় যেন সত্যিকারের রাজপ্রাসাদ দেখাচ্ছে। 
ছ'আনা খরচ করে সেটা তো দেখতেই হবে। রাতে অন্য কিছু না খেয়ে শুধু বোম্বাই 
বোগ্ডা খেলেই হবে। ব্যাটা রাঁড়ের পত গুণ্ডেগৌড় একশ" টাকার রসিদ লিখিয়ে নিল। 


গৃহভঙ্গ ২২৩ 


বর্ধাসন পাবার পর তালুক অফিসের সবাইকে দিয়ে-থুয়ে মোটে চার পাঁচটা টাকা থাকবে 
হাতে। এখন কাছে আছে পাঁচ টাকা। সব মিলিয়ে এই দশ টাকায় কদিনই বা চালানো 
যাবে £ একটা মৈসূরপাকের দামই তো ন'পয়সা। চার আনায় মান্ত্র ছ'খানা দেয় হারাম- 
জাদারা। আর দুটো বেশী দিলে কি ক্ষতি হত ব্যাটাদের £ দুত্োর তোর মায়ের *-*। 

এই সময় রামসন্দ্র গ্রামে সরকারী প্রাইমারী স্কুল খুলল। স্কুলের জন্য বাড়ি দরকার। 
সরকার গ্রামের প্যাটেলের কাছে খোজ করল কোথায় স্কল বসানো যায়। শিবেগৌড় 
রায় দিল, হনুমান মন্দিরই হচ্ছে উপযুক্ত জায়গা । অর্থাৎ অপ্পন্নায়া এবং গশ্মাকে 
এবার সরতে হবে সেখান থেকে । খবরটা কানে যেতেই গঙ্জম্মা শিবেগৌড়ের বাড়ির 
সামনে গিয়ে মুঠো মুঠো মাটি ছ-ড়তে শুরু করল। অবশেষে পুরোহিত অন্নাজোইস এসে 
মন্দিরে সকল হবে না এ কথাটা জানাতে তবে শান্ত হল সে। শিবেগৌড়েরই একটা 
খালি বাড়ি ছিল, সেইটা বাষিক ছন্রিশ টাকায় ভাড়া নিল সরকার স্কলের জন্য। কিক্কেরী 
থেকে স্রপ্পা নামে এক মাস্টারও এসে গেল। কিছু ছেলে ভর্তি হল স্কুলে। কিন্তু 
মেয়েদের স্কলে ভর্তি করা হবে কি না তাই নিয়ে আলোচনা চলতে লাগল । মাস্টার- 
মশাই বললেন, “ময়েরাও পড়ক, কোন চিন্তা নেই। আজকাল বড় বড় গ্রামে মেয়েরা 
হাই স্কলেও পড়ছে” কিন্তু কথাটা কারোই মনঃপুত হল না। মাস্টার আবার বললেন, 
“যে সব বোনেরা লেখা-পড়া একটু শিখেছেন তাঁরা তো জানেন, সামান্য অক্ষর পরিচয় 
থাকলেই অন্তত বিশটা টাকা রোজগার করা যায়। এই কথা শুনে নন্জম্মা পার্বতীকে 
স্কুলে ভর্তি করে দিল। গ্রামস্ুদ্ধ লোক বলাবলি করতে লাগল, “কি সাহস এ মেয়ের দেখলে £' 
পাবতীর সঙ্গে রামন্নাও ভর্তি হল স্কুলে, তাকে বোঝানো হল স্কুলে মাস্টার মশাই একটুও 
মারবেন না, বালির ওপরেও লেখাবেন না, সে শ্লেটে লিখতে শিখবে। 

এবারেও প্রসবের সময় এল অনব্কম্মা। কিন্তু এবার নন্জম্মার মেয়েটি জন্মাবার 
আধ ঘন্টা পরেই মারা গেল। অক্শ্মা বলল, “পোয়াতি অবস্থায় তোর এই এত এত পাতা 
তুলে কাজ করা উচিত হয়নি নন্জ। কি থেকে কি হল, কেন বাচ্চাটা বাঁচল নাকে 
জানে ।? 

নন্জ কিছু বলল না, সে নিঃশব্দে কাঁদছিল। “কাঁদিস নে মা, সব ঠিক হয়ে যাবে। 
তোর নিজের শরীর ভেঙে গেলে এই বাচ্চাণুলোকে কে দেখবে £ দুদিন ধরে অক্ষম্মা 
অনেক সান্তনা দেবার পর একটু সামলে উঠল নন্জম্মা। গঙ্গম্মা মন্দিরে থেকেই 
অশৌচ পালন করল, কিন্তু বৌয়ের কাছে এসে একবার একটা সান্তনার কথাও বলে 
গেল না সে। শিশুটি মারা যাবার পরও তিন মাস অন্কম্মা থেকে গেল নন্জ্র সেবাযত্বের 
জন্য। গ্রামে ফিরে যাবার আগের দিন সে নাতনীকে বলল, “তার স্বামীর তো নিজের 
ছেলেপেলের জন্যও এতট্রুক্‌ মায়ামমতা নেই। নিজের পেট ভরানো ছাড়া আর কিছু বোঝে না 
ও। তোকে কত কম্ট করে মানুষ করতে হচ্ছে বাচ্চাগুলোকে। এর পর আর ওকে তোর 
বিছানার কাছে ঘেঁসতে দিসনে। 

চুপ করে থাকে নন্জ। অক্রশ্মা বলে, “তাতে যদি ওর রাগ হয় তো হোক, তুই 
ওর থেকে দূরে থাকবি । এবার বলে ওঠে নন্জম্মা, “কি করব অক্বম্মা, এসব পূর্ব জন্মের 


১২৪ গৃহভঙ্গ 


কর্মকল। আমি যদি ওরকম ব্যবহার করি তাহলে ও লাজলজ্জার মাথা খেয়ে রাস্তায় দাড়িয়ে 
গালিগালাজ করবে । আমি আগেই ও চেম্টা করে দেখেছি । 

“হা রে পোড়াকপাল' বলে ভ্ব্ধ হয়ে যায় অন্ধশ্মা। 

অক্কম্মার বয়স এখন আটাত্বর, তবুও সে পায়ে হেঁটেই গ্রামে ফিরতে চায়, শুধু সঙ্গে 
একটা লোক চাই। কিন্তু নাতনী কি ওভাবে পাঠাতে পারে তাকে £ তিন টাকা দিয়ে 
একটা নতুন লাল শাড়ী পরিয়ে, দেড় টাকায় একটা গরুর গাড়ি ভাড়া করে ঠাকমাকে 
বাড়ি পাঠালো নন্জন্মা। 


€ 


একদিন দুপুরবেলা রেবন্নাশেট্টীর বৌ সবক্কা হঠাৎ এসে বলল, নন্জম্মা, ঘরে আজ আমার 
কিছুই নেই, দ্ু'সের আটা দিতে পার 

“আটা তো পেষা নেই সবক্কা। এসো, বস। 

“তাহলে না হয় দু'সের মড়য়াই দাও ।' 

পাত্র এনেছিল সবর্ধা, তাতে দু'সের মড়ুয়া মেপে চেলে দিল নন্জম্মা। তখনকার মত 
আর কিছু না বলে চলে গেল সবন্ধা। কিন্তু সেইদিনই সন্ধ্যায় আবার এল সে। নন্জশ্মা তখন 
বসে বসে পলাশের পাতা গাঁথছে। সবক্কা ওর কাছে বসে পড়ে বলল, “কার কাছে ভিক্ষে চাইতে 
যাব, তাই ভাবছিলাম । বাচ্চারা উপোষ করে ছিল। উপোষ করতে করতে আমারও সহ্যের 
সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তুমি মড় যাটুকু দিয়ে আজ আমাদের প্রাণ বাঁচিয়েছ ভাই। 

“সে কি সবক্ডা, তোমার মুখে এমন কথা? তোমরা জমি জায়গাওয়ালা বড়লোক, 
তোমার মুখে একথা কে বিশ্বাস করবে? 

“সত্যি বলছ? তুমি কিছু শোন নি 

“কিছু কিছু শুনেছি। কিন্তু ঘরে খাবার মত আটাও নেই এটা ভাবতে পারিনি । 

“আমার ভাগ্য! পূর্ব জন্মে নিশ্চয় ভাল করে শিব পুজো করিনি” চোখের জল ফেলতে 
ফেলতে সবক্কা জানায় তার দুর্ভাগ্যের ইতিহাস। 

রেবন্নাশেটী কোডীহল্লীতে তাস খেলতে যেত। তাসের জুয়ায় কমাগত হেরেছে, আর 
হ্যাগুনোট লিখে লিখে টাকা ধার নিয়েছে, ধারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল তিন হাজার টাকা। 
জমি বেচে এ টাকা শোধ করবে বলেছিল। চিক্কেগৌড়ের সঙ্গে ওখান থেকেই সোজা 
তিপটুরে গিয়ে রেজিস্ট্রি করানো হয়ে গেছে, তারপর হ্যাগুনোট ছিঁড়ে ফিরে এসেছে। 
এখন আছে মান্র দেড় দ্র' একর জমি। রম্টি নামবে, পুকুর ভরবে, ক্ষেতে লাঙ্গল পড়বে 
তার পরে তো ফসলের আশা । তাতেও অন্ততঃ বারো খণ্ডি ধান হওয়া দরকার। কারণ 
ধোপদুরস্ত কাপড় আর চটি পরা “উকিল খেতাব-পাওয়া রেবন্নাশেট্রী তো আর নিজে নিজে 
খেত চষতে পারে না, সে অন্যকে দিয়ে নিজের খেতে চাষ করায়, তার ভাগে আসে মাত্র 
চার খণ্ডি ধান। শোনা যাচ্ছে এই জমিটুক্‌ও নাকি কাশিমবদ্দির কাছে বাঁধা দিয়ে আটশ, 
টাকা নেওয়া হয়ে গেছে। 


গৃহতজ ১২৫ 


শ্ 


“তা হঠাৎ জমি বাঁধা দেওয়ার দরকার হল যে? রুদ্রাণীর বিয়ে ঠিক হয়ে গেল 
নাকি £ 

“মেয়ের বিয়ের চিন্তা যদি কারো থাকে তবে তো ঠিক হবে? ঘরে এতবড় বিয়ের 
যুগ্যি মেয়ে রয়েছে! ওদিকে সেই সোয়ামীর ত্যাগ করা বউটা আছে না? সেই যে 
হ্শুরের সঙ্গে পিরীত করেছিল যে? সে তো এখন গাঁয়ের ওপাশে ঝোপের ধারে খাপরার 
চালের বাড়ি করেছে, সেখানে আবার দোকান দিয়েছে। কোথায় পেল সে অত পয়সা £ 
শুনছি তো এই আটশ' টাকা এর ছেনালটার কাছেই ঢেলেছে। এখন পঞ্চাশটা গাছের 
বাগানখানা আছে, তা নারকেলগুলো তৈরী হবার আগেই পেড়ে পেড়ে বিকী করে ফেলছে। 
হাতে কাঁচা পয়সা না থাকলে রেবন্নাশেন্টীর ধবধবে সাদা ধুতি আর কলার দেওয়া সার্ট 
কাচার সাবান জুটবে কি করে? তারপর দাড়ি কামাবার ব্লেড, হলুদ হাতী ছাপ সিগ্রেট, 
এসবের পয়সা আসবে কোথা থেকে £ 

নরসী এখন গ্রামদেবীর পীঠস্থান ঝাঁকড়া গাছটার কাছে তিন কামরার ছোট একখানা 
বাড়ি তুলে সেখানে দোকান খুলেছে । অপমানিত শ্বশুর চেম্নাশেট্রী লজ্জায় রামসন্দ্র ছেড়ে 
চলে গেছে, সে এখন তিপটুর ছাড়িয়ে সেই চন্নাপুরে গিয়ে দোকান করেছে। স্বামী 
গিরিয়াশেট্রীও চলে গেছে গ্রাম ছেড়ে। লোকে বলে সে নাকি এখন অরসিকেরের কাছে 
কোন গ্রামের কার বাড়িতে চাকরের কাজ করছে। 

রেবন্নাশেটীকে সৎ পরামর্শ দেবার মত কেউ নেই। তার মুখের সামনে কেউ দাঁড়াতেই 
পারে না। সর্বন্ধার বাপের বাড়িতে তার ভাইয়েরা আছে, তারা বোন আর তার ছেলে- 
মেয়েদের জন্য যথাসাধ্য করেছে। কিন্তু তাদেরও নিজের নিজের সংসারে আছে। তাদের 
কাছে গিয়ে কত আর কাদুনী গাওয়া যায়ঃ একবার বড় ভাই এসেছিল ভগ্মীপতিকে 
বোঝাতে, কিন্তু রেবন্না তাদের মা, খুড়ি, ঠাকমা, দিদিমা পর্যন্ত তুলে এমন গালাগালির 
ফোয়ারা ছুটিয়েছিল যে সে বলে গেছে আর জন্মে কখনও ওর সঙ্গে কথা বলতে আসবে না। 

সবন্কা বলছিল, “দখ নন্জম্মা, এতগুলো বাচ্চার জন্ম দিয়ে খুব ভুল করেছি, এখন 
যেমন করে হোক এদের মানুষ তো করতেই হবে! তোমার মত পাতা তৈরী করতেও 
জানি না, একটু শিখিয়ে দেবে আমায় £ শিখে নিলে তারপর এ বছর তুমি যখন 
চোলেশ্বরের টিলায় পাতা আনতে যাবে, আমিও যাব তোমার সঙ্গে 

“তুমি পাতা তুলে বেড়ালে শেট্ীজী চুপ করে থাকবেন ভেবেছ £ 

চুপ থাকবে না তো করবেটা কি শুনি আজ দুপুরে যখন তোমার কাছে মড়ূয়া 
ধার করে নিয়ে পিষে লোন্দা বানালাম তখনতো ঠিক কৃকরের মত গিলেছে বসে বসে। 

পরের দিন থেকে সবক্কা রোজ পাতা তৈরী শিখতে আসে। গাথবার কাঠিগুলো 
কিভাবে চিরতে হয়। পাতার বৌটা ছিড়ে কিভাবে একটু জল ছিটিয়ে নিয়ে চারদিক 
থেকে গোল করে সাজিয়ে গাঁথতে হয়, কাঠিগুলো ভাঙতে হয় কিভাবে সব সে শিখে 
ফেলল কদিনে। “একটু অভ্যাস হয়ে গেলেই আরো তাড়াতাড়ি হাত চলবে ।” নন্জম্মার 
এ কথায় অনেকটা ভরসা পেল সবক্কা। 


১২৬ গৃহভজ 


৬ 

সেদিন দুপুরে সরকারী কুয়ো থেকে খাবার জল আনতে গিয়েছিল নন্জম্মা। হঠাৎ 
দড়ি ছিড়ে কলসিটা পড়ে গেল কুয়োর মধ্যে। বাড়িতে এ একটাই কলসি। কম্বনকেরের 
কাশিম সাবী এলে তবেই এ কলসি তোলা যাবে। এখন বাড়ি গিয়ে আবার ঘড়া নিয়ে 
আসতে হবে। ঘড়ায় করে সরকারী কয়ো থেকে জল নিয়ে যেতে একটু লজ্জাও করছিল, 
কিন্তু উপায় কি? এই সব ভাবতে ভাবতে বাড়ি এসে দেখে কল্লেশ বসে আছে, ছেলে- 
মেয়েরা মামার আনা চকোলেট খাচ্ছে মহা উৎসাহে। 

“ওরা বলল, জল আনতে গেছিস, তা খালি হাতে এলি যে 

“দড়ি ছিড়ে কলসিটা জলে পড়ে গেল।” “চল, আমি তুলে দিচ্ছি গিয়ে" নন্জ ভাইয়ের 
পিছনে চলল। মামা কি করে কয়োতে নামবে তাই দেখতে বাচ্চাদেরও কৌতুহল কম 
নয়, অগত্যা বাড়িতে তালা লাগিয়ে যেতে হল নন্জকে। 

গ্রামের অন্য সব কয়োর জল একটু কটু, তাই বছর দুই হল সরকার থেকে এই 
কুয়ো খুঁড়ে পাথর দিয়ে বাঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর জল খুব মিষ্টি এবং পরিল্কার। 
ডোম চামার ছাড়া অন্য সব জাতের লোকই এই কয়োর জল নিয়ে যায় খাওয়ার ও রান্নার 
জন্য। ব্রাক্ষমণ, লিঙ্গায়েত, সোনার বেনে, বৈষ্ণব ইত্যাদি উচু জাতের বাড়ির মেয়েরা 
নিজের নিজের দড়ি, কলসি আনে এবং কুয়োয় দড়ি নামাবার আগে বাড়ি থেকে আনা 
কলসির জলে দড়ি নামাবার চাকাটা ধুয়ে শুদ্ধ করে নেয়। 

দড়ির একটা প্রান্ত কুয়োর মধ্যে ফেলে অন্য দিকটা জল তোলার চাকাটার লোহার 
খুঁটিতে বাঁধল কল্লেশ। ধুতি, কোট ইত্যাদি খুলে রেখে দড়ি ধরে নামতে শুরু করল। 
জল একেবারে পাতালে, কুয়োটা দু” গজ লম্বা, দুঃ গজ চওড়া, তবে ওঠা-নামা করার জন্য 
কুয়োর দেওয়ালে ছোট ছোট কোণ বার করা পাথর লাগানো আছে। জল পযন্ত পৌছে 
একটা কলসি তুলল কল্লেশ, তারপর দড়ির ফাঁসে বেধে বোনকে বলল ওপরে টেনে নিতে । 
নন্জ টেনে তুলল কলসি, কিন্তু দেখা গেল সেটা ওর কলসি নয়। “ওটা ওখানেই রেখে 
দে, কেউ চাইলেও দিবি না এখন। দড়িটা আবার ফেলেদে নিচে” নির্দেশ দিয়ে আবার 
ড্ব দিল কলেলেশ। আরেকটা কলসি পাওয়া গেল। জল হাতড়ে দেখে আরো অন্তত 
দশ বারাটা কলসি রয়েছে । একে একে সবকটা তুলল সে। 

দড়ি ধরে ওপরে উচ্ে এল পাথরের খাঁজে পা রেখে রেখে । কয়োর পাড়ে ততক্ষণে 
কুড়িজনেরও বেশী শ্ত্রী-পুরুষ জমা হয়েছে এসে । কল্লেশ বলল, 'নন্জা, কোনটা তোর 
কলসি বেছে নে। তারপর অন্যদের দিকে ফিরে বলল, “যার যার কলসি তারা আট আনা 
করে পয়সা দিয়ে কলসি নিয়ে যেতে পার। পয়সা না পেলে আমি কলসিগুলো বাড়ি 
নিয়ে যাব।, 

কিছু লোক তখনি বাড়ি গেল পয়সা আনতে । আগেকার অস্থায়ী পাটোয়ারী শিবলিজেও 
এসেছে। সে বলে বসল, “আমার গ্রামের কুয়োতে নামবার অনুমতি কে দিয়েছে তোমায় £ 

“বেশ তো, কলসিগুলোতে আবার জল ভরে ফেলে দিচ্ছি কয়োতে। এতবার নিঃশ্বাস 
বন্ধ করে এতবার ডুব দিলাম কি এমনি এমনি £ 


গৃহভজ ১২৭ 


শিবলিজে আর কিছু বলতে পারল না। সবাই আট আনা করে পয়সা দেওয়ায় সাড়ে 
ছ' টাকা পেল কল্লেশ। কোটের পকেটে পয়সা রেখে, ধূতি, সার্ট, কোট সব হাতে নিয়ে, 
ভিজে জাঙিয়া পরেই বাড়ির দিকে চলল সে। 

অনেকদিন পরে ভাইয়া এসেছে, দিন দুই তো নিশ্চয় থাকবে । একট্র ভাল খাবার- 
দাবার করতে হবে ভাবল নন্জু। সেওই তৈরীর জন্য জিনিসপন্্র নিয়ে এল সে। দুপুরের 
আহারের পর শুয়েছিল কল্লেশ, উঠে বসে বলল, “ও সব আবার কি আনতে গেলি £, 

“কাল একটু সেওই করব, তুমি ভালবাস তো! 

“আমি থাকছি না। আজই সন্ধ্যায় ফিরব।' 

“সে আবার কি £ এই তো এলে, এখনি যাবে কেন £ থেকে যাওনা দুদিন £ 

না না, খুব দরকারী কাজ আছে। তোকে একবার দেখতে এলাম শুধু। একটু 
কফি করে দে ব্যাস, তাহলেই হবে ।” 

রামন্নাকে দোকানে পাঠিয়ে ছ" পয়সার কফির গুঁড়ো আনিয়ে, গুড় দিয়ে কাঁসার ঘটি 
ভরে কফি তৈরী করে দিল নন্জ। সেটা খেয়েই বেরিয়ে পড়ল কল্লেশ। ততক্ষণে 
সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বেশ অন্ধকার । বাপের মত কল্লেশেরও অন্ধকারে ভয়-ডর নেই। 

সে চলে যাবার একটু পরেই এল সবক্কা, বলল, “নন্জশ্মা শোন, চোলেশ্বরের টিলার 
কাছে নাকি এরমধ্যেই সোনার রঙের পলাশ পাতা গজিয়েছে। মন্দিরের মহাদেবায়াজী 
হবিনহল্লীতে ভিক্ষায় গিয়ে দেখে এসেছেন, লোকে বিশ্বাস করবে না ভেবে পাতা তুলেও 
এনেছেন, আমি দেখেছি ।” 

“এখনও তো মাঘ মাসও শেষ হয়নি সবক্কা £, 

“এ বছর অথাণ মাসে রূম্টি হল নাঃ তাতেই বোধ হয় এত শীগ্গীর নতুন পাতা 
বেরিয়েছে । চল, কালই যাওয়া যাক।” 

যদি আবার বর্ষাও তাড়াতাড়ি নামে তাহলে পাতাগুলো খারাপ হয়ে যাবে, নতুন নতুনই 
তুলে নেওয়া ভাল, এই ভেবে রাজি হয়ে গেল নন্জম্মা। পরদিন অন্ধকার থাকতে তৈরী 
হতে বলে বাড়ি ফিরে গেল সবক্ধা। সে প্রথম দিন যাবে বলে উৎসাহটা বেশী । রাতে 
ঘুমই হল না তার। কোন রকমে রাত কাটিয়ে, কাক পক্ষী ডাকার আগেই রুটির পুটলি 
নিয়ে, ঘোমটায় মুখ ঢেকে নন্জম্মার বাড়িতে এসে হাজির । নন্জম্মাও তৈরী হয়ে 
বেরিয়ে পড়ল। বাইরে এখনও কিন্তু চাঁদের আলো রয়েছে। নন্জম্মার ভয় হল বোধ- 
হয় এত জ্যোৎস্না দেখেই কাক ডেকে উচেছে, ভোর হয়নি এখনও আসলে । কিন্তু সবক্কা 
তাড়া দিল, “না না, এরপর রোদ উঠে গেলে মুশকিল হবে, তাড়াতাড়ি চল।” অগত্যা 
চলতে শুর করল নন্জম্মা। দুজনে গ্রামের সীমা প্রায় পেরিয়ে এসেছে, এমন সময় 
দেখতে পেল ঝাঁকড়া গাছটার পাশে নরসীর বাড়ির দরজাটা হঠাৎ খুলে গেল, একটি 
লোক “নিশ্চয়, নিশ্চয়” বলতে বলতে বেরিয়ে এল এবং এদেরই সামনের পথ ধরে দ্রুত 
পদক্ষেপে এগিয়ে চলল। নরসীর বাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে গেল আবার। 

চিনতে এক মুহ্তও দেরী হল না নন্জশ্মার, লোকটি আর কেউ নয়, কল্লেশ। 
মাথায় ঘোমটা এবং পিগের ওপর থলি থাকায় কল্লেশ চিনতে পারল না যে স্ত্রীলোক 


১২৮ গৃহভ 


দুটির মধ্যে একজন তারই বোন নন্জু। এরা কে তাই নিয়ে চিন্তা না করে সে খুব 
জোর কদমে হেটে এগিয়ে গেল। নন্জ একটু আস্তে হেটে ইচ্ছে করেই পিছিয়ে পড়ল 
কিন্তু সবক্কাকে বলল না কিছু । সামনের লোকটি দুষ্টির আড়ালে চলে যেতেই প্রশ্ন করল 
সবন্ধা “ওটি আপনার বড় ভাই নাঃ 

“কে জানে কে!” 

হ্যা, হ্যা, সেই হবে। শুনেছি দশ-বারো দিন পরে পরে একবার করে আসে । রাতের 
আঁধারে এসে তোকে আর ভোরে মোরগ ডাকার আগেই চলে যায় । নরসী নিজেই তো একথা 
সবাইকার কাছে বলে বেড়ায় ।? 

কোন উত্তর দেয় না নন্জশ্মা। মুখ বুঝে এমনভাবে হাঁটতে থাকে যেন এতসব 
কথা তার কানেই ঢোকে নি। 


বম অধ্র্যাম় 


একটা জায়গায় কেউ যদি অনেকদিন ধরে থেকে যায় তাহলে সাধারণত তার নাম করেই 
জায়গাটার উল্লেখ করা হয়ে থাকে । হনুমান মন্দিরেরও এই অবস্থা হয়েছে। সেখানে 
অন্নাজোইসের নিত্যপূজোর অধিকার যদিও অক্ষুণ্ন আছে, কিন্তু লোকে আজকাল ও জায়গাটাকে 
গঙ্গশ্মার বাড়ি” বলতে শুরু করেছে। 

গজম্মা আর অপ্পন্নায়া হামেশাই এদিক-ওদিকের গ্রামগ্ডলোতে যাতায়াত করে। আগে 
প্যাটেল শিবেগৌড়ের নাম রামসন্দ্রের তিন মাইল পরিধির বাইরে বিশেষ কেউ জানত না, 
কিন্তু এখন গজম্মাদের কল্যাণে আশে-পাশে বিশ মাইল দৃরের গ্রামেও সে বেশ সুপরিচিত 
ব্ক্তি। মা আর ছেলে গ্রামে গ্রামে ঘুরে কাঁদুনি গেয়ে বেড়ায়। এ পাপী রাঁড়ের ব্যাটা 
আমাদের ঠকিয়ে সমস্ত সম্পত্তি হাতিয়ে নিয়েছে, দয়া করে কিছু সাহায্য কর গো।” এই 
সব বলতে বলতে নিজের লাল শাড়ীর আঁচল পেতে বসে পড়ে গজশ্মা গৃহস্থের উঠোনে । 
লোকে কুলোয় করে এনে তার আঁচলে ঢেলে দেয় মড়ূয়া, বরবটি, লঙ্কা ইত্যাদি। আঁচলে 
বেধে উঠে পড়ে গঙ্গম্মা সেখান থেকে । বেশ কিছু রসদ সংগৃহীত হলে অপ্পন্নায়া বস্তায় 
ভরে মাথায় চাপিয়ে সেগুলো নিয়ে আসে বাড়িতে । ভিক্ষা অবশ্য মহাদেবায়াজীও করেন, 
কিন্তু সে অন্য রকম ব্যাপার। তিনি বন্ধনহীন বৈরাগী মানুষ। গেরুয়া পরনে, মাথায় গেরুয়া 
পাগড়ি, কপালে বিভূতিমাখা সন্গ্যাসী, লোকের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে একবার শুধু বলেন, 
“ভিক্ষা, গুরু রেবন্নাজীর শিক্ষা।, এক মুঠো মড়য়া হয়ত পড়ে তাঁর ঝুলিতে । কিন্তু 
গশমা প্রতিটি বাড়িতে বসে বসে নিজের ইতিহাস শোনায় এবং অভিসম্পাত দিতে থাকে 
শিবেগৌড়ের পরিবারকে । যা হোক কিছু তো পাওয়া যায়ই, আর যারা কিছু দেয় না, তাদের 
গঙ্গশ্মা শাপমন্যি দিয়ে চলে আসে। 

গঞ্ম্মার বাড়িতেও একটা সিন্দুক আছে, সেটাতে মড়য়া ভরা। দু”বস্তা বরবটির 
ডাল এবং একটা বড় হাঁড়ি ভতি লঙ্কাও আছে। শিবেগৌড় বেঁচে আছে বটে, কিন্তু আমিও 
তো মরিনি।” এই বলে নিজের ধর্ম-কর্মের বড়াই করে গঙ্গম্মা। 

ইতিমধ্যে হঠাৎ একদিন দুপুরবেলা দু'খানা গরুর গাড়ি এসে দাঁড়াল হনুমান মন্দিরের 
সামনে । একটা গাড়ির চালক তেলী শিঙ্গরেট্রী, অন্যটায় মিস্ত্রী মুক্ধন্না। গাড়ি দুটোয় 
বাসন-কোসন, বিছানা-মাদ্বর ইত্যাদি ঘর-সংসারের যাবতীয় জিনিস ঠাসা। গাড়িতে 
এসেছে বছর পঞ্চাশ বয়সের একটি বিধবা মহিলা, বছর পঁচিশের এক ষুবতী, সাত বছরের 
একটি মেয়ে ও চার বছরের ছোট্ট একটি ছেলে। এদের আসতে দেখেই অপপন্নায়া চোরের 
মত চুপি চুপি মন্দিরের পেছন দিকের ঘাস বনের মধ্যে দিয়ে কেটে পড়ল। মুকম্না গাড়ি 


৯ 


২১৩০ গহভজ 


থেকে নেমে বলে উঠল, “এইটেই গঙ্গম্মাজীর বাড়ি'। জিনিসপত্র নামাতে শুরু করল 
সে। মহিলা একটু সঙ্কৃচিতভাবেই ভিতরে এল, গঙ্গম্মা চিনতে পারছে না এদের। ব্দ্ধা 
এবার বলল, “আমরা নুগ্গীকেরে থেকে আসছি । আমার স্বামী মারা গেছেন দু'বছর হয়ে 
গেল। সাতু তার ছেলেমেয়ে নিয়ে এখন এখানেই থাকতে চায়, তাই ওদের নিয়ে এলাম ।' 

মিনিট দুই লাগল গঙ্গম্মার সমস্ত ব্যাপারটা বুঝতে । ইতিমধ্যে বাচ্চাদের হাত ধরে 
সাতুও ভিতরে এসেছে। মুহ্তে অনেক. কিছু ভেবে ফেলল গঙ্গম্মা, বলে উঠল, হ্যারে 
ছেনাল, এ মেয়েটা তো তার বাপেরই বুঝলাম, এখানে থাকতেই তুই পোয়াতি হয়েছিলি। 
তা এই ছেলেটা কার শুনি? পাটোয়ারী রামন্নার কুলে কালি দিলি শেষ পর্যন্ত? দাঁড়া, 
দেখাচ্ছি মজা তোকে! কোণায় রাখা আবর্জনার টুকরীটা তুলে নিল সে। 

তার বেয়ান ঠাকরুণ বলে উঠলেন, “এ সব যা তা কথা বলছেন কেন? আপনার 
ছেলে তো আসত আমাদের গ্রামে, তাকে ডেকে জিজক্তাসা করুন না। আমার মেয়ের 
স্বভাবে কোন দোষ নেই। নামকরণের সময় তো খবর দিয়ে চিঠি লিখেছিলাম, কেউ 
এলেন না কেন£ কিন্তু এ সব কথা কানেই ঢুকল না গঙ্গম্মার। 

মন্দির থেকে বেরিয়ে এল সাতু। বাচ্চারা ভয়ে ভয়ে মায়ের আঁচল চেপে ধরে দীঁড়িয়ে 
আছে। সাতুর মা বেরিয়ে আসতে আসতে বললেন, “বাপরে বাপ, এমন মেয়েমানুষ জন্মে 
দেখিনি, খুব শিক্ষা হল যাহোক । সাতু বলল, “ও"'র সঙ্গে দেখা না করে আমি যাব না। 
আমার বড় জা এখানেই আলাদা থাকে, এখনকার মত তার বাড়িতে চল।” মা রাজি 
হলেন। ম্কম্না আর শিঙ্গরেট্রী গাড়ি দুটো নিয়ে এল এবার নন্জশ্মার বাড়ির সামনে, 
সেখানেই নামিয়ে দিল জিনিসপন্র। এদের আগমনের কারণ জানতে চাইল না নন্জশ্মা, 
সাতুর মায়ের লাল শাড়ী দেখেই সে বুঝল সাতুর বাবা মারা গেছেন। আহা, হয়ত অনেক 
কম্ট পেয়েছে এরা! খাওয়া দাওয়া করুক আগে, তারপর সব খবর নিলেই হবে। 
সবাইকে আদর করে ভিতরে নিয়ে এল সে। ছেলেটিকে দেখে তারও একট্র আশ্চর্য 
লাগছিল, কিন্ত কোন রকম গোলমাল থাকলে একে নিয়ে আসার সাহস নিশ্চয় হত না 
সাতুর! সাতু কাঁদতে শুরু করেছে। তার মা তঙ্ম্মা বললেন, “অপ্পন্বায়া দ্র বার এসে 
পনেরদিন করে থেকে গেছে, তারপর তো এই রামকুষ্ণ জন্মাল। গ্র বজ্জাত মাগী, রাস্তা 
থেকেও যাতে লোকে শুনতে পায় এমন করে চেচিয়ে চেচিয়ে আমার মেয়ের স্বভাব-চরিক্র 
নিয়ে খোটা দিল!, 

“আপনারা কাপড়-চোপড় বদলে নিন। কতদিন হল উনি মারা গেছেন £' 

পু বছর হল। তিনি যতদিন ছিলেন, পুরোহিতের কাজ করতেন, কোন অভাবই 
ছিল না। এখন আমরা অনাথ, কে দেখবে আমাদের £ স্বামীর কাছেই স্ত্রীর থাকার 
কথা। অপ্পন্নায়া যখন এসেছিল, বলেওছিল এদের নিয়ে আসবে । সে তো আর গেল 
না, তাই আমাদেরই আসতে হল। তিপটুর থেকে বাসে এসেছি। এই দুটো গাড়ি 
গোবরের সার নিয়ে খেতে গিয়েছিল, সেখান থেকে চার-চার আনায় ভাড়া নিলাম জিনিস- 
প্র গুলো বয়ে আনার জন্য।, 

“সাতু, বাচ্চাদের জামা-কাপড় বদলে নাও, ওদের খিদে পেয়েছে নিশ্চয় নন্জম্মার 


গৃহভঙ্গ ১৩১ 


মুখের কথা শেষ হতে না হতে গম্মার তীন্ষ কন্ঠের চিৎকার শোনা গেল, 'এ ছেনালকে 
জুতোপেটা করে মাথা মুড়িয়ে গাঁছাড়া করব, না করি তো আমার নাম গঙ্গম্মা নয়। 
এ বাড়িতে ঢুকেই আবার শুরু করল, “তুইও ওর দলে নাম লেখাবি না কি রে ছেনাল, 
ওকে যে ঘরে বড় জায়গা দিয়েছিস? তোকেও উচিত শিক্ষা দিয়ে তবে ছাড়ব।” গজম্মার 
পেছন পেছন এসে ঢুকলেন অহইয়াশাস্ত্রী এবং অন্নাজোইস | মিনিটখানেকের মধ্যেই এসে 
গেল শিবেগোড় ও শিবলিজে, দশ গুনতে না গনতে তাদের পেছনে রেবন্নাশেনট্রী, তার জঙ্গে 
সঙ্গে আরো বেশ ক'জন কৌতুহলী দর্শক, মনে হচ্ছে যেন এ বাড়ির উঠোনে ভালুক নাচের 
তামাশা হচ্ছে বুঝি। বেশ বোঝা গেল গঙ্গম্মাই এদের সব ডেকে এনেছে। 

তেলেবেগুনে ভ্রলে উঠল নন্জম্মা। একবার ইচ্ছা হল জিক্তাসা করে, “কেন এসেছেন 
আপনারা, কে আসতে বলেছে এখানে £ কিন্তু গ্রামের এইসব প্রধান ব্যক্তিদের শন্র 
করে তোলাটা উচিত হবে না। তবে কাউকেই সে ভিতরে এসে বসতে আহবানও জানাল 
না এবং মাদুর বিছিয়ে আপ্যায়নও করল না। এতক্ষণে চেন্নিগরায়ের ঘুম ভেঙেছে, সে 
এসে দু'খানা মাদুর বিছিয়ে দিল। দুই পুরোহিতের জন্য আলাদা আসন। জাতু, দুই 
বাচ্চা এবং তঙ্গম্মা তখন রান্নন্নাঘরে আশ্রয় নিয়েছে। 

গঙ্ম্মা চিৎকার করল, “পালাচ্ছিস কোথায়? ছেনাল, রাঁড় কোথাকার, এদিকে আয় 
পঞ্চায়েতের সামনে । 

ধর্মের প্রতিনিধি রেবন্নাশেট্রী হাঁক দিল, “ন্যায়বিচার হবে, ন্যায়বিচার! সামনে 
চলে এস বোন।” রেবন্নাশেট্রী এখানে এসে ধর্মাত্মা সেজে ন্যায়বিচারের জন্য আস্ফালন 
করছে, এটা একেবারে অসহ্য মনে হল নন্জম্মার, কিন্তু এদের তাড়াবে কি করে সে? 
একটা উপায় আছে! ঠিক এই সময় শ্লেট-বই নিয়ে স্কল থেকে ফিরল পার্বতী আর 
রামন্না। নন্জম্মা তাদের বলল, “দৌড়ে যা দেখি, মন্দির থেকে মহাদেবায়াজীকে আর 
তোদের মাস্টারমশাইকে ডেকে নিয়ে আয়, বলবি এখনি আসেন যেন, একটুও দেরী 
না করেন।” দুই ছেলেমেয়ে ছুটে চলে যায়। 

নন্জম্মার দিকে তাকিয়ে রেবন্নাশেট্ী বলে ওঠে, “কেন আমরা কি ন্যায়বিচার করতে 
পারি না নাকি? উত্তর না দিয়ে ঘরে ঢুকে গেল নন্জশ্মা। গঙ্গম্মা ব্যঙ্গ করে বলে 
ওঠে, “উকিলনী, ঘরে গিয়ে ঢুকলেন যে বড় £ নন্জম্মা কিন্তু বাইরে এল না। 

অইয়াশাস্ত্রীজী এবং অন্নাজোইস এবার প্রস্তুত হলেন তাঁদের শাম্ত্রঙ্তানের পরিচয় 
দিতে। অন্নাজোইস একটা মন্ত্র আউড়ে ফেলল। মনু-ধর্মশাস্থে লিখেছে, ব্যভিচারিণীর 
মস্তকচ্ছেদ করাই বিধেয়। বেদে বলা হয়েছে, হাজার আসরফি ব্যয় করে প্রায়শ্চিত্ত 
করা উচিত। প্রায়শ্চিত্ের পূর্বে একে গৃহে প্রবেশ করতে দিয়ে নন্জম্মাও অন্যায় করেছে, 
বিজ্ের মত মন্তব্য করলেন অইয়াশাস্ত্রী। 

ইতিমধ্যে মহাদেবায়াজীও এসে গেলেন। গঙ্গম্মা তো সারা গ্রামে ট্যাটরা পিটতে পিটতে 
এসেছে, সুতরাং গ্রামসুদ্ধ লোক তামাশা দেখতে হাজির, যেন মেলা বসেছে । তাদের 
ভিড় ঠেলে পথ করে ভিতরে এলেন মহাদেবায়াজী। ব্যাপারটা তাঁকে বুঝিয়ে বলার 
দরকার ছিল না। তাঁকে দেখে এবার নন্জম্মা বাইরে এসে বলল, “অইয়াজী আপনি 


১৩২ গৃহতঙ্গ 


খা 


ধর্ম জানেন, ন্যায়বিচারের জন্য যা প্রম্ন করার আপনিই করুন। সবাই মিলে যেন কথা 
বলতে না আসে। ও ভিতরে বসে আছে, ঈশ্বরের নামে শপথ করে এখনও বলছে, 
অপ্পন্নায়া ওখানে গিয়েছিল, সেই এই সন্তানের জন্মদাতা ।” 

ব্যাপারটা বুঝতে দেরী হল না মহাদেবায়াজীর। তিনি বললেন, “আগে অপ্পন্নায়াকে ডাক, 
তারপর বিচার হবে।” গজম্মা চেচিয়ে উঠল, “আমার বাছার কোন দোষ নেই, তেমন 
মায়ের ছেলে নয় সে। 

“দোষ আছে কিনা সেইটেই তো খোজ নিতে হবে। স্বামী যদি স্ত্রীর কাছে যায় তাতে 
কোন দোষ হয় না" । এইভাবে গঙ্গম্মাকে শান্ত করে মহাদেবায়াজী দরজার বাইরে সমবেত 
জনতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, যেখান থেকে হোক, অপ্পন্নায়াকে আগে ডেকে আন।” 
দশ-বারোজন দৌড়ল এদিক-ওদিকে। পুরোহিতদ্য় এরমধ্যে আবার শাম্্রচচা আরক্ত 
করার চেষ্টায় ছিলেন, কিন্তু মহাদেবায়াজী এক কথায় সবাইকার মুখ বন্ধ করে দিয়ে 
বললেন, “অপ্পন্নায়া না এসে পৌছন পর্যন্ত কোন কথা হবে না”। 

মিনিট পনের পর অপ্পন্নায়াকে এনে হাজির করা হল। শোনা গেল, সে বসপ্পাশেট্রীর 
খড়ের গাদায় লুকিয়ে বসেছিল। সবাইকার চোখ এড়িয়ে পালাবার তালে ছিল, কিন্তু 
অনুসন্ধানকারীদের মধ্যে দু'জন দেখতে পেয়ে গ্রেপ্তার করে এনেছে । টিকিটা খুলে তার 
চুলগুলো ঝুলছে মুখের চারপাশে । মহাদেবায়াজী ওকে প্রথমটা কিছু জিজ্তাসা না করে 
নন্জশ্মাকে বললেন ঘরের মধ্যে ঠাকুরের ছবি রেখে তার সামনে প্রদীপ ভ্বেলে দিতে । 
নন্জম্মা ঘরে একটি আসন পেতে সেখানে শ্রীরামচন্দ্রের ছবি রেখে দীপ ত্বালল। এবার 
সিঁদ্ুরের কৌটোটা চাইলেন মহাদেবায়াজী। কৌটো খুলে অপ্পন্নায়ার কপালে একটি ফোটা 
দিয়ে, তাকে শ্রীভগবানের ছবি স্পর্শ করিয়ে বললেন, “দেখ বাপু, মিথ্যা বললে ভগবান 
তোমার হাত-পা নষ্ট করে দেবেন, দেবীর কোপে তোমার বিনাশ হবে। সত্যি কথা বল 
দেখি, মাকে লুকিয়ে তুমি শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিলে কিনা £ 

অপ্পনায়া চুপ করে রইল। “আমার বাছাকে এমন জোর-জবরদত্তি করে মিথ্যে 
কথা বলিয্ে নিচ্ছ কেন বল তোঠ চেঁচিয়ে উঠল গঙ্শ্মা। সে কথায় কান না দিয়ে 
মহাদেবায়াজী বললেন, “উত্তর দিতেই হবে। সত্য কথা না বললে তোমার হাতে-পায়ে 
পক্ষাঘাত হবে। এ যে প্রদীপের আগুন দেখছ, এ আগুন ধু ধু করে ত্বলে উঠে তোমায় 
ভস্ম করে ফেলবে। শনি ঠাকুরের কথা জান তো£ রাজা বিক্ষের হাত-পা কিভাবে 
কাটা পড়েছিল£ নাও মুখ খোল এবার । 

বেশ ভয় পেয়ে গেছে অপ্পনায়া। নায়িশিঙ্গি গ্রামের দেবীদাসজী শনিমাহাত্ম্-বিষয়ক 
যক্ষগান মঞ্চস্থ করিয়েছিলেন, তাতে পা-কাটা যাওয়া বিকুমের বিলাপের দৃশ্য মনে পড়ে 
গেল তার। এই সময় মহাদেবায়াজী আবার বললেন, “মিথ্যা উচ্চারণ করলেই শনিদেব 
-1 তার কথা শেষ হবার আগেই অপ্পন্নায়া বলে উঠল, “আমি মিথ্যা বলছি না, 
দু'বার আমি নুগ্গীকেরে গিয়েছিলাম । 

“কতদিন করে থেকেছিলে 2, 

“একবার পনেরদিন, অন্যবারের কথা মনে নেই? 


গৃহভঙ্গ ২১৩৩ 


“শেষবার কবে গিয়েছিলে £ 

“এর আগের বার যখন প্লেগের মড়ক লেগেছিল সেই'সময় ।" 

অর্থাৎ প্রায় ছ'বছর আগে। নন্জশ্মা এবার ভিতর থেকে সাতুর ছেলেটির হাত 
ধরে বাইরে এনে দাঁড় করিয়ে দিল। ছেলেটির বয়স বছর পাঁচেক, মুখের চেহারায় 
অপ্পন্নায়ার সঙ্গে সাদৃশ্য অত্যন্ত স্পঙ্ট। 

“হারামজাদা জাবগল্ল যাবার নাম করে তুই এই করতে গিয়েছিলি £ যা তবে ওখানেই 
থাক গিয়ে, আমি আর তোর খোরাক জোগাতে পারব না। রাঁড়ের ব্যাটা কোথাকার £ 
বলেই সেখান থেকে চলে যায় গঙ্গম্মা। তামাশাটা বড় চট করে শেষ হয়ে গেল। এখানে 
আর বসে থেকে কোন লাভ নেই দেখে দুই পুরোহিত উঠে পড়লেন, অন্য সবাইও সভা ভঙ্গ 
করে চলে গেল। 


ই 

সেই দিনই গঙ্গশ্মা ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে অন্য গ্রামের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল। এরকম ওরা 
প্রায়ই যায়, এটা কিছু নতুন কথা নয়। মন্দিরের দরজার অন্য চাবিটা থাকে অন্নাজোইসের 
কাছে, কাজেই তাদের অনুপস্থিতিতেও অন্নাজোইস চাবি খুলে মন্দিরে পূজো করতে ঢোকে । 

সাতু আর তার দুই ছেলেমেয়ে নন্জম্মার কাছেই থেকে গেল। এদের জন্য মষ্টয়া 
এবং বরবটি নন্জন্মার ঘরে যথেস্ট আছে, কিন্তু মুশকিল হল মড়ূয়ার রুটি আর বরবটির 
ডাল সাতুর বাচ্চাদের পেটে সহ্য হয় না। এদিকে প্রত্যহ ভাত এবং অড়হর ডাল রাঁধবার 
মত সঙ্গতি নেই নন্জম্মার। বিশেষ কোন পৃজাপার্বনের দিন সে মোটাচালের ভাত রাঁধে 
আর এলাকাদার বা এঁ জাতীয় কোন সরকারী কর্মচারী এলে তবেই বাড়িতে মিহি সাদা 
চালের ভাত, অড়হর ডাল ইত্যাদি রান্না হয়। এর বেশী কিছু করা তার ক্ষমতার বাইরে । 
কিন্তু উপায় কি£ অগত্যা হাসিমুখেই নন্জু আজকাল রোজই ভাত ও অড়হর ভাল 
রাঁধছে। ভাত দেখলে তার নিজের ছেলেমেয়েরাও নেচে ওঠে, চেন্িগরায়ের তো কথাই 
নেই। এতগুলি লোকের জন্য রোজ ভাত বাঁধতে গিয়ে মনজুর পক্ষে সংসারের খরচ 
চালানো কমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। 

দিন পনের পর শোনা গেল মাতা, পুত্র গ্রামে ফিরেছেন। সন্ধ্যার পর একটা প্রদীপ 
ভেলে সে পার্বতীকে বলল, “যা দেখি, চুপি চুপি তোর কাকাকে ডেকে নিয়ে আয়, ঠাকুমা 
যেন টের না পায়।” পার্বতীও ব্যাপার বুঝে চুপচাপ অপ্পনায়াকে সঙ্গে করে নিয়ে এল। 
এ বাড়িতে এসে স্ত্রীকে দেখে অপ্পন্নায়ার ভালও লাগল আবার ভয়ও হল মনে। লজ্জিত 
ভাবে একটা থামে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। নন্জশ্মা তাকে বসতে দিয়ে কথা 
বলতে লাগল। সাতু রান্না ঘরে রান্নায় ব্যস্ত। 


"আজ এখানেই খেয়ে যাও, অগ্পনায়া । 
“কিন্ত মা *--।” 


১৩৪ গৃহভঙ 


“মা কিছু বলবেন না, রাতের ফলাহারে উনি তোমার রুটি খেয়ে নেবেন এখন। 
ওঠো মুখ হাত ধুয়ে নাও।” চেন্নিগরায়ও উঠে পড়ল। বাচ্চাদের বসিয়ে দিয়ে নন্জম্মা 
সাতুকে বলল পরিবেশন করতে । “থাক, আর চাইনা" এটুকু বলতেও সঙ্কোচ বোধ করছে 
অপ্পন্নায়ার। সাতুরও লঙ্জা করছে, সেই জঙ্গে নিজেকে সকলের কপার পান্র ভেবে 
অপমানিতও বোধ করছে সে। নন্জম্মা আর তঙ্গম্মা রয়েছে উঠোনে । খেয়ে উঠে 
দুই ভাই পান নিল। নন্জম্মা এবার ঘরের মধ্যে এসে সাতুকে চুপি চুপি কিছু বলে, 
বিধবা তজম্মাও এসে যোগ দেয় এই আলোচনায় । 

ধান-চাল ইত্যাদি জমা করে রাখার জন্য একটা ছোট ঘর আছে এ বাড়িতে, সে ঘরটা 
পরিস্কার করে সেখানে মাদুর পাতে নন্জন্মা, সাতু সেখানে একটা বিছানা পেতে দেয়। 
অস্পন্নায়া বাড়ি যাবার জন্য উঠতেই নন্জশ্মা বলে ওঠে, 'আজ এখানেই থেকে যাও না? 

এই অপ্রত্যাশিত প্রস্তাবে অগপন্নায়া বেশ খুশি হয়ে ওঠে, কিন্তু ভয় করছে যে? 
অন্যমনস্কভাবে বলে ওঠে, কিন্তু, মা --*”  নন্জ বলে, “না হয় পার্বতী আর রামন্নাকে 
মার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি, যদি একা থাকতে ভয় করে তাঁর। তুমি এ ছোট ঘরটায় 
গিয়ে শুয়ে পড়।” এদিকে চেন্নিগরায় স্ত্রীকে বকতে শুরু করে, “তার এসব ব্যাপারে 
এত মাথাব্যাথা কেন শুনি স্বামীকে তার পরিকল্পনায় বাগড়া দিতে দেখে চটে গিয়ে 
নন্জও এবার চোখ রাঙিয়ে বলে, “চুপচাপ মুখ বুজে থাক দেখি। তিরুমল গৌড়জীর 
বাড়ি থেকে প্রসাদী দুধ এসেছে, তাই দিয়ে পায়েস হচ্ছে, খাবে কি খাবে না বলে দাও ।, 
পায়েসের নাম শুনেই আর কথাটি না বলে চেমিগরায় রান্নাঘরে ঢোকে । অগ্পন্নায়া ঢুকে 
পড়ে ছোট কৃঠরীটার মধ্যে। নন্জু এবার রান্নাঘরে গিয়ে স্বামীকে বলে ওঠে, "পায়েস 
হয়ে গেলে আমি ডাকব, ততক্ষণ আর একবার তামাক খাও গে যাও” স্বামীকে কোনমতে 
বাড়ি থেকে বাইরে পাঠিয়ে, সাতুকে পাঠায় অপ্পন্নায়ার ঘরে, তারপর দরজাটা বাইরে 
থেকে শিকল তুলে দেয়। 

পায়েসের নাম করে তো এখনকার মত কাজ উদ্ধার হল, কিন্তু এখন পায়েস তৈরী 
করার মত গরু বা মোষের দুধ পাওয়া যায় কোথায় £ বৃদ্ধি খাটিয়ে নন্জম্মা তাড়াতাড়ি 
বাচ্চাদের আগে শুইয়ে দিল। তারপর একটা নারকেল ভেঙে, কিছু চাল ও নারকেল 
একসঙ্গে পিষে, দু ভেলি গুড় মিশিয়ে, ওপর থেকে সামান্য একট্রু দুধ ঢেলে বানিয়ে ফেলল 
পায়েস। তঙ্গম্মাকে বলল এবার চেনিগরায়কে ডেকে দিতে । পাটোয়ারীজী তখনও না 
ঘুমিয়ে বসেছিলেন পায়েসের আশায়। ডাক শুনে ভিতরে এসে বসে পড়তেই, গায়েসের 
হাঁড়ি আর এল্যুমিনিয়মের থালা সামনে দিয়ে নন্জম্মা বলল, নিজে তুলে নিয়ে খেয়ে 
নাও। ওদের মোষটা আজ পনের দিন হল বিইয়েছে, তা দুধটা ফাটেনি, ভালই হয়েছে পায়েস।, 

চেন্নিগরায় এক হাতা পায়েস তুলে থালায় নিয়ে চাখল, চমৎকার হয়েছে। নন্জম্মা 
বলল, “তাহলে নিজেই নিয়ে খেয়ে নাও। আমি যাচ্ছি, কাজ আছে। আহারে ব্যস্ত 
চেনিগরায়ের তখন “হু” বলবার মতও অবসর নেই। 

সকালে উঠে পুকুরধার থেকে ঘুরে এসেই অগ্পন্ায়া মন্দিরে চলে গেল। মাকে 
গিয়ে বলল, “ওদের এখানেই নিয়ে আসি, মা? 


গৃহভঙজ ৩৫ 


কাদের £ 

“ওই নুগ্গীকেরের ওদের ॥, 

গজম্মা তো অবাক। একটু পরেই ব্যাপার বুঝে ফেলল সে। “ওরে রাঁড়ের ব্যাটা, 
আমি ভাবলুম বৃঝি দাবলাপুরে যক্ষগান দেখতে গেছিস। তুই গিয়ে এ খারাপ মেয়েটার 
সঙ্গে শুয়েছিস ? 

অপ্পন্ায়া দাঁড়িয়ে আছে নতমস্তকে। কিছুক্ষণ অবিশ্রান্ত গালিবর্ণের পর গঙ্গম্মা 
প্রশ্ন করে, “সেই লক্ষমীছাড়িই বলেছে বুঝি এখানে নিয়ে আসার কথা £ 

সাহস সঞ্চয় করে আগ্পন্নায়া বলে, “সে আর কি বলবে, আমিই বলেছি। ওখানে 
ফেলে রাখার কি দরকার? নিয়েই আসব ।, 

“ওরে হারামজাদা, তুই কি তাকে এখানে নিয়ে আসবি বলে কথা দিয়ে এসেছিস 
নাকি £ দাঁড়া, অন্নাজোইসজীকে বলে তোকে দেখাচ্ছি মজা ।” বিন্দুমান্র দেরী না করে 
গজম্মা অন্নাজোইসের বাড়িতে গিয়ে ডাক দেয়, জাইসজী একটু শুনে যান তো।, 

গঙ্গশ্মার গলা শুনেই দু চারজন লোক জমে গেছে। জোইস বাইরে আসতেই গঙ্গম্মা 
বলে, কাল সেই ব্যভিচারিণী মেয়েমানুষের সঙ্গে রাত কাটিয়ে এসেছে, আজ বলছে তাকে 
মন্দিরে নিয়ে আসবে । আপনিই বলুন, স্বামী-স্ত্রী কি মন্দিরে একন্র বাস করতে পারে £ 

“হনুমানজী নিজেই ব্রহ্মচারী, তাঁর মন্দিরে স্বামী-স্ত্রীর একন্রে বাস ধর্ম-নিষিদ্ধ। 
ওর বুদ্ধিদ্রংশ হয়েছে। এ কাজ যদি করে আমি তোমাদের সবশ্দ্ধ মন্দির থেকে দূর 
করে দেব। এরকম পাপ ঘটলে এ গ্রামে হবে অনারম্টি আর দুর্ভিক্ষ ।” অন্নাজোইস 
মন্দিরে গিয়ে অগ্পন্ায়াকে শাসিয়ে দিয়ে এল। এবার অপ্পন্নায়ার মুখ শুকিয়ে গেল। 
কিন্ত কাল রাতের সুখস্মৃতিও মনকে উতলা করে তুলছে, শ্রীকে ছেড়ে থাকার চিন্তাও 
অসহ্য লাগছে এখন। বহু কম্টে নিজেকে একটু শান্ত করে বৌদিদির কাছে গিয়ে 
সব ব্যাপার খুলে বলল অপ্পন্নায়া। কিন্তু পেছন পেছন গ্রঙ্গম্মাও এসে হাজির। 
দরজার কাছ থেকেই চেম্নিগরায় ও নন্জম্মার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করছে। 
চেন্নিগরায় তখনও শুয়ে শুয়ে রান্রের পায়েসের জাবর কাটছিল, উঠে বসল এবার। হয়ত 
বৌকে ধমক দিতে শুরু করত, কিন্তু পুকুরে যাবার তাড়া থাকায় উপস্থিত কিছু না বলেই 
দৌড়ল। গঙ্গশ্মা ভাবল বড় ছেলেও বুঝি তার বিরুদ্ধে। সে আর সময় নষ্ট না করে 
বাড়ি ফিরে এল । 


১, 


অপ্পন্নায়া বৌদির বাড়িতেই থেকে গেল সে দিনটা । এই দু তিন দিনে সে মনে মনে 
সিদ্ধান্ত করে ফেলেছে স্ত্রী এবং সন্তানদের নিয়ে আলাদা থাকবে । শাশুড়ীকেও তাদের 
সংসারেই রাখতে হবে। এতদিন ধরে মায়ের সঙ্গে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে যথেস্ট 
অভিজ্ঞতা হয়েছে, ভিক্ষা করেই সে সংসার প্রতিপালন করতে পারবে এ বিষয়ে যথেস্ট 
আত্মবিশ্বাস আছে তার। শুধু একটা আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা দরকার । 


১৩৬ গৃহভঙ্গ 


হনুমান মন্দির থেকে মানত তিরিশ গজ দুরেই ক্রুবরহল্লীর গুণেগৌড়জীর একটা 
বাগান পড়ে আছে, সে বাগানটা কারোই কোন কাজে লাগে না। নন্জম্মা একদিন 
অপ্পন্নায়াকে নিয়ে গুশেগোড়জীর কাছে গিয়ে কথাবার্তা বলে সব ব্যবস্থা করে ফেলল । 
অপ্পন্নায়া যদি নিজে খরচ-পন্র করে সেখানে ঘর তুলে নেয় তাহলে গুগেগৌড়জীর তাকে 
থাকতে দিতে কোন আপত্তি নেই একথা জানিয়ে দিলেন তিনি। অপ্পন্নায়া চেন্নিগরায়ের 
মত অলস নয়। কেউ পথ বাতলে দিলে পরিশ্রম করার মত শক্তি তার যথেষ্ট আছে। 
বহুদিন পরে স্ত্রীকে কাছে পেয়ে দেহে মনে বেশ উৎসাহের জোয়ার নেমেছে তার। নন্জম্মা 
হয়েছে দিশারী। সাতু তার একসেরী রূপার পঞ্চ পান্রটা বিকী করে পঁচিশ টাকা এনে 
দিল স্বামীর হাতে । তাই দিয়ে অপ্পন্নায়া চটপট বাঁশ, মাটি, পাথরের পিলপে ইত্যাদি 
কিনে নিয়ে, নিজেই মাপজোক করে দেখতে দেখতে কোমর পর্যন্ত উচু দেওয়াল তুলে 
ফেলল। পাথরের পিলপেগুলো পুতে তার সঙ্গে বাঁধল বাঁশ আর কাঠের বক্লা। পাঁচ- 
জনের কাছে চেয়েচিন্তে খড় আর নারকেল পাতা দিয়ে ঘরের ছাদ ছাওয়া হয়ে গেল। 
তিন টাকা মজুরী দিয়ে ছিটকিনী সমেত একটা কাঠের দরজাও করানো হল ছুতোরকে 
দিয়ে। তারপর এক শুভদিনে “দুধ উথলানো” অনুষ্ঠান সেরে নতুন বাড়িতে সপরিবারে 
গৃহপ্রবেশ করল অপ্পন্নায়া। এতদিন পর্যন্ত নন্জম্মার কাছেই খাওয়া-দাওয়া চলছিল 
এদের। 

এবার জীবিকার চেস্টায় লাগতে হবে। মাকে ছেড়ে একাই গ্রামে গ্রামে ঘুরতে শুরু 
করল অপ্পনায়া। সর্বব্রই আগের মত শিবেগৌড়কে দোষারোপ করে কিছু ভিক্ষা চাইত। 
ঠিক, দরজায় ঝুলি পেতে দাঁড়ানো ভিক্ষুক তো নয় সে, কাজেই অন্ততঃ আধসেরের কম 
কেউই দিত না। এরই মধ্যে দ্বিতীয় ফসলের মরশুম এসে গেল এবং অপ্পন্নায়াকে দেখা 
যেতে লাগল কৃষকদের খেতের ধারে । রাশিপূজার সময় আগন্তককে কিছু দান করলে 
নাকি ধন রদ্ধি হয়, সুতরাং সময়মত পৌছলে অপ্পন্নায়া পেয়ে যেত এক কলোভরা শস্যের 
দানা। মাঝে মাঝে আবার কারো খেতের পাশে অতরকিতে দেখা হয়ে যায় মা এবং 
ছেলের। কেউ কারো সঙ্গে কথা বলে না, এমন ভাণ করে, যেন দেখতেই পায় নি। 
এদিকে লোকে বিদ্রপ করে বলে, “দেখানো হচ্ছে যে দুজনে আলাদা হয়ে গেছে, কিন্ত 
আমরা তাই বলে দুবার করে দেব কেন? কেউ কেউ অবশ্য কোন কথা না শুনিয়ে 
দুজনকেই দেয় কিছু কিছু। 

অন্য গ্রামে ভিক্ষায় বেরিয়েও মাঝে মাঝে এ রকম পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। আগে 
যে সব বাড়িতে মা ও ছেলে একসঙ্গে যেত এখন সেখানে দুজনে যায় আলাদা আলাদা । 
কিছু দিনের মধ্যেই অনেকে বলতে শুরু করল, “এমনভাবে দুজনকে আলাদা করে বার 
বার কোথা থেকে দেব আমরা £& গঙ্গম্মা তাই প্রাণপণে চেস্টা করে যাতে সে অপ্পন্নায়ার 
চেয়ে আগে আগে প্রত্যেকবার পরিকুমাটা সেরে ফেলতে পারে। যদিও তার তো মান্র 
একটা পেট, খরচ অনেক কম। এত মড়ূয়া, বরবটি আর লঙ্কা তাঁর ভাঁড়ারে জমে গেছে 
যে এখন তিন বছর বসে খেলেও বোধহয় ফরোবে না। ওদিকে অপ্পন্নায়াকে পাঁচজনের 
মত অনসংস্থান করতে হয়, তার মধ্যে আবার একটি বিধবা । তাছাড়া ব্বদ্ধা গগম্মা 


গৃহভজ ১৩৭ 


ভিক্ষা চাইলে লোকের দয়া হয়, কিন্তু একজন শক্ত সমর্থ পুরুষ ভিক্ষা চেয়ে বেড়ালে 
অনেক সময়েই লোকে শুনিয়ে দেয় মখের ওপর, “তা হাত-পা কি পড়ে গেছে নাকি £ 
মুটেগিরি করলেও তো রোজগার হয় £ 

বৌকে কাছে পেয়ে প্রথম কিছুদিন অপ্পন্নায়ার মনে বড় স্ফূর্তি ছিল, কিন্তু কিছুদিনের 
মধ্যেই উৎসাহে ভাটা পড়ে এল। সারাদিন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে দরজায় দরজায় 
নানা রকম মিঠে কড়া বুলি শুনতে আর ভাল লাগে না। আগে ভিক্ষা চাওয়াটা ছিল মায়ের 
কাজ, লাল শাড়ীর আঁচল পেতে সে সংগ্রহ করে আনত, তারপর সবটা একসঙ্গে বস্তায় 
ভরে বাড়ি পর্যন্ত বয়ে আনার কাজটাই শুধু করতে হত অপ্পন্নায়াকে। এখন নিজেকে 
মুখ ফটে চাইতেও হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে ক্যাটকেটে কথাও শুনতে হয়, মনটা তেতো হয়ে 
ওঠে। 

নন্জম্মা এল একদিন এ বাড়িতে । অপপন্নায়া তখন তিক্ষায় বেরিয়েছে। এদিক- 
ওদিক দু-চার কথার পর নন্জম্মা বলল, “জয়লক্ষমী তো পার্বতীর চেয়ে বেশী ছোট নয়, 
ওকে আর রামক্ষণকেও স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া উচিত। ছেলেপেলের অক্ষরপরিচয় 
না হলে মানুষ হবে কি করে।, 

হ্যা, তাতো বটেই।' 

“আর একটা কথাও বলতে এলাম আমি” তঙ্গশ্মাকে বলে সে, “আপনারা নাকি মড়ুয়া 
যা পাওয়া যায় সব বেচে দেন£ এই দ্বিতীয় ফসলের পর কিছুদিন লোকে একটু-আধটু 
ধান দেবে কিন্ত জ্যৈষ্ঠ-আধাট়ের পর কেউ আর একদানাও ধান ঘরের বার করবে না। 
এখন যদি সমস্ত ধান খরচ করে ফেলেন, পরে খুব অসুবিধায় পড়তে হবে। সন্নেনহল্লীর 
থেকে দু একটা বড় মাটির জালা আনিয়ে কিছু ধান জমিয়ে রাখুন ।” 

বিধবা তঙ্গম্মা জবাব দিল, “এর পোড়ার মড়য়া রেখে করবটা কি? কেউ তো খাবে 
না ওসব ূ 

নন্জম্মা জানে এদের মড়য়া হজম হয় না, কিন্তু শুধু ভাত খায় এমন লোক এ 
গ্রাম কটা আছেঃ আস্তে আস্তে অভ্যাস করে নেওয়া উচিত। জমিদার তো নয় যে 
ভাত খেয়েই জীবন কাটাতে পারবে সব! নন্জম্মার মনে হল, কয়েকটা ব্যাপারেই 
এদের একটু সুপরামর্শ দেওয়া দরকার। এদের নিয়মিত কফি পানের অভ্যাস আছে, 
কড়ুরের অধিবাসীদের নাকি বাল্যকাল থেকেই এ অভ্যাস হয়ে যায়। সাতু যখন প্রথম 
শ্বশুর বাড়ি এসেছিল শাশুড়ীর ভয়ে কিছু বলতে পারত না। আজকাল অবশ্য এই রামসন্দ্র 
গ্রামও কফির প্রচলন হয়েছে । তা ধনীরা না হয় খেতে পারে কিন্তু অগ্পনায়ার এই 
পাঁচজন সদস্যের সংসারে দিনে দুবার কফির পাট চললে খরচে কুলোবে কি করে? 

এর অভ্যাসটা যদি ছাড়তে পারেন অনেক সাশ্রয় হবে আপনাদের ।” 

«ও বাবা, কফি তো আমি ছাড়তে পারব না” বলে উঠল তঙ্গম্মা, “সকালে উঠে খালি 
পেটে কখনও থাকা যায় £ তোমরা তো দিব্যি শুকনো রুটি খেয়ে নাও, আমাদের ওরকম 
খাওয়া কখনও অভ্যাস নেই তো, 

এ নিয়ে আর কথা বাড়াল না নন্জম্মা। 


১৩৮ গৃহত্ 


সেদিন সাতু বড় জায়ের বাড়ি এসেছে বেড়াতে । নন্জম্মা তখন দ্রুত হাতে কাঠি 
ভেঙে ভেঙে দু মিনিটে একটা করে পাতা তৈরী করে করে গোছা করে রাখছে । “উঃ 
কত কাজ তুমি করতে পার দিদি! সংসারের পাট সেরে, পাটোয়ারীর খাতা লেখ, 
তারপর আবার পলাশপাতা তুলে এনে এই এত এত পাতা বানিয়ে ফেলছ। আমি তো 
জন্মেও এত কাজ করতে পারব না” বলে উঠল সাতু। 

নন্জম্মা বলল, “দেখ, কিছুদিন থেকেই ভাবছি একটা কথা তোদের বলব, কিন্তু 
যদি আবার কিছু মনে করিস, তাই বলিনি এতদিন ।, 

“কি কথা দিদি, বল নাঃ, 

“তোদের সংসারে খেতে পাঁচটি মুখ। রোজগার তো মোটে একজনের । তাও এভাবে 
ভিক্ষা করেই কি সারাজীবন চলবে £ নিজেদের কিছু কাজ কর্ম তো করা উচিত। 
উপার্জন করার অভ্যাস থাকলে এই পরিবারের আজ এই দশা হবেই বা কেনঃ তা 
বাড়িতে তোরা দুটি স্ত্রীলোক আছিস, তোরাও তো কিছু করতে পারিস£ বাড়ির কাজ 
সেরেও সারাদিন অন্ততঃ তিনশ-পাতা সহজেই তৈরী করা যায়। বাজারে এখন একশ 
পাতার বাণ্ডিলের দাম সাত-আনা। শুনি নাকি তিপট্ুর থেকে লরী বোঝাই হয়ে বাঙ্গালোর 
পর্যন্ত যায়। যদি মাসে তিরিশ টাকা রোজগার করতে পারিস কত সুবিধা হবে বলতো £ 

“রোজ রোজ পলাশপাতা নিয়ে কাজ করলে শরীর গরম হবে না 

“অভ্যাস হয়ে গেলে কিছুই হবে না। তাছাড়া গরম হলেও রান্রে শোবার আগে দুই 
হাতের তালুতে একটু রেড়ির তেল মেখে নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।, 

সুতরাং সাতুও এবার মন স্থির করে ফেলল সেও পাতা তৈরী করা শুরু করবে। 
পরের দিনই বড় জায়ের বাড়িতে এসে ঘসে গেল তার সঙ্গে। নন্জশ্মা দেখতে দেখতে 
শ*্খানেক পাতা বানিয়ে ফেলেছে, আর এতক্ষণে সাতুর হয়েছে মান্র আঠারটা। উৎসাহ 
দিয়ে নন্জম্মমা বলে, 'একট্রু অভ্যাস হয়ে গেলেই দেখবি কত তাড়াতাড়ি হাত চলবে ।' 
কিন্তু পরের দিনই সাতুর হাত-পা জ্বালা করতে লাগল, তাই দেখে তঙ্গম্মা বোঝাল মেয়েকে, 
ছেলেমেয়েদের ভরণ-পোষণ করা স্বামীরই কতব্য, তোর এ সব পাতা-টাতা বানাতে যেতে 
হবে না আর।' ব্যস, হয়ে গেল ওর পাতা তৈরী শেখার দফা শেষ। ইতিমধ্যেই দেখা 
গেল সে সন্তান-সম্ভবা, বমি ইত্যাদি উপসর্গ শুরু হয়ে গেল তার। 

সাতুর বাবা ছিলেন পুরোহিত শ্যামভন্র, এরা পুরোন পুরোহিত বংশ, কাজেই পবিভ্রতা, 
অপবিভ্রতা, আচার-বিচার ইত্যাদি নিয়ে তঙ্গম্মার শুচিতার একটু বাড়াবাড়ি ছিল। এদিকে 
গঙ্গম্মার বাড়িতে কোন কালেই কেউ এসব ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাত না, নন্জমশ্মাও 
পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার নিয়মগুলো মেনে চলত কিন্তু আচার-বিচার নিয়ে বাড়াবাড়ি সে 
করত না। সে হাঁড়িতে করেই ডাল রাঁধে, মাটির পান্রে ভাত রাধে কারণ পিতলের 
হাঁড়ির চেয়ে মাটির হাঁড়ি বেশী ঠাণ্ডা থাকে । তা চাষাভূষোর ঘরে না হয় এসব চলতে 
পারে, তাই বলে সদ্ত্রাক্ষণের ঘরে এমন অনাচার করলে চলে কখনো? নন্জম্মার 
ছেলেপেলেরা তো যখন তখন মহাদেবায়াজীর দেওয়া খাবার খায়। মহাদেবায়াজী স্বজাতের 
বাড়ি থেকে ভিক্ষান্ন নিয়ে এলে বিশ্ব তো তাঁর কোলে বসেই খেয়ে আসে কতদিন। 


গৃহভঙ্গ ১৩৯ 


নন্জম্মা এসব জানতে পারলেও ছেলেমেয়েদের শাসন করে না, এটা তঙ্জম্মার মোটেই 
ভাল লাগে না। সাতুরও বিশেষ পছন্দ নয় এ সব ব্যাপার। 

57287275517 
পরায়ণা মহিলা । অন্নাজোইসের স্ত্রী মাসিক খতুর সময় নিজেকে একেবারে সরিয়ে রাখে 
স্বামীর দৃষ্টিপথ থেকে । এদিকে নন্জশ্মা নাকি এ দিনগুলিতেও লুকিয়ে লুকিয়ে বাড়ির 
রান্নাবান্না সবই করে। অন্নাজোইসের স্ত্রী বেঙ্কটলক্ষমী তঙ্গশ্মাকে বলেছেন এ কথা। 
বাইর কেউ জিক্তাসা করলে দে বলে পার্বতী রেঁধেছে' কিন্তু সেটা বাজে কথা । এই 
খবরটা শুনে পর্যন্ত তঙ্গ্মা স্থির করে ফেলেছেন, জীবনে আর কখনো নন্জম্মার বাড়িতে 
আহার করবেন না। নিচু জাতের বাড়ির মেয়েরা খতুর প্রথম দিনেই স্লান করে রামাঘরে 
ঢুকে কাজকর্ম শুরু করে দেয় বটে, কিন্তু ব্রাহ্মণের ঘরেও যদি সেই ব্যাপার চলতে থাকে 
তবে আর ছোট জাতের সঙ্গে তফাৎ রইল কোথায় ছিঃ ছিঃ থুঃ। 

একদিন সাতু ও তঙ্গশমা গেছে অন্নাজোইসের বাড়িতে বেড়াতে । সেখানে জোইসজী 
তাদের মনে একটা খটকা ধরিয়ে দিলেন, "পতৃক সম্পত্তিতে দুই ভ্রাতার সমান অধিকার, 
ঠিক কি না? তা এদের সম্প্তিতো সবই বেহাত হয়ে গেছে। পাটোয়ারীগিরির যা 
কিছু উপার্জন তা তো ভোগ করছে একা চেন্লিগরায়। অপগ্পন্নয়া কিছুই পাচ্ছে না এটা 
তো অন্যায়। বর্ষাসনের পাওনাটা দুই ভাইয়ের মধ্যে ভাগ হওয়া উচিত। সরকারী 
আইনেই বলে একথা । এভাবে আর কতদিন ওরা ঠকাবে £ 

সচকিত হয়ে ওঠে তঙ্গম্মা। তাই বল! আমাদের ন্যায্য পাওনা সগ্বন্ধে কখনো 
উচ্চবাচ্যও করে না, আর এদিকে কথায় কথায় আসে উপদেশ দিতে! বড় জায়ের প্রতি 
ঈর্ষা আর বিদ্বেষে সাতুও মনে মনে ত্বলে ওঠে । এবার অন্নাজোইস পরামর্শ দেয়, “অপ্পন্ায়া 
আর তুমি আগে বলে দেখ, যদি রাজি না হয় তখন তিপটুরে গিয়ে আমলাদারের পায়ে 
পড়লেই হবে, তিনি ঠিক পাইয়ে দেবেন” 

সেদিন সন্ধ্যায় অপ্মন্নায়া ফিরতেই সাতু তাকে জানাল সমস্ত কথা, বলল, “আমাদেরও 
তো ছেলেপেলে রয়েছে। পৈতৃক অধিকারের লাভের ভাগ তো আমাদেরও পাওয়া উচিত। 
বর্ষধাসন পাওয়া যায় একশ কড়ি টাকা, তারমধ্যে ষাট টাকা নিশ্চয় আমাদের প্রাপ্য। 
তাছাড়া দস্ভ্ররীও পাওয়া যায়, তারও ভাগ চাই। 

অগ্পন্নায়া কিছুই জানে না। তবে সে শুনেছিল পাটোয়ারীর কাজ, প্যাটেলের কাজ 
এসব উত্তরাধিকার সূত্রে বড়ছেলেই পেয়ে থাকে । সরকারী আইন-কানুন কিছুই তো জানা নেই, 
অন্নাজোইস নিশ্চয় ভাল করেই সব জানে এই ভেবে সে রান্রেই চলে গেল জোইসকে সব 
জিড্তাসা করতে । অন্নাজোইস পরিষ্কার বুঝিয়ে দিলেন, “বড়-ছোট দুই ভাইয়েরই সমান 
ভাগ পাওয়া উচিত, ওরা এতদিন ধরে তোমাকে ঠকিয়ে সব কিছু ভোগ করছে। এবার 
ক্ষেপে উঠল অপ্পন্ায়া, ছুটে এল বড় ভাইয়ের বাড়িতে। চেন্নিগরায় বাড়িতে নেই। 
প্রদীপের আলোয় বসে নন্জম্মা ছেলেমেয়েকে গড়াচ্ছে । সোজা তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে 
ঘোষণা করল, “ধোকাবাজি আর চলবে না, বর্ষাসনের অর্ধেক অংশ আমি চাই।” 

এ কথার মানে বুঝতে না পেরে নন্জশ্মমা প্রশ্ন করল, “কিসের বর্ষাসন £ কিসের 


১৪০ গহভঙগ 


কথা বলছ 

“পাটোয়ারীণিরির। খালি চিনৈয়া নয়, আমিও আমার বাপের ছেলে । অর্ধেক অংশ 
না পেলে সোজা আমলাদারের কাছে যাব, বুঝলে £ বড় ভাই হয়ত মহাদেবায়াজীর মন্দিরেই 
আছে, কথাটা মনে হতেই অপ্পন্নায়া সেদিকে চলল মনে মনে গজরাতে গজরাতে, “আমিও 
বাপের ব্যাটা, বর্যাসনের অর্ধেক কেন পাব নাঃ আমি গাঁয়ে গায়ে ভিক্ষে করে বেড়াৰ 
আর উনি বর্ষাসস হজম করে মজা লুটবেন, বারে!” চিন্তাটা বেশ স্বরবেই করছিল সে 
যাতে আশে-পাশের লোক শুনতে পায়। 

অপ্পন্নায়া যে মহাদেবায়াজীর মন্দিরে গেছে তা বুঝতে পারেনি নন্জম্মা। তাই 
ব্যাপারটা বোঝার জন্য সে অপ্পন্নায়ার বাড়িতেই এল। অপ্পন্নায়া তখন নেই সেখানে । 
সাতুকেই বলল সে, “এখনি অগ্পন্নায়া এসেছিল, “বর্ধাসনের অর্ধেক ভাগ চাই” আরো কি সব 
বলে গেল। তা ব্যাপারটা কি? 

সাতু বলে উঠল, “দুই ভাইয়ের সমান ভাগ পাওয়াই তো উচিত। ইনি না হয় এতদিন 
জানতেন না, কিন্তু তোমাদের কি নিজে থেকেই অর্ধেক ভাগ দেওয়া উচিত ছিল নাঃ 
এ যুগে কাউকে বিশ্বাস করলেই ঠকতে হয় !, 

“সরকারী আইনে এ কথা বলে না। কে উল্টোপাল্টা বুঝিয়েছে তোমাদের £ বর্ষাসন 
একশ বিশ টাকা আসে বটে, কিন্তু তার জন্য খরচও আছে তা জান তো? খাতার কাগজ, 
কালি এসব খরচ আছে। রাত জেগে কত কষ্ট করে লাইন টেনে টেনে খাতা-ভরা 
হিসেব লিখতে হয়। না বৃঝে-সুঝে অপ্পন্নায়া সবাইকে শুনিয়ে চেচামেচি করছে, এটা 
কি ঠিক হচ্ছে? 

“কি এত হিসেব লেখার আছে? ও আমিও লিখতে পারি। না মরলে কি আর 
স্বগ নাগালের মধ্যে আঙে £ 

আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই বুঝে বাড়ি ফিরে এল নন্জম্মা। চেন্নিগরায় মন্দিরে 
ছিল না। বাঁধের ওপরের পথ দিয়ে বাড়িতে ফিরে সন্ধ্যা পূজায় বসেছিল। ছেলেমেয়েরা 
আলোর কাছে বসে পড়ছে। সন্ধ্যাপুজোয় ব্যাঘাত না করে নন্জম্মা রান্না ঘরে ঢুকল। 
ঝাঁট দিয়ে, থালা সাজিয়ে ঠাক্রের সামনে প্রদীপ স্বেলে প্রদক্ষিণ করে হাতজোড় করল 
সে। অপ্পন্নায়াকে সে ভাল করেই চেনে, কিন্তু সাতুর ব্যবহারে আজ সে অবাক হয়ে 
গেছে। “স্বামীকে সেই বুঝিয়েছে, কিন্তু তাকে কে কৃপরামর্শ দিল£ যেই হোক, তার 
কথা শুনে সাতুর কি এমনভাবে বদলে যাওয়া উচিত£ এ যুগে সত্যিই কি কারো উপকার 
করতে নেই£ নুন খেয়ে কেউ মনে রাখে নাঠ এই সব ভাবতে ভাবতে স্তব্ধ হয়ে 
বসে রইল সে। 

বাইরে হঠাৎ অপ্পন্নায়ার সাড়া পাওয়া গেল। মনে হল যেন আরো আট দশজন 
লোক রয়েছে তার সঙ্গে। তাদের পেছন থেকে গঙ্গশ্মা ঠাকরুণের কন্ঠস্বরও শোনা 
যাচ্ছে। নন্জম্মা বাইরে এসে দেখে, অন্নাজোইস অহইয়াশাস্ত্রী, রেবন্নাশেট্রী, তেলীশিঙ্গা, 
তৃতপূর্ব পাটোয়ারী শিবলিঙ্গে ইত্যাদি, অর্থাৎ সমস্ত পঞ্চায়েত এসে হাজির হয়েছে। কিন্তু 
প্যাটেল শিবেগোড়কে দেখা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে চেন্নিগরায় সন্ধ্যাপুজো শেষ করে উঠে 


গৃহভঙ্গ ১৪১ 


পঞ্চপান্রটা রান্নাঘরে রেখে গায়ে চাদর জড়াচ্ছে। এইসময় নন্জশ্মা বাইরে আঙসতেই 
চিৎকার শুরু করল গঙ্জশ্মা, “অন্য জায়গায় জমি থাকলে ঠাকুমা পর্যন্ত জমির ভাগ পায়। 
সেই পৃণ্যাত্মা, এই দুই ছেলের জন্ম দিয়েছেন, কিন্তু এটাও তো মিথ্যে নয় যে তিনিই আমার 
গলাতেও মঙ্গলসন্র পরিয়েছিলেন £ বর্ধাসনের মধ্যে আমারও ভাগ আছে, ঠিক কিনা 
রেবন্নাশেন্টী তুমিই বল £ 

রেবন্নাশেট্রী বলল, “শিবলিঙ্গে এককালে পাটোয়ারীর কাজ করেছে, এসব ক্ষেত্রে আইনে 
কি বলে তা ওর নিশ্চয় জানা আছে, ওকেই বসানো হোক ন্যায়পীঠে।” 

মহা উৎসাহে উঠে গিয়ে থামের পাশে বসে পড়ল শিবলিঙ্গে, তারপর প্রশ্ন করল “চিনৈয়া 
তোমার কি বলবার আছে £ চেন্নিগরায় ব্যাপারটা বুঝেছে এতক্ষণে, কিন্তু এ ক্ষেত্রে কি 
বলা উচিত ঠিক করতে পারছে না। সে স্ত্রীকে দেখিয়ে দিয়ে ওকে জিজ্ঞাসা কর” বলেই 
বসে পড়ল। একদুষ্টে নন্জম্মার দিকে চেয়ে রেবন্নাশেট্রী বলল, “বেশ কথা, যা বলবার 
তুমিই বল বোন। একটু পরে আবার অভয় দিতে চেস্টা করল, “ভয় পাবার কিছু নেই।, 

ততক্ষণে সাতু আর তঙ্গশ্মাও এসে দরজার বাইরে দাঁড়িয়েছে । খুব রাগ হয়ে গেল 
নন্জম্মার। জোর গলায় সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল সে, “কে আপনাদের এখানে 
ডেকে এনেছে? অন্যের বাড়ির সব ব্যাপারে নাক গলাতে ছুটে আসেন কেন£ নিজেদের 
সংসারের অবস্থাগুলো একটু চোখ মেলে দেখুন, যাতে মান সন্ফ্রম নিয়ে গ্রামে বাস করতে 
পারেন। যদি সবাই নিজে থেকে ভালয় ভালয় না বেরিয়ে যান তো কারো সঙ্গে খাতির রাখব না 
আমি, তা বলে দিচ্ছি। 

এ রকম চোটপাট কথাবার্তা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। তেলী শিঙ্গা, গুরুবয়া প্রমুখ কিছু 
কিছু লোক ঠিক করে জানেই না আসল ঘটনাটা কি। পঞ্চায়েত বসাতে হবে, চলে এসো, 
বলে অপ্পনায়া রাস্তা থেকে এদের ধরে এনেছে এবং এরাও সুড়-সুড় করে চলে এসেছে । 
এখন ব্যাপার শুনে সবাই বলাবলি করতে লাগল, “সারা গ্রামের পাটোয়ারী হিসেব এদের 
কাছে আছে, শুধু শুধু এদের সঙ্গে শত্রুতা করে কি দরকার একে একে সবাই কেটে 
পড়তে শুরু করল। নন্জম্মা দ্বিতীয়বার হুমকি দেবার পর শিবলিঙ্গে এবং রেবন্নাশেট্টীও 
আর দাঁড়াল না সেখানে । নন্জশ্মা এবার প্রশ্ন করল, “কোন ঘর ভাঙানে তোমাকে এই 
পরামর্শ দিল বলত অপ্পন্নায়া £ কোন জবাব দিল না অপ্পন্নায়া, কিন্তু অন্নাজোইস বলে 
উঠল, “যাই, সন্ধ্যাপূজোর সময় হয়ে গেছে । এ সব হল নিজের নিজের ঘরের কথা, 
অপ্পন্নায়াটার কবে যে বৃদ্ধিশুদ্ধি হবে! মানা করলুম, তবু গাঁসুদ্ধ লোক ডেকে জড়ো করলে !, 
অন্নাজোইসের পেছন পেছন গায়ের চাদরটা ঠিক করতে করতে অহয়াশাস্ত্রীও অদৃশ্য হলেন। 

“পাটোয়ারী অধিকার চিরকাল বড় ছেলেই পায়, চাও তো তিপটুরে গিয়ে জেনে এস* 
নন্জম্মার মুখে এইট্ুক্‌ শুনেই নিঃশব্দে উঠে পড়ল অপ্পন্নায়া। গজম্মা কিন্তু যেতে 
যেতেও কথা শোনাতে ছাড়ল না, “কি মুখের তেজ লক্ষমীছাড়ীর, সারা গাঁসুদ্দধ লোককে 
অপমান করে বসল! যাক, যা খুশি বলুক, আমার ভাগ আমি কিছুতেই ছাড়ছি না বাপু ***। 

খেতে বসেও এ নিয়ে কোন মন্তব্ই করল না চেনিগরায়। নন্জম্মা যখন বলল, 
“দেখলে একবার ওদের কাগুটা £ তখনও “বলুক-গে যা খুশি” বলে এমন একটা ভাব 


১৪২ গ্হভঙ 


সি 


দেখাল যেন সমস্ত ঘটনাটার সঙ্গে তার কোন সম্বন্ধই নেই। দুপুরের তৈরী তাজা সবুজ 
পাতায় পর্বতপ্রমাণ আহার করে উঠে পড়ল দসে। নন্জশ্মা কিন্তু ভাল করে ঘুমোতে 
পারল না সে রান্ত্রে। সাতুর এই ভাব পরিবর্তন তাকে খুবই ব্যথা দিয়েছে । সেই সঙ্গেই 
মনের কোণে আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে, সত্যিই যদি ভাগ দিতে হয়, কি উপায় হবে তাহলে £ 
অনেক রান্রে তার মনে হল, “ঠিক তো! দাবরসায়াজীকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেই হয়।” 

ভোর হতে না হতেই স্বামীকে ডেকে তুলল নন্জম্মা, কিন্তু চেনিগরায় চাদরের নিচে 
থেকেই গজ গজ করে উঠল, “আমি ওসব পারব না, যেতে হয়, তুই যা। অগত্যা 
রামন্না আর পাবতীকেই ডেকে তুলে মুখ, হাত ধুইয়ে একটু ছাতু মেখে খাইয়ে, ওদের 
নিয়েই বেরিয়ে পড়ল সে। 

দাবরসায়াজী খুব বুড়ো হয়ে পড়েছেন, শরীর আজকাল প্রায়ই ভাল থাকে না, তাই 
শীতের সময় বেলা করে ওঠেন। স্যোদয়ের সময় হঠাৎ নন্জম্মাকে দেখে খুব আশ্চর্য 
হয়ে গেলেন তিনি। প্রায় বছর দুই সে এদিকে আসেনি । কিন্তু একথা ভেবেই তাঁর 
তুপ্তি হত যে, আজকাল তার মানে নন্জম্মা নিজেই পাটোয়ারীর হিসেব লেখার কাজ 
সম্পূর্ণভাবে সামলাতে পারে। আজ ওদের আসার উদ্দেশ্য শুনে তিনি অভয় দিয়ে বললেন, 
“কোন চিন্তা নেই, আমি খুব ভালভাবেই জানি, এ অধিকার কেবল জ্যেষ্ঠ পুন্রেরই প্রাপ্য। 
ঠিক মহারাজের সিংহাসনের মতন। রাজ্য কখনো দুই ভাইয়ের মধ্যে ভাগ হয় £ 

নন্জম্মা আর ছেলেমেয়েরা স্নান সেরে নিল, তাদের জল খাবার খাওয়ার পর দাবর- 
সাম়্াজী বললেন, “কম্ধনকেরে তো এখান থেকে দূর নয়, মান্র তিন মাইল, তুমি যাও না, 
গিয়ে একেবারে খোদ এলাকাদারকেই জিজ্তাসা করে এস, তাহলে আর মনে কোন সংশয় 
থাকবে না। 

ওদের পথ দেখাবার জন্য দাবরসায়াজী সঙ্গে একটি লোকও দিয়ে দিলেন। দুই 
ছেলেমেয়েকে নিয়ে নন্জম্মা জোর কদমে হাঁটতে শুরু করল তালুকের প্রধান জায়গা 
কম্বনকেরের উদ্দেশ্যে। এলাকাদার তার পূর্ব-পরিচিত, রামসন্দ্র এলে ওদের বাড়িতেই 
অতিথি হন তিনি। ডাল, ভাত, চাটনী, পঞ্চব্যঞ্জন রেধে নন্জম্মা তাঁকে অনেকবার 
থাইয়েছে। মানুষটির স্বভাব ভাল, নন্জম্মাকে সর্বদা “বোন, বলে সম্বোধন করেন। 
তাই এর সঙ্গে দেখা করতে নন্জম্মার মনে কোন দ্বিধা ছিল না। এদের দেখে তিনি 
নিজেই আগে থেকে বলে উঠলেন, “কি ব্যাপার বোন, পাটোয়ারীর বর্ধাসনে ছোট ভাইয়ের 
অংশ আছে কিনা তাই জানতে এসেছ তো? 

নন্জম্মা তো একেবারে অবাক। তাকে আশ্চর্য হয়ে চেয়ে থাকতে দেখে এলাকাদার 
এবার ব্যাখ্যা করে বলেন, এই তো, এখনও আধ ঘন্টাও হয়নি বোধহয়, তোমার দেওর 
অপ্পন্নায়া আর তার স্ত্রী এসেছিল এখানে । আমার সামনে ভয়ে তাদের তো মুখ দিয়ে 
কথাই বেরোয় না, দরজার বাইরে দাঁড়িয়েছিল জোড় হাতে । অন্নাজোইসজী আর শিব- 
লিজেগৌড়ই ওদের হয়ে কথাবার্তা বললেন। আমি চারজনকেই আচ্ছা করে শুনিয়ে 
দিয়েছি। আপনার কোন চিন্তা নেই বোন, সবাই জানে এ কাজের অধিকার পায় শুধু জ্যে্ঠ 
পুত্র। এই সামান্য কথা জিক্তাসা করতে কম্ট করে এতটা পথ হেটে এলেন কেন শুধু শুধু 


গুহভজ ১৪৩ 


এতক্ষণে দুশ্চিন্তা কাটল নন্জশ্মার। “এই রোদে এসেছেন, চলুন বাড়ির ভিতরে? 
এলাকাদার ওদের আপ্যায়ন করে নিজের স্ত্রীকে নির্দেশ দিলেন সকলের আহারের ব্যবস্থা 
করতে । বিকেলে রোদ পড়লে তবে ওদের যেতে দিলেন। সধবা মানুষ বাড়িতে এসেছে 
বলে নন্জম্মাকে দেওয়া হল পান আর একটি চোলীর (ব্লাউজ) কাপড় এবং বাচ্চাদের 
হাতে দেওয়া হল গুড় ও নারকেল। 

সোজা এলেও কম্বনকেরে থেকে রামসন্দ্র পাঁচ মাইল। বাচ্চাদের এবার পা ব্যথা 
করছে, আর হাঁটতে চাইছে না ওরা। কিন্তু এলাকাদারের আশ্বাসে নন্জম্মার মন খুশিতে 
ভরা, তাই সে দুই ছেলেমেয়ের হাত ধরে অনেক গল্প করে ভুলিয়ে ভালিয়ে পথটুক পার 
করে সন্ধ্যার আগেই ফিরে এল নিজেদের গ্রামে। 


৪ 


অপ্পন্ায়া স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা হয়ে যাবার পর থেকে আজকাল নিজেকে বড় একলা মনে 
হয় গঙ্গশ্মার। নিজের পেটের ছেলেরাই তাকে দূরে ঠেলে দিল এ চিন্তাটাও মনকে বেশ 
ব্যথিত করে। এ যেন তার মস্ত একটা পরাজয়, এটা কি করে চুপচাপ সহ্য করবে 
সেঃ মনে মনে সে ভেবে নিয়েছে, বড় বৌয়ের সাহায্য পেয়েই আলাদা বাড়িখানা এমন 
চটপট তৈরী করে ফেলল ছোটছেলে। 

শ্রী, সন্তান ও শাশুড়ীকে নিয়ে আলাদা হবার পর কেটে গেল প্রায় দেড় বছর। গ্রামে 
গ্রামে ঘুরে ভিক্ষা চেয়ে আর লোকের মুখনাড়া শুনে শুনে তিক্ত হয়ে উঠেছে অপ্পন্নায়ার 
মন। সেদিন সে গিয়েছিল কেঁচেগৌড় গ্রামের কল্লেগৌড়ের বাড়ি। গৌড় বাড়িতেই 
ছিল, কিন্তু ওকে দেখেও বসতে আসন দিল না। শেষ পর্যন্ত মাটিতেই বসে পড়ল 
অপ্পন্নায়া, তারপর কিছু মড়ুয়া চাইবামান্র গন করে উঠল গৌড়, “মাথা খারাপ নাকি £ 
এই তো একটু আগে তোমার মা এসে নিয়ে গেল, এরই মধ্যে আবার তুমি এসে হাজির? 
মড়য়্ার কি পয়সা লাগে না নাকি? খেতে দিচ্ছি, এসো আমার খেতে সারাদিন কাজ 
কর, যাবার সময় দু সের ধানও দেব।, 

চপ করে বসে রইল অপ্পন্নায়া। এবার গৌড় বলে উঠল, “ভালয় ভালয় বিদেয় 
হবে, না ঘাড় ধরে বের করে দেব? 

দারুণ কম্ট হল অগ্পন্নায়ার। গত দেড় বছর ধরে অনেক রকম কটু কথা তো 
শুনতেই হচ্ছে, কিন্তু ঘাড় ধরে বের করে দেবার কথা এ পযন্ত কেউ বলেনি। নিঃশব্দে 
নিজের ঝোলা আর টুকরী নিয়ে উঠে পড়ল সে। বাইরে এসে চোখের জল আর সামলাতে 
পারল না। চোখ মুছতে মুছতে কিছুদূর এগোতেই দেখা হল গঙ্গম্মার সঙ্গে, তার কোচড় 
ভরা মড়ূয়া। এতবড় ছেলের চোখে জল দেখে গঙশ্মারও হঠাৎ যেন বুকটা মোচড় 
দিয়ে উঠল, সে প্রশ্ন করল, “কি হয়েছে রে£ চোখে জল কেন তোর £ মায়ের গলা 
শুনেই অপ্পন্নায়ার কান্না আরো উচ্ছসিত হয়ে ওঠে । সব কথা বলে সে মাকেই সালিশ 
মানে, “বল তো, কল্লেগৌড়ের অমন কথা বলাটা কি উচিত হয়েছে 


১৪৪ গৃহভঙ্গ 


ছেলেকে ডেকে নিয়ে এসে নন্দীমন্দিরের বারাম্দদয় বসল গঙগশ্মা, বলল, “আয়, এখানে 
বসে একটু কথা বলি। সত্যিই তো আমরা মা, ব্যাটা দুজনেই ভিখ মেগে বেড়াই, লোকেই 
বাকি করবে! তা তুই এ বাড়িতে গেলি কেন? 

“না গেলে আমারই বা চলবে কি করে? 

“হা রে পোড়াকপাল আমার! আমার পেটে জন্মেছিস, এতদিন রাজপুত্বরের মত করে 
তোকে যত্র করেছি, কত দূর-দৃরান্তর থেকে ভিক্ষে করে এনে তোকে খাইয়েছি। আর 
এখন এ ছেনালগুলোর জন্যে তোর এত কম্ট। তুই সারাদিন ঘুরে ঘুরে মড়ূয়া যোগাড় 
করে নিয়ে যাস আর ওরা সেই মড়ুয়া বেচে সরু চালের ভাত আর ভাল ডালের সম্বর 
বানিয়ে খায় পেট ভরে। তার ওপর আবার কফি চাই। এ ছেনালের রং বেরং এর 
শাড়ির বাহার আর এই দেখ আমার অঙ্গে ছেঁড়া ন্যাকড়া। ওই বজ্জাত মেয়েমানুষ দুটো 
নিজেদের সুখ ছাড়া আর কিছুই বোঝে না।, 

মায়ের কথাগুলো খুব যুক্তিযুক্ত মনে হল অপ্পন্নায়ার। সত্যিই তো স্ত্রী, ছেলেমেয়ে 
আসার আগে তাকে কোনদিন ভিক্ষা করতে হয়নি। সে বেশ আরামে গ্রামের বাইরে 
বসে বসে তামাক খেত। মা বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করে ধান ও মড়ুয়া ইত্যাদি নিয়ে এলে 
সেগুলো বস্তায় ভরে বয়ে নিয়ে আসাই ছিল ওর একমাত্র কাজ। এইভাবে মাস তিনেক 
গ্রাম-গ্রামান্তরে ঘুরলেই মা আর ছেলের সারা বছরের খোরাক সংগৃহীত হয়ে যেত। 

“বৌটাকে না হয় খাওয়াচ্ছিস, কিন্তু বেহায়া এঁ শাশুড়ীমাগীও কি বলে বসে বসে 
তোর ঘাড়ে খাচ্ছে এতদিন £ মন্তব্য করে গঙম্মা। 

সেদিন আর কোন বাড়িতে ভিক্ষা চাইতে গেল না অপ্পন্নায়া। মা যা সংগ্রশহ্ন করেছিল 
সেইগুলোই বস্তায় ভরে মাথায় তুলে নিল। মোট বওয়া তার কাছে কিছুমাত্র কম্টসাধ্য 
নয়। পথে যেতে যেতে গঙম্মা বলে, “এ হতভাগা মহাদেবায়াটাইতো পেটের ছেলেকে 
আলাদা করে দিল মায়ের কোল থেকে। তোকে দিয়ে কি সব মিথ্যা কথা বলিয়ে নিল 
আর তুই ও-সব মেনে নিলি। ও গাঁয়ে তুই দু-একবার গিয়েছিস ঠিক কথা কিন্ত তুই 
জানলি কি করে যে ও বাচ্চা তোরই£ তুই যাবার আগেই যে সাতু পোয়াতি হয়নি 
তারই বা প্রমাণ কি? 

কোন উত্তর না দিয়ে চুপচাপ হাঁটছিল অপ্পন্নায়া। গ্রামের কাছাকাছি এসে গঙ্জম্মা 
বলল, “তুই চলে আয় আমার কাছে, আগে যেমন সুখে ছিলি তেমনি থাকবি আবার ।” 

ছেলে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে তার বাড়িতেই এল, এসে আর কিছু না করে শুয়ে ঘুমিয়ে 
পড়ল। গঙ্গম্মা তাড়াতাড়ি বরবটির ডাল ও গরম গরম মড়য়ার ডেলার লোন্দা বানিয়ে, 
রসুন দিয়ে চাটনী পিষে তারপর ডেকে তুলল ছেলেকে । খেতে বসে অপ্পন্নায়ার মনে 
হল যেন দেড় বছর আগেকার সেই স্বর্গসুথখ আবার ফিরে এসেছে । লোন্দা তো চিরকালই 
ওর প্রিয় খাদ্য, তার ওপর খোসা ছাড়ানো বরবটির ডালের মত ভাল জিনিষ আর কিছু 
আছে নাকি। বৌ আর শাশুড়ী তো একদিনও বাড়িতে মড়ুয়ার লোন্দা তৈরী করে না। 
আবার বলে বরবটির ভালে পেটে হাওয়া হয়। ওসব নাকি বাজে লোকেরাই খায়! 
“যত ছেনালের দল" মনে মনে তাদের মুণ্পাত করতে করতে আকন্ঠ ভোজন করে অপ্পন্নায়া। 


গৃহভঙজ ১৪৫ 


তারপর আর বৌয়ের বাড়ির দিকে গেলই না অপ্পন্ায়া, প্রথম দিন তো সাতু ভাবল, 
হয়ত দূর গ্রামে গিয়ে আটকে পড়েছে, কিন্তু তারপর খবর পাওয়া গেল স্বামী আবার মায়ের 
আঁচলের তলায় ফিরে গেছে। নিজে ডাকতে যেতে লজ্জা করল, তাই ছেলে রামকুষ্ণকে 
পাঠাল। কিন্তু ছেলে গিয়ে দেখে হনুমান মন্দিরে তালা ঝুলছে। পনের দিন মা আর 
ছেলে গ্রামে ফিরলই না। এদিকে ঘরে বিকী করার মত মড়ুয়া আর নেই, চালও শেষ 
হয়ে গেছে। কফি পাউডার বাড়তন্ত। জলাশয়ের ওপারে গুড় তৈরীর সময় জয়লক্ষমী 
আর রামকষ্ণ গিয়ে যে গুড়ের ভেলি চেয়ে এনেছিল সেগুলো অবশ্য কিছু আছে, কিন্তু 
শুধু গুড় দিয়ে তো কফি হয় না। গ্রামের লোকেরা এদের আগেই জেনে গিয়েছিল যে, 
অপ্পন্নায়া আবার মায়ের কাছে ফিরে গেছে, কাজেই দোকানী ধারেও এখন কিছু আর 
দিতে চায় না। উপায় কি এখন? না খেয়ে থাকতে হবে না কিঃ কফি না খেয়ে 
এদিকে মাথা ধরে উচেছে। বাড়ির বড় পঞ্চপান্রটা কাশিমবদ্দির কাছে বাঁধা রেখে দু টাকা 
পাওয়া গেল। এক টাকায় আট সের চাল, দু আনার কফির গুঁড়ো আর এক আনার দুধ 
কিনে আনা হল শেষ পযন্ত। 

এদিকে মায়ের সঙ্গে গ্রামে ফিরেছে অপ্পনায়া। বৌয়ের কাছে যায়নি এখনও । সাতু 
চারমাস পোয়াতি। সে নিজে না গিয়ে আবার ছেলেকেই পাঠাল স্বামীর কাছে। কিন্ত্ত 
গজম্মা ছোট্ট ছেলেটাকে তাড়িয়ে দিল এই বলে যে, “যা যা, যে কলাঙ্গার তোর জন্ম দিয়েছে 
তার কাছ থেকেই খোরাক যোগাড় করতে বল্‌ গে যা। 

ছেলে বাড়ি ফিরে মাকে বলল, যা যা শুনে এসেছে ঠাক্মার মুখে । শুনে অসম্ভব 
রাগ হল সাতৃর। তঙ্গম্মা তো তেলে-বেগুনে ভ্বলে উঠল। সাতু অবশ্য বলল, “মা, তুমি 
এ ঝগড়ার মধ্যে থেকো না। কিন্তু তজম্মা সে কথায় কান না দিয়ে সোজা গিয়ে হাজির 
হল হনুমান মন্দিরের সামনে । চিত্কার করে বলল জামাইকে. “ঘরে একদানা খাবার 
নেই। বৌ বাচ্চাকে খাওয়াবার মুরোদ নেই যার, তার বিয়ে করার সখ হয় 
কেন, 

গঙ্গম্মাও সমান তেজে জবাব দেয়, “ওরে পুজুরি বামুনের বৌ, শুনে রাখ, আমার 
ছেলে চিরকাল বেশ্যা নিয়ে ঘর করবে না। 

“কে বলে আমার মেয়ে বেশ্যা ঃ তুই নিজেই নিশ্চয় জাত খুইয়ে এ ছেলের জন্ম দিয়েছিস ! 
আমরা তো তোকে জাতে তুলেছি, কিন্তু তোর এ কুকুরির মত স্বভাব যাবে কোথায় !” 
তঙ্গম্মার কথার মধ্যেই এসে পৌছয় সাতু, সে মাকে বলে, “মা তুমি কেন মুখ নষ্ট 
করছ। যা খুশি বলতে দাও ওদের। এ সব মিথ্যা বলার পাপেই ওরা ডুববে ।” গঙ্গম্মা 
সাতুর কথাগুলো শুনতে পেয়ে ছেলের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে, “কথা শুনছিস অপ্পন্না? প্রথমে 
মাকে পাঠিয়েছে শিখিয়ে-পড়িয়ে তারপর এখন আবার আমার কথাকে পাপ বলা হচ্ছে। 
স্বামীর অনুপস্থিতিতে ছেলে বিয়োন পাপ নয় বুঝিঠ ইতিমধো অপ্পন্নায়াও ক্রুদ্ধভাবে 
বেরিয়ে এসেছে ঘর থেকে, সে চেচিয়ে ওঠে, “তুই কি ভেবেছিস আমি জানিনে তোর স্বভাব 
চরিত্র কেমন£ আজ জতোপেটা করব তোকে বুঝলি ছেনাল?' এবার সাত আর তঙ্গম্মা 
ঘাবড়ে গিয়ে চুপচাপ বাড়ি ফিরে যায়। গজম্মা এবার পরামর্শ দেয়, “চুপ করে দেখছিস 


১০ 


১৪৬ গৃহভঙ্গ 


কি£ ওর মঞ্জলসূত্রটা কেড়ে নিয়ে দূর করে দে এ গ্রাম থেকে । এঁ ঘরখানা তো তুইই 
তুলেছিস, আগুন ধরিয়ে দে ওতে। 

অপপন্নায়া তৎক্ষণাৎ চলে গেল স্ত্রী পুন্রকন্যাকে বিতাড়িত করতে । সাতু গিয়ে ঘরে 
ঢুকছে এমন সময় পিছন থেকে তার মজলসূত্র ধরে মারল এক টান, সুতো ছিড়ে পুঁতি- 
গুলো ছড়িয়ে পড়ল মাটিতে, মাজল্যপূর্ণ মাদুলীটা তখনও সুতোর মধ্যেই রয়েছে । এদিকে 
সাতুর গলার পাশটা কেটে রত্ত বেরোচ্ছে, সে “ও মাগো” বলে লুটিয়ে পড়ল 
মাটিতে । বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ল অপ্পন্নায়া। রান্নাঘরে উনুন ত্বলছিল, তার থেকে 
একটা ত্বলস্ত নারকেলের ডাঁটা তুলে নিয়ে সে ছাদের নারকেলপাতার ছাউনীতে আগুন 
ধরিয়ে দিল, ঘরের মধ্যে থেকেই ত্বলে উঠল ছাদটা। ওপর থেকে দেখা যেতে লাগল 
ধোয়া ও আগুনের শিখা । মহা শোরগোল শুরু হয়ে গেল, পথচলতি লোকেরা এসে জমা 
হল সেখানে । 

তঙজম্মা চিৎকার করছে, “ওগো আমাদের সবস্ব পুড়ে গেল, তোমরা এসে জিনিসগুলো 
বাইরে বার করে দাও গো। লোকে সাহায্য করতে হাত লাগাল, সবাই মিলে বাসন- 
কোসন, কাপড়-চোপড়, ঝুড়ি-বালতি যা পেল বাইরে এনে ছুঁড়ে ফেলতে শুরু করল। 
নারকেলপাতার কুঁড়েতে আগুন লাগলে জল ঢেলে নেভানোর চেস্টা ব্ৃথা। তাছাড়া জল 
নেইও কাছাকাছি। সুতরাং মাত্র দেড় বছর আগে অগ্পন্নায়া নিজে হাতে কোদাল চালিয়ে, 
মাটি মেখে দেওয়াল গেথে যে কুটির গড়ে তুলেছিল তা তারই স্বহস্তে লাগানো আগুনে 
পুড়ে ছাই হয়ে গেল আধঘন্টার মধ্যে। রইল শুধু পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া নিচের 
দেওয়ালটুক্‌ আর পাথরের পিলপেশুলো। 

অপ্পন্নায়া বাঘের মত গর্জন করে উঠল, “দেখছিস তো, কি করতে পারি আমি? 

তঙম্মা বলে উঠল “এর হাত খসে পড় ক” কিন্তু তৎক্ষণাৎ সাতু বলে উল, “মা, 
আমার দিব্যি, তুমি কোন কথা বোল না। 

এ হারামজাদীর মঙ্গলসূত্র আমি কেড়ে নিয়েছি। এখন ও আমার স্ত্রী নয়, আমিও 
ওর স্বামী নই। বেশ্যা কোথাকার ***1” এই সব শোনাতে শোনাতে ছেঁড়া মঙ্গলসুন্ত্রটা 
উঁচু করে ঝুলিয়ে সবাইকে দেখিয়ে গ্রামের পথে পথে ঘুরে এল অপ্পন্নায়া। 

বাড়িতে আগুন লাগার খবর পেয়ে নন্জশ্মাও ছুটে এসেছিল, অন্যদের সঙ্গে হাত 
মিলিয়ে সেও যথাসাধ্য জিনিসপত্র টেনে টেনে বার করেছে। কিন্তু এখন কি করা উচিত, 
কি বলা উচিত কিছুই বুঝতে পারছিল না সে। সাতুই তার কাছে এসে বলল, “দিদি 
তুমিই আমার একমান্র ভরসা।” কিন্তু নন্জম্মা কি ভরসা দেবে ভেবে পেল না। এই 
মুহ্র্তে অগ্পন্নায়াকে কিছু বলতে যাওয়া ঠিক হবে না, আর শাশুড়ী গঙ্শ্মার সঙ্গে এ 
ব্যাপারে কোন আলোচনা করতে যাওয়া তো বাতুলতা মান্র। 

সে জিক্তাসা করল সাতুকে, “আমি কি করতে পারি বল্‌ 

“এখন দু-একদিন তো তোমার বাড়িতে আশ্রয় দাও, তারপর ভেবে দেখি কি করা 
যায়।, 

এ পরিস্থিতিতে “না বলা সম্ভব নয় নন্জম্মার পক্ষে। উপস্থিত লোকগুলিকে সে 


গৃহতজ ১৪৭ 


ঙ্ 


অনুরোধ করল, “তোমরা সবাই মিলে এদের জিনিসপন্রগুলো একটু আমার বাড়ি পর্যস্ত 
পৌঁছে দাও ভাই। সে নিজের হাতেও তুলে নিল কিছু জিনিস। সবাই মিলে এ বাড়ির 
জিনিসপত্র এনে নন্জন্মার বাড়ির একটা ঘরে রেখে গেল। এবার নন্জম্মা ঢুকল 
রান্নাঘরে । এরা তো আবার মড়ুয়ার রুটি খাবে না, সুতরাং বিশেষ পাল-পার্বণের 
জন্য তুলে রাখা সঞ্চয় থেকে কিছু চাল বার করে ভিজিয়ে দিল সে। ঘরে অড়হর ডালও 
বাড়ন্ত। পার্বতীকে দোকানে পাঠিয়ে চার আনায় এক সের ডাল আনাল। 

সবাই গিয়ে বড় বৌয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে শুনেই ছটফটিয়ে উঠল গজম্মা। এএ ডাইনী 
আবার কিছু ছলা-কলা করে আমার বাছাকে বশ করে ফেলবে” ভাবতে ভাবতে ছুটল সে 
অন্নাজোইসের বাড়িতে, বলল, “জোইসজী, খবর শুনেছেন তো? 

গঙ্গম্মার মুখেই বিশদ বিবরণ শোনার আশায় জোইস বললেন, “কই না তো! কি 
হয়েছে কি? 

ছেলে কিভাবে বীরের মত স্ত্রীর গলা থেকে মজলসুন্র কেড়ে নিয়েছে দে-কাহিনী সবিস্তারে 
বর্ণনা করে গজম্মা প্রশ্ন করল, “যার মঙ্গলসন্র কেড়ে নেওয়া হয়েছে তাকেই কিনা নিজের 
বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছে বড় বৌ! পঞ্চায়েত ডেকে ওকে শান্তি দেওয়া উচিত কিনা 
আপনিই বলুন £ 

ধর্মের বিধান ব্যাখ্যা করার একটা সুযোগ পেয়ে গেলেন অন্নাজোইস। মনে মনে 
তৎক্ষণাৎ স্থির করে ফেললেন পঞ্চায়েত ডেকে নন্জম্মার অন্তত পঁচিশ টাকা জরিমানা 
করাতে হবে। কিন্তু তখনি মনে পড়ল, কিছুদিন আগেই বর্ষাসনের ভাগ আদায় করানোর 
জন্য যে পঞ্চায়েত বসেছিল তাদের কিভাবে আপ্যায়িত করেছে নন্জম্মা। তার পরদিন 
এলাকাদারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেটাও বিশেষ সুখকর বলা 
চলে না, কাজেই একটু ভেবে চিত্তে এগোতে হবে। সেবারকার অপমানের শোধ নেওয়া 
দরকার। গঙ্গম্মাকে একটু অপেক্ষা করতে বলে, অন্নাজোইস গেলেন খুড়ো অইয়াশাস্ত্রীর 
কাছে। এমন চমৎকার সুযোগ হাতছাড়া করার পান্তরই নন অইয়াশাস্ত্রী। তিনিও সদন্তে 
ঘোষণা করলেন, “এটা ব্রাক্মণ্য ধর্মের সমস্যা, ব্রাহ্মণের ধর্মকে শুদ্ধাচারে রক্ষা করতে 
হবে, না রসাতলে পাঠাতে হবে, তাই স্থির করার সময় এসেছে এখন ।, 

সুতরাং ব্রাহ্মণ্য ধর্মের এই দুই রক্ষাকতা গ্রামের অন্যান্য ব্রাহ্মণদের একত্রিত করে 
সদলবলে এলেন নন্জম্মার বাড়িতে । গজম্মা এবং অপ্পন্নায়াও আছে তাঁদের সঙ্গে। 
এরা সব এসেছেন ন্যায়বিচার করতে । নন্জম্মার সে খেয়াল আছে কিনা কে জানে। 
অন্নাজোইসজী প্রথমে শুরু করলেন, “যার মঙ্গলসুন্র খোয়া গেছে সে স্ত্রীলোক বিধবা তুল্য। 
কিন্তু এক্ষেত্রে পতি জীবিত, সুতরাং তাকে বিধবা বলা চলবে না, অতএব এরূপ স্ত্রীলোককে 
জীবিত অবস্থাতেই মৃত বলে গণ্য করতে হবে। এরূপ স্ত্রীলাকের মুখদর্শন করাও অনুচিত, 
অথচ এগৃহে তাকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে । এই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে, সেজন্য 
তোমাদের জরিমানা দিতে হবে ।, 

জরিমানার কথা শুনেই ঘাবড়ে গেল চেন্নিগরায়। বলে উঠল, “আমি কিছু জানিনে 
মশাই, ওই ও নিয়ে এসেছে এদের। যদি বলেন তো এখনই এদের গলাধান্কা দিয়ে 


১৪৮ গৃহভঙ্গ 


বিদায় করে দিচ্ছি), 

“তা হলে তো কোন কথাই নেই। কিন্ত এরাতো ইতিমধ্যেই বাড়িতে প্রবেশ করেছে, 
কাজেই জরিমানা তো দিতেই হবে । 

“কত দিতে হবে £, 

“ুড়োমশাই, আপনি বলুন” প্রশ্ন করেন অন্নাজোইস ॥ অহইয়াশাস্ত্রী রায় দেন, “এরাও 
গরীব, সেটাও বিবেচনা করতে হবে, তা-_পঁচিশ টাকা হলেই যথখেন্ট হবে! 

“এত টাকা কোথায় পাব শাস্ত্রীজী, আরো কিছু কম করুন দয়া করে! 

“আরে চিন্নয়া, তুমি কি ভাবছ এ টাকা আমার হাতে থাকবে? তা মোটেই নয়, 
এ টাকা পাঠাতে হবে একেবারে সেই শঙ্গেরী মতে ।, 

এর ওপর আর কোন কথা নেই। চেনিগরায় এবার ফেটে পড়ে নিজের স্ত্রীর ওপর, 
“ছেনাল কোথাকার! কি ভেবেছিস কি তুই£ এই অলঙক্ষুণেদের কেন বাড়িতে এনে 
তুললি শুনি£ এখুনি গলাধাক্কা দিয়ে বিদেয় কর সব কটাকে।” 

তঙ্গশ্মা এতক্ষণ রান্নাঘরে বসে বসে সবই শুনছিল, এবার বাইরে এসে বলল, 
“জোইসজী, আপনার সঙ্গে আমাদের এতদিনকার আত্মীয়তা, আজ হঠাৎ এমন শত্রুতা 
করছেন কেন£ আপনার কি ক্ষতি করেছি আমরা বলন তো, 

“দেখ বোন, ব্যক্তিগতভাবে তোমার প্রতি আমার কোন বিদ্বেষ নেই, কিন্তু এ হল 
শাস্ত্রের বিধান। এই ব্যাপার ঘটতে দেখেও যদি চুপ করে থাকি তাহলে শুঙ্গেরী মতে 
আমাদের জবাবদিহি করতে হবে যে!” বললেন অন্নাজোইসজী । 

নন্জম্মা এতক্ষণ চুপ করে ছিল, এবার দে বলে উঠল, “অপপন্নায়া মঙ্গলসূন্্র ছিড়ে 
দিয়েছে। স্ত্রীর গলা থেকে এভাবে মঙ্গলসন্র টেনে ছিড়ে নেবার অধিকার কি স্বামীর আছে £ 
শাস্ত্রে কি বলে এ বিষয়েঃ জরিমানা যদি করতে হয় তো তাকেই করা উচিত। ঘর- 
দোর পুড়ে গেছে, ছেলেপেলে নিয়ে নিরাশ্রয় হয়ে পড়েছে এরা, এ সময় আশ্রয় না দিয়ে 
কি করা উচিত ছিল£ঠ আপনাদের ধর্মশাস্ত্রে কি এই লেখা আছে যে, “লোকে বিপদে 
পড়লে কোনমতেই সাহায্য করবে না তাকে”ঠ, 

ধর্মের ধ্বজাধারী দুই পণ্ডিত এবার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। বউটা যেন জাদু 
জানে, সমস্ত দোষ এখন তার ছেলের ঘাড়েই এনে ফেলছে দেখে গঙ্গশ্মা প্রায় বক্রাহত 
হয়ে পড়ল। রব্রদ্ধ অইয়াশাস্ত্রী বললেন, “মঙজলসূন্র সেই পরিয়েছিল আবার সেই খুলে 
নিয়েছে "১? অন্নাজোইস কথার মাঝখানেই তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন, “আপনি 
চুপ করুন খুড়োমশায়। শুনছি তো সাতুই নাকি তেজ দেখিয়ে মঙ্গলসূন্র ফিরিয়ে দিয়েছে, 
বলেছে, “তোমার দেওয়া মঙ্গলসূত্র চাই না আমার”, তাই না গঙ্গম্মা 2 

“হ্যা, হ্যা, তিক তাই। এ হারামজাদীই ““মঙ্গলসূত্র চাই না” বলে ছিড়ে ফেলে দিয়েছে ।” 

তঙ্গশ্মা বলে উঠল এবার, “এসব পাপ কথা মুখে আনছ কেন£ কোন প্রমাণ আছে 
তোমাদের কাছে £ 

“সারা গ্রাম চোখে দেখেছে এসব। আবার কি প্রমাণ দিতে হবে শুনি£ জবাব 
দিল গজশ্মা। 


গৃহভঙ ১৪৯ 


এইভাবে ন্যায়বিচারের কাজটায় বাধা পড়ে গেল। এদের হয়ে লড়াই করবার মত 
তেমন শক্তিশালী পুরুষমানুষ কেউ থাকলে হয়ত এই কলহের ফলাফল অন্যরকম দাঁড়াত। 
নন্জশ্মা সেটা ভাল করেই জানে, তাই এবার সে শক্ত হয়ে বলল, “জোাইসজী, আপনারা 
কেউই স্বচক্ষে ঘটনাটা দেখেননি । পরের সংসারে ঝগড়া বাঁধিয়ে দিয়ে এভাবে তামাশা 
দেখতে আসেন কেন আপনারা £ এটা কি ভদ্রলোকের কাজ £ কে ডেকেছে আপনাদের ? 
যান, আর কথা না বাড়িয়ে, বাড়ি যান। আর হ্যা, ভবিষ্যতে আর কখনও এইরকম 
ন্যায়বিচার করতে আমার বাড়ি আসবেন না আপনারা ।, 

“দেখুন জোইসজী, দেখুন একবার, কি অহঙ্কার হারামজাদীর-_-কথা শুরু করেছিল 
গঙ্শ্মা, এর মধ্যে হঠাৎ রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল সাতু, দরজার পাশে রাখা ঝাঁটা- 
গাছটা তুলে নিল হাতে, তারপর “এই ঘরভাঙানী মেয়েমান্ুষটাই সব নম্টের গোড়া” বলতে 
বলতে ঝাঁটাটা ছ-ড়ে মারল শাশুড়ীর মুখের ওপর। আচমকা এই ব্যাপারে গশ্মার মুখ 
দিয়ে কোন কথা বেরোল না। কিন্তু তেলেবেগুনে ভ্বলে উঠে তেড়ে এল অগ্পন্ায়া। 
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে নন্জন্মা তাড়াতাড়ি সাতু আর তঙ্গম্মাকে ঠেলে রান্নাঘরে ঢুকিয়ে 
দরজা বন্ধ করে দিল, তারপর দরজাটা আগলে দাঁড়িয়ে চেচিয়ে উঠল, “আপনারা সবাই 
এখান থেকে যাবেন কি-না £ দুই পুরোহিতই উঠে পড়লেন। অন্য ব্রাহ্মণেরাও এই 
ব্যাপারে তাঁদের কোন দায়িত্ব নেই বুঝে যাবার জন্য পা বাড়ালেন। কিন্তু ইতিমধ্যে 
গঙ্গম্মা ক্ষেপে উঠেছে । কোণায় রাখা উদৃখলের মুষলটা তুলে নিয়ে সে এগিয়ে এল 
রান্নাঘরের দরজার সামনে । নন্জম্মা দরজা আগলে গর্জে উঠল, “এটা পাটোয়ারীর 
বাড়ি, মনে থাকে যেন। তেমন কিছু ঘটলে আমি এখনি পুলিশ ডাকব ।, একট্রু ঘাবড়ে 
গেল গঙ্গম্মা। অপ্পন্নায়া তো এই হুমকি শুনেই ঘামতে শুরু করেছে। মায়ের হাত 
থেকে মুষলটা টেনে নিয়ে রেখে দিতে দিতে সে বলল, “চল মা এই ছোটলোকদের বাড়িতে 
আর থাকতে হবে না।” কিন্তু একেবারে মুখ বুজে চলে এলে মান থাকে না তাই বেশ 
কিছুক্ষণ গালিবর্ষণ করে তারপর ছেলেকে অনুসরণ করে ফিরে গেল গজম্মা। 

ভাত ডাল সবই রান্না হয়েছে, কিন্তু সাতু বা তঙ্গশ্মা কিছুই মুখে তুলতে পারল না। 
এবার দিন চলবে কি করে সেই ভাবনায় দুজনেই উদ্দিগ্ন। দুপুরের ঘটনার আকস্মিকতা 
ওদের খুব আঘাত দিয়েছে। 


€ 


সারা রাত মা ও মেয়েতে অনেক আলোচনা হল। সকালে উঠে নন্জম্মাকে বলল তঙশ্মা, 
“আর এখানে থেকে লাভ কিঃ গ্রামে আমাদের একখানা বাড়ি ছিল, কিন্তু এখানে আসার 
আগে সে বাড়ি বিকী করে এসেছি। তবে আশেপাশের গ্রামে দু-চার ঘর শিষ্য আছে। 
রামক্ষ্ণকর বয়স তো প্রায় আট বছর হয়ে এল, কোনরকমে ওর পৈতেটা দিয়ে নিলে বাঁধা 
ঘরগুলোতে পৃজোপার্বন, নবগ্রহদান এসব কাজ করতে পারবে, তাইতেই যা হোক করে 


১৫০ গৃহভজ 


পেট চালাতে হবে। কেউ দয়া করে একটু জায়গা দিলে সেখানেই একখানা কুঁড়ে বেধে 
নেব।, 

নন্জশ্মা কি পরামর্শ দেবে এদের £ এরা মা মেয়ে কেউই পরিশ্রম করতে পারে 
না, মড়য়ার রুটি, লোন্দা এদের রোচে না। গরীব ঘরের মত খাওয়া দাওয়ার অভ্যাস 
করার চেম্টাও করে না এরা, তা যদি করত তাহলে অপ্পন্নায়া হয়ত এ কাগড বাঁধাত 
না। গ্রামে ফিরে গেলেও এদের অভ্যাস বদলাবে বলে মনে হয় না। কিন্তু নন্জম্মার 
পক্ষেও তো আর কিছু করা সম্ভব নয়, কাজেই মা ও মেয়ের এই পরিকল্পনায় সম্মতি 
দেওয়া ছাড়া আর কি করবে সেঃ এখন এরা যত শীঘ্ সম্ভব এ গ্রাম ছাড়বার জন্য 
ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। সাতু তার কানবালা দুটি বিকী করতে চাওয়ায় নন্জম্মার এক 
প্রতিবেশিনী পঁচিশ টাকায় সে দুটো কিনে নিল। এ থেকে পথ খরচটা হয়ে যাবে। নন্জম্মা 
পায়েস রাঁধল সেদিন। সাত আর জয়লক্ষমীকে সিদুরের টিপ পরাল। পরদিন গরুর 
গাড়িতে সব মালপন্তর চাপিয়ে বাস ছাড়ার জায়গা পর্যন্ত এল ওদের সঙ্গে সঙজে। যাবার 
সময় সাতু বলল, “দিদি দুজনেই এ বাড়িতে বউ হয়ে এসেছিলাম। তুমি তো কোনরকমে 
এখনও মানিয়ে চলছ, কিন্তু আমার কপালে শেষ পর্যন্ত এই ছিল।” 

এ কথার জবাবে কিছুই বলতে পারল না নন্জম্মা। বিয়ে হয়ে এ গ্রামে আসার 
পর থেকে একটার পর একটা ঘটনা সব মনে পড়ছিল। “কেনই বা আমরা জন্মেছিলাম, 
আর কি কুক্ষণেই এ বাড়িতে সম্বঞ্ধ হয়েছিল আমাদের £ এই প্রশ্মগুলোই উঠছিল তার 
মনের মধ্যে তখন। বাসের ছাদে মালপন্তর সব তোলা হলে, সবাই উঠে বসল ভিতরে। 
একবার আমাদের গ্রামে যেও দিদি একথা বলার সময় মনে মনে দুজনেরই গভীর সন্দেহ 
ছিল, কি জানি আর কখনও দুই জায়ে দেখা হবে কি না। 

খালি গরুর গাড়িটায় চড়ে বাড়ি ফিরে এল নন্জম্মা। কিছুক্ষণ পরে মাস্টার 
সুরপ্পার স্ত্রী রুকম্মা এল ওর বাড়িতে । এদিক ওদিক দু-চার কথা বলার পর সে জানাল, 
“লোকে বলছে আপনাদের একঘরে করার জন্য অন্নাশাস্ত্রীজী নাকি মঠে চিঠি লিখেছেন ।, 

“চিঠি লিখে কি করবে? 

“ওমা, তা জানেন না বুঝি2 মঠ থেকে আদেশ আসবে যে, গ্রামের কেউ যেন এ 
বাড়িতে যাওয়া-আসা খাওয়া-দাওয়া কোন কিছু না করে। সবাই সব সম্পর্ক তুলে 
দেবে। গ্রামের জাতভাইদের কাছে একঘরে হয়ে থাকলে জীবন কাটবে কি করে 

কথাটা শুনে নন্জম্মাও প্রথমটা বেশ থতমত খেয়ে গেল, কিন্তু তারপরই ওর মনে 
হল জাতভাইরা এতদিন পর্যন্ত কবে ওর কোন উপকারটা করেছে £ ভবিষাতেও কিছু 
করবে এমন কোন আশা আছে নাকি £ তাহলে কেউ ওর বাড়িতে না এলে কি আর 
ক্ষতি হবেঃ যা হোক, সে যে একটুও ভাবনায় পড়েছে এমন ভাব বাইরে একেবারেই 
প্রকাশ করল না। 

দিন পনেরো পরে অন্নাজোইস ও অহইয়াশাস্ত্রী এলেন নন্জম্মার বাড়িতে, এসেই একটা 
চিঠি দিলেন তার হাতে । শুঙ্গেরীর সর্বাধিকারীর স্বাক্ষরযুক্ত সেই চিঠিতে লেখা রয়েছে, 
“যে স্ত্রীলোক নিজের স্বামীকেই অস্বীকার করেছে এবং মঙ্গলসূন্র ছিড়ে ফেলে দিয়েছে সেই 


গৃহভ্গ ১৫১ 


স্্রীলোককে স্বগৃহে প্রবেশ করতে দেওয়ার অপরাধে পাটোয়ারী চেন্নিগরায়ের পরিবারকে 
সমাজ থেকে বহিষ্কৃত করা হল। এই মঠে একশত টাকা জরিমানা দিয়ে, 
দূর্বা পুড়িয়ে জিহবা পরিশুদ্ধ করে, গ্রামের পুরোহিত দ্বারা প্রায়শ্চিত্ত না করা পর্যন্ত এই 
পরিবারের সঙ্গে কারো অগ্নি বা জল দেওয়া নেওয়ার সম্পক থাকবে না। যে এই নির্দেশ 
অমান্য করবে তাকেও সমাজ থেকে বহিম্কৃত করে সকলে শ্ীমের সঙ্গে সহযোগিতা 
করুন। চিঠির ওপর মঠের শিলমোহরের ছাপও রয়েছে। 
চিতিখানা পড়ে ফেলল নন্জম্মা। অইয়াশাস্ত্রী প্রশ্ন করলেন, “ক করবে এখন £ 
নন্জম্মা উত্তর দিল, “এতকাল ধরে রামনবমীর দিন কোনমতে শরবৎ মিষ্টি ইত্যাদি 
তৈরী করে আপনাদের পাঁচজনের সামনে পরিবেশন করতাম, এখন থেকে সেটা আর 
তৈরী করতে হবে না। 
তরী করলেও আমরা কেউ খেতে আসব না, 

“সে আপনাদের অভিরুচি |” 

“রাজমহলের সঙ্গে টক্কর দিয়ে বাঁচতে পারবে £ গুরুগৃহ থেকে বহিম্কারের আদেশ 
এসেছে, এরপর জীবন দুর্বহ হয়ে উঠবে তোমাদের এটা মনে রেখো* শাসিয়ে দিয়ে চলে 
গেলেন দুই পুরোহিত । নন্জম্মার যথেজ্ট অপমানিত মনে হচ্ছিল নিজেকে, কিন্তু সে 
ভয় পায়নি একট্ুও। দ্বিতীয় দিন সে একটি পন্ত্রে সমস্ত বিবরণ বিশদভাবে লিখল । 
-_মায়ের প্ররোচনায় পুন্র নিজেই স্ত্রীর গলা থেকে মঙ্গলসূন্ত্র ছিড়ে নিয়েছে, এক্ষেত্রে স্ত্রীর 
কোন দোষ ছিল না। এরপর অনাথ স্ত্রী ও তার সন্তানদের একদিনের জন্য পাটোয়ারীর 
বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে তারপর তাদের স্বগ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর কোন অন্যায় 
তারা করেনি, ইত্যাদি সব কিছু লিখে নিচে স্বামী চেন্নিগরায়কে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে, 
পরদিন পোস্টম্যানের কাছে একটি লেফাফা চেয়ে নিয়ে তাকে দিয়েই ঠিকানা লিখিয়ে 
চিঠিখানা পাঠিয়ে দিল নন্জম্মা। কিন্তু বহুদিন কেটে যাবার পরও কোন উত্তর এল না 
মত থেকে। 

পৌষ মাসে শ্বশুরের বাৎসরিক শ্রাদ্ধ। এতদিন এ অনুষ্ঠান বড় ছেলে চেন্নিগরায়ের 
বাড়িতেই হয়ে আসছে । নিজে একপয়সাও খরচ না করে অপ্পন্নায়াও এখানে এসেই 
তপণের কাজ সেরে চলে যায়। আসল শ্রাদ্ধের কাজ বড় ছেলেই করে, কনিষ্ঠ কেবল 
চুপ করে বসে দেখে এবং পুরোহিতের নির্দেশ মত যথাসময়ে প্রণাম করে। . এরা 
আলাদা হবার পর থেকে স্বামীর শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানে যোগ দিতেও আসত না গজম্মা, 
কিন্তু ইদানীং শ্রাদ্ধের দিনে সে আসতে শুরু করেছিল। এবার পুরোহিতেরা আগেই 
জানিয়ে দিয়েছেন যে যেহেতু এরা “একঘরে” তাই এদের বাড়িতে শ্রাদ্ধের কাজ করাতে 
এবং পংস্তি ভোজনে যোগ দিতে তাঁরা আসবেন না। চেন্নিগরায় মহা দুশ্চিন্তায় পড়েছে। 
সব গণ্ডগোলের মূল হচ্ছে এই বউটি। তাকেই গালাগাল দিয়ে গায়ের ভ্বালা মেটায় সে-- 
“হারামজাদী, কেন খামোকা ওদের বাড়িতে এনে তোকাতে গেলি ।* স্ত্রী চুপ করেই শুনে 
যায় কিন্তু সমস্যার কোন সমাধান হয় না। 

দুই পুরোহিত মিলে স্থির করেছেন, এ বছর বাৎসরিক শ্রাদ্ধ হবে গরঙ্জম্মার বাড়িতে, 


১৫২ গৃহভঙগ 


অপ্পন্নাই উপোষ করে শ্রাদ্ধ করবে । অর্থাৎ তাকে বাড়ির কতার সম্মান দেওয়া হচ্ছে। বেশ 
খুশি হয়ে ওঠে অপ্পনায়া, সেও তাহলে একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি হয়ে উঠল। তাছাড়া, এ বাড়িতে 
শ্রাদ্ধ হলে খাবার দাবার বড়া, লুচি, সুজির নাড়, ইত্যাদি যা উদ্বত্ত থাকবে অন্ততঃ সাত-আট দিন 
ধরে খাওয়া চলবে সেগুলো । কিন্তু খরচটা যে সমস্ত ওর ঘাড়েই পড়বে সেটার দিকে খেয়ালই 
নেই তার। 

খরচের কথা গঙ্গম্মাও বিশেষ ভাবছে না। খরচ হবে বড়জোর পনেরো-যোল টাকা, 
সে কোনরকমে যোগাড় হয়েই যাবে। যেসব জায়গায় সে ভিক্ষায় যায় সেখানে স্বামীর 
শ্রাদ্ধের কথা বললে সবাই দু-চার আনা করে দেবে। তাছাড়া নারকেল, তিসি, কলাই 
ডাল, বরবটি এসব যা পাওয়া যাবে তা দিয়ে তিনটে শ্রাদ্ধ হয়ে যায়। কিন্ত সমস্যাটা 
অন্য। বড় ছেলের বর্তমানে তার হাত দিয়ে পি না দিয়ে ছোট ছেলেকে দিয়ে পিগুদান 
করলে স্বরগলোক থেকে কাকের রূপধারী স্বামী এসে সে পিশু জ্পর্শ করবেন কি? 
পাটোয়ারীর কাজ যেমন বড় ছেলেরই প্রাপ্য তেমনি শ্রাদ্ধ ও পিওদানের অধিকারও তো 
তারই । সুতরাং গঙ্ম্মা চলল জোইসজীর বাড়ি। জরিমানার একশ" টাকা দেবার 
ক্ষমতা তো কারোই নেই। কিন্তু এদের অপরাধের জন্য স্বর্গগত স্বামী রামন্নাজী যদি 
বাৎসরিক পিগুটাও না পান তাহলে তাঁকে উপবাসে থাকতে হবে যে! তাছাড়া আসল 
অপরাধ তো এঁ হারামজাদী বৌয়ের, চিন্নয়া বেচারা তো কিছু করেনি। এখন কি ব্যবস্থা 
করা যায় £ 

গশ্মার কথায় যুক্তি আছে এটা দুই পুরোহিতকেই মানতে হল। এখন সিদ্ধান্ত 
নেওয়া হল যে যৎসামান্য জরিমানা নিয়ে চেন্নিগরায়কে আবার সমাজে গ্রহণ করা হবে 
কিন্তু তার স্ত্রী, পুন্র, কন্যা “একঘরে” হয়েই থাকবে । কিন্তু জরিমানা দেবার মত সামান্য 
টাকাও কি আছে চেন্নিগরায়ের £ অগত্যা দুই পুরোহিত সেটারও ব্যবস্থা করে দিলেন। 
এ গ্রামে অন্নাজোইসকে খাজনা দিতে হয় মোট ন'টাকা আট আনা । অইয়াশাস্ত্রীর দেয় 
খাজনা মান্র ছ'টাকা তিন আনা পাঁচ পাই। চেন্নিগরায় এদের দুজনকেই এই মর্মে রসিদ 
লিখে দিল যে এদের কাছ থেকে সে সরকারী রাজস্ব পেয়ে গেছে । পরে এই টাকা তার 
বর্ষাসন থেকে কাটিয়ে দিলেই হবে, সে ব্যবস্থা তো আছেই। যাক, এইভাবে পাটোয়ারী 
চেনিগরায় তার বাৎসরিক পিতুশ্রাদ্ধ করার অধিকার ফিরে পেল। স্থির হল সে তার 
মায়ের বাড়িতে গিয়ে পিতৃশ্রাদ্ধ সম্পন্ন করবে । তার স্ত্রী আর ছেলেমেয়েদের সেখানে 
প্রবেশ নিষেধ। 

অন্নাজোইসকে পূর্বপংক্তিতে বসতে হবে তাই সেদিন সকাল থেকে তাঁর উপবাস। 
তাছাড়া সকালে আর কোন কাজও নেই। তাঁর স্ত্রী বেঙ্কটলক্ষমী রান্নাঘরে বসে তরকারী 
কুটছিল। সকাল থেকে উপোষ করার জন্যই বোধ হয়, কবে একবার শ্বশুর বাড়িতে খাওয়া 
ঘিয়ে ভাজা লুচির স্মৃতি অন্নাজোইসকে উতলা করে তুলল। তিনি রান্নাঘরে গিয়ে স্ত্রীকে 
বললেন, “সেই যে একবার তোমার মা ঘিয়ে ভাজা লুচি খাইয়েছিলেন নাঃ আহা সে স্বাদ 
আর ভোলবার নয় । তা তুমি তো কখনো এ রকম লুচি তৈরী কর না?, 

“তা, অতখানি ঘি যদি এনে দিতে পার তাহলে যা চাইবে সবই ঘিয়ে ভেজে দেব এখন । 


গৃহভঙ ১৫৩ 


“এক সের ঘি চার আনা। আনব কোথা থেকে £ 

“তা হলে আবার খাওয়ার সখ কেন £ চুপ-চাপ থাকলেই হয় !, 

জোইসজী একটু মিইয়ে গেলেন। একটু পরে একটা উপায় মনে পড়ল। স্ত্রীকে 
বললেন, “আজ মাখন থেকে তৈরী ঘিয়ে ভাজা খাবার খাব, দেখে নিও। স্ত্রী এবার 
ব্যঙ্গ করে শুনিয়ে দিল, “কে অতসব খাওয়াচ্ছে তোমায় £ চপ করে থাক, বেশী কথা 
বোল না।, 

“দেখতেই পাবে সব' বলেই অন্নাজোইস ছেলেকে ডাক দিলেন, ওরে নরসিং, যা দেখি, 
ছুটে গিয়ে অপ্পন্নায়াকে ডেকে আন একবার 

অপ্পন্নায়া তখন স্নান করে শুচি শুদ্ধ হয়ে ভিজে গামছা পরে মাকে রান্নায় সাহায্য 
করছিল। জোইসজী ডাকছেন শুনে খালি গায়েই ছুটে এল। জোইসজী বললেন, “দেখ 
অগ্পন্না, আমার শরীরটা ভাল চেকেছে না, ঠাণ্ডা লেগে জ্বর হয়েছে। আমি তো কাজ 
করাতে বসতে পারব না।” 

“এখন একথা বললে চলবে কি করে জোইসজী£ এত বেলা হয়ে গেছে, এখন আর 
অন্য কাকে যোগাড় করব 

“তোমার মাকে ডেকে আন, তারপর বলছি । 

গঙ্পম্মাও ছুটে এল। দুর থেকেই প্রণাম জানিয়ে মিনতি করে বলল, “জাইসজী, 
এখন কাজে বাধা পড়লে আমার স্বামী স্বর্গে উপবাসে থাকবেন । 

“দেখি, এত করে বলছ যখন, “না” করি কি করে। ব্রাক্ষমণ ভোজনে গিয়ে না খেয়ে 
থাকাটাও আবার অশাস্ত্রীয়। তা এক কাজ কর। আমার খাবারটা যা দেবে সব কিছু 
ঘিয়ে ভেজে দিও, তাহলে খেতে পারব ।, 

এখন এত ঘি পাব কোথায় জোইসজী £ 

“পয়সা নিয়ে এস, গোয়ালাদের কাছ থেকে আমি মাখন যোগাড় করে দিচ্ছি। এখনও 
তো আমার স্লান হয়নি৷” 

বাড়ি ফিরে গেল গঙশ্মা। এক ব্রাহ্গণকে ঘিয়ে ভাজা খাবার পরিবেশন করলে 
অন্যজনকে তো আর তেলেভাজা দেওয়া চলে না। নিজেদের জন্য না হয় তেলেই রান্না 
হবে। ওদের দুইজনের লুচি, বড়া ইত্যাদি ভাল ঘি দিয়ে ভাজতে হলে অন্ততঃ দেড় সের 
ঘি চাই, অর্থাৎ ছ'সাত সের মাখন। ঘরে তো আছে মোটে দুটি টাকা। গঙ্গম্মার 
নিজের বিয়েতে পাওয়া রূপোর পঞ্চপান্রটা ছিল এখনও, অপ্পন্নায়ার হাতে সেইটেই পাঠাতে 
হল কাশিমবদ্দির কাছে। সে ওজন করে বারো তোলা রূপোর জন্য দিল দু টাকা মান্র, 
তাও প্রতিদিন দু পয়সা করে স্দ। 

যাহোক মাখন থেকে প্রস্ভত ঘিয়ে ভাজা লুচি পেট ভরে খেলেন জোইসজী। যা 
বাকি রইল ছেলে-পেলেদের নাম করে ছাঁদা বেঁধে নিলেন, বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে বললেন, “নাও 
তুমিও খেয়ে দেখ দুটো ।” স্ত্রী বলল “অন্যের বাড়ির শ্রাদ্ধের ব্রাহ্মণ ভোজনের প্রসাদ 

+ আমি কি করে খাব£ঃ, 


“আরে কিছু হবে না, খেয়ে ফেলো । ছেলেদেরও দাও একট্রু একট্রু।, 


১৫৪ গৃহভঙ্গ 


“দেখ বাপু, আমি লৌকিকের ঘরের মেয়ে। তোমাদের শাস্ত্রের আচার নিয়মে আমার 
যথেষ্ট ভয় আছে। পুরোহিতরা নিজেরা না হয় যা খুশি করতে পারে' কথাটা বলে 
হেসে ফেলল বেঙ্কটলক্ষমী। জোইসজী আর জোর করতে পারলেন না এ নিয়ে। 


৬ 


শ্রাদ্ধ-কিয়া এবং ব্রাক্মণ ভোজনের পর চেন্নিগরায় দেবতাকে উৎসর্গ করা পাতার সামনে 
বসে প্রসাদ ভোজন” করল পেট ভরে । তারপর জামাটা পরে ফেলে বাঁধের দিকে চলে গেল। 
বেলা তখন প্রায় সাড়ে চারটে। দুপুরে স্ানের পর থেকে আর পান খাওয়া হয়নি। হন্মান 
মন্দিরে পান সুপারির ব্যবস্থা ছিল না। পান কেনার মত পয়সাও নেই পকেটে । বাঁধ 
থেকে নেমে গ্রামে ঢোকার পথে গ্রামদেবীর ঝাঁকড়া গাছের পাশে নরসীর দোকান । খাপরার 
চালের তিন কামরার বাড়ি, তার সামনের ঘরখানায় দোকান খুলেছে নরসী। পেছনের 
ঘরে থাকে ওর সংসারের জিনিসপন্তর। লোকে বলে একেবারে শেষ ঘরখানার মাচার 
ওপরেও নাকি ঠাসা আছে দোকানের মালপন্্র। 

দোকানে বসে বসেই সে দেখতে পেল পাটোয়ারী আসছে। ওর সামনেই সাজানো 
রয়েছে পানের গোছা। পান আর তামাকের চাহিদায় পাটোয়ারী নিজেই এসে হাজির 
হল দোকানের সামনে, বলল, “নরসী, দু-একটা পান একটু সুপাড়ী আর তামাকপাতা 
দিতে পারবে £ 

নরসীর মুখেও পান রয়েছে। বড় বড় চোখ, গোলগাল মুখখানা তার সর্বদাই পানের 
রসে ভরা থাকে । ভারি ঢলঢলে চেহারাটি নরসীর, দেখলেই মনে হয় কোন দুঃখ নেই 
তার জীবনে, হাসিমুখে কথা বলার সময় তার চোখদুটি এমন ঝিলিক দিয়ে নেচে ওঠে 
যে, দর্শকের আর চোখের পলক পড়ে না। সে বলে উঠল, “ব্যাপার কি পাটোয়ারীজী, 
আমার কাছে পান চাইছেন£ঃ বউ আজ পান সেজে দেয়নি না কি, 

“বাড়িতে পান নেই। আজ আমার বাৎসরিক পিতুশ্রাদ্ধ ছিল, সে কাজ সেরে বাঁধের 
পথ ধরে ফিরছিলাম ।” 

“আসুন আসুন, পান দিচ্ছি। আপনি হলেন এ গ্রামের পাটোয়ারী, আপনাকে কি না 
বলতে পারি£ চোখ নাচিয়ে হাসল সে। যাক এ গ্রামে একজন অন্ততঃ তাকে পাটোয়ারী 
বলে খাতির করছে এতেই ভারি খুশি হয়ে দোকানে ঢুকল চেন্লিগরায়। “আসুন না, ভিতরে 
এসে বসুন” বলে তাকে একেবারে বাড়ির মধ্যেই নিয়ে গেল নরসী। ভিতরটা আবছা 
অন্ধকার, ভাল করে কিছু